ঢাকা      সোমবার ২৪, জুন ২০১৯ - ১০, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাজী শামসুল আরেফীন

মেডিকেল অফিসার (৩৩ তম বিসিএস), 
সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।


চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মস্থল দিন: আমরা নির্ভয়ে চিকিৎসা দিব

মে মাসের ২৬ তারিখ ছিল সেদিন। সময় রাত ৮:৩০ টা। টানা ৪৮ ঘন্টা ইমার্জেন্সি ডিউটি করে এমনিতেই অনেক ক্লান্ত ছিলাম। রোজার দিনগুলো আসলেই ইমার্জেন্সিতে কি অবস্থা হয় সেটা কল্পনাতীত। ইফতারের পর থেকেই ঝাঁকে ঝাঁকে রোগী আসতে থাকে। একজন ৪৫ বছরের রোগী আসল প্রচন্ড বুকে ব্যথা নিয়ে। ব্লাড প্রেশার একটু বেশি ছিল। তাকে ইসিজি করতে দেয়া হয়েছিল।

আমি যখন ইমার্জেন্সিতে ঢুকছিলাম তখন ইসিজি করে আসে লোকটি। ইসিজি দেখে আমি হতবাক। মারাত্নক হার্ট এটাক। Lead 2, 3 ,aVF এ ST elevation এবং anterior সবগুলা lead এ ST ডিপ্রেশন। যেকোন মুহুর্তে রোগী খারাপ হয়ে যেতে পারে। রোগীটা বুকের ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। ইমার্জেন্সি টেবিলের সাথে মাথা ঠুকে শুয়েছিল।

প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং কাউন্সেলিং করে রোগীকে কোন প্রকার ওষুধ না দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে যেতে বললাম অথবা সামর্থ্য থাকলে কার্ডিওলজিস্ট দেখানোর কথা বললাম। রোগীর লোকজন বলছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়াটা তাদের জন্য আপাতত কষ্ট হয়ে যায়। আমি এখানেই চিকিৎসা যেন দিয়ে দেই।

আমি বললাম: আপনাদের কি মাথা নষ্ট হয়েছে। যে কোন মুহূর্তে রোগী মারা যেতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব কার্ডিওলজিস্ট দেখান। তারা আবারও বলছিল আপাতত ব্যথা কমার কোন ওষুধ দেয়ার জন্য। আমি বললাম উপজেলা লেভেলে এই ধরনের রোগী ম্যানেজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নেই। আপনার রোগী ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও রাখে কিনা সন্দেহ আছে। ঢাকাও যাওয়া লাগতে পারে। তারা কি যেন চিন্তা করে একটু পর চলে গেল।

প্রশ্ন করতে পারেন আমি কেন কোন ওষুধ দিলাম না। অন্য কোন ওষুধ না হোক এটলিস্ট কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সি লোডিং ডোজ দেয়া যেত। আপনাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, ছয় সাত মাস আগে সকাল সাতটার দিকে ঠিক এমনই একটা পেশেন্ট প্রাইমারি লোডিং ডোজ দিয়ে এক রোগীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছিলাম। রোগী অল্প কিছুদূর যেতে না যেতেই মৃত্যুবরণ করে। রোগীর লোকজন সেই মৃতদেহ নিয়ে আবার ইমার্জেন্সিতে আসে। এসেই তাদের প্রথম অভিযোগ ছিল আমি নাকি ভুল ওষুধ দিয়ে রোগীকে মেরে ফেলেছি!

ইমার্জেন্সিতে যখন আসে তখন নাকি রোগীর অবস্থা ভাল ছিল। আমার দেয়া ওষুধ খাওয়ার পরই নাকি রোগীর মৃত্যু হয়।

তারপর শুরু হলো ফোনের পর ফোন। এমনকি আমার মোবাইলেও ফোন আসতে থাকে আমি নাকি ভুল চিকিৎসা দিয়ে রোগী মেরে ফেলেছি। দু’একজন শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে ফোন দিয়ে বলে স্যার আপনাকে অনেক ভাল বলে জানি, কিন্তু লোকজন উত্তেজিত হয়ে নাকি ২০-৩০ জনের লোক হাসপাতালের দিকে আক্রমনাত্নক ভাবে আসছে। আমি যেন সাবধানে থাকি। সাংবাদিকও আসল। অনেক ভয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছি। এবং তাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলাম যে আমার চিকিৎসা কোথায় ভুল হয়েছে বের করার জন্য। কিন্তু যদি উনারা ভূল প্রমাণিত হয় তাহলে উনাদের বিরুদ্ধে আমি মানহানির মামলা করব। যাহোক, ওইসময় ই চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে গিয়েছিল। 

ইন্টার্ন শেষ করার পর বিসিএস চাকরির আগ পর্যন্ত নিয়িমিত খেপের উপর ছিলাম। যথেষ্ট খারাপ রোগী ম্যানেজ করার অভিজ্ঞতা আছে। যথেষ্ট কনফিডেন্টও ছিলাম। হার্টের অনেক খারাপ খারাপ রোগীও ম্যানেজ করেছি।

সেইদিনের ঘটনার আমার চাকরি জীবনের প্রথম ধাক্কা। এরপর থেকে চাকরির প্রতি হতাশা চলে এসেছিল। এত ডেডিকেটেডলি সার্ভিস দেয়ার পরও অভিযোগ আসল ভুল চিকিৎসার! তারপর থেকে আর উপজেলা লেভেলে খারাপ কোন রোগী রাখি না। রেফার করে দেই। রোগীর লোকজন নির্ভয় দিলেও রাখি না, কারণ একটাই। মানুষ এখন এক কথা বলে কিন্তু রোগী মারা গেলে ভূল পাল্টাতে এক সেকেন্ড সময়ও লাগে না। 

আজ যদি সরকার আমাকে কঠোর নিরাপত্তা দিতো, তাহলে আমি মন খুলে চিকিৎসা দিতে পারতাম। জানিনা রোগী কোথায় গিয়েছে। এটাও জানি খুব দ্রুত কোন ব্যবস্থা না নিলে রোগীটা নির্ঘাত মারা যাবে। সবার কাছেই সবার জীবনের মায়া আছে। আমার ও আছে। আমারও পরিবার আছে। আমিও আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মত। ঐদিনের মত আমি যদি রিস্ক নিয়ে লোডিং ডোজ দিয়ে চিকিৎসা দিতে পারতাম। কিন্তু তারপর যদি রোগীটা মারা যেত। তাহলে আমার জীবনের কি হত? কে আমাকে নিরাপত্তা দিবে?

ডাক্তারদের কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিয়ে অনেক আগে থেকেই কথা হচ্ছে। কোন কাজ হচ্ছে না। কর্মস্থলে ডাক্তারদের নিরাপত্তা না দিতে পারলে সেদিন অবশ্য খুব দেরি নেই, যেদিন পথে ঘাটে রোগী মারা যাবে। কারণ একটাই, বুকে ব্যথা নিয়ে উপজেলা লেভেলে আসবে। খারাপ দেখে আমি রেফার করে দিব সদর হাসপাতালে। ঐখানেও খারাপ দেখে রেফার করে দিবে ঢাকাতে। সবারই তো ভাই জানের ভয় আছে। সবারই পরিবার আছে। আমাদের তো এটলিস্ট তাদের জন্য হলেও বাঁচতে হবে। ন্যাড়া কিন্তু একবারই বেলতলায় যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এতোদিন ভাবতাম ডাক্তার হিসাবে আমি ‘ব্যতিক্রম’

এতোদিন ভাবতাম ডাক্তার হিসাবে আমি ‘ব্যতিক্রম’

আজ ১৭ই জুন, ২০১৯। সর্বভারতে আজ চিকিৎসক ধর্মঘট। পশ্চিমবঙ্গের নীলরতন সরকার হাসপাতালের…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর