ঢাকা      মঙ্গলবার ১৮, জুন ২০১৯ - ৫, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মো. কামরুজ্জামান

এফসিপিএস (হিমাটোলজি) 
সহকারী অধ্যাপক (হিমাটোলজি) 
ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।
 

 


রক্তদান ও প্রয়োজনীয় কিছু নির্দেশনা

একজন মানুষের ওজন যতো, তার শতকরা প্রায় ৮ ভাগই রক্ত। কারো ওজন ৬০ কেজি হলে তার শরীরে প্রায় ৬০ × ৮% = ৪.৮ লিটার রক্ত থাকে। তাই রক্ত পরীক্ষার জন্য ৫ বা ১০ বা ২০ সিসি রক্ত দিলে রক্ত কমে না। তবে, নবজাতকদের ক্ষেত্রে এই লাইনটি প্রযোজ্য নয়। কারণ, একজন নবজাতকের ওজন ৩ কেজি হলে রক্ত থাকে মাত্র ২০০ মিলি (৭৫ মিলি/কেজি)। তাই ভূমিষ্ঠ শিশুর বার বার রক্ত নিলে রক্তস্বল্পতা হতে পারে।

আবার একজন বয়স্ক মানুষ একবার রক্ত দান করলে শরীরের প্রায় ৫ হাজার মিলি রক্ত হতে মাত্র ৩৫০ মিলি থেকে ৪০০ মিলি রক্ত নেওয়া হয়, যার ফলে শারিরীক সমস্যাও তেমন হয় না।

অস্থিমজ্জার ভিতরে প্রতিনিয়ত রক্তের কনিকা তৈরি হয়ে শরীরের ধমনি, শিরা উপশিরার রক্তে মিশে যায় এবং প্রতিটি রক্ত কনিকাগুলো নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল শেষে মারা যায়। মানুষকে রক্ত দান করা হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট সময় পর পর রক্ত কনিকাগুলো কিন্তু আপন গতিতেই মারা যায়। তাই রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।

যেহেতু রক্তের লোহিত রক্ত কনিকার আয়ুস্কাল গড়ে ১২০ দিন বা ৪ মাস তাই একজন সুস্থ মানুষ ১৭ বছর বয়সের পর থেকে প্রতি ৪ মাস পর পর রক্ত দান করতে পারে। তবে, একবার রক্তদানের ২ মাসের মধ্যে পুনরায় রক্তদান করা উচিত নয়। প্লেটলেট এর আয়ুস্কাল গড়ে ৭ থেকে ৯ দিন তাই একজন সুস্থ মানুষ ১৭ বছর বয়সের পর থেকেড থিওরিটিক্যালি প্রতি ৭ দিন পর পর রক্তের প্লেটলেট দান করতে পারে।

আইনগতভাবে ১৭ বছর বয়সের আগে নিজে কনসেন্ট বা সম্মতি দিতে পারে না, তাই ১৭ বছর বয়সের আগে স্বেচ্ছায় রক্ত দান করতে পারে না। তবে, নিজের প্রয়োজনে নিজে রক্ত নিতে পারে। এটাকে বলে অটোলোগাজ ব্লাড ডোনার। শরীর পরিপূর্ণ সুস্থ থাকলে ১৭ বছর বয়সের পর যেকোনো বয়সেই রক্ত দান করা যায়।

রক্তের দুইটি অংশঃ প্লাজমা (৫৫%, এর ৯২% ই পানি) এবং রক্ত কনিকা (৪৫%)।

প্লাজমা বা জলীয় অংশে কিছু কিছু উপাদান (প্রোটিন, ইলেক্ট্রলাইটস, ক্লোটিং ফ্যাক্টর) বাদ দিলে সবই পানি যা কিডনি দিয়ে প্রস্রাব তৈরি হয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এইজন্য প্রতিদিন ১.৫ লিটার থেকে ২.৫ লিটার পানি পান করা উচিত।

রক্ত কনিকা তিন ধরনের-

১. লোহিত রক্ত কনিকা বা রেড সেল যার মধ্যে থাকে হিমোগ্লোবিন তাই রক্ত লাল দেখায়।

২. স্বেত রক্ত কনিকা যা দেহের রোগ প্রতিরোধ করে।

৩. অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট যা রক্ত জমাট বাধতে সাহায্য করে। এর ঘাটতির মাত্রা ভেদে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

রক্তের প্লাজমাতে কিছু উপাদান থাকে, যাকে ক্লোটিং ফ্যাক্টরস বলে। অর্থাৎ এরাও রক্ত জমাট বাধতে সাহায্য করে। ফলে, এদের ঘাটতির মাত্রা ভেদে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

যে কোন কারনে রক্তের লোহিত কনিকার সংখ্যা কমে গেলে বা হিমোগ্লোবিন কমে গেলে (যেমনঃ অস্থিমজ্জা হতে রক্ত কনিকার উৎপাদন কমে গেলে, যেকোনো কারণে রক্ত কনিকা ভেঙ্গে গেলে বা রক্তক্ষরণ হলে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়, ফলে শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যায়, দুর্বলতা দেখা দেয়। তাই, কি কারণে রক্তস্বল্পতা হতে পারে তার সঠিক কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসা নিতে হয়। আর হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি পূরনের জন্য খাবার বা ঔষধ দিয়েও যদি রক্ত বৃদ্ধির সম্ভবনা না থাকে তবেই রক্ত দিতে হয়।

রক্তের হিমোগ্লোবিন ৬ গ্রাম/ডিএল এর বেশি এবং উক্ত রোগীর অন্যান্য অসুখ না থাকলে রক্ত দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করার দরকার নাই। তবে, অল্প সময়ে অধিক রক্তক্ষরনের সম্ভবনা থাকলে (মোট রক্তের ৫ ভাগের ১ ভাগ অর্থাৎ ১ লিটার বা ২ ব্যাগ রক্তপাত হলে) রক্ত দিয়ে হিমোগ্লোবিন ৭ গ্রাম/ডিএল রাখলে মৃত্যুর ঝুঁকি কমে যায় এবং বাকী ঘাটতিটুকু রক্ত বৃদ্ধির খাদ্য, আয়রন, অন্যান্য ঔষধ, বায়োলজিকাল এজেন্ট ইত্যাদি দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।

তাই, রক্তস্বল্পতার কারণ উদঘাটন না করে, অহেতুক শুধুমাত্র রক্তের হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে রক্ত না দিই। অহেতুক রক্তের অপচয় না করে, অন্য মুমূর্ষু রোগীর প্রয়োজন মেটানো যায় এবং রক্ত নিলে যে জটিলতা হতে পারে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

যেহেতু রক্ত কনিকাগুলো (লোহিত রক্ত কনিকা বা আরসিসি, প্লেটলেট, প্লাজমা) আলাদা করার মেশিন আছে, তাই এক ব্যাগ রক্ত থেকে তিন ধরনের (রক্তস্বল্পতা বা হিমোগ্লোবিন কম, প্লেটলেট জনিত রক্তক্ষরণ, ক্লোটিং ফ্যাক্টর জনিত রক্তক্ষরণ) রোগীর উপকার করা যায়।

তাই বলা হয়ে থাকে- "যার যেটা প্রয়োজন, তাকে সেটা দিন।"

উন্নত বিশ্বে হোল ব্লাড খুব কমই ব্যবহার করা হয় কারন এর জটিলতা বেশি। মূলত রক্তদাতার স্বেত-কনিকাই এর জন্য দ্বায়ী। এলোইমিউনাইজেশন করে পরবর্তীতে রিয়েকশন করে। এমন কি ট্রান্সফিউশন এসোসিয়েট গ্রাভ ভারসাস হোষ্ট ডিজিজ করে যার ফলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। এ থেকে পরিত্রান পেতে হলে লিউকোডিপ্লেশন ফিল্টার ও ইরেডিয়েটেট ব্লাড ব্যবহার করতে হয়। রক্তের স্বেত কনিকা বাড়ানোর জন্য বানিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত বায়োলজিকাল এজেন্ট আমাদের দেশেই পাওয়া যায়।

শুধু রক্তস্বল্পতার জন্য বা হিমোগ্লোবিন বাড়ানোর জন্য লোহিত কনিকা বা আরসিসি বা প্যাকড সেল দিতে হয়। বানিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত বায়োলজিক্যাল এজেন্টও ক্ষেত্র বিশেষ ব্যবহার করা হয়।

প্লেটলেট এর সমস্যা জনিত রক্তক্ষরণ রোগে প্লেটলেট বাড়ানোর জন্য শুধুই প্লেটলেট দিতে হয়। বানিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত ঔষধও বাজারে আছে। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। ক্লোটিং ফ্যাক্টরের ঘাটতি জনিত রক্তক্ষরণ হলে প্লাজমা বা বানিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত ক্লোটিং ফ্যাক্টর (ফ্যাক্টর এইট, ফ্যাক্টর নাইন) দিতে হয়।

কোন রোগীর হিমোগ্লোবিন কম, সাথে প্লেটলেটও কম থাকলে সেক্ষেত্রেও হোল ব্লাড না দিয়ে আলাদাভাবে আরসিসি বা প্যাকড সেল এবং প্লেটলেট দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে রক্তের অবশিষ্ট ক্লোটিং ফ্যাক্টর অন্য রোগীর প্রয়োজনে কাজে লাগে।

যে রোগীর রক্তক্ষরণ নাই অর্থাৎ প্লেটলেট বা ক্লোটিং ফ্যাক্টর এর ঘাটতি নাই কিন্তু রক্তস্বল্পতা বা হিমোগ্লোবিন কম আছে, তাকে শুধুই লাল রক্ত বা লোহিত কনিকা বা প্যাকড সেল দিতে হবে। অবশ্যই হোল ব্লাড নয়, যাতে হোল ব্লাডের মধ্যে যে প্লেটলেট বা প্লাজমা অবশিষ্ট থাকে তা প্রয়োজনে অন্য রোগীর জীবন বাচাতে পারে।

ঠিক তেমনি ভাবে, প্লেটলেট বা ক্লোটিং ফ্যাক্টরের ঘাটতিতে রক্তক্ষরণজনিত রোগীকে যথাক্রমে শুধুই প্লেটলেট বা প্লাজমা (যার মধ্যে ক্লোটিং ফ্যাক্টর থাকে) দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। অবশ্যই হোল ব্লাড নয়। যাতে অবশিষ্ট লোহিত কনিকা অন্য রক্তস্বল্পতার (হিমোগ্লোবিন কম) রোগীকে দেওয়া যায়।

প্রতিটা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ব্লাডের এই সেল সেপারেশন মেশিন অতীব জরুরী। কর্তৃপক্ষ দক্ষ জনবল নিয়োগের পর উক্ত মেশিন প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সহজলভ্য করে সার্বক্ষণিকভাবে সচল রাখলে নিশ্চয়ই রোগীর উপকারে আসবে।

নিরাপদ ও বিশুদ্ধ রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

যেসব ক্যাপসুলে হতে পারে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট!

যেসব ক্যাপসুলে হতে পারে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট!

এ্যাজমা ও ক্রনিক অবষ্টাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজস (COPD) রোগীদের ব্যথানাশক ওষুধ (NSAIDs), প্রেসারের…

রাতে দাঁতব্রাশ না করায় ক্যান্সারসহ ভয়াবহ বিপদের আশঙ্কা

রাতে দাঁতব্রাশ না করায় ক্যান্সারসহ ভয়াবহ বিপদের আশঙ্কা

সকালের চেয়ে রাতে টুথব্রাশ করা ১০০গুন বেশি জরুরী। কারণ, রাতে ঘুমানের পর…

লিচু আতঙ্ক ও আজগুবি গুজব

লিচু আতঙ্ক ও আজগুবি গুজব

এই সিজনে প্রায় হাজার খানেক এবং প্রতি বসায় মিনিমাম পঞ্চাশটা করে লিচু…

দাঁতের রোগে উদাসীনতা নয়

দাঁতের রোগে উদাসীনতা নয়

মুখ ও দাঁতের রোগে জীবনে কখনো ভোগেননি এমন কাউকে পাওয়া সত্যি দুষ্কর।…

রক্ত দান না জীবন দান?

রক্ত দান না জীবন দান?

তখন ফিফথ ইয়ারে পড়ি। মেডিসিনে হুমায়ুন স্যারের ইউনিটে প্লেসমেন্ট। স্যার শান্ত, সৌম্য,…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর