ঢাকা      সোমবার ২৪, জুন ২০১৯ - ১০, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাজী শামসুল আরেফীন

মেডিকেল অফিসার (৩৩ তম বিসিএস), 
সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।


একজন সরকারি চিকিৎসকের খোলা চিঠি

৩৩ তম বিসিএসে সরকারি চাকরির বয়স এই আগস্টে পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। আমার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে মাত্র চারজন মেডিকেল অফিসার রয়েছেন। এখানে অনেকদিন ধরেই আরএমও পোস্ট ফাঁকা আছে। এই চারজনের মধ্যেই একজন আরএমও এর দায়িত্ব পালন করছেন। চারজন মিলেই ২৪ ঘন্টা সাতদিন ইমার্জেন্সি চলে। একই সাথে সপ্তাহে ৬ দিন এবং বিশেষ বন্ধের দিনেও আউটডোর সবসময় খোলা থাকে।

উপজেলা স্বাস্থ্য চালু হওয়ার পর থেকে হাসপাতালে কোনদিন ইমার্জেন্সি বন্ধ হয়নি, এমনকি হবেও না। ঈদ, পূজা, ঝড়-বাদলা সবদিনেই খোলা থাকে। অত্র হাসপাতালে আউটডোরে প্রতিদিন কম করে হলেও ৪০০ জনেরও বেশি রোগী হয়। এছাড়া ইমার্জেন্সিতে প্রায় ৬০-৭০ জন হয়, যদি কোন বড় ধরনের মারামারি না হয়।

পাবলিকের একটা কমন প্রশ্ন, সরকারি হাসপাতালে গেলে ভালো করে রোগী দেখে না। প্রতিদিন একজন ডাক্তারকে কম হলেও ১৫০ জনের মতো রোগী দেখতে হয়। ইমার্জেন্সির তো কথা বাদ দিলাম। নাস্তার ব্রেক বাদে নিরবচ্ছিন্ন প্রায় তিন ঘন্টা আউটডোর সেবা দেয়া হয়। অর্থাৎ ১৫০ টা রোগীর জন্য তিন ঘন্টা সময় বরাদ্দ।

এর মধ্যে একটা রোগী ঢুকা এবং অন্য রোগী বের হওয়া বাবদ কিছু সিস্টেম লস হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, একজন রোগী সর্বোচ্চ ১ মিনিট সময় পায়। তাহলে আপনি বলুন, এই এক মিনিট সময়ের মধ্যে রোগীর সমস্যা কি শুনব আর ট্রিটমেন্ট ই বা কি দিব? এখানে তো দম ফেলারও জায়গা থাকে না ভাই। তারপরও লাইন ভাঙা নিয়ে ঝগড়া, এর আগে ও গেছে। ওর আগে এ গেছে।

কয়েকজন তো হাসপাতাল কে নিজের বাবার সম্পত্তি মনে করে। কয়েকজন আসে সরকারি সরাইখানার ওষুধ নিতে। উনাদের এন্টিবায়োটিক ওষুধ খুব-ই পছন্দের। এসেই এন্টিবায়োটিক ওষুধ চায়। আমি দিতে না চাইলে বলে, সরকার দিয়ে রেখেছে আপনি কেন দিবেন না! আর কিছু সংখ্যক লোক আছে যারা বানিয়ে বানিয়ে সমস্যা বলে, যেন হাসপাতাল থেকে ওষুধ দেয়া হয়। আর কিছু উঠতি বয়সের পাতি নেতা তো আছেই। যাদের কাজই হচ্ছে হাসপাতালকে গরম করে রাখা।

মাত্র তিন টাকার একটা টিকেট। ফ্রি বললেও মন্দ হয় না। এই তিন টাকার টিকেটের টাকার জন্য অনেকেই আমার কাছে সাহায্য চাইতে আসছে।

আউটডোরে বসে আসলে মেধার অপচয় হচ্ছে। কিছু এটিপিক্যাল রোগী যে পাচ্ছি না সেটা না। ওই সিটে বসে PC, BC আর HC লিখলে মেধার চর্চা হয় না আসলে। অনেক চিন্তা করে একটা কঠিন রোগ ধরতে পারলে সেটার মন খুশিমত চিকিৎসা দিতে গেলে পাবলিক বলে হাসপাতাল থেকে দিয়ে দেন। তাদেরকে কাউন্সেলিং করে যে আসল ওষুধ যে কিনাতে পারব না সেটা না। কিন্তু সময়টা কোথায় ভাই। আসলে ফ্রি দুইটা ওষুধ পেলে পাবলিকও খুশি, সরকারও খুশি। কিন্তু পাবলিক যে আসলে কি সেবা পাচ্ছে এইটা সহজেই অনুমেয়।

প্রশ্ন করতে পারেন, এই সমস্যা উত্তরণের উপায় কি? উপায় অবশ্যই আছে। ডাক্তার প্রতি রোগী ফিক্সড করে দেয়া। যেমন, একজন ডাক্তার সর্বোচ্চ ২০ টা বা ৩০ টার বেশি রোগী দেখবে না। একদিন সর্বোচ্চ অতটা রোগী আউটডোরে সেবা পাবে। একজন ডাক্তার যখন জানবেন তাকে ৩০টা রোগী দেখতে হবে তাহলে যথেষ্ট সময় নিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে চিকিৎসা সেবা দেয়া যায়।

আর হ্যাঁ, সরকারকে অনুরোধ করব এই তিন টাকার টিকেটের মূল্য বাড়ান। সেই মান্ধাতার আমল থেকে তিন টাকা চলে আসতেছে। তিন টাকা দিয়ে একটা Love Candy কিনতে পাওয়া যায়। এই তিন টাকা দিয়ে উপজেলা হাসপাতাল থেকে একজন রোগী ইন্টার্নশিপ সহ সাত বছর পড়াশোনা করে বিসিএস পাশ করা বাংলাদেশের একজন প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তার সেবা পাচ্ছেন।

আর হ্যাঁ টিকেটের মূল্য বাড়ালে রোগী এটলিস্ট একজন ডাক্তারের সামনে দুমড়ানো মোচড়ানো কোন প্রেসক্রিপশন নিয়ে আসবে না। টিকেটে থাকবে না হলুদের দাগ। অথবা পথে ঘাটে এই প্রেসক্রিপশন এর ছোট্ট একটা কাগজকে পড়ে থাকতে দেখতে হবে না।

আমরা সর্বোচ্চ সেবা দিতে চাই। কিন্তু, যিনি সেবা গ্রহীতা তাকেও যথেষ্ট সহনশীল হতে হবে। হুমকি ধামকি দিয়ে কখনো ডাক্তারের মন জয় করা যায় না,  করতেও পারবেন না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এতোদিন ভাবতাম ডাক্তার হিসাবে আমি ‘ব্যতিক্রম’

এতোদিন ভাবতাম ডাক্তার হিসাবে আমি ‘ব্যতিক্রম’

আজ ১৭ই জুন, ২০১৯। সর্বভারতে আজ চিকিৎসক ধর্মঘট। পশ্চিমবঙ্গের নীলরতন সরকার হাসপাতালের…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর