ডা. ছাবিকুন নাহার

ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


২৭ মে, ২০১৯ ১০:২৭ এএম

সিজারিয়ান সেকশনের ইতিবৃত্ত

সিজারিয়ান সেকশনের ইতিবৃত্ত

কত দিন পর রোগী-কথন লিখছি! মনে হচ্ছে এক যুগ পর! আজকে আমরা সিজারিয়ান সেকশন নিয়ে কথা বলব। তার আগে আমি কেনো সিজারিয়ান ডেলিভারি করিয়েছিলাম সে গল্পটা বলি। তাহলে বুঝতে একটু সুবিধে হবে।

বিয়ের আট মাসের মাথায় আবিস্কার করি নতুন কিছু। চিরকালের উড়নচন্ডী বালিকা আমি। এক লহমায় বদলে যায় আমার পৃথিবী। মা মা অনুভূতিতে ভাসতে থাকি। মা... মা... আমি মা হতে চলছি! কী অদ্ভুত! কী অদ্ভুত!

এক একটা দিন যায়। ঠিক করে বুঝে ওঠতে পারিনা সব ঠিকঠাক চলছে কিনা। কোন কিছু খেলেই বমি হতো। না খেলেও। আজব তো! বমির ধমকে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসতো। হাফ গ্লাস পানিও খেতে পারতাম না একসাথে। খেলেই বমি। ওআরএস বোতলে ভরে রাখতাম। কিছুক্ষণ পরপর এক সিপ, দুই সিপ। এটাই তখন একমাত্র খাদ্যদ্রব্য আমার।

হঠাৎ উথাল পাতাল জ্বরে পড়লাম। সবার বেলায় স্পষ্টবাদী হলেও নিজের জন্য চিরকালের অভিমানী আমি। নিজের দুঃখ কষ্টের কথা বলতে শ্লাঘা লাগে খুব। কাজেই কেউ বুঝতে পারে না তেমন। কেউ না। যখন জ্বর ১০৪ তখন আর হুশ থাকে না। ধরা পরে যাই। অসুস্থতা জিতে যায়। সিদ্ধান্ত হয় সনোগ্রাম করাবো। কেনো এমন হল? বাচ্চাকাচ্চা ঠিকঠাক আছে তো? অজানা আশঙ্কায় বুক কাঁপে!

আশঙ্কাই ঠিক ছিলো তাহলে? আমার তখন ১৩ সপ্তাহ চলছিলো। অথচ বাচ্চা দেখাচ্ছে মাত্র আট সপ্তাহ। হার্টবিট নাই। নাই...! তার মানে পাঁচ সপ্তাহ আগে জান বাচ্চা আমার চলে গেছে আমাকে ছেড়ে। আমি বুঝতে পারিনি। যখন ইনফেকশন হয়ে সেপটিসেমিয়া হয়, জ্বর আসে তখন আর না বোঝার উপায় থাকে না। আমার পৃথিবীর সবার উপর অভিমান হয়। খুব..। সব কিছু কাঁপিয়ে কান্না আসে। সব ভাসিয়ে কান্না আসে। কিন্তু আমি কাঁদি নীরবে। ওই যে নিজের চিরকালের নিরেট আমি, শক্ত আমি। ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে যাই। কিন্তু বাইরে সব ঠিকঠাক। সব।

আপারেশন থিয়েটার। নিজের ভেতর থেকে আত্মজকে কুড়ে কুড়ে বের করে আনা। ঔষধ। সবকিছু রিলে করা ছবির মতো চলতে থাকে।

তার একবছর পর আবার। এবার আমরা সাবধানি। সব সময় বেড রেস্ট। ওয়াশরুমে যাই, নড়াচড়া বলতে এইটুকুই। আমার পৃথিবী বিছানাবন্দি হয়ে পড়ে। তারপরও শেষ রক্ষা হয় না। আবারো অপারেশন থিয়েটার। অজ্ঞান। কুড়ে কুড়ে জীবন থেকে জীবন ছিনিয়ে আনা অথবা জীবন থেকে জীবন ছিনিয়ে নেয়া।

আবারও কনসিভ করলাম। এবার আমি আর স্ট্রেস নিতে পারিনা। মনে হয় এই বেলা আমি মরব তবু...

না আমাকে মরতে হয়নি। আল্লাহ আমার উপর সদয় হোন। আমার সমস্ত ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আমাকে একটা দেবশিশু উপহার দেন। সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে সে শিশু পৃথিবীতে আসে। নরমাল ডেলিভারির রিস্ক নিতে পারিনি আমরা।

আমি কেনো সিজারিয়ান ডেলিভারি করালাম? জানি আপনারা বলবেন, এত কষ্টের বাচ্চা সিজারই তো করাবে। নরমাল করাতে গিয়ে ডেলিভারি প্রসেসে আল্লাহ না করুক যদি কোনো সমস্যা হয় এবং বাচ্চার ক্ষতি হয় এই দায় কে নেবে? বাচ্চার বাবা মা সহ্যই করবে কিভাবে? এক্সাক্টলি। ঠিক এই কারনেই আমরা সিজারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমার চিকিৎসক ও আমার সাথে এগ্রি করেছেন। শতকরা ত্রিশ ভাগ ক্ষেত্রে মা অর্থাৎ পেসেন্ট এবং পেসেন্টের পরিবারের ইচ্ছায় সিজার করতে হয়।

আমার প্রথম বাচ্চা সিজার তাই দ্বিতীয় বাচ্চাও সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে হয়েছে। বর্তমানে এই ধরনের রিপিট সিজারিয়ান সেকশনই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। শতকরা পঞ্চাশ ভাগের মতো।

দুটো কারণ তো জানলেন, আরো কিছু কিছু কারণ আছে যেগুলোতে অবশ্যই অবশ্যই সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা ডেলিভারি করতে হয়। যেমন -

* সিপিডি (বাচ্চা বড়, মায়ের পেলভিস ছোট অথবা দুটোই)

* প্লাসেন্টা প্রিভিয়া (গর্ভফুল জরায়ুর মুখের কাছে অবস্হান করা)

* জরায়ুর ক্যান্সার

* সাকসেসফুল ভিভিএফ অপারেশন (মূত্রথলির ছিদ্র বন্ধ করার অপারেশন)

আরো কিছু রিলেটিভ কারণ আছে। যেমন-

* বিগ বেবি/ম্যাক্রোসোমিয়া( চার কেজির বেশি বড় বাচ্চা)

* বাচ্চা ব্রিচ পজিশন ( উল্টা বাচ্চা)

* হাইড্রকেফালাস (মাথা বড় বাচ্চা)

* জোড়া লাগানো জমজ বাচ্চা

* জন্মগত এবং সময়ের আগে ডেলিভারি হওয়া কম ওজনের বাচ্চা (দেড় কেজি বা কম বেশি) ইত্যাদি।

এছাড়াও সার্জনের জন্য ও সিজার করতে হয় অনেক সময়। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সার্জনকে দিয়েই ডেলিভারি করানোর জন্য একটু আগে পরে সিজারের সময় নির্বাচন করা হয়। কেননা, নরমাল ডেলিভারি ব্যাথা তো কারো কথায় ওঠবে না। আগে পরে হতে পারে সে ক্ষেত্রে উক্ত সার্জন নাও এভেলএবল থাকতে পারেন। এটার হারও খুব একটা কম নয়।

সবচেয়ে বড় কারণ এখনো বলা হয়নি। বলেন তো কি? ঠিক ধরেছেন বেসরকারি ক্লিনিক। যত সিজারিয়ান হয় তার সত্তর ভাগই হয় ক্লিনিকে। তাদের আয়ের সিংহভাগই নাকি আসে সিজার থেকে। একটা কথা মনে রাখা ভালো, কোনো ক্লিনিক মানেই তার মালিক ডাক্তার এটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

কোনো রোগী এলে সেটা সিজারে সিদ্ধান্ত নেয় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ, ডাক্তার নয়। তারা রোগী অপারেশন টেবিলে তুলে রেখে সার্জন কল করেন, এনেস্থিসিয়া কল করেন। সার্জন গিয়ে যদি দেখনও নরমাল ডেলিভারি সম্ভব কিন্তু না রোগী, না ক্লিনিক কেউই সে পথে যেতে রাজি হবে না। রোগী সাধারণত ব্যথার ভয়ে রাজি থাকে না। এখানে সার্জন বড়জোর যা করতে পারেন তা হলো সেখান থেকে চলে আসতে পারেন। তার দুশো দুশো চারশো টাকা সিএনজি ভাড়া যাবে এই যা। তবে বিনিময়ে সেই ক্লিনিকের কল তিনি আর পাবেন না। ক্লিনিকের কাছে দালাল বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ডাক্তার নয়।

সব তো জানলেন, এখন একটু চিন্তা করেন তো কি কি কারণে সিজার হয়। ঢালাওভাবে এক পক্ষকে দায়ী করে আসলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। বরং যেটুকু ভালো হওয়ার কথা সেটুকুও আপনার আমার লাগামহীন কথায় বাধাগ্রস্ত হবে।

সিজারিয়ান ডেলিভারির যত সুবিধাই থাকুক না কেনো, তা কোনো মতেই নরমাল ডেলিভারির মতো নয়। নরমাল মানে নরমাল। তবে বিদেশের মতো যত যাই হোক নরমালই করতে হবে, এমনটা করে বেড়া ছেড়া লাগিয়েন না। সেসব দেশে নাকি এই নরমাল করাতে যেয়ে পেরিনিয়াল টিয়ার মানে পায়খানা এবং মাসিকের রাস্তা এক হয়ে যাওয়া, সিপি মানে অটিস্টিক বাচ্চার হার উদ্বেগ জনক হারে বেড়ে গেছে!

একটি কথা বলে শেষ করছি- প্রেগন্যান্সির সময় নিয়মিতভাবে অন্তত চারবার এন্টিনেটাল চেকআপ করাবেন। যে কোনো সরকারি হাসপাতালে ডেলিভারি করাতে আসবেন। কথা দিলাম কেউই আপনাকে প্রয়োজন ছাড়া সিজারিয়ান ডেলিভারি করাবে না। আপনি চেষ্টা করেও করাতে পারবেন না। প্রয়োজনে জীবন সুন্দর করার তাগিদে সিজারিয়ান সেকশন করালেও আমাদের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত নরমাল। আসুন নরমাল থাকি, নরমাল চলি, নরমালে গড়ি জীবন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত