০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১১:০৭ এএম

রংপুর মেডিকেলে র‌্যাগিংয়ের নামে অত্যাচার, দুই ছাত্রী হাসপাতালে

রংপুর মেডিকেলে র‌্যাগিংয়ের নামে অত্যাচার, দুই ছাত্রী হাসপাতালে

রংপুর মেডিক্যাল কলেজের মহিলা হোস্টেলে ছাত্রলীগ নেত্রীদের র‌্যাগিংয়ের নামে ছাত্রীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনায় মুমূর্ষ অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুই শিক্ষার্থী।  এ ঘটনার প্রতিবাদে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় কক্ষ ও আসবাবপত্র ভাংচুরকরাসহ এক ছাত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের রুম সিলগালা করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ । তবে এটুকু যথেষ্ট নয় মনে করে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন অভিভাবকরা। র‌্যাগিং এর কারণে আগেই অনেক ছাত্রী হোস্টেল ছেড়ে নগরীর বিভিন্ন স্বজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। 

 

ভুক্তভোগী ছাত্রীদের মাধ্যমে জানা যায়,  রংপুর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী হোস্টেলের ছাত্রলীগ নেত্রী  আশা এবং মুমুর নেতৃত্বে সোমবার রাতে বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ নেত্রী  ৪৪ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার মুমু ও পুনমকে রাত ১১টা থেকে রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত একপায়ে র‌্যাগিংয়ের নামে দাঁড় করিয়ে রাখে এবং বিভিন্ন অশালীন ভাষা প্রয়োগ করে মানসিক নির্যাতন চালায় এবং শারীরিক নির্যাতনও চালান বলেও অভিযোগ। একপর্যায়ে তারা অজ্ঞান হয়ে গেলে সহপাঠিরা তাদের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। 

 

এদিকে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একই ব্যাচের শিক্ষার্থী আনিকা রাজ মঙ্গলবার দিনের বেলা তার ফেসবুকে ‘র‌্যাগ খাও, মাথা ঘুড়ানি দিয়ে পড়ো, ঠাসঠুস করো, অন্যকারো গায়ে গিয়ে পড়ো, তাদের এই প্যানিকে কেউ কেউ মরতে বস যখন, অটো ডাকো, এমার্জেন্সিতে ঢুকাও, এই যাও সেই যাও, কি করবে রাতে এতুগুলা মেয়ে, আপুরা বিদায় দিয়ে হাফছেড়ে বাঁচে। যাদের ভোগের তারা ভুগছে ভুগবে। সবাই পুনমের জন্য দোয়া করবেন।’ লিখে স্ট্যাটাস দেন। এই স্ট্যাটাসে ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রলীগ নেত্রী আশা ও মুমুর নেতৃত্বে হলের ছাত্রলীগ নেত্রীরা আনিকার রুমে গিয়ে তার বিছানা, চেয়ার টেবিল ভাংচুর করেন। তার বেড শিট ও পোশাক পরিচ্ছদ কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করেন। বইপত্র খাতাসহ সব জিনিস ছিন্ন ভিন্ন করে দেন। একপর্যায়ে তারা হলে ছাত্রলীগ নেতাদের ডেকে আনেন। জানা গেছে, রাত ১২টার সময় ছাত্রলীগ নেতারা গিয়ে আনিকাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং আনিকাকে শারীরিকভাবে মারধোর করেন। এতে আনিকার চোখ মুখ ও হাত মারাত্মকভাবে জখম। অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে থাকলে হলের শিক্ষার্থীরা পুলিশ ও হল প্রশাসনকে খবর দেন। এসময় ছাত্রলীগ নেতারা বাইরে চলে যায়। পুলিশ এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। তবে ছাত্রলীগ নেত্রী ও নেতাদের হুমকিতে এরই মধ্যে অনেক ছাত্রী হোস্টেল ছেড়ে নগরীর বিভিন্ন স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই বাড়ি চলে গেছেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কলেজের অধ্যক্ষ প্রাধ্যক্ষ এবং রংপুর ডিসিকে জানানো হয়। আনিকাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। পাবনা থেকে ছুটে আসেন তার মা ফাতিমা বেগম।

 

ফাতিমা বেগম বুধবার সন্ধায় হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে জানান, আশা ও মুমুর নামে ওই ছাত্রলীগ নেত্রীরা প্রতিদিন হলের বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের র‌্যাগের নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করছে। তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে তাদেরকে ২০০ করে টাকা চাঁদা দিতে হয়। এসব ভালো লাগেনি তাই আমার মেয়ে ফেসবুকে এসব নিয়ে কিছু কথা লিখেছে, ওর বান্ধবীর জন্য দোয়া চেয়েছে। এটা কোনো অপরাধের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু এ কারনে আশা আর মুমু এবং বাইরে থেকে এসে ছাত্রলীগ নেতারা যেভাবে আমার ছোট বাচ্চা মেয়েটাকে মেরেছে। ওর চোখ মুখ হাস শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে গেছে। ওরা মেয়ের রুম ভাংচুর করেছে। কুচি কুচি করে বেড পোশাক কেটেছে। এটা কেমন নিয়ম? এই মেয়েরা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কাজ করলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 

 

আনিকার মা কাঁদতে কাঁদতে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন,  আমি কলেজের অধ্যক্ষ এবং হলের প্রাধ্যক্ষকে জানিয়েছি। তারা বুধবার এসে ওই মেয়ে দুটির রুম সিলগালা করে দিয়েছে। আমার মেয়ের রুমের ছবি তুলে নিয়ে গেছেন। তারা বলেছেন, ওদের বহিস্কার করা হবে। আমি তাদের বলেছি, আপনারা যদি এ্যকশন নিতে না পারেন তা হলে আমাদের বলেন। আমরাই এ্যাকশন নিবো। কিন্তু কোনো জবাব পাইনি। তিনি আরো বলেন, যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া না হলে আমি বৃহস্পতিবার ডিসির সাথে দেখা করবো প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।

 

এ ব্যপারে হলের প্রাধ্যক্ষ ডা. চন্দনা জানান, ইতোমধ্যেই সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থীর রুম সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। তাদেরকে বহিস্কার করা হবে। ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। অসুস্থ দুজনের সুচিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

 

বিষয়গুলো জানতে ছাত্রলীগ নেত্রী আশা ও মুমুর মোবাইলে একাধিকবার মোবাইল করেও তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

 

রংপুর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সৈয়দ আবু তালেব জানান, বুধবার  আমার শেষ দিন। বিষয়টি আমার নলেজে এসেছে। আমি এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত