ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫১ মিনিট আগে
ডা. কাওসার উদ্দিন

ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


২৪ মে, ২০১৯ ১২:৩৬

মাল্টিপল মায়েলোমা: এক অদ্ভুত ভয়ংকর রোগের কাহিনী

মাল্টিপল মায়েলোমা: এক অদ্ভুত ভয়ংকর রোগের কাহিনী

আমার বন্ধু সুব্রত। অনেকদিন পর ওকে যখন দেখি তখন ও হাড় জিরেজিরে শরীরের একটা মানুষ। বিছানার এককোণে মশারীর ভেতর গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। নড়াচড়া খুব একটা করে না, হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়, ব্যথা হয় প্রচন্ড। প্রসাব করার ডিব্বা দেখলাম বিছানার পাশে, কোন রকম স্ক্র্যা চে ভর দিয়ে বা কারো সাহায্য নিয়ে বাথরুমে যায় শুধু।

ওর রোগটা Multiple Myeloma. চিকিৎসাপত্রের ফাইল জমে স্তুপ! বাংলাদেশ ইন্ডিয়া চিকিৎসা নিতে নিতে ও'সহ পরিবারের সবাই মোটামুটি ক্লান্ত। কেমোটেমো দেয়া শেষ। ওর বাবা চাকুরীর পাশাপাশি এক আধটু হোমিও প্র্যামকটিসও করেন! সব শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে এখন সেটাই দিচ্ছেন ছেলেকে! ওর এই রোগের শুরুটা বেশ অদ্ভুত, আর এ কারণেই এটা নিয়ে লিখতে বসা!

ওর perianal abscess ছিল। অপারেশন হয় বড় সরকারী প্রতিষ্ঠানে বড় স্যারের অধীনে। কিন্তু দূর্ভাগ্য, অপারেশনের বেশ কিছুদিন পরেও ওর ঘাঁ শুকায় না, বরং সেখান থেকে ফাউল স্মেলিং ডিসচার্জ বের হতে থাকে। ও নন'ডায়বেটিক, এনিমিয়া নাই, স্যারকে দেখিয়ে রিপিট এন্টিবায়োটিকের কোর্স কমপ্লিট করে, বারবার ড্রেসিং করে, কিন্তু তাতেও ঘাঁ শুকায় না। ডিসচার্জ বের হতেই থাকে, আস্তে আস্তে ও বেশ দূর্বল হয়ে, সাথে নতুন করে যা শুরু হয় তা হল back pain!

এভাবে পার হয় কিছুদিন। তারপর ও শরণাপন্ন হয় একটি বড় বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে অন্য এক ডাক্তারের কাছে। এক্সরে করা হয় হিপবোনের, দেখা যায় lytic lession! এরপর MRI spine, দেখা যায় multiple focal lession! এই ধারণা থেকে plasma electrophoresis, পাওয়া গেল paraprotein (M protein বা monoclonal protein)!

ডায়াগনোসিস মোটামুটি নিশ্চিত। মোটামুটি এজন্যে যে, আর একটা টেস্ট দরকার কনফার্ম করতে, সেটা bone marrow examination. সেটা আর এখানে করা হলো না। রোগীর ধারণা হলো, যে ধারণা এখনো আছে, আর সেটা হল তার এই সকল সমস্যার শুরু ওই perianal abscess, প্রথম স্যার ঠিকঠাক মত চিকিৎসা করতে পারেননি, তাই তিনিও এর জন্য দায়ী! এ ধারণা ভাঙতে বহুত ব্যাখা আমি দিলাম, জানিনা কোন কিন্তু আছে কিনা। টাকা পয়সার প্রবলেম নাই, রোগী তাই ইন্ডিয়া যায়, bone marrow করে কনফার্ম হয়ে কেমো নেয়া শুরু করে। খুব একটা সুবিধা হয় না, কারণ multiple myeloma একটা incurable disease, কারো কারো আজীবনেও কিছু হয় না। আর কারো এমন symptoms develop করে যে কোন কিছুতেই আর ভাল হয় না, কারণ এটাই নিয়তি!

ভূমিকা শেষ। এটা নিয়ে যত যা চিন্তা করেছি তার অনেকটা জুড়ে আছে এর নাম। নামটা কেন multiple myeloma?

এটা plasma cell এর একটা malignancy, সেই হিসেবে plasmacytosarcoma বা অন্য কিছু হলে ভাল হত, কিন্তু তা না হয়ে হল myeloma! আসলে এর কারণ হল, myeloma মানে bone marrow. malignant plasma cell গুলো bone marrow তে multiplicate করে, তাই myeloma. তার আগে multiple কেন? এর কোন কারণ নাই, কিন্তু এটা দিয়ে মনে রাখা যায়, এ রোগী multiple infection এ ভোগে!

নামে কি আসে যায়, কামেই তো পরিচয়! তাহলে এরা কাম কি করে?

plasma cell এর malignancy, অর্থাৎ bone marrow তে থাকা plasma cell যারা B lymphocyte থেকে তৈরি হয়েছিল, সেই plasma cell গুলো প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সংখ্যাবৃদ্ধি শুরু করে। এখন এই সংখ্যাবৃদ্ধি করা plasma cell গুলো যদি স্বাভাবিক differentiated cell এর মত আচরণ করতো, তো তাকে plasmacytosis বলা যেত, বা যদি benign হত তবে plasmacytoma বলা যেত, কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি! কারণ এই plasma cell গুলো undifferentiated বা malignant, তারা কাজ করে উল্টাপাল্টা। শরীরের কোথাও infection হলে তাদের কাজ ছিল সেটা প্রতিরোধে স্বাভাবিক antibody protein তৈরি করা যাতে light chain ও heavy chain দুটোই থাকবে, কিন্তু এই malignant plasma cell গুলো যে protein তৈরি করে সেগুলোতে শুধু light chain থাকে বা light chain পরিমাণে বেশি থাকে যাদেরকে বলে M (Myeloma) protein বা paraprotein বা Bence Jones protein, যারা কাজের কাজ কিচ্ছু করে না, যত্তসব অকাজের ঢেকি! আর এতেই যত যা সমস্যা! আর একটা বিষয় হল, normal antibody protein গুলো হয় polyclonal, অর্থাৎ poly (বিভিন্ন) plasma cell থেকে তৈরি হয়ে যুক্ত হয় poly (বিভিন্ন) epitope of antigen এর সাথে। অন্যদিকে abnormal protein গুলো হয় monoclonal, অর্থাৎ mono (একটা) plasma cell থেকে তৈরি হয়ে যুক্ত হয় mono (একটা) epitope of antigen এর সাথে।

কারণ কি এই malignancy ডেভেলপ করার?

নির্দিষ্ট কোন কারণ জানা যায়নি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে যারা radiation exposure হয়েছে, পরে তাদের অনেকেরই নাকি হয়েছে। কিন্তু এখন অন্য যাদের হয় তাদের কারণ কি?

কোন পরিবেশগত কারণে জেনেটিক মিউটেশন। আবার যারা পেট্রোলিয়াম বা কার্বণ নিয়ে কাজ করে, কৃষক, কাঠ ও চামড়ার কাজ করে যারা তাদের ঝুঁকি বেশি। সুব্রতর অসুস্থতা আমাকে আরো যে কারণে বেশি ভাবিয়েছে সেটা হল ও করতো অফিস জব আর ওর বয়স মাত্র ২৮ কি ২৯, কিন্তু বইপত্রের মতে multiple myeloma ৪০ বছরের নিচে সাধারণত হয় না, বয়স যত বাড়ে রিস্ক তত বেশি, সবচেয়ে বেশি হয় ৭০ এর পর। আমি তাই ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, 'চিন্তা করিস নে, তোর মনে হয় ক্যান্সার হয়নি, চিকিৎসা নিতে থাক, সুস্থ হয়ে যাবি!' আসলে আমি জানি না 'আমি কি ভুল, নাকি ও ব্যতিক্রম!'

কি করে এ রোগ, থাকে কি কি clinical features এবং কিভাবে হয় সেসব?

সুব্রতর প্রথম দিকের কথা মনে আছে? ব্যাথায় জড়সড়, নড়াচড়া করতে কষ্ট হয়। অর্থাৎ এ রোগের প্রধাণ symptom হল severe bone pain. কারণ হল myeloma cell গুলো osteoclast activity বাড়ায়, কমায় osteoblast activity, ফলে bone lysis হতে থাকে, কমে যায় weight bearing capacity, ফলে রোগী যখনই নড়াচড়া করে তখনই ব্যাথা বাড়ে! bone এ অন্য metastatic carcinoma তে যে ব্যাথা হয় তার সাথে এর প্রধাণ পার্থক্য হল, সেসবে ব্যাথা বাড়ে rest এ, নড়াচড়ায় কিছুটা আরাম পায়, আর multiple myeloma তে মূলত উল্টোটা! সুব্রত তাই সারাদিন শুয়ে বসেই থাকে, আর ল্যাপটপে মুভ্যি দেখে।

Osteoclast activity বেড়ে গিয়ে bone যখন lysis হয়, হতে হতে এক সময় bone fracture হয়ে যায়, অর্থাৎ এসব রোগী প্রায়শই pathological fracture এ ভোগে।

fracture হলে বোঝা যাবে কিভাবে?

রোগী সারা শরীরে ব্যাথার সাথে হঠাৎ কোন একটা জায়গায় তীব্র ব্যাথার কথা বলবে, joint movement এ সমস্যা হতে পারে। আর যদি vertebral fracture হয় তবে spinal cord compression হয়ে myelopathy, radiculopathy, loss of bladder bowel control এসব ডেভেলপ করবে!

এবার চিন্তা করুন, এত এত bone lysis হচ্ছে, ফলে bone এ জমা calcium গুলো ক্ষয় হয়ে কোথায় যাবে? কই আর যাবে, আসবে ব্লাডে, হবে hypercalcemia, যা polyuria polydypsia করবে। আর একারণেই সুব্রতের বিছানার পাশে প্রসাব করার ডিব্বা ছিল, ত্যাগ ও পান দুটোই চলছে সমানতালে! পাশাপাশি এই অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামের চাপ ও ব্যাথা কমানোর জন্য রোগীরা নিয়মিত NSAID খেতে খেতে কিডনির বারোটা বাজবে, হবে renal failure। অন্যদিকে hypercalcemia হলে যে tetrad সম্পর্কে আমরা জানি সেগুলো তো থাকবেই-

1. Bones - Bone pain

2. Stones - Calcium stones

3. Groans - Abdominal pains, nausea, vomiting, constipation

4. Moans - Depression, confusion

এবার চিন্তা করুন bone marrow তে plasma cell এর malignant proliferation হচ্ছে। রাশিরাশি malignant cell এর চাপে normal hematopoietic stem cell গুলো তাদের জায়গা হারাচ্ছে, এতে হবে normal blood cell production কমে গিয়ে হবে anaemia, leucopenia, thrombocytopenia. anaemia টা বেশি হবে কারণ উপরে পড়ে আসা renal failure এর জন্য erythropoietin production ও কমে যাবে।

multiple myeloma রোগী সবচেয়ে বেশি মারা যায় কিসে?

খুব সহজেই বলতে পারি infection, ওই যে উপরে পড়েছি multiple infections. কারণ হল Infection এর বিরুদ্ধে দূর্বল ডিফেন্স! একদিকে leucopenia, অন্যদিকে জীবাণু শরীরে ঢুকলে যে কার্যকর antibody তৈরি করার কথা সেটা না হয়ে তৈরি হচ্ছে abnormal protein যা জীবাণুকে মারতে পারে না। আর একারণেই রোগীরা সহজেই infection এ ভোগে-

- Streptococcus pneumoniae

- Staphylococcus aureus

- Klebsiella pneumoniae

- E-coli, etc

ফলে বেশি হয় pneumonia, UTI pyelonephritis, skin ও soft tissue infection ইত্যাদি! সুব্রতর যে ভুল ধারণা, infection থেকেই ওর রোগসৃষ্টি, সেটা ভেঙে দিতে বলেছিলাম, 'রোগটা ছিল আগে থেকেই, perianal abscess ইনফেকশন ছিল তার ফল মাত্র!'

প্রচুর malignant plasma cell থেকে তৈরি হওয়া প্রচুর abnormal protein রক্তে ঘোরাঘুরি করে, আর আমরা জানি রক্তের viscosity মেইনটেইন করে plasma protein. তাহলে বলতেই পারি এ রোগীর রক্তের viscosity অনেক বেশি, ডেভেলপ করে hyperviscosity syndrome. ফলে হবে,

- headache, fatigue

- shortness of breath

- exacerbation of heart failure

- visual disturbances, retinopathy

- somnolence, coma

- Deep vein thrombosis

রক্তে যে abnormal protein গুলো বাড়ে তার মধ্যে একটা পরিচিত abnormal protein হল amyloid. অর্থাৎ এই রোগীর amyloidosis ডেভেলপ করবে এবং এই amyloid protein বিভিন্ন টিস্যুতে যেয়ে ডিপোজিট হবে, করবে,

- peripheral neuropathy

- carpal tunnel syndrome

- nephrotic syndrome

সব মিলিয়ে সমস্যার মহাসমুদ্র!

রোগ অনুমান করতে উপরের clinical features সাহায্য করবে, আর কনফার্ম করতে কি করতে হবে?

- increased malignant plasma cells in the bone marrow or plasma. Bone marrow তে malignant plasma cells বেশি হয়ে গেলে সেটা spill out হয়ে plasma তে চলে আসবে (Bone marrow exam, CBC, PBF)

- serum and/or urinary M-protein (electrophoresis)

- skeletal lytic lesions (x-ray, MRI)

সব তো হল, এখন চিকিৎসা?

No symptom, no treatment. symptom থাকলে তবেই treatment. আগেই বলেছি আমার বন্ধুটি কয়েক সাইকেল কেমোথেরাপি নিয়ে এসেছে ইন্ডিয়া থেকে, ওই একই ওষুধ কিনে এদেশেও দিয়েছে কয়েকবার। অর্থাৎ কেমোথেরাপি হল specific চিকিৎসা যা malignant cell proliferation কমাবে, ফলে কমবে paraprotein তৈরি হওয়া,

Immunomodulatory drugs
- Thalidomide, side effects বেশি
- Lenalidomide, side effects কম

এগুলো pregnancy তে contraindicated, মারাত্মক phocomelia করে, ছোট ছোট হাত পা ওয়ালা বাচ্চার জন্ম হয়।

Alkylating agents
- Melphalan
- Cylclophosphamide

Steroid
- Prednisolone
- Dexamethasone

Proteasome inhibitor
- Bortezomib
- Carfilzomib

উপরের কেমোগুলো বিভিন্ন কম্বিনেশন এ দেয়া হয়। কতদিন চলবে? যতদিন না paraprotein level কমে! কমলে কি করণীয়। এ রোগ পুরোপুরি ভাল হবে না। মনিটর, কেমো, মনিটর, কেমো! এভাবে চলবে যে ক'দিন চলে। রোগীর বয়স কম হলে autologous bone marrow transplant করা যায়, এতেও পুরোপুরি ভাল হবে না, তবে তুলনামূলক ভাল থাকবে।

Specific treatment তো হল, সাথে আর কি দিবো?

- Localized bone lysis ও fracture ইনহিবিট করতে radiotherapy দেয়া।

- Bone lysis হয়ে hypercalcemia হয়, তার চিকিৎসায় দেয়া হয় bisphosphonate. তবে দীর্ঘদিন oral bisphosphonate ব্যাবহারে একটু সতর্কতা, করতে পারে osteonecrosis of jaw!

- Bone pain কমাতে NSAID, তবে careful renal function মনিটরিং লাগবে।

- Infection হলে appropriate antibiotic, আর Infection প্রিভেন্ট করতে intravenous gamma globulin.

- Anaemia হলে blood transfusion, folic acid & B12 supplementation, erythropoietin injection.

- Malignant cell death হয়ে tumor lysis syndrome ডেভেলপ করে hyperuricemia হবে। urate nephropathy প্রিভেন্ট করতে urate lowering থেরাপি Allopurinol.

- Hyperviscosity syndrome হলে plasma থেকে অতিরিক্ত abnormal protein কমাতে Plasmapheresis করা।

- Hyperviscosity হয়ে DVT হলে aspirin বা warfarin বা low-molecular-weight heparin দেয়া যায়।

- Streptococcus pneumoniae এটাক কমাতে pneumococcal polysaccharide vaccine, প্রতি পাঁচ বছরে ১ টা।

- পানি ও তরল খাবার বেশি খাওয়া, এতে Hyperviscosity কিছুটা কমবে, কমবে Hypercalcaemia. আগেই বলেছি এ রোগীরা পানি খায় বেশি, কারণ কি উপরে বলেছি।

চিকিৎসা চলবে, সাথে চলবে মনিটরিং, treatment prognosis জানতে প্রায়শই যেটা করা হয় সেটা Beta 2 microglobulin ও albumin. Beta 2 microglobulin যত বেশি আর albumin যত কম, রোগ ততই যম!

সুব্রতের শেষ রিপোর্টে Beta 2 microglobulin সামান্য বেশি থাকলেও albumin ছিল normal, পজিটিভ কাউন্সেলিং এর শেষ অস্ত্র!

স্কুল বন্ধুরা মিলে কিছুটা সময় পার হলো। ওকে বেশ শক্ত মনে হল। সব কিছু জেনে নিয়ে - মেনে নিয়ে - হাল ছেড়ে শক্ত; না আশায় বুক বেঁধে শক্ত সে পার্থক্য আমি করতে পারিনি। আমরা শুধু সাহস দিয়েছি, দিয়েছি আশ্বাস, কারণ আশাই জীবন জীবনের শ্রী..

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত