০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১০:৫২ এএম

ফরেনসিক মেডিসিনে আগ্রহ কম ধুঁকে ধুঁকে চলছে সেবা

ফরেনসিক মেডিসিনে আগ্রহ কম ধুঁকে ধুঁকে চলছে সেবা

ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে পড়তে আগ্রহ নেই শিক্ষার্থীদের। এ কারণে এ বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে না প্রয়োজন অনুযায়ী। দেশের অন্তত ২৩টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ বিভাগ চালু থাকলেও সেখানে নেই দক্ষ চিকিৎসক। ফলে এসব হাসপাতালে এ বিভাগ চলছে ধুঁকে ধুঁকে। সেবা গ্রহীতাদেরও পোহাতে হচ্ছে বিড়ম্বনা। চিকিৎসকরা বলছেন, কাজে ঝুঁকি এবং অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেকে এ বিভাগে শিক্ষা নিতে চান না। এমনই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও দ্য মেডিবুলিগাল সোসাইটি অব বাংলাদেশে মহাসচিব ডা. সোহেল মাহমুদ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ চলছে ধুঁকে ধুঁকে। একটিতেও নেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক। কোথাও মেডিকেল অফিসার, কোথাও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের দিয়ে নেয়া হচ্ছে ক্লাস-পরীক্ষা। নেই পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। একই চিত্র জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও। সেখানে আবাসিক চিকিৎসকরাই (আরএমও) এর কাজ চালান বলে অভিযোগ আছে। সেখানে সরঞ্জামের তো বালাই-ই নেই।

এমনকি বিশ্বের সব দেশে থাকলেও বাংলাদেশে ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে নেই কোনো জাতীয় বিধিমালাও (ন্যাশনাল গাইডলাইন)। হত্যা না আত্মহত্যা, পিতৃত্ব নির্ণয় ও ধর্ষণের সুনিশ্চিত প্রমাণ পাওয়াসহ জটিল সব অপরাধের সুরাহা করতে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ওপর নির্ভর করতে হয়।

অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ নির্ণয় ও বিভিন্ন পরীক্ষা করে থাকেন এর বিশেষজ্ঞরা। মরদেহের ময়নাতদন্তও করে থাকেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, দক্ষ চিকিৎসক/বিশেষজ্ঞের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত ও বিচারও বাধার মুখে পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে নতুন পুরনো মিলিয়ে সরকারি ৩৬টি মেডিকেল কলেজ আছে। এর মধ্যে ২৩ থেকে ২৫টিতে চালু রয়েছে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ। এর মাত্র একটিতে এবং মাত্র একজন অধ্যাপক রয়েছেন। আর সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞ (সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক এবং অন্তত ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী বা প্রশিক্ষণ নেয়া চিকিৎসক) রয়েছেন মাত্র ৩২ জন। বর্তমানে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন মাত্র ২ জন। অথচ ১৪৪ জন চিকিৎসক থাকার দরকার ছিল। ঢামেকে সরকারি কোটায় প্রতি বছর ৫ জন শিক্ষার্থী এমবিবিএস এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হওয়ার কথা থাকলেও গড়ে ভর্তি হন মাত্র একজন। গত পাঁচ বছরে তিনজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে এখানে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কলেজে ফরেনসিক বিভাগ চালাতে অন্তত ৫ জন শিক্ষক (একজন অধ্যাপক, একজন সহযোগী অধ্যাপক, একজন সহকারী অধ্যাপক এবং ২ জন প্রভাষক) প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশগুলোতেই আছেন মাত্র একজন করে। বাধ্য হয়েই ভিন্ন বিষয়ের স্নাতকোত্তর ও ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের দিয়ে পাঠ দেয়া হয়। অধ্যাপকসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক সংকটের কারণে এমবিবিএস কোর্সের মৌলিক এ বিষয়টিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, উচ্চশিক্ষার কোর্সের (এমডি, এমসিপিএস ও ডিপ্লোমা) শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এমবিবিএস কোর্সে তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে মৌলিক এ বিষয়টি পড়ানো হয়।


সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ফরেনসিক মেডিসিনে ঢামেকে অধ্যাপক রয়েছেন একজন। তিনিও এ মাসের ৩০ তারিখে অবসরে চলে যাওয়ার কথা রয়েছে। সহযোগী, সহকারী ও প্রভাষক পদেও যে সংকট রয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০০৮-০৯ সালে ঢামেকে পাঁচ বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর কোর্স চালু করা হয়। এর আগে চিকিৎসকেরা এ বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি করতেন। সূত্র জানায়, সম্প্রতি সারা দেশের ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয় ঢামেকে। সেখানে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকসহ ১০ থেকে ১২ জন চিকিৎসক অংশ নেন। যার ৬ জনই ঢাকার তিনটি মেডিকেল কলেজে কর্মরত। সূত্র মতে, এভাবে চলতে থাকলে দু-এক বছরের মধ্যে মৌলিক এ বিষয়ে শিক্ষা দেয়ার মতো অভিজ্ঞ শিক্ষক খুঁজে পেতে কষ্ট হবে। এছাড়া এমবিবিএস, স্নাতকোত্তর ও ডিপ্লোমা কোর্সের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস নেয়া, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সমন্বয় সাধন, পরীক্ষা নেয়া, খাতা দেখা, ফলাফল প্রকাশ, লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সঠিকভাবে প্রণয়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, বর্তমানে চিকিৎসকরা যেসব বিষয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের মাধ্যমে বাড়তি আয় করা যায় না, সেগুলোতে শিক্ষক হতে চান না। নানা কারণে এ বিভাগের শিক্ষকদের দ্রুত পদোন্নতি না হওয়ায়ও চিকিৎসকরা এ বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এ বিভাগের চিকিৎসকদের ছুটির দিনেও কাজ করতে হয় এবং দেশের যে কোনো আদালত ডেকে পাঠালে ছুটে যেতে হয়। নেই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ ভাতারও ব্যবস্থা নেই। সাধারণ রোগের চিকিৎসা নিতে আসেন না রোগীরা। এসব কারণে এ বিভাগে কেউ পড়তে চান না।  অন্যদিকে, সরকারি মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞের ঘাটতি থাকলেও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে এ চিত্র কিছুটা ভিন্ন।

 সূত্র জানায়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞকে কোনো মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে হয় না। কোনো পুলিশি ঝামেলাও পোহাতে হয় না। ফলে তার নিরাপত্তার কোনো সমস্যা হয় না। শুধু ছাত্র পড়িয়েই তারা উচ্চ বেতন পেয়ে থাকেন। হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে নারী চিকিৎসক আছেন মাত্র চারজন। এ বিভাগে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তার কথা বিভিন্ন সময়ে নানা মহল থেকে উল্লেখ করা হয়। কারণ দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনজনিত কারণে এ বিভাগের কাজ বেড়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গাইনি নারী চিকিৎসকের সহায়তা নিয়ে নারীদের ফরেনসিক রিপোর্ট করেন পুরুষ চিকিৎসক।


এ প্রসঙ্গে ঢামেকের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, নিরাপত্তাহীনতা এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণেই এ বিভাগে কেউ পড়তে চায় না। কারণ পৃথিবীর সব দেশেই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞকে পোস্টমর্টেম করার জন্য ভাতা দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তা দেয়া হয় না। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কারও পক্ষে যায়, আবার কারও বিপক্ষে। রিপোর্টের ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য বিভিন্ন আদালতে নিজ খরচে যাতায়াত করতে হয়। এক্ষেত্রে থাকে নিরাপত্তা ঝুঁকি। তিনি বলেন, রিপোর্ট কারও বিরুদ্ধে গেলে সে বা তারা চিকিৎসককে নানা হুমকি দিয়ে থাকে। নাজেহাল করে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণনাশও হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র কোনো রকম নিরাপত্তা দেয় না। সব মিলিয়ে এ বিষয়ে কেউ আর পড়তে চায় না। আমাদেরকে ‘মরা মানুষের ডাক্তার’ বলে অ্যাখ্যায়িত করে। তাই প্র্যাকটিসও জমাতে পারি না। রোগী চলে যায়। প্রতিবছর এ বিষয়ে ১৫ থেকে ১৬ জনের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু সেখানে গড়ে একজন ভর্তি হয় ঢামেকে। তিনি বলেন, সরকারের সহযোগিতা চাই, অন্য দেশের মতো চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং ভাতার ব্যবস্থা করলে হয়তো ছাত্রদের কিছুটা আগ্রহ বাড়বে।
 স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) অধ্যাপক ডা. সামিউল ইসলাম সাদী এ প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, এই কাজটি জটিল। এদের জন্য আলাদা অতিরিক্ত ভাতা দিতে হবে। অতীতে নিজের মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি আরো বলেন, দেশে-বিদেশে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উন্নয়নের সহায়তায় প্রযুক্তির যাত্রায় সমন্বিত করতে হবে। ভিসেরা পরীক্ষায়  বিশেষজ্ঞ তৈরি করা দরকার বলে তিনি মনে করে। দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়তে হবে তাদের। নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং বড় কর্মসূচি নিতে হবে। সর্বোপরি তাদের ঝুঁকিকে মূল্যায়ন করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

কার্টেসি- মানব জমিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত