ডা. তাইফুর রহমান

ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


২৩ মে, ২০১৯ ০৪:২৮ পিএম

বোকা ডাক্তার!

বোকা ডাক্তার!

আমার চাকুরির প্রথম দিককার ঘটনা। ২০০২/২০০৩ সাল। পোস্টিং হোমনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তখনকার দিনে নিয়ম ছিল প্রত্যেক মেডিকেল অফিসার তাদের স্ব স্ব রোগী নিজেদের আন্ডারেই ভর্তি রাখবেন।  

তো, রাতের রাউন্ডে গিয়ে দেখলাম, অন্য এক ডাক্তার সাহেবের একটা রোগী প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। অল্প বয়সের একটা মেয়ে রোগী। এক্স রে পরীক্ষায় দেখলাম, ম্যাসিভ প্লুরাল ইফ্যুসান ফুসফুসে পানি। ওনার ডাক্তারকে জানাতে বললাম। ডাক্তার কর্মস্থলে নাই। 

সিস্টারকে বললাম, আসুন আমি পানি বের করে দেই। সিস্টার বললেন, এটা সম্ভব না। একজনের রোগীর পানি অন্যজনে বের করার নিয়ম নাই। বাসায় গেলাম, রাতের খাবার খেতে বসলাম। কিন্তু গলা দিয়ে খাবার নামছে না, বারবার রোগীনির কষ্টক্লান্ত চেহারাটা ভেসে আসছে। আবার গেলাম। বললাম, আমি দায়িত্ব নিয়েই পানিটা বের করে দিতে চাই। 

আহ্, আমি বোকা ডাক্তার!

কুমিল্লায় আসলাম। লাং এবসেস, ফুসফুসের ফোড়া, ফুসফুসের পুঁজের রোগী। গরিব রোগী। ইনজেকটেবল এন্টিবায়োটিক, লাংস এর পুসচরাল ড্রেনেজ চলছে। রোগী আস্তে আস্তে সুস্থ হচ্ছে। সঙ্গে বাড়ছে হাসপাতালের বিল, ওষুধের বিল। এক সময় রোগীর লোকজন রোগীকে রেখে পালালো। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রোগীর চিকিৎসা। দোকানে অনুরোধ করে ওষুধ সরবরাহ ঠিক রাখলাম। একসময় রোগী বাড়ি যাওয়ার উপযুক্ত হলো। কিন্তু, রোগীর লোকজনের কোন হদিস নাই। আমার শাশুড়ি (আল্লাহ ওনাকে জান্নাত নসীব করুন) যিনি দুই হাতে দান করতেন, ওনার কাছে হাত পাতলাম টাকার জন্য। আমার ফি ফ্রি, ওষুধের দাম ও হাসপাতালের কিছু বিল মিটিয়ে, রোগীর বাড়ি যাওয়ার খরচ দিয়ে বিদায় করলাম। 

আসলেই আমি বোকা ডাক্তার!

একসময় করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) কনসালটেন্ট হলাম। খাগড়াছড়ি থেকে আসা এক রোগী মুনের জেনারেল ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। হঠাৎ খারাপ হয়ে যাওয়াতে তাড়াতাড়ি সিসিইউতে নিয়ে যাওয়া হলো এবং লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হলো। ডোপামিন, নরড্রেনালিন সাপোর্ট দেয়া হলো। পরদিনই দেখলাম, রোগীর নাটকীয় উন্নতি হয়েছে। এখনো পুরোপুরি সাপোর্টে, তবে লাইফ সাপোর্ট খোলার প্রস্তুতি শুরু করতে পারি। তখনই রোগীর লোকজন আসলো, লুঙ্গি পড়া, হতদরিদ্র। কোনো আলোচনার ধার ধারেনি তারা, স্যার নল খুইল্লা দেন বাড়িতে নিয়া যামু।

যতই বুঝাই যে নল খোলার সঙ্গে সঙ্গে রোগী মারা যাবে। একটা সুস্থ হওয়ার মতো মানুষকে কিভাবে মেরে ফেলি!কিন্তু কোন কথাই তারা শুনতে রাজি না। আমরা গরিব, টাকা দিতে পারবো না। অগত্যা আমি বললাম, এখন পর্যন্ত কত বিল আসলো দেখেন। কাল ইনশাআল্লাহ রোগী ছুটি দেবো, বাকি বিলটা আমার দায়িত্বে রইল। আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া যে, এর পরদিন রোগী সুস্থ হয়ে কেবিনে গেলো।

আমি আসলেই একজন বোকা ডাক্তার!

আজো আমার চেম্বারের ৮০ শতাংশ রোগী কম ভিজিট দেয়। টাকাটা মুঠ করে দিয়ে একটা মলিন হাসি দেয়। দুঃখ জনক হলো কেউ কেউ জাল টাকাও দেয়!

আসলেই আমি বোকা ডাক্তার!

এরকম শত শত ঘটনার সাক্ষী আমার এই ক্ষুদ্র জীবন। আমি বিশ্বাস করি আমার মতো হাজারো বোকা ডাক্তার এই বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছেন। কাজ করে যাচ্ছেন নিরবে, নিভৃতে।

কেন করি?

মনের তাগিদে, হৃদয়ের তাগিদে, বিবেকের তাড়নায়। আমি যদি মহান প্রভুর একজন বান্দাকে বিপদে সাহায্য করি, মহান প্রভু আমাকেও বিপদে সাহায্য করবেন। প্রভুর অনুগ্রহের যে বড় প্রয়োজন।

এগুলো প্রকাশ্যে বলার কথা ছিল না। তবুও সময় আমাকে বলতে বাধ্য করেছে। আমি দুঃখিত।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত