ঢাকা      সোমবার ২৪, জুন ২০১৯ - ১০, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


গেঁটেবাতঃ এক সাধারণ অথচ জীবনব্যাপী এক রোগের উপাখ্যান

গাউট (Gout) বা বাংলায় যেটাকে গেঁটেবাত বলে, সেটার ধরণ ধারণ সহজ মনে হলেও আমার কাছে বেশ হিজিবিজি! এই যেমন এটা হয় ইউরিক এসিডের জন্য, কিন্তু ৯০% রোগী যাদের রক্তে ইউরিক এসিড (uric acid) অনেক বেশি কিন্তু গাউট হয় না আজীবনেও! আবার এক রোগী এলো ক্লিনকাট গাউটের উপসর্গ (symptoms) নিয়ে কিন্তু ইউরিক এসিড টেস্ট করে দেখা গেল সেটা একদমই নর্মাল।

সিরাম ইউরিক এসিডের (serum uric acid) সাথে গাউটের এই অদ্ভুত সম্পর্কের কারণ হল, এই সিরাম ইউরিক এসিডের কতটকু ওই জয়েন্টে (joint) যাচ্ছে এবং জয়েন্টের প্রদাহ (inflammation) করছে। তার মানে হল, সিরামে ইউরিক এসিড বেশি থাকলেই যে জয়েন্টে গিয়ে গাউট বাঁধিয়ে বসবে তা যেমন নয়, তেমন সিরামে নর্মাল কিন্তু সেটাই জয়েন্টে গিয়ে গাউট করবে না তাও নয়!

এইসব হিজিবিজি কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, অনেককে দেখি সিরাম ইউরিক এসিড বেশি পেয়েই ফটাফট ইউরিক এসিড কমিয়ে থেরাপি শুরু করতে, যা মোটেও নিয়ম সম্মত না। কারণ, যত বেশিই ইউরিক এসিড থাকুক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কোন উপসর্গ পাওয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত কোন চিকিৎসা নয়!

আবার অনেকে আছে রোগী তীব্র গেঁটেবাত (acute gout) নিয়ে আসছে। দিয়ে দিলাম Allopurinol, Febuxostat... এটাও ঠিক না। তীব্র অবস্থায়ও (acute condition) এগুলোর কোন নিয়ম নাই, প্রয়োজনে দিতে হবে ৬ সপ্তাহ পর।

তীব্র অবস্থায় প্রদাহ কমানোর জন্য আমরা যা দিতে পারি তা হল-

১. খুব দ্রুত কাজ শুরু করে এমন NSAID যেমন Naproxen, Diclofenac, Indomethacin. এখন রোগীর যদি Heart failure থাকে তাহলে NSAID fluid overload করতে পারে। তাই তখন এগুলো দেয়া যাবে না, এবং যদি মুত্রাশয়ে বিকলতা (renal impairment) থাকে তখনও দেয়া যাবে না।

২. এ অবস্থায় NSAID এর বিকল্প হিসেবে Cholchicine দেয়া যায়। এটার বেশ কিছু পার্শ্ব-পতিক্রিয়া (side effects) আছে। যেমন-

- GI upset - ডায়রিয়া, বমি।

- Bone marrow suppression

- Peripheral neuropathy

- Renal damage

- Clouding of cornea

তাই NSAID এর বিকল্প হিসেবে Cholchicine ব্যবহারের পর রোগী যদি উপরের পার্শ্ব-পতিক্রিয়ার জন্য হা-হুতাশ করে তখন Cholchicine ও বাদ। এখন শেষ ও তিন নম্বর অপশন হিসেবে অন অনলি সর্বরোগের মহৌষধ...!

৩. Corticosteroid - oral অল্প দিনের জন্য, বা IM injection.

উপরের তিন অপশনে তীব্র গেঁটেবাতের ব্যাথা ও প্রদাহ কমিয়ে তারপর Allopurinol বা Febuxostat দেয়া যায়, যদি Hyperuricemia থাকে, সেটা কমানোর জন্য। এখন ধরুন acute condition ভাল হয়ে গেল। আমি রোগীকে বললাম, 'আসেন ৬ সপ্তাহ পর, তখন নতুন একটা ওষুধ দিব!' রোগী ৬ সপ্তাহ পর আসলো, ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দিবো? 

ওষুধ দেয়ার আগে যা যা ভাবতে হবে-

- রোগীর এটাই ছিল প্রথম এট্যাক। acute condition এর ট্রিটমেন্টে ব্যাথা কমে গেছে, আর ব্যাথা হয়নি, এখনও ব্যাথা নাই, তাহলে ওষুধের প্রয়োজন নাই। যতই Hyperuricemia থাকুক না কেন, uric acid lowering ওষুধ তখনই দিব যখন Recurrent acute gouty attack থাকবে।

- ওষুধ তখনই দিব যখন tophaceous gout থাকবে। এই tophi গুলো দেখা যায় fingers, hand, wrist, forearm, elbow এর extensor surface এ, পায়ের tendo achilles এ, কানের লতিতে।

- affected joint এর x-ray করে দেখা গেল শুধু inflammation না, দীর্ঘদিনের inflammation এর ফলে bone & joint damage আছে।

- uric acid বেশি, renal stone এর হিস্ট্রি আছে, কোন টাইপ এর stone সে ব্যাপারে হয়ত নিশ্চিত না, কিন্তু hyperuricemia দেখে ধরে নেয়া যায় সম্ভবত urate stone.

- renal impairment এর রোগী, তাই uric acid ঠিকমত excrete out করতে পারছে না।

উপরের শর্তগুলোর যে কোনটা পূরণ করলেই uric acid lowering agent শুরু করার নিয়ম। কোন ওষুধ কিভাবে শুরু করতে হবে সে ব্যাপারেও একেকজনকে এক এক রকম চিকিৎসা দিতে দেখি! যদিও First line হল Allopurinol, কিন্তু অনেকে Febuxostat দিয়ে শুরু করেন!

- First line: Allopurinol. side effects সহ্য করতে পারে না, Heart failure, severe Kidney impairment আছে সে সব ক্ষেত্রে,
- Second line: Febuxostat

এই First ও Second line দুটোই xanthine oxidase inhibitor, দুটোই uric acid synthesis কমায়। এছাড়া আরো কিছু ওষুধ আছে যারা অন্যভাবে uric acid কমায়,

- Probenecid, Sulfinpyrazone: এরা Kidney দিয়ে uric acid re-absorption ইনহিবিট করে।

- Rasburicase, Pegloticase: এরা ব্লাডের uric acid কে inactive ও more soluble Allantoin এ রূপান্তর করে।

তাহলে উপরের নিয়মে uric acid কমানোর ট্রিটমেন্ট দিতে পারি।

ট্রিটমেন্ট পড়া শেষ, কিন্তু রোগ কিভাবে ডায়াগনোসিস হল তা এখনও পড়া হয়নি। ধরুন, আমি একজন নিধিরাম সর্দার, যার ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, অর্থাৎ কাছাকাছি ল্যাব ফিসিলিটি নাই, রোগীর হিস্ট্রি আর এক্সামিনেশনই আমার একমাত্র সম্বল।

- Gout এর ম্যাক্সিমাম প্রায় 50% রোগী এসে বলবে তার great toe তে ব্যাথা ফোলা (First MTP joint), এছাড়া পায়ের TMT joint, Ankle, Knee, হাতের small joint, wrist, elbow এসবে হতে পারে।

দুটো কথা মাথায় রাখা যায়-

১. খুব বড় joint যেমন Hip, Shoulder এ সাধারণত হয় না।

২. একসাথে একটা joint এ হয়, অর্থাৎ monoarthritis এর অন্যতম DD হল Acute Gout. তবে Chronic condition এ একাধিক joint একসাথে আক্রান্ত হতে পারে।

Osteoarthritis বা inflammatory arthritis এ রোগী যেমন অনেকদিনের intermittent হিস্ট্রি দেয়, তেমন না দিয়ে এখানে দিবে acute হিস্ট্রি, এমনই acute যে 2-6 ঘন্টার মধ্যে গিঁট ফুলে লাল আর ব্যাথায় টনটন করছে, এতটাই ব্যাথা যে রাতে ঘুমাতে পারে না।

- affected joint এক্সামিনেশনে সেখানে swelling, redness, tenderness থাকবে। আর tophaceous gout হলে উপরের joint গুলোর extensor surface এ গোঁটা গোঁটা Tophi দেখা যাবে, অনেক সময় tophi এর উপরের skin এ ulcer ও secondary infection ও থাকতে পারে।

এসব শুনে দেখে Acute Gout মাথায় রেখে Acute Gout এর উপরের চিকিৎসা দেয়া যায়। সাথে DD হিসেবে অবশ্যই মাথায় রাখা যায়, Septic Arthritis, Reactive Arthritis. এসব আলাদা করার জটিলতায় এখন না যাই, তবে রোগীর ongoing বা previous কোন infection আছে কিনা সে ব্যাপারে একটু জিজ্ঞেস করে নেয়াই ভাল।

Acute condition এর চিকিৎসা দিয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করে দেয়াটা উত্তম, কারণ সেখানে affected joint fluid aspirate করে polarized light microscopy এর মাধ্যমে needle shaped Monosodium urate monohydrate crystal পাওয়া গেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে এটা আসলেই Gout, না অন্য কিছু।

আর রোগী যদি একান্তই না যেতে চায় সেক্ষেত্রে নাই মামার চেয়ে কানা মামার মত একটা S. Uric acid এর এডভাইস দেয়া যায়। এটা বেশি পেলে আপনি আপনার Gout সংক্রান্ত চিন্তার পথে অনেকটাই ঠিক আছেন এটা মেনে নিয়ে বাকি চিকিৎসার পথে আগানোর চিন্তা করতে পারবেন। আর কম পেলে, শুরুতে যেমন পড়েছি তেমন কিছুটা ধোঁয়াশার মধ্যে থাকতে হবে এই যা। পাশাপাশি অন্য কোন septic বা inflammatory arthritis সন্দেহ হলে FBC, ESR, CRP করে সেসব সন্দেহ exclude করা যেতে পারে।

আর হ্যা, এক বড় ভাইয়ের জিজ্ঞাসা ছিল, তার রক্তে uric acid বেশি, তাই ডাক্তার তাকে সব ধরণের ফল খেতে নিষেধ করেছেন! আমার মনে হয় বড় ভাই ভুল শুনেছেন। সে যাই হোক, এটা নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করলাম, কিন্তু সবখানেই Fresh fruits খাওয়াকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এবং বইতে যে high fructose intake করলে uric acid production বাড়ে সেই fructose এই ফলের fructose না, বরং artificial fructose যা আইসক্রিম, কেক ও বিভিন্ন মিষ্টান্ন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। তাই ভাইকে বলেছি আপনি ফল খান, কিন্তু যেটা বেশি খান সেই red meat খাওয়া কমান। seafood এ uric acid বাড়ে। এসব খাবারে purine থাকে, আর purine থেকেই তৈরি হয় uric acid.

অনেক যেহেতু পড়েছি, তাহলে আরো একটু পড়ি। বেশি খাই, তাই বেশি uric acid production হয় এটা যেমন ঠিক, তার থেকেও uric acid বেশি বাড়ে kidney diasease এ, কারণ production হওয়া জিনিস kidney দিয়ে ঠিকমত বের হতে পারে না। তাই Hyperuricemia দেখলে শুধু Gout নিয়ে চিন্তা না করে, পাশাপাশি Kidney কি হালে আছে সেটা নিয়ে একটু ভাবা যায়।

Lead তৈরি পাইপে যদি খাওয়ার পানি আসে, যদিও এখন অধিকাংশ প্লাস্টিক, তাই Lead toxicity হলেও uric acid বাড়ে। রোগী দীর্ঘদিন ধরে Metformin খায় হোক সে DM বা PCOS বা ওজন কমানোর জন্য, তার যদি frequent lactic acidosis ডেভেলপ করে তবেও uric acid বাড়তে পারে। ধুমছে পানিচুনি (Alcohol) খাওয়ার অভ্যাস আছে, তাহলেও বাড়তে পারে।

কিছু ড্রাগ যারা uric acid বাড়ায়-

- Thiazide ও Loop diuretics

- Low dose Aspirin

- Cyclosporin

- Pyrazinamide, এটা Anti TB drug, Hyperuricemia, Gout সবই করতে পারে, তাই একটু monitoring করতে হবে।

আর একটা কমন থিউরি হল, শরীরে কোন কারণে যদি Cell Division বাড়ে, তখন বেড়ে যায় Cell death ও। আর মরা Cell metabolism এর সময়ও প্রচুর uric acid তৈরি হয়। এরকম বেশি বেশি cell division ও death হয় Lymphoproliferative ও Myeloproliferative disease এ। অন্যদিকে বেশি বেশি cell division হয়ে tumor হল, আর সেই বেশি cell কে kill করতে আমরা chemotherapy দিলাম, সেক্ষেত্রে tumor lysis হয়ে uric acid বাড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

দাঁতের রোগে উদাসীনতা নয়

দাঁতের রোগে উদাসীনতা নয়

মুখ ও দাঁতের রোগে জীবনে কখনো ভোগেননি এমন কাউকে পাওয়া সত্যি দুষ্কর।…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর