ঢাকা      রবিবার ১৮, অগাস্ট ২০১৯ - ৩, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ফাহিম উদ্দিন

ইন্টার্ন চিকিৎসক

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


ডাক্তারের টেস্ট রিপিট ও রোগীদের কমিশন ভাবনা

ডাক্তাররা কোনো টেস্ট রিপিট করতে দিলেই মানুষ মনে করেন কমিশন খাওয়ার জন্য টেস্ট করতে দিয়েছেন ডাক্তার। কিন্তু এমন ধারনা আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। এ ব্যাপারে কিছু কথা বলার পূর্বে প্রথমেই একটি ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি।

আমি তখন মেডিকেল কলেজে ফিফ্থ ইয়ারে। আমার এক আত্মীয় (ফিমেল, বয়স ২০ বছর) ঢাকায় পড়াশোনা করতে গেলো এবং কিছুদিন পর তার বমির সমস্যা দেখা দিল। মাঝে মাঝে বমি হয় আর সবসময় বমি বমি ভাব লেগেই থাকে। কিছু খেতে পারে না। প্রথমে সবাই ভাবলো হয়ত গ্যাস্ট্রাইটিসের জন্য এমন হচ্ছে। তাই প্রথম দিকে কিছুদিন এন্টিআলসারেন্ট ক্যাপসুল খেলো, এরপরেও কমছে না দেখে সিরাপও খেলো কিছুদিন। সাথে বমির সমস্যার জন্য এন্টিএমিটিক ড্রাগ/বমির ঔষধ। কিন্তু তাও কমছে না।

এভাবে ১০/১২ দিন যাওয়ার পর আমি বললাম, ঢাকায় যেহেতু নতুন গিয়েছে ভাইরাল হেপাটাইটিস হতে পারে! যদিও ক্লিনিক্যালি জন্ডিস নেই। তাও S. Bilirubin & SGPT করাতে বললাম। ভালো সেন্টার থেকে টেস্ট করানো হল। কিন্তু রেজাল্ট নরমাল আসলো! 

এবার ভাবলাম তাহলে হয়ত গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল কোনো সমস্যার জন্যই এমন হচ্ছে। ভাবলাম হয়ত সিভিয়ার গ্যাস্ট্রাইটিস ডেভেলপ করেছে। টানা কিছুদিন এন্টিআলসারেন্ট ক্যাপসু-সিরাপ আর এন্টিএমিটিক ড্রাগ খেয়ে গেলো পেশেন্ট। কিন্তু তাও কমছে না। এভাবে প্রায় ২০/২৫ দিন পার হয়ে গেল। ভাবলাম এবার কি এন্ডোস্কোপি করা লাগবে কিনা!

এদিকে, যেহেতু হোস্টেলে সেবা সুশ্রুষা করার মত কেউ নেই, তাই পেশেন্ট ঢাকা থেকে বাসায় চলে আসলো। আমিও তখন ছুটিতে বাসায়। এরপর মেডিসিনের কনসাল্ট্যান্ট Dr. Mohammad Iqbal Hossain স্যারের কাছে গেলাম পেশেন্ট কে নিয়ে (Sir is an excellent Clinician)। যেহেতু সমস্যা শুরু হওয়ার প্রায় ২ সপ্তাহ পর টেস্ট করিয়েও S. Bilirubin & SGPT দুটোই নরমাল আসলো, তাই স্যার দেখেই বললেন Lungs (Respiratory tract) or, Urinary tract যেকোনো এক জায়গায় ইনফেকশন থাকার সম্ভাবনা আছে। যদিও পেশেন্টের অন্য কোনো কমপ্লেইন নেই। ক্লিনিক্যালি জন্ডিসের পক্ষেও কিছুই নেই। তাই CBC with ESR, Chest X ray, Urine R/E, USG Whole Abdomen করতে দিলেন স্যার। পাশাপাশি আগের সেই S. Bilirubin & SGPT আবারো করতে দিলেন স্যার। 

রিপোর্ট হাতে আসার পর আমি নিজেই অবাক! Urine Pus cell: 35-40/HPF, S. Bilirubin: > 3 mg/dl, SGPT: 1134 IU/ml, Chest X ray P/A view: Normal, USG whole abdomen: Normal.

সুতরাং অবশেষে ডায়াগনোসিস হল: Acute Viral Hepatitis with Urinary Tract Infection. (অর্থাৎ লিভার এবং মূত্রনালি দুই জায়গায় ইনফেকশনের জন্যই ওরকম বমির ভাব হচ্ছিল, যার মধ্যে মূত্রনালির ইনফেকশন টা মাত্রাতিরিক্ত ছিল। এজন্যই এতদিন বমির ঔষধ দিয়ে বমি কন্ট্রোল করা যাচ্ছিল না। তখন মূত্রনালির ইনফেকশনের জন্য এন্টিবায়োটিক দেয়া হয়, পাশাপাশি অন্যান্য ঔষধ। পরবর্তীতে বমির ভাব কমে আসে এবং ২ সপ্তাহ পর SGPT কমে 121 IU/ml এ চলে আসে।)

অথচ, পেশেন্টের চোখ হলুদ হওয়া/প্রস্রাব হলুদ হওয়া, জ্বর/প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া এই ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না। তারপরেও টেস্ট করার কারনেই রোগটা ধরা পড়লো। তাছাড়া, প্রথমে যেই টেস্ট দুটো নরমাল ছিল, কিছুদিনের মাথায় সেগুলো এবনরমাল হয়ে গেলো। স্যারের পরামর্শ মোতাবেক রিপিট টেস্ট না করালে হয়ত এই ডায়াগনোসিসটা মিস হয়ে যেতো!

অনেকক্ষেত্রে রিপিট টেস্ট করতে দেয়ার কিছু কারণ এখানে উল্লেখ করছি:

১. অনেকক্ষেত্রে রিপিট টেস্ট দেয়া হয়, কেননা পেশেন্ট যেই সেন্টার থেকে পূর্বের টেস্টগুলো করে আনে সেই রিপোর্টের উপর ডাক্তার পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেন না। (অনেকক্ষেত্রে সেটা ঐ সেন্টারের নিম্ন মানের কারণে/মফস্বলের সেই সেন্টারের কোয়ালিটি সম্পর্কে ডাক্তারের জানা না থাকায়! কেননা সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো লেবেলিং করা নেই। আবার লেবেলিং এর সিস্টেম চালু করলেও এদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতি/টাকার গরমে সেটা কতটুকু সততা /নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে!)। 

২. অনেকক্ষেত্রে রিপিট করতে দেয়া হয় কারণ, আগের রিপোর্টের লেভেলের সাথে তুলনা করার জন্য। তার মানে আগের চেয়ে কমেছে নাকি বেড়েছে।

৩. অনেকক্ষেত্রে রিপিট করতে দেয়া হয় দুইটা সেন্টারের মধ্যে তুলনা করে দেখার জন্য। কারণ, অনেক সময় একজনের/এক সেন্টারের রিপোর্টের উপর ব্যাসিস করে ডিসিশন দেয়া কঠিন/রিস্কি হয়ে পড়ে।

৪. অনেক সময় রিপিট করতে দেয়া হয়, কেননা পেশেন্ট পার্টি পূর্বের রিপোর্ট গুলো সব এলোমেলো করে রাখে। কোনোটা আছে, তো কোনোটা বাসায় ফেলে আসে। বসে বসে এগুলো খোঁজার/গোছানোর সময় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া রুটিন চেক আপের টেস্টগুলো কিছু সময় পরপর এমনিতেই করা উচিত। তাই এরকম ক্ষেত্রে দেখা যায় সবগুলোই আবার করতে দেয়া হয়।

তাছাড়া একটা রোগ পরিপূর্ণ ভাবে ডায়াগনোসিস করার জন্য অনেক টেস্টের প্রয়োজন হয়। সুতরাং টেস্ট দেয়া মানেই কমিশন খাওয়ার জন্য নয়। শতকরা কয়েকজন ডাক্তার অবৈধ উদ্দেশ্যে হয়ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত টেস্ট (যদিও অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো আবার রুটিন চেক আপের অন্তর্ভূক্ত, সুতরাং আন্তর্জাতিক নিয়মে কোনো অন্যায় নয়!) দিয়ে থাকেন, তার জন্য গণহারে সবাই দিচ্ছে এমন ভাবা টা উচিত নয়! 

মূল সমস্যা:

সরকারি হসপিটালে যেমন রোগীর চাপ বেশি, আমাদের দেশে রেফারেল সিস্টেম না থাকায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের চেম্বারেও রোগীর চাপ বেশি (সামান্য সেল্ফ লিমিটং ভাইরাস জ্বর থেকে শুরু করে সর্দি-কাশি-ডায়ারিয়া তেও সবাই বিশেষজ্ঞের চেম্বারে গিয়ে ভীড় জমাচ্ছে)। তাছাড়া, একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার প্রতিদিন সর্বোচ্চ কতজন রোগী দেখতে পারবেন, এমনও কোনো নিয়ম নেই। যার জন্য সরকারি হাসপাতাল-চেম্বার সব জায়গাতেই রোগীর চাপের কারণে ডাক্তাররা রোগীদেরকে ঠিকমত সময় দেন না/দিতে পারেন না।

টেস্টগুলো কেনো রিপিট করতে দেয়া হলো সেটা বুঝিয়ে বলেন না/বলা সম্ভব হয় না। আবার অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, ডাক্তারদের প্রতি কিছু মানুষের এতই অনাস্থা তৈরি হয়েছে (যার পেছনে হলুদ সাংবাদিকতা অনেকাংশে দায়ী) যে, বুঝিয়ে বললেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। ফলশ্রুতিতে মানুষ ভুল বুঝে এবং ধরে নেয় যে, কমিশন খাওয়ার জন্যই টেস্ট রিপিট করতে দেয়া হয়েছে!

বি: দ্র: ইংরেজিতে একটা কথা আছে... Knowledge increases by Sharing, not by Saving! এই সিরিজের সবগুলো লিখাই একাডেমিক আলোচনার জন্য। সুতরাং কোনো ভুলত্রুটি হয়ে থাকলে দয়া করে "সুন্দর ভাবে" শুধরে দেবার অনুরোধ রইল। প্রাসঙ্গিক কোনো তথ্য/অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাইলেও করতে পারেন, আমাদের জুনিয়রদের উপকারে আসবে। দয়া করে ভালো না লাগলে এভয়েড করুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ঈদে চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল প্রসঙ্গে আবেদন

ঈদে চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল প্রসঙ্গে আবেদন

‘‘এবারের পবিত্র ঈদুল আজহায় ছুটি না নিয়ে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার্থে আপনারা স্বাস্থ্য…

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিটোর নিয়ে কিছু কথা উঠেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতালটির…

মৃত্যুর আগে কথোপকথন

মৃত্যুর আগে কথোপকথন

হাতির মতন বিশাল মেশিনটি আমার বুকের উপর দিয়ে বার কয়েক চক্কর দিয়ে…

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

একজন কনসালটেন্ট তার মামাতো ভাইকে দেখাতে এসেছে। রোগীর সাথে কথা বলছি, এই…

শুধুমাত্র চিকিৎসকদের ঈদ ছুটি বাতিল কেন?

শুধুমাত্র চিকিৎসকদের ঈদ ছুটি বাতিল কেন?

দুপুর আড়াই টা, বৃহস্পতিবার, ৮ আগষ্ট ২০১৯। ব্যাংকে গিয়ে চেক জমা দিলাম।…

মানহীন মেডিকেলের প্রাদুর্ভাব বন্ধে মেডিকেলিয় ভূমিকা

মানহীন মেডিকেলের প্রাদুর্ভাব বন্ধে মেডিকেলিয় ভূমিকা

আমরা সবাই জানি এবং প্রতিনিয়ত বলে বেড়াচ্ছি ব্যাঙের ছাতার মতো মানহীন মেডিকেল…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর