ঢাকা      মঙ্গলবার ২৫, জুন ২০১৯ - ১১, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. আতিকুর রহমান

এমিবিবিএস, এসএমসি
নন-ক্যাডার (৩৯তম বিসিএস)


‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগের দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার ৪০টিরও বেশি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল ইউনিট গড়ে তুলেছে। ৩১ শয্যাবিশিষ্ট শত শত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স উন্নীত হয়েছে ৫০ শয্যায়। অধিকাংশ জেলা সদর হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা কোনোটিতে ১০০ থেকে ১৫০ শয্যা, এমনকি ২৫০ শয্যা পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে। ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট গড়ে তুলা হয়েছে। এছাড়াও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য রয়েছে ইউনিয়ন সাব সেন্টার এবং ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক। 

দক্ষ জনবলের অভাব

অবকাঠামোগত এতো উন্নয়ন সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানে নেই সব প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল। জনবল চাহিদা মেটাতেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান সংকট নিরসনের লক্ষ্যেই ২০১৭ সালের এপ্রিলে তিনি ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর প্রদান করেন। এর মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীর এই দেশে স্বাস্থ্যখাতের চাহিদা পূরণে নিজের প্রতিশ্রুতিশীলতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। 

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ নিয়ে বলতে হয়, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনবল নিয়োগে পদ সৃষ্টি না হওয়ায় এসব হাসপাতালে কর্মরত সীমিত জনবল নিদারুণ পরিণতি ভোগ করছেন। সেই সঙ্গে চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কোটি কোটি মানুষ। 

প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টিই যেখানে করা হয়নি সেখানে নিয়োগ বহুদূর, এর ফলশ্রুতিতে স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত সীমিত লোকবল হিমশিম খাচ্ছেন ইনডোর, আউটডোরের লাখো রোগী সামলাতে। পাশাপাশি দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে একজন চিকিৎসকের দেখা মিললেও রোগ নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সময় দিতে ব্যর্থ হন চিকিৎসকরা। কর্মরত অপ্রতুল চিকিৎসকদের জন্য এ অবস্থা সত্যিই দুর্বিসহ। 

পর্যাপ্ত সময় দিতে গেলে রোগীর দীর্ঘলাইন কমিয়ে আনতে হবে, দীর্ঘলাইন সামলাতে গেলে সময়ের অভাবে বাস্তবিক অর্থে রোগের মূল ডায়াগনোসিস ছাড়া সিম্পটোমেটিক ট্রিটমেন্ট তথা উপসর্গমূলক চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল হতে হয়। এতে রোগ অনুযায়ী পুঙ্খানুপুঙ্খ চিকিৎসা প্রদান সরকারি হাসপাতালগুলোর অধিকাংশ জায়গায় অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। 

চিকিৎসকদের দক্ষতা বিশ্বে প্রশংসিত

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের মানুষের মেধা বিশ্বব্যাপী ঈর্ষণীয়। এদেশের অন্যতম মেধাবী জনগোষ্ঠী চিকিৎসক সমাজের যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ উন্নত বিশ্বের বড় বড় চিকিৎসকরা। তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন ও সদ্ব্যবহার না হওয়ায় মানুষ দিন দিন আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে এবং একটু স্বাবলম্বী হলেই বিদেশমুখী হচ্ছে৷চিকিৎসকদের শতভাগ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এদেশের রোগীদের বিদেশমুখী হওয়া আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। 

সংকট সমাধানে পদ সৃষ্টি জরুরি

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দ্বীন মোহাম্মদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'সারাদেশের চাহিদা মেটাতে ৬৫ হাজার চিকিৎসকের প্রয়োজন হলেও আদতে ২৪ হাজারের মতো চিকিৎসক কর্মরত আছে'। 

দুঃখজনক হলেও সত্যি, এতোটা বছর ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সরকারি হাসাপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা মোতাবেক অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী তেমন কোনো চিকিৎসক পদ সৃষ্টি করেনি। তাই ২০১৪ সালের তৎকালীন পরিস্থিতির পর বহু হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসক শূন্যপদ আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের খসড়া স্বাস্থ্য বুলেটিনে উল্টো চিত্র দেখানো হয়েছে। বুলেটিনে শূন্যপদ দেখানো হয়, মাত্র ৫ হাজার ৬৬টি।

তবে আদতে যে পরিস্থিতি বিরাজমান, যা ইতোমধ্যে আলোচনায় তুলে ধরেছি, তাতে বিপুল জনবল চাহিদার কথা প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংকট থেকেই অনুমেয়। নইলে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং সচিবলায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার কথা অনুযায়ী, আবারও ১০ হাজারসহ মোট ১৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রসঙ্গ আসতো না। অবশ্য শূন্যপদের বিরাট অংশ অবশ্য ৩৯তম স্পেশাল বিসিএসে ক্যাডার হিসেবে নির্বাচিত চিকিৎসক দ্বারাই মেটানো সম্ভব হবে।

আমরা মনে করি, বিষয়টির সঙ্গে শুধুমাত্র ৩৯তম বিসিএসের ভাইভাসহ উত্তীর্ণ ৮ হাজার ৩৬০ জন জড়িত নয়, এর সঙ্গে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল ৮০ শতাংশের অধিক মানুষ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপরন্তু, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সবগুলো পরীক্ষা এবং আনুসঙ্গিক শর্ত পূরণ ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিপুল চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া আগামী অন্তত ৩ বছরের মধ্যে সম্ভব নয়। 

এ অবস্থায় চিকিৎসকদের জন্য স্পেশালভাবে অনুষ্ঠিত ৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ সরকারি চাকরি প্রত্যাশী প্রার্থী চিকিৎসকরা সরকারের স্বদিচ্ছা পূরণে নিকটবর্তী সহায়ক শক্তি হিসেবে বিরাজমান। 

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ জরুরি 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল পেশাজীবী মানুষের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে অত্যন্ত আন্তরিক এবং বিভিন্ন সময়ে তিনি দেশের চিকিৎসকদের উপর আস্থাজ্ঞাপন করেছেন। এই ৮ হাজার ৩৬০ জন বিসিএস উত্তীর্ণ চিকিৎসক সরকারি সেবাদানের নিশ্চয়তা পেতে বেশ কিছুদিন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় পদ সংখ্যার জট খুলতে যে ছোটাছুটি করছেন এবং গত শনিবার (১৮ মে) আড়াই হাজার চিকিৎসক জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি নিয়ে জড়ো হন, দাবি মেটা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পথে তাদের মূল্যবান সময় ব্যয়ের আপাত নিয়ত নিয়েই জড়ো হন।

তাদের যৌক্তিক দাবি মেটাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ এবং লিখিত নির্দেশনার গত্যন্তর নেই। চিকিৎসকদের দাবির মূল ব্যানারে শেখ হাসিনার ছবিটি একটা প্রতীকি ভাষা বয়ে বেড়াচ্ছে, 'বিশ্ব মানবতার জননী শেখ হাসিনা যদি চান, তবেই হবে এর সুষ্ঠু সমাধান।' 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অগাধ আস্থার প্রতিদান স্বরূপ স্বাস্থ্যখাতের এই যৌক্তিক দাবিটি মেনে নিবেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ক্রমাগত বেড়ে চলা শয্যা সংখ্যার অনুপাতে প্রয়োজন মাফিক জনবলের চাহিদা পূরণে কার্যকর করে তুলবেন এই আশাবাদ সকলের। তিনি জনগণের চাহিদা মেটাতে পারেন বলেই, তাঁর প্রতি জনগণের আস্থা আর চাহিদার পরিমাণটাও বেশি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 





জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর