ঢাকা      মঙ্গলবার ২৫, জুন ২০১৯ - ১১, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. তারাকী হাসান মেহেদী

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)।


চিকিৎসক জীবনের সবচেয়ে মধুর সম্বোধন!

খবর: ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করায় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্চিতা হালদা লাথি মেরে ব্যবসায়ীর মাছ ফেলে দিলেন। পরে তিনি এ ঘটনার জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। এটা তার মহত্বের লক্ষণ।

এই ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করার ক্ষমতা বা যোগ্যতা আমার নেই।

তবে আমি ভাবছি ভিন্ন কথা। সামান্য দিদি ডাকেই যদি ওই এসিল্যান্ড এমন প্রতিক্রিয়া দেখান, তাহলে তিনি যদি ডাক্তার হতেন তাহলে কী করতেন?

সম্বোধনের ক্ষেত্রে আমাদের ডাক্তারদের চামড়া অনেকটা গন্ডারের চামড়ার মত হয়ে গেছে।

হাসপাতালে রোগীরা যখন আমাদের কাছে প্রথম আসে তখন ডাকে ‘স্যার’। এরপর যখন একটু সুস্থ হন, তখন ডাকে ‘ভাই’। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় ডাকে ‘চুদির ভাই’।

শুনতে খারাপ লাগলেও এরকম সম্বোধন শুনতে অভ্যস্ত আমরা। এরপরেও আমরা সম্বোধনটাকে বড় করে দেখি না, সার্ভিসটাকে বড় করে দেখি।

স্যার, ভাই, আপা, ভাতিজা, ডাক্তারবাবু, বাবা, ছেলে, মা - ইত্যাদি বিভিন্ন নামে লোকে সম্বোধন করে আমাদের ডাকে। যার যেটা মনে হয় সেটাই ডাকে। নারী ডাক্তারদের তো অনেকে আবার সিস্টারও ডাকে!

এগুলো তো গেল ভাল ডাক। এ ছাড়াও নেগেটিভ শালা ডাক্তার, ডাক্তার ব্যাটা, হারামজাদা, কসাই, চু** ভাই ইত্যাদি ডাক তো আছেই।

যাই হোক, এবার আসি স্যার সম্বোধন নিয়ে। বড়কর্তা হলেই আমাদের দেশে স্যার ডাকা, চেয়ারে তোয়ালা ঝুলিয়ে আলাদা প্রভুত্ব বুঝানোর সিস্টেম সেই ব্রিটিশ কলোনিয়াল আমলে তৈরি।

বর্তমান বিশ্বে মিলিটারি, পুলিশ, সশস্ত্র সার্ভিস ছাড়া কোথাও এভাবে সাধারণ চাকরিতে স্যার স্যার ডাকার রেওয়াজ তেমন নেই।

তবে হ্যাঁ, স্যার শব্দটার বহুল প্রচলিত ব্যবহার সব দেশেই আছে। কিন্তু সচারচর যে স্যার ডাকা হয়, তা সকলকে সাধারণ সম্বোধন করার জন্য। নিজের বস হিসেবে বা মালিক হিসেবে সম্মান করার জন্য নয়।

কলোনিয়াল যুগের সাথে সাথে এই ব্রিটিশ প্রভুত্ব সিস্টেমের স্যার সম্বোধন কোথায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা, তা না হয়ে এর ব্যবহার আরো উত্তরোত্তর বাড়ছে।

এখন কর্তা ব্যক্তিদের স্যার না ডাকলে তো মনক্ষুন্ন হনই, অনেকে আবার লাথি দিয়ে মাছও ফেলে দেন।

এমনকি এর বহুল ব্যবহারের জন্য ‘পুরুষবাচক’ স্যার শব্দটাকে নারীবাদিরা ফেমিনিজম করে এখন নারীদের জন্যও স্যার সম্বোধনের প্রচলন করেছে।

সে যাই হোক, পুরুষবাচক শব্দের মধ্যে সবাই ক্ষমতা খুঁজে পায়, এটার রেওয়াজ অনেক আগে থেকে চলে আসছে।

অনেকে যুক্তি হিসেবে বলেন, আসলে পুরুষ বা নারী মুখ্য নয়, এখানে ওই পদ বা চেয়ারটা মুখ্য। ওই পদ বা চেয়ারকে সম্মান করে সে যেই থাকুক, তাকে স্যার ডাকা হয়। (আবার সম্বোধন একই থাকলেও সর্বনাম হিসেবে পুরুষদের He, নারীদের She ঠিকই আলাদাভাবে ব্যবহার করা হয়। একটা জগাখিঁচুড়ি মার্কা অবস্থা)।

আমার জানা নেই বাংলাদেশের চাকরিবিধির কোথাও এই ব্যাপারটা উল্লেখ আছে কি না। তবে বিশ্বে রীতি এটাই যে, যার যে পদ তাকে সেই পদের নামে সম্বোধন করে ডাকা। যেমন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে মি. প্রেসিডেন্ট ডাকা হয়।

এবার আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর সম্বোধনের কথা বলি। আমি তখন গ্রামের এক হাসপাতালে ছিলাম। ওই হাসপাতালে এক গ্রাম্য মহিলা রোগী ভর্তি ছিলেন। তাকে দেখতে গেলেই তিনি ‘ডাক্তার ভাই’ বলে এতো মিষ্টি করে ডাকতেন যে, তার ডাক শোনার জন্য তাকেই প্রথম দেখতে যেতাম!

তার সে ডাকের মধ্যে যেমন আন্তরিকতাও ছিল, তেমনি ছিল নিজের বড় ভাইয়ের মত সম্মান (যদিও আমি তার বয়সে ছোট)।

একদিন দেখি, তিনি আমাকে হঠাৎ স্যার ডাকছেন। অবাক হয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম, আজ হঠাৎ স্যার ডাকলেন যে!

এরপর তিনি জানালেন, গতদিন রাউন্ড শেষে আমার যাওয়ার পর কেউ একজন তাকে ধমক দিয়ে ডাক্তার ভাই ডাকতে নিষেধ করেছেন।

আমি তাকে অভয় দিলাম, ডাক্তার ভাই-ই বলতে বললাম, কিন্তু এরপরেও যে কয়দিন হাসপাতালে ছিলেন তিনি আর কখনো সেই নামে সম্বোধন করেননি।

কিন্তু সেই ডাক্তার ভাই ডাকের মধ্যে যে আন্তরিকতা ও সম্মান আমার চোখে পড়ছিল, এই স্যার ডাকটাকে সে তুলনায় অন্তঃসারশূন্য মনে হচ্ছিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 





জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর