ঢাকা      মঙ্গলবার ২৫, জুন ২০১৯ - ১১, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রাতিন মন্ডল

সহযোগী অধ্যাপক,

মেডিসিন বিভাগ

রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ।


দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

আমার মা ২ সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। উনি গত আড়াই বছর ধরে ওভারিয়ান ক্যান্সারে ভুগছিলেন। মায়ের চিকিৎসার সকল ধাপ আমাদের দেশেই করেছি। অপারেশন হয়েছে রংপুরে। এরপর কেমোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করা হয়েছে। রোগ নির্ণয়ের সময় মায়ের ক্যান্সার খুব খারাপ অবস্থায় ছিল (বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল), এরপরেও মা আড়াই বছর বেঁচে ছিলেন শুধুমাত্র ঈশ্বরের কৃপায় আর চিকিৎসকদের কল্যানে।

দেশের বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়েছিলেন, তবুও আমি মাকে দেশেই চিকিৎসা করিয়েছি। কারণ, আমি জানি চিকিৎসা মোটামুটি সব দেশেই একই রকমের হয়। দীর্ঘ আড়াই বছরে মাকে ১৩ বার কেমো দেয়া হয়েছে। এই সময়ের পুরোটাই আমি মাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, সব কিছু ম্যানেজ করেছি। একজন ডাক্তার, একজন রোগীর লোক হিসেবে আমি আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি-

১. ক্যান্সার রোগগুলো সাধারনত বয়স বেশি হলে হয়। সুতরাং বয়স ৪০ পার হলে প্রতি বছর নিজের শরীরের সব কিছু চেক আপ করুন। সামান্য সমস্যা হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

২. আপনি একজন চিকিৎসককে আপনার জিপি বা ফ্যামিলী ফিজিশিয়ান বানান, যার কাছে আপনার সব তথ্য থাকবে। যিনি আপনার সব ব্যাপারে আপানাকে পরামর্শ প্রদান করবেন। যদিও এই জিপি বা ফ্যামিলী ফিজিশিয়ান আমাদের দেশে খুব একটা এভেলেবল না, তবুও জিপি ও ফ্যামিলী ফিজিশিয়ান প্র্যাকটিস দেশের বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়েছে। আশা করি এই কনসেপ্ট দ্রুত বিস্তার লাভ করবে।

৩. ক্যান্সারকে দাওয়াত দিয়ে বাসায় আনবেন না। যে কোন ক্যান্সারের জন্য-ধুমপান, তামাক জাতীয় জিনিস দায়ী। আজকেই এসব খাওয়া বন্ধ করুন। সাস্থ্যকর খাবার খান, ফ্রেশ শাকসবজি, ফলমূল খান, প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটুন।

৪. যাদের পরিবারে ক্যান্সার রোগ আছে, যেমন- ওভারিয়ান ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার তাদের সন্তানদের এই রোগ হবার সম্ভবনা অনেক বেশি। সুতরাং আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

৫. ক্যান্সার রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া অনেক জটিল। সাধারনত শরীরের কোন জায়গা থেকে মাংস নিয়ে পরীক্ষা করতে হয় ক্যান্সার কনফার্ম করার জন্য। এর আগে রক্ত, প্রসাব, এক্সরে, সিটি স্ক্যান ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হয়। অনেক সময় একই পরীক্ষা বেশ কয়েকবার করার প্রয়োজন হয়, যা বেশ ব্যায়বহুল।

৬. রোগ নির্ণয় হবার পর চিকিৎসা। সাধারনত ক্যান্সার চিকিৎসায় প্রথমে অপেরাশন এরপর কেমোথেরাপী, রেডিওথেরাপী দরকার হয়। অপারেশনগুলো সাধারণত অনেক জটিল এবং ব্যায়বহুল হয়। কেমোথেরাপি একজন ক্যনাসার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী দেয়া হয়, যা এখন আমাদের দেশের সব বিভাগীয় শহরে সম্ভব। কিন্তু রেডিওথেরাপী এখনও সব বিভাগীয় শহরে সম্ভব না।

৭. কেমোথেরাপি সাধারনত ২১ দিন বা এক মাস পর পর ৬ থেকে ৭ বার দেয়া হয়। একবার কেমোথেরাপি দিতে প্রায় ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ টাকারও বেশি লাগে (ঔষধের দামের উপর নির্ভর করে, যত দামী ঔষধ তত কাজ ভালো, আর সাইড ইফেক্ট কম)। 

৮. কেমো দেবার পর সাধারণত রোগীর মুখে ঘা হয়, খাবার রুচি চলে যায়, রক্ত কমে যায়, রোগী খারাপ হয়ে যায়। এসবের কারণ, কেমো ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে, সেই যুদ্ধের ফলে শরীরের এই অবনতি হয়। তবে এগুলো সাময়িক, ৭-১৪ দিন পর এগুলো ভালো হয়ে যায়। প্রতিবার কেমো দেবার আগে রক্ত পরীক্ষা করতে হয়।

৯. আমাদের দেশের রোগীরা সাধারণত ক্যন্সার চিকিৎসা সুসম্পন্ন করতে পারেন না। এর নানাবিধ কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো রোগ নির্ণয় ব্যায়বহুল, অপেরাশন জটিল ও ব্যায়বহুল, অপেরাশনের পর কেমো বা রেডিওথেরাপী ব্যায়বহুল। এসব দেবার পর রোগী বেশ অসুস্থ বোধ করেন, তাই অনেকে কেমো নেয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে কেমো এর ডোজ কমপ্লিট করতেই হবে। আর প্রতিবার কেমো দেবার আগে চেকআপ জরুরী। এমনকি কেমো এর ডোজ শেষ হবার পর নিয়মিত ফলোআপ খুব জরুরী। কারণ, ক্যান্সার কখনও নিরাময় হয় না, আবার ফিরে আসে।

১০. আমাদের দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বর্তমানে অনেক এবং এই সংখ্যা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণগুলো হলো- ধুমপান, খাদ্যে ভেজাল, কায়িকশ্রমের অভাব, রেডিয়েশন ইত্যাদি। তাই আমাদের দেশে ক্যান্সারের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কার্যক্রম বৃদ্ধি করা উচিত। সেইসাথে ক্যান্সার হাসপাতাল ও চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা উচিত। আর অবশ্যই ক্যান্সার চিকিৎসার উপকরন যেমন- কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপী সব জায়গায় এভেলেবল করা উচিত আর কেমোর মূল্য যতটা সম্ভব কমানো উচিত।

১১. একটা পরিবারে ক্যান্সার নির্ণয় হলে, সেই পরিবারের যে কি অবস্থা হয় সেটা যার হয়েছে একমাত্র সেই বোঝে। পুরো পরিবার সবসময় আতংকিত থাকেন তার প্রিয়জনকে নিয়ে। আর ক্যান্সার রোগীকে মৃত্যু যন্ত্রনা ও মৃত্যু ভাবনা প্রতিদিন তাড়া করে। তাই এই ক্যান্সার রোগীর মানসিক সাপোর্টের জন্য সাইকোলজিস্ট নিয়োগ খুব জরুরী।

সবশেষে বলব- যার হয় ক্যান্সার তার নাই এনসার, এই কথাটি ভুল। যে কোন বড় অসুখ যেমন- হার্টের অসুখ, কিডনীর অসুখ, ব্রেনের অসুখ; এ সবগুলোরই কোন এনসার নেই, দোষ শুধু হয় ক্যান্সারের। ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা ব্যায়বহুল ও জটিল হলেও রোগী অনেকদিন ভালো থাকে। তাই ক্যান্সার নির্ণয় হলে, মনোবল হারাবেন না, সাহস নিয়ে চিকিৎসা করুন, রোগী ভালো থাকবে। আশা করি আমাদের দেশের ক্যন্সার চিকিৎসার জন্য কেমোথেরাপির মূল্য আমাদের দেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 





জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর