ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৩ ঘন্টা আগে
ডা. আতিকুর রহমান

ডা. আতিকুর রহমান

এমিবিবিএস, এসএমসি
নন-ক্যাডার (৩৯তম বিসিএস)


১৭ মে, ২০১৯ ১৭:২৮

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

যুক্তি-১
বিপক্ষ মতের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, একসঙ্গে এত চিকিৎসক নিয়োগের আদৌ প্রয়োজন আছে কি?

প্রতিদিন গণমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যায়, চিকিৎসার অভাবে রোগীর মৃত্যু। অপরদিকে আমাদের সমাজের অ্যাপোলো, স্কয়ার, ল্যাব এইড কিংবা দেশের বাইরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নিজেদের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য রাখা মানুষদের জন্য নতুন নিয়োগ কেনো একটি সরকারি চিকিৎসকরেও প্রয়োজন নেই, এ কথা সত্যি। 

তবে দেশের ৯০ শতাংশের অধিক মানুষ যারা সরকারি হাসপাতালের ১২ টাকার টিকিটে চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল তারা জানেন—চিকিৎসক সংকট কাকে বলে, দীর্ঘলাইন কাকে বলে। রোগ সামান্য জটিলতর হলে তার জন্য ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা সদর, সেখান থেকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত দৌড়ে পথিমধ্যেই জান যাই যাই অবস্থা। 

জন্মগতভাবে পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একমাত্র 'স্বাস্থ্য' বিষয়ক অধিকারটি আজও হতদরিদ্র মানুষের জন্য বিড়ম্বনার বিষয়। তার কারণ খুঁজতে গেলে প্রতিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আপনাকে জানিয়ে দিবে, "...পোস্টগুলো খালি পড়ে রয়েছে। সীমিত জনবল নিয়ে আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। জনবলের অভাবে একদিকে যেমন চিকিৎসকরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাচ্ছেন, উল্টো তাতেও মানুষকে খুশি করা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত জনবল থাকলে রোগীদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব"। পাল্টা প্রশ্ন থেকে গেলো, আরও চিকিৎসক নিয়োগের প্রয়োজন আছে কিনা?

যুক্তি-২ 
অনেকে বলে থাকেন, একটি বিসিএস থেকে ৪ হাজার ৭৫০ জনকে নিয়োগ তো দেয়াই হলো। তবে আরো কেনো?

তাদের জ্ঞাতার্থে জানাতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, তিনি পুরো বিশ্বের অন্যতম বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন। এটা দল, মত নির্বিশেষে সকলে মেনে নিতে বাধ্য। যাই হোক, তিনি আমাদের সরকারপ্রধান, স্বয়ং তিনি ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য স্বাক্ষর প্রদান করেন। তিনি মানুষকে দিতে চান, অথচ আমরাই যদি নিতে না চাই তবে এ কেমন আত্মঘাতী মানসিকতা আমাদের?

যুক্তি-৩
এ পক্ষটির দাবি, ৩৭তম বিসিএসের নন ক্যাডাররা তবে কি দোষ করলো? তারা কেনো নিয়োগ বঞ্চিত হবে?

এটা কারও অজানা নয়, ৩৭তম কিংবা অন্য বিসিএসে নন-ক্যাডার হিসেবে ঝুলে থাকা চিকিৎসক সংখ্যা সব মিলিয়ে কয়েকশর বেশি না। তদের মাঝেও ৪৩ শতাংশকে বিভিন্ন জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে। বাকি যারা, যে কজনই থাকেন তাদের বয়স কিংবা অন্যান্য শর্ত সাপেক্ষে শূন্যপদে পদায়নের জন্য আপনারাও প্রয়োজন মনে করলে চেষ্টা চালান। এতে তো কেউ বাধা দেয়নি, দিবে না এবং আপনাদের সাথে তুলনাতেও যাবে না ৩৯তম’র নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা। এখানে তো কেউ কারো প্রতিপক্ষ না। তাহলে তাদের নিয়োগের জন্যেও চেষ্টা না করে উল্টো ৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যডারদের চাওয়াকে অযৌক্তিক বলে চালাতে চাচ্ছেন কেন?

যুক্তি-৪
পরবর্তী ব্যাচগুলোর শিক্ষার্থীরা কি দোষ করলো। তাদের দিকটাও দেখা উচিত নয় কি? একসাথে বেশি না নিয়ে প্রতিবছর অল্প অল্প করে নিলেই তো হয়। আর পরের ব্যাচগুলার জন্য কিছু সুযোগ রাখা হোক।

কথাটা কিছুটা যৌক্তিক তার চেয়ে বড় অংশ অযৌক্তিক। পরের ব্যাচগুলা থেকেও অসংখ্য মেধাবী চিকিৎসক প্রয়োজন। তাদের জন্য অবশ্যই সুযোগ রাখা উচিত। কিন্তু তার জন্য ৩৯তম’র বড় নিয়োগ কোনো কারণেই বাধা হতে পারে না। তার কারণটা ভাল করে খেয়াল করেন, মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাত্র কয়দিন আগেই বললেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুই তৃতীয়াংশের মতো পোস্টই খালি পড়ে রয়েছে। তাহলে এরকম হাজার হাজার চিকিৎসক দিয়ে সে পদ পূরণ সম্ভব হবে। ৩৯তম কিংবা অন্যান্য বিসিএসের উত্তীর্ণ সবাইকে নিয়ে নিলেও পরবর্তী ব্যাচগুলোর জন্য হাজার হাজার চিকিৎসক পদ শূন্য পড়ে থাকবে। তাছাড়া সামনের কয়েক বছরের মধ্যে আরেকটি স্পেশাল বিসিএস হবার সম্ভাবনার কথা ইতোমধ্যে বলা হয়েছে এবং মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রী সর্বশেষ মাত্র কদিন আগে পর্যায়ক্রমে ১৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের কথা বলেছেন। সুতরাং সরকারের স্বদিচ্ছা থাকলে কেউই কারো জন্য প্রতিপক্ষ নয়, বরং হেল্থ সেক্টরে জনবল চাহিদা আরো দীর্ঘকাল থেকে যাবে।

যুক্তি-৫
কেউ কেউ বলেন, অন্য সেক্টরের তুলনায় স্বাস্থ্য সেক্টরে এতো বেশি নিয়োগে কথা আসছে কেনো?

দেখুন স্বাস্থ্য সেক্টর অন্য যে কোনো সেক্টরের তুলনায় ভাইটাল। এই সেক্টরের সঙ্গে মানুষের সুস্থ জীবনযাপন থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত জড়িত। প্রয়োজনীয় জনবলের ধারেকাছেও না থাকা জনবল নিয়ে কিভাবে সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব? তাছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) একটি রিপোর্টে নজর দিলে এসব অবান্তর কথা আর বলবেন না।  WHO বিশ্বব্যাপী ৫ বছর মেয়াদী জনসংখ্যা অনুপাতে কর্মরত চিকিৎসক সংখ্যার প্রতিবেদন প্রকাশ করে।  (গুগলে খুঁজলে সহজেই প্রতিবেদনটি পেয়ে যাবেন)। 

সর্বশেষ ২০১৩-১৭ এই কয়বছরের জন্য প্রকাশিত জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ ১৮৮টি দেশের মাঝে ১৩৩ নাম্বারে অবস্থান করছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ প্রকল্প, ফ্লাইওভার নির্মাণ, মধ্যম-আয়ের দেশে উন্নীত, ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও পালন-পালন, সকল কর্মকর্তা কর্মচারীর কয়েকগুণ বেতন ভাতা বৃদ্ধির ডিজিটাল সোনার বাংলাদেশে একটি সেক্টর কিভাবে এতোটা পিছিয়ে থাকতে পারে তা বোধগম্য নয়।

যুক্তি-৬
এ চিন্তাশীল অংশটি মনে করেন, এতোগুলো চিকিৎসক কোথায় রাখবে আর তাতে আদৌ কি চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন হবে?

আমাদের বক্তব্য হলো, অসংখ্য সরকারি হাসপাতালে হাজার হাজার বেড সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় বলতে গেলে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, একটি নতুন পদও সৃষ্টি করা হয়নি। এটি হলে আসল চিত্র ফুটে উঠবে এবং দেখা যাবে যতজন নিয়োগের জন্য ছোটাছুটি করছে তার চেয়ে অসংখ্য পদ খালি পড়ে রয়েছে। আর মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে, যেহেতু সরকার এরই মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে ফেলেছেন এবং বেড সংখ্যাও অনেক বাড়ানো হয়েছে, সেক্ষেত্রে এখন প্রয়োজনীয় জনবলটাই মানোন্নয়নের পথে প্রধানতম অন্তরায়।

যুক্তি-৭ 
তাদের আশঙ্কা, একসাথে ১৩ হাজার নিয়োগ দিলে মেধাবী চিকিৎসক পাওয়া যাবে তো?

সরল কথায় উপরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী অসংখ্য ফাঁকা পদের বিপরীতে 'নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো' এ কথাটি স্মরণ করুন। তার সাথে বলি, ইন্টারমেডিয়েটের পর এক মহাযুদ্ধে জিতে এক একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট ভর্তি হয়৷ পাস করে ডাক্তার হতে তার চেয়েও বহুগুণ কষ্ট করতে হয়। এই চাপ নিতে না পেরে মেডিকেল সেক্টরে সুইসাইডের মত অঘটন ঘটিয়ে ফেলছে অহরহ আর আপনাদের কেউ কেউ মেধা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আসছেন। বুকে হাত দিয়ে কজন বলতে পারবেন যে, আপনি মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেলে পড়তেন না? তারপরেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা একেবারে কম ছিলো কি? আজ কাড্যারভুক্ত হতে চাওয়া ৮ হাজার ৩৬০ জন তারাই, যারা ৪০ হাজার চিকিৎসকের মাঝ থেকে টিকে আসছে। আমরা মনে করি, যারা বাদ পড়েছে তাদের অবস্থাও টিকে থাকাদের চেয়ে খারাপ নয়, বরং বিসিএসে না টেকা অনেকের অবস্থা অধিক ভালো। হয়তো ভাগ্যের সামান্য হেরফেরে কেউ টিকেছে কেউ টিকে নাই। 

যুক্তি-৮
তারা জানতে চায়, নিয়োগ দিলেও চিকিৎসকরা গ্রামে থাকবে তো?

এই অভিযোগ একেবারে অমূলক নয়। তবে স্বাস্থ্য ক্যাডারের মানুষ এমনিতেই সারাজীবন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে অভ্যস্ত। একমাত্র এই ক্যাডারকে গ্রামেগঞ্জে বাধ্যতামূলক পোস্টিংয়ে থাকতে হয় এটা জেনেই চিকিৎসকরা ক্যাডার হতে আগ্রহী। সরকার সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন মাফিক করলে চিকিৎসকরা অবশ্যই গ্রামকে আপন করে নিবে। বসার মতো জায়গা না থাকলে, সহকারী এক দুজন না থাকলে, প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র না থাকলে, জরাজীর্ণ ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের টয়লেটের গেটটা পর্যন্ত না থাকলে একজন সাধারণ মানুষও থাকতে নিরুৎসাহিত হবে। তারমাঝেই চিকিৎসকরা অনেকটা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ৩৯তম’র মাধ্যমে ক্যাডার হতে চাওয়া চিকিৎসকগণ গ্রামে থাকার আপাত নিয়ত নেমেই মাঠে নেমেছে। তাদের শুধু চাকরিটা চায়, সেবাদানের সুযোগ চায়, আহামরি সুবিধাতো কেউ চেয়ে বসেনি৷ তারপরেও কেউ যদি নিয়মের ব্যত্যয় করতে যায়, সেটা দমন করার উপায় তো সরকারের হাতেই আছে। সরকারের চাহিদা মোতাবেক সার্ভিস না দিতে চাইলে সরকার প্রয়োজনে তাকে ছাঁটাই করে ফেলবে।

সার্বিক দিক থেকে ৩৯তম বিসিএসের ৮ হাজার ৩৬০ জন নন-ক্যাডারকে ক্যাডারভুক্ত করতে আপনাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাহায্য-সহযোগিতা এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ একান্তভাবে কাম্য। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত