ঢাকা      মঙ্গলবার ২৫, জুন ২০১৯ - ১১, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ! জানি না আর কি কি খারাপ আছে সামনে! সকাল ৮টা। ইনডোরে রাউন্ড দিচ্ছি। ওয়ার্ড ভর্তি ডায়রিয়ার রোগী। বেড ছাপিয়ে ফ্লোর বারান্দা সব পূর্ণ। পৌনে নয়টা বাজে, রাউন্ড চলছে। হঠাৎ এক অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আমার ব্যক্তিগত নাম্বারে।  প্রথমবার রিসিভ করলাম না, একহাতে ফাইল, অন্যহাতে কলম। এরপর আবার ফোন, ফাইল রেখে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে- কী, ফোন ধরেন না কেন? কই আছেন আপনে?

- কে বলছেন আপনি?

- আমি কে তা দিয়া কি করবেন? আপনি কই? আমার রোগী আছে!

- রোগী কোথায়? আমাকেই বা কেন ফোন দিয়েছেন?

- কেন, আপনাকে ফোন দেয়া যাবে না?

- রোগী নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসবেন। এতে আমাকে ফোন দিতে হবে কেন? আর আমি এখন কাজ করছি, রাউন্ড দিচ্ছি। আপনি জরুরি বিভাগে রোগী নিয়ে আসুন, সেখানে আপনার রোগীকে দেখার জন্য কর্তব্যরত লোকজন আছেন। প্রয়োজনে তারা আমাকে আপনার রোগী সম্পর্কে অবহিত করবেন।

পাঁচ মিনিট পরেই ছবির ছেলেটার হন্তদন্ত হয়ে ওয়ার্ডে আগমন। আমি তখনো রাউন্ড দিচ্ছি, আমার সাথে দুজন সিস্টার। ঢুকেই উচ্চবাচ্চ, 'আমার রোগীর ডায়রিয়া, আপনাকে ফোন দিছি, আপনি কী এমন হয়ে গেছেন?'

- এটা ওয়ার্ড, এখানে চিৎকার করবেন না।

- কেন চিৎকার করলে কী করবেন? চেনেন আমারে?

কিছু কিছু সময়ে টেম্পার ধরে রাখা খুব কঠিন। যখন আপনি টানা কয়েকদিন ধরে কাজ করছেন, প্রচণ্ড এই গরমে রোযা রেখে আউটডোরে শতশত রোগী দেখার পাশাপাশি দিনরাত ইমার্জেন্সি এটেন্ড করছেন। আপনি ড্রাই ফুড খেয়ে সাহরী করেন, কয়েক রাত সেটাও ঠিকমত খেতে পারেন না, সকালে রাউন্ড শেষ করে আপনাকে আবার বসতে হবে আউটডোরে।

আমি জানি না এই অবস্থায় এহেন কোন স্টুপিডকে চেনার কোন অবকাশ আপনার থাকবে কিনা। ফলাফল তার রিপিটেড চিৎকারে আমি অতিষ্ঠ। আমিও চিৎকার দিয়ে বললাম,‘দিদি সিকিউরিটিকে খবর দেন!’ রোগীদের দিকে চেয়ে বললাম, ‘আমি কি আপনাদের চিকিৎসা দিব, না এই লোকের চিৎকার শুনবো?'

ইতিমধ্যে দিদি দুজন প্রতিবাদ শুরু করেছেন, তাকে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে যেতে বলছেন, রোগীরাও এর আচরণে বীতশ্রদ্ধ, তারাও যখন তাকে বের হয়ে যেতে বললো তখন সে চোখ রাঙানি দিয়ে বলে যেতে থাকলো, 'আপনি নিচে নামেন, তারপর দেখাচ্ছি!'

- নিচে থাকেন। কী দেখাবেন দেখার জন্য অপেক্ষা করবো!'

ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতবিহবল। সিস্টাররা বললেন, 'আপনি এখনি নিচে নামবেন না, এক ঘণ্টা পরে নামবেন, ছেলে ভাল না।'

- আরে এসবে ভয় পেয়ে লাভ আছে, দেখি কী করে!

দশটার দিকে রাউন্ড শেষ হল। এর মধ্যে ইমার্জেন্সি থেকে আর ফোন আসেনি, আমি যেয়ে আউটডোর রোগী দেখছি। দুপুর ১২টার দিকের ঘটনা। আমি ইমার্জেন্সির দিকে যাচ্ছি একটা পেশেন্ট এটেন্ড করতে। বের হতেই সেই ছেলে আমার পথ আগলে দাঁড়ালো এবং আঙুল উঁচিয়ে উচ্চস্বরে বলতে লাগলো, ‘আপনি সব রোগীরে রাউন্ড দিছেন, আমার রোগীরে রাউন্ড দেন নাই কেন?’

- প্লিজ চিৎকার করবেন না, এটা সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, আপনার চিৎকারে সেবাদান ব্যহত হচ্ছে। আপনার রোগী রাউন্ডের সময় ওয়ার্ডে ছিল না, তাই তখন দেখতে পারিনি। এখন যদি থাকে, তো পরে যখন রাউন্ডে যাবো তখন দেখবো। আর আপনার রোগী যদি ভর্তি হয়েই থাকে, তার তো চিকিৎসা চলছেই। 

আবার তাদের চিৎকার, 'ব্যবসা করতে আইছো, ব্যবসা?'

সে এত উচ্চস্বরে কথা বলছিলো যে আশপাশ থেকে লোক এসে হাজির। তার সাথে আর এক ছেলে এসেও একইভাবে উচ্চস্বরে কথা বলতে লাগলো, এবং আমাকে এসে ধাক্কা দিল। 

মোবাইল দিয়ে এসবের কিছু ভিডিও করা ছিল। তারা ধাক্কা দিতেই থাকলো, উলটাপালটা কথা তো আছেই। ইতিমধ্যে অনেক লোক হাজির। তারা এসে তাদের দুজনকে ধরে সরিয়ে দিলো।

ইমার্জেন্সিতে রোগী আছে তখনো। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত আমি, এসে চেয়ারে বসি। পাশে বসা রোগী বলছে, 'স্যার, আগে আপনি একটু রেস্ট নেন, পরে চিকিৎসা দিয়েন। আমি বলি, 'দেখে রাখেন, আপনারা এতগুলো ভাল লোক কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন গুঁটিকয়েক খারাপ লোক দ্বারা!'

বেডে শোয়ানো ফিজিক্যাল এসল্টের রোগী। কিসের কি, আমার মাথাই আর কাজ করছে না, এ লক্ষণ হাইপোগ্লাইসেমিয়ার না, এ লক্ষণ এসব অসভ্যের অশ্রাব্য শব্দগুলো শুনার হতাশার।

থানায় ফোন দেয়া দরকার। সামনে অনেকগুলো ডায়রিয়ার রোগী। ভিড়ও কমানো দরকার। ভর্তি দিলাম সব। ইতিমধ্যে ঘটনা সম্পর্কে অনেকেই অবগত। ইউএইচএফপিও স্যার মিটিংয়ে। কিছুক্ষণ পর দেখি বেশ ক’জন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ হাসপাতালে ঢুকছেন, আমি তখনও ইমার্জেন্সি রুমে।

স্যারের রুমে বসলেন সবাই, আমাকে ডাকা হল। আমি মোবাইলের ভিডিও ছবি সব দেখালাম। উপর থেকে সিস্টারদের ডাক দিলাম, তারা এসেও ঘটনার বর্ণনা দিল। সবাই এ ঘটনায় বেশ ক্ষুব্ধ।

ছেলেটার নাম ইয়াসির আরাফাত। উপজেলা অফিসের পিওন, কাম পাতিনেতা, কাম সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের চামচা। আর এখন গরম দেখায় ইউএনওর, সেই গরমেই বিভিন্ন জায়গায় গরম দেখিয়ে বেড়ায়।

বর্তমান উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আসলেন, কিছুক্ষণ পর আমাদের স্যারও আসলেন। ঘটনার চাক্ষুষ যারা ছিলেন, ফার্মেসি দোকানদার, কিছু স্টাফ, সিস্টার সবাই উপস্থিত। ছেলেটা যেহেতু পাতিনেতা তার নাম্বার নেতাদের কাছে আছে, তারা তাকে ফোন দিয়ে এক্ষুণি হাসপাতালে আসতে বললেন।

সে এসে ভাইস চেয়ারম্যানের পায়ের কাছে বসে পড়লো, সে নাকি অসুস্থ বোধ করছে, বসে বসে তার বক্তব্য দিল! যাই হোক, নেতারা বেশ গরম দেখালেন, বকা দিলেন অনেক, শেষে আমার পা ধরে মাফ চাইতে বললেন। আমার স্যারও চুপ, আসল প্রশ্রয় তাদের থেকেই আসে, সে গল্পে আর না যাই।

তাই শুধু বললেন, 'তোমরা তো বোঝ না হাসপাতাল কিভাবে চলে, দুজন ডাক্তার দিয়ে চালাই! তোমরা এভাবে করলে চলবে কিভাবে! আর কিছু হলেই মন্ত্রীর গরম দেখাও!'

আমি খুশি না, মোটেও খুশি না! আমি খুশি হতাম যদি স্যার বলতো, ‘সরকারি কর্তব্য পালনে বাধা প্রদানের জন্য এদের বিরুদ্ধে মামলা করবো।’ কিন্তু স্যার এটা বলবে না, আগেও কখনো বলেনি, তিনি শুধু আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি ঠান্ডা করেন!

পরিস্থিতি ম্যানেজড হলো, সবাই চলে গেলে স্যার বললেন, যাক সালিশ তো হয়ে গেল! 'আমিও কিছু আর বললাম না, বলেও লাভ নাই জানি, সবাই সব কিছু ম্যানেজ করে চলে, স্যারও তার মত সব কুল ঠিক রেখে ম্যানেজ করেছেন!

মামলা করেই বা কী হত? ম্যানেজ করে অমুক-তমুকের মত কয়েক ঘণ্টায় জামিন পেয়ে যেত!

যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ হলেও মানুষ আশা নিয়ে বাঁচে, কারণ আগামী রহস্যময়! আমাদের প্রভুত উন্নতির সাথে একটা জিনিসের উন্নতি খুব বেশি প্রয়োজন, আর তা হল মানুষের মনুষ্যত্ববোধ ও জ্ঞানবুদ্ধির। এহেন দূরাচারী মানুষগুলো যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে না, তাদের আচরণ আমাদের হতাশ করে। সেবাকে বাধাগ্রস্ত করে, পিছিয়ে দেয় সমাজকে, যদিও এসব নিয়ে আমরা ভাবি কম!

সবকিছু মিলিয়ে বেশ টক্সিক লাগছে, রেস্টলেস তো বটেই। জানি কিছু হবে না, তবুও নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদলির এপ্লিকেশন জমা দিয়েছি, আমার একার জন্য তো শুধু এটুকুই সম্ভব! ভেবেছিলাম লিখবো না, তাও লিখে ফেললাম, এটাও এক প্রতিবাদ। প্রতিবাদ না হোক, তবু স্মৃতিতে থাকুক; কেউ কিছু জানুক শিখুক, আমিও শিখি কিছু...

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 





জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর