ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

মেডিকেল অফিসার, রেডিওলোজি এন্ড ইমেজিং ডিপার্টমেন্ট,

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল।


থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত একটি ভালবাসা ও তার পরিণতি

প্রথম দেখাতেই ভালো লাগা। ভাললাগা থেকে ভালবাসা। দুই পরিবারের সম্মতি নিয়ে বিয়ে। বিয়ের পরও পাখির ডানায় ভর করে চলছিল ছন্দময় জীবন। জীবনের চার হাতের বন্ধনকে আরো শক্তিশালী করতেই এলো কচি দুটো হাত। প্রথম সন্তান। প্রথম প্রেমের মতোই রোমাঞ্চকর অনুভব। আবির আর অনুর (ছদ্মনাম) আদর যত্ন ভালোবাসাতে একটু একটু করে বড় হচ্ছিল দৃপ্ত।

মাস ছয়েক বয়স। গোসল করাতে গিয়ে দৃপ্তর দাদী প্রথম অনুভব করল নাতির পেটের বাম দিকে চাকা। অস্থির বাবা মা দ্রুত চিকিৎসকের নিকট নিয়ে গেল। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানা গেল দৃপ্ত থ্যালাসেমিয়াতে আক্রান্ত।

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে লোহিত রক্ত কনিকা ঠিক মতো তৈরী হয় না বলে রোগী রক্ত শুন্যতায় ভুগে। বেঁচে থাকার জন্য রোগীকে প্রতি মাসে এক বা দুই ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।

একটি হাসি খুশি প্রানবন্ত পরিবারের সব খুশি মুহূর্তে বিলীন হওয়ার জন্য পরিবারের কোন সদস্যের থ্যালাসেমিয়াতে আক্রান্ত হওয়াই যথেষ্ট।

বংশগত রোগ বলে বাবা মা দুজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে পরিবারের একাধিক সন্তান থ্যালাসেমিয়াতে আক্রান্ত হতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যায়বহুল। প্রতি মাসেই রক্ত দিতে হয় বলে চিকিৎসা পদ্ধতি ও বেশ জটিল। মলিন মুখের থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুটি এই জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি নিতে নিতে হয়ে যায় খিটখিটে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ৬০ হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। প্রতি বছর প্রায় সাত হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম নিচ্ছে।

মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোতে যেখানে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষার যোগান দিতে পরিবারের কর্তা ব্যক্তিটিকে হিমসিম খেতে হয়, সেখানে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসাতে প্রতি মাসে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা খরচ হয়। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিকে সমাজ এবং পরিবারে রীতিমত বোঝা হিসেবে গণ্য করা হয়।

এতটা ভয়ংকর যে থ্যালাসেমিয়া রোগ তা থেকে মুক্তির উপায় কি? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য থ্যালাসেমিয়ার কোন টিকা নাই। নিরাময়যোগ্য সহজলভ্য কোন চিকিৎসা নাই। জন্মের দু’এক বছরের মধ্যেই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু ফ্যাকাশে হওয়া, খিটখিটে মেজাজ, দুর্বল হওয়া, বৃদ্ধি ব্যহত, জন্ডিস, বার বার বিভিন্ন ইনফেকশন হওয়া প্রভৃতি রোগ লক্ষন নিয়ে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হয়।

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হওয়ার পরে রোগ মুক্তি প্রায় অসম্ভব। কারণ, রক্তের অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন নামক থ্যালাসেমিয়ার উন্নত চিকিৎসার অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রতিস্থাপনের জন্য অস্থিমজ্জার ডোনার পাওয়া যায় না।

থ্যালাসেমিয়ার অভিশাপ থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হবে। আর এই মুক্তির একটাই পথ। সেই পথ হলো, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা। নতুন করে আর একটি শিশুও যেন থ্যালাসেমিয়াতে আক্রান্ত না হয়, সেজন্য সমাজের সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাত এক কোটি দশ লক্ষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক রয়েছেন। থ্যালাসেমিয়া বংশগত একটা রোগ। বাহক ব্যাক্তির শরীরের প্রতিটি কোষের জীনের বাহক। একজন বাহক পুরুষ যখন অপর একজন বাহক নারীকে বিয়ে করেন, কেবল তখনি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত সন্তান জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়।

আর তাই থ্যালাসেমিয়া মুক্ত পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে একমাত্র উপায় হচ্ছে এই সম্ভাবনাটাকে নাই করে দেয়া। বিয়ের আগে রক্তের একটা ছোট্ট পরীক্ষা আর সে পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে নেয়া সময়ের সাহসী সিদ্ধান্ত পারে আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে যে আপনার কোন সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবে না।

আপনি নারী পুরুষ যেই হোন, বিয়ের আগে একটি ভালো ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে রক্তের হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস নামক পরীক্ষা করালেই আপনি জানতে পারবেন আপনি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কিনা।

আপনি যদি বাহক হোন আর আপনার জীবন সঙ্গীও যদি বাহক হয়, তবেই সন্তানদের থ্যালাসেমিয়া হতে পারে। কিন্তু, আপনি যদি বাহক হোন এবং এমন একজনকে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করেন যিনি বাহক নন, তাহলে আপনাদের সন্তানদের মধ্যে আপনার থেকে প্রাপ্ত জীন দ্বারা বাহক সন্তান আসতে পারে। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত সন্তান আসবে না।

থ্যালাসেমিয়ার বাহকদের ক্ষেত্রে রোগ লক্ষন প্রকাশিত হয় না বলে সে সম্পূর্ন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।

একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, রক্তের গ্রুপের সাথে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হবার কোন সম্ভাবনা নেই। একটা কমন প্রশ্ন থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে সবার প্রথমে জিজ্ঞেস করা হয়ে থাকে। রক্তের সম্পর্কের কারো সাথে বিয়ে হলে থ্যালাসেমিয়া হবে কি না। প্রশ্নটা বেশ যৌক্তিক। রক্তের সম্পর্কিত আত্মীয়দের মধ্যে জীনগত বৈশিষ্ট্যের মিল থাকায় অনেক সময় একই পরিবারের অনেকেই বাহক হয়ে থাকে। যেহেতু, বাহকদের রোগ লক্ষন প্রকাশ পায় না তাই অনায়াসেই বিয়ে হয়ে যায়।

বাবা মা দুজনই একই পরিবারের এবং বাহক হওয়ার ফলে একাধিক সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হতে পারে। তবে এক্ষেত্রেও বিয়ের আগে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া বাহক না হলে তবেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

মনে রাখতে হবে, আমাদের সমাজে পরিবার একটা ইনিষ্টিটিউশন এবং বিয়ে নামক পবিত্র সম্পর্ক প্রজন্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ধারক ও বাহক।

একটি সুস্থ স্বাভাবিক বিবাহিত জুটিই কেবল সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পারে। একটি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত সন্তান একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না। হাহাকার।

তাই পুরনো ধ্যান ধারনাকে বদলে ফেলুন। বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের গায়ের রং, উচ্চতা, চুলের দৈর্ঘ্য কিংবা ছেলের উচ্চতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকুরীর স্থায়িত্ব বিবেচনার আগে ছেলে মেয়ের হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষার রিপোর্টকে বিবেচনা করুন।

আপনি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলে সব ভাবনা, পছন্দ অপছন্দকে পদদলিত করে থ্যালাসেমিয়া বাহক না এমন কাউকে বিয়ে করুন।

সমাজের সকলের সচেতনতা এবং সদিচ্ছাই পারবে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। আর থ্যালাসেমিয়া মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সফল অভিযানে আমরা সকলেই যেন এক একজন গর্বিত সেনা হই এই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর