ঢাকা      মঙ্গলবার ২১, মে ২০১৯ - ৭, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী

৩৯তম বিসিএসে সাড়ে ৮ হাজার নন-ক্যাডার চিকিৎসকের ভাগ্য অনিশ্চিত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রায় সাড়ে আট হাজার ডাক্তার নন-ক্যাডার হয়েছেন, পদ স্বল্পতার কারণে যাদের নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম বিভিন্ন সময় বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে দশ হাজার ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হবে। ঘোষণা অনুযায়ী, এরই মধ্যে সাড়ে চার হাজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সাড়ে পাঁচ হাজার ক্যাডার নিয়োগ দেওয়া এখনো বাকি। এ প্রেক্ষাপটে নিয়োগের দাবিতে স্বোচ্চার হয়েছেন এসব চিকিৎসক। তাদের আশঙ্কা গেজেট প্রকাশ হলে আর কিছুই করার থাকবে না। তারা মনে করেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পাস করলেই আরো কয়েক হাজার চিকিৎসক নিয়োগ সম্ভব। তাই বাকি পাঁচ হাজার ক্যাডার নিয়োগ প্রাপ্তির দাবিতে নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিচ্ছেন এই চিকিৎসকরা। 

৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ উম্মে তাহেরা ইলা মেডিভয়েসকে বলেন, “আমরা প্রত্যেকেই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করেছি, যা আমাদের রেজাল্টে বলা ছিল। ক্যাডার হওয়ার জন্য যেসব ক্রাইটেরিয়া দেয়া হয়েছিল, তার সবগুলো পূরণ করেছি আমরা। কিন্তু পদের স্বল্পতার কারণে আমাদেরকে ননক্যাডার দেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি একটাই, আমাদের ৮ হাজার ৩৬০ জন, যারা পিএসসির ক্রাইটেরিয়া পূরণ করেছে, তাদের ক্যাডারভুক্ত করা হোক।” 

বিষয়টি নিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান উল্লেখ করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ৪২ ব্যাচের এ শিক্ষার্থী বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে একটি আবেদনপত্র দেওয়া হয়েছে। সাক্ষাতের সুযোগ পেলে সেখানে এ দাবিগুলো তুলে ধরা হবে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার প্রধানমন্ত্রীর যে উদ্দেশ্য—তা বাস্তবায়নে অনেক বেশি ডাক্তার দরকার।”

তিনি আরও বলেন, “এ বিসিএস ছিল স্পেশাল বিসিএস। এটা অন্যসব বিসিএসের মতো না। নির্বাচনের আগে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। নির্বাচনের পরেও বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তার নিয়োগ দেওয়ার কথা বলেছেন।”

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ এম পারভেজ রহিম মেডিভয়েসকে বলেন, “আমরা ১০ হাজার নেবো, তবে একবারে নেবো না। এটা একদম পরিষ্কার। যদি আজকে ১০ হাজার নিয়ে নিই, তাহলে পরের ব্যাচের যারা, তারা বাদ পড়ে যাবে।  যারা পরের ব্যাচের তারা তো অপরাধ করেনি। আমরা তো সবার অভিভাবক। আমাদেরকে তো একটা সিস্টেমের মধ্যে কাজ করতে হয়। এখন ১০ হাজার নিয়ে নিলে পরের ৩টি ব্যাচ থেকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। সুতরাং আমাদেরকে একটি সেগমেন্ট মিলে যেতে হবে, কেউ যেন বঞ্চিত না হয়। এজন্য আমরা ১০ হাজার চিকিৎসক দুইবারে বা তিনবারে নেবো। ”

নন-ক্যাডার সাড়ে আট হাজার চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অবশ্যই নেওয়া হবে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের নাম স্বাস্থ্য ও পরিবাল কল্যাণ মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য বা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক যারা, তারা বিসিএস হেল্থ—তারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করবে, ইউনিয়ন সাবসেন্টারে কাজ করবে।  মা ও শিশু কেন্দ্রে যারা চাকরি করে তারা তো বিসিএস হেল্থ না। ইউনিয়নে যেসব মা ও শিশু কেন্দ্র খোলা হচ্ছে—এগুলো পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, এখানে চিকিৎসকের পোস্ট আছে, তা ওই নন-ক্যাডারদের থেকে নেওয়া হবে। তারা বিসিএস হেল্থ না, তারা স্বাস্থ্য বিভাগে কাজ করবে না। তারা কাজ করবে অন্য জায়গায়, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে, জেলখানায়। অনেকে বলে, তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা হয়ে যাবে, এটা ঠিক না—তারা প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা, তারা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়োগপ্রাপ্ত। তবে তারা বিসিএস হেল্থ নয়।  দুটিকে এক করা যাবে না। নন-ক্যাডার আর ক্যাডার আলাদা।” 

তিনি আরও বলেন, “এটা প্রথম বিসিএস না। এর আগেও নন-ক্যাডার ডাক্তার নেওয়া হয়েছে।  স্বাস্থ্য ক্যাডারের মতো নন-ক্যাডাররাও সব ধরনের সযো-সুবিধা ভোগ করবে। বিসিএসের ডাক্তাররা যেভাবে লেখাপড়ায় ডেপুটেশনসহ বিভিন্ন সুবিধা পায়, তারাও এ রকম সুবিধা পাবেন। ”

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক মেডিভয়েসকে বলেন, “তাদের আশঙ্কার মধ্যে থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ তাদের নিয়োগ হবে, এমন কথা তো বলা হয়নি। নন-ক্যাডারে যারা থাকে তারা সবাই নিয়োগ পায় না। এক্ষেত্রে যদি নন-ক্যাডারের ডাক্তারের কোনো রিকুজিশন আসে, তাহলে হয় তো সেটা দেওয়া হবে। নাহলে তো নিয়োগ পাবে না। আট হাজার লোককে আমি কোথায় নিয়োগ দেবো? পোস্ট তো নাই। যদি নন-ক্যাডারে শূন্যপদে কোনো রিকুজিশন আসে, তখন এখান থেকে আমরা দিতে পারবো। শূন্যপদ ছাড়া তো তাদেরকে দেওয়া যাবে না।”

পর্যায়ক্রমে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এর পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি সাড়ে ৫ হাজার নিয়োগের ক্ষেত্রে সাড়ে আট হাজার নন-ক্যাডার চিকিৎসক থেকে নেওয়া হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যেভাবে হিসাব করা হয়েছে, বিষয়টি এ রকম নয়।  শূন্য পদের বিপরীতে রিকুজিশন আসে, শূন্য পদে যেগুলো এসেছে, আমরা দিয়েছি। যারা ভাইভাতে পাস করেছিল, তাদেরকে আমরা নন-ক্যাডারে অপেক্ষমান রেখেছি, এটি সব বিসিএসে হয়। ননক্যাডারে যদি কোনো রিকুজিশন আসে এবং তারা যেতে রাজি হয়, তাহলে যাবে। এটা কয়টা হবে আমি জানি না। সুতরাং তাদের চাকরি হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই।”

এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন পিএসসি চেয়ারম্যান।  

এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত পেশাজীবী নেতা ডা. বাহারুল আলম বলেন, “৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রায় সাড়ে আট হাজার চিকিৎসককে নন-ক্যাডার খেতাব দিয়ে নিয়োগ বঞ্চিত করে রেখেছে আমলাতন্ত্রের গোলকধাঁধা। অংশগ্রহণকারী যে সকল নবীন চিকিৎসকদের বয়স সীমা শেষ, তারা আর কোনো দিন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ পাবে না, জন্মেই এরা মৃত্যুকে করেছে আলিঙ্গন।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগী চিকিৎসার প্রয়োজনে ও জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে নতুন পদ সৃষ্টি করা হয় না। অপরদিকে পদ শূন্য থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়া হয় না। ৩৯তম বিসিএসে প্রায় সাড়ে আট হাজার চিকিৎসক লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও নন-ক্যাডার ঘোষণা দিয়ে রাখা হয়েছে, নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা স্পষ্ট নয়, কবে কখন তারা ক্যাডারভুক্ত হবে এবং নিয়োগ পাবে। তারা যদি ৩৯তম বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদেরকে ব্যর্থই বলবে, নন-ক্যাডার কেন বলবে?”

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী যা বলেছিলেন  
২০১৭ সালের ৩ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সভাকক্ষে বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের পরিচালকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক-সংকট দূর করতে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে এসব চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।

মোহাম্মদ নাসিম বলেন, তিন বছর আগে ৬ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ায় গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক-সংকট অনেকটা দূর হয়। আবারও যেন সংকট না হয়, সে জন্য সরকার আরও ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেবে।  

এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে গত ৭ এপ্রিল রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, সারাদেশে পর্যায়ক্রমে ১৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী দুই মাস পর ৫ হাজার, এবং এরপর আরো ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এই নিয়োগ সম্পন্ন হলে চিকিৎসক সংকট অনেকটা কমে আসবে। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডা. মুরাদ স্বাস্থ্য থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে 

ডা. মুরাদ স্বাস্থ্য থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে 

মেডিভয়েস রিপোর্ট: মন্ত্রিপরিষদ পুনর্বিন্যাস করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। রোববার বিকালে…

`দশ হাজার চিকিৎসক নিয়োগে অনুমোদন দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী'

`দশ হাজার চিকিৎসক নিয়োগে অনুমোদন দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী'

প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের বিভিন্ন খাতের সঙ্গে সঙ্গে…

চিকিৎসক ও নার্সদের আর কোনো তদবির গ্রাহ্য হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

চিকিৎসক ও নার্সদের আর কোনো তদবির গ্রাহ্য হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ঢাকার বাইরে…

ছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে উত্তাল মমেক ক্যাম্পাস

ছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে উত্তাল মমেক ক্যাম্পাস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের (মমেক) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীকে রিকশাচালকের যৌন হয়রানির…

চিকিৎসক নার্সদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিতে মনিটরিং সেল

চিকিৎসক নার্সদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিতে মনিটরিং সেল

মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি…

১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকায় নির্মাণ হচ্ছে নতুন শিশু হাসপাতাল

১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকায় নির্মাণ হচ্ছে নতুন শিশু হাসপাতাল

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট: সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে এক হাজার শয্যা বিশিষ্ট একটি…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর