ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মুজিবুল হক

সহযোগী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।


আর নয় থ্যালাসেমিয়া: এবার প্রতিরোধ চাই

আজ ৮ মে, আন্তর্জাতিক থ্যালাসেমিয়া দিবস। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এবারের প্রতিপাদ্য: "অনাগত সন্তানকে দিতে থ্যালাসেমিয়া থেকে সুরক্ষা, বিয়ের আগে করুন রক্তের ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষা"। এটি থ্যালাসেমিয়া রোগের বিস্তার প্রতিরোধে উত্তম কার্যকর পন্থা। আসুন থ্যালসেমিয়া প্রতিরোধের গুরুত্ব ও উপায় সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নিই।

থ্যালসেমিয়া কী?

থ্যালাসেমিয়া রক্তের এক ধরনের মারাত্মক রোগ। এই রোগে রক্তের মূল্যবান উপাদান হিমোগ্লোবিন ঠিকমত উৎপাদিত হয় না। ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনের কারণে রক্তের লোহিত কণিকা স্বাভাবিক সময়ের আগে ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে রোগী রক্ত স্বল্পতায় ভোগে এবং শরীরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অতিরিক্ত আয়রন জমা হয়ে নানা ধরনের জটিলতার সৃষ্টি করে।

থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রধানত দুটি ধরনের হতে পারে- ১. আলফা থ্যালসেমিয়া। ২. বিটা থ্যালসেমিয়া। এখানে থ্যালসেমিয়া বলতে মূলত বিটা থ্যালাসেমিয়া রোগকে বোঝানো হচ্ছে।
 
থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গগুলো হল-

১. অবসাদ অনুভব।

২. দুর্বলতা।

৩. মুখমন্ডল ফ্যকাশে হয়ে যাওয়া।

৪. ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া (জ্বন্ডিস)।

৫. মুখের হাড়ের বিকৃতি।

৬. যকৃত ও প্লিম্বা বড় হয়ে যাওয়ার কারণে পেট বড় হয়ে যাওয়া।

৭. শরীরে বৃদ্ধি ঠিকমত হয়না ইত্যাদি।

ঠিক মত চিকিত্সা না করলে নানা ধরণের জটিলতা দেখা দেয় এবং রোগীর মৃত্যু ঘটে।

থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা:

নিয়মিত বিরতিতে রক্তগ্রহন থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রধান চিকিৎসা। যারা নিয়মিত রক্তগ্রহন করে তাদের আবার প্রয়োজন অনুযায়ী লৌহ অপসারনকারী ঔষধ গ্রহণ করতে হয়। স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশনের মাধ্যমে থ্যালসেমিয়া রোগের স্থায়ী চিকিৎসা করা যেতে পারে। তবে এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

থ্যালাসেমিয়া কিভাবে বিস্তার লাভ করে:

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। পিতা-মাতার কাছ থেকে সন্তানদের মধ্যে এ রোগ জিন (Gene) এর মাধ্যমে প্রবেশ করে। সাধারণত মানবদেহের  প্রতিটি বৈশিষ্টের জন্য এক জোড়া করে জিন দায়ী থাকে। এর একটি অংশ মায়ের শরীর থেকে অপরটি বাবার শরীর থেকে আসে। জিন দুটির যেকোন একটি ভালো থাকলে এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না, কিন্তু দুটি জিনই ত্রুটিপূর্ণ হলে থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়।

যাদের শরীরে থ্যালাসেমিয়া রোগের জিন আছে, কিন্তু রোগের কোন উপসর্গ প্রকাশ পায় না, তাদের থ্যালসেমিয়া রোগের বাহক বলা হয়। এরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তবে এরা এদের সন্তানদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগের বিস্তার ঘটায়। পিতা মাতা উভয়েই বাহক হলে থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, নতুবা নয়। যে কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হতে পারে। কাজেই বিয়ের আগে সবারই জেনে নেওয়া দরকার তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কি-না।

কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক কিনা তা জানতে হলে রক্তের বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করতে হবে যার নাম হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরিসিস।

থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা:

বাংলাদেশে এক কোটি বিশ লাখ লোক অজ্ঞাতসারে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। প্রতি বছর প্রায় নয় হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম গ্রহণ করে। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার জন। এখন পর্যন্ত নিয়মিত বিরতিতে রক্তগ্রহন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের লৌহ অপসারনকারী ঔষুধ গ্রহন করাই থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসা। একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীকে প্রতি ৩-৪ সপ্তাহ অন্তর অন্তর রক্ত নিতে হয়।

আমাদের দেশে যে পরিমাণ রক্ত দান করা হয়, তার শতকরা ৪০ ভাগই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হয়। যে হারে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তাতে তাদের জন্য রক্ত যোগাড় করা দুরুহ ব্যাপার হবে।

যেহেতু, এসব রোগীকে নিয়মিতভাবে রক্তগ্রহন করতে হয়, সেহেতু তাদের লৌহ অপসারকারী ঔষধ ব্যবহার করতে হয়। এসব ঔষধ সহজলভ্য নয় এবং দামও অত্যন্ত বেশি। ফলে আমাদের দেশের থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অধিকাংশ এসব লৌহ অপসারনকারী ঔষধ ব্যবহার করতে পারে না। সহজ কথায় বলা যায়, থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। ফলে আমাদের অধিকাংশ থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু চিকিৎসার অভাবে অকালে প্রাণ হারায়।

একটি থ্যালাসেমিয়া শিশুর জন্ম শুধু তার পরিবারের উপর নয়, সমগ্র সমাজ ও দেশের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অবস্থার উপর বিশাল চাপ তৈরি করে। যেহেতু থ্যালাসেমিয়া রোগের স্থায়ী চিকিৎসা অপ্রতুল, তাই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রতিরোধ করাই থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা কমানোর একমাত্র উপায়।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ আমাদের করণীয়:

থ্যালাসেমিয়া একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানামুখী কর্মসূচীর মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। থ্যালাসেমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

১. জনসচেতনতা সৃষ্টি: যেকোন জনস্বাস্থ্য সমস্যা দূর করতে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। দেশের প্রতিটি নাগরিককে থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। এজন্য বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম যথা টেলিভিশন, রেডিও, খবরের কাগজ ইত্যাদিতে প্রচার কার্যক্রম চালাতে হবে। তাছাড়া বিশেষ ক্রোড়পত্র, পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদি বিতরণ করতে হবে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্য বইয়ে থ্যালাসেমিয়াকে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে।

২. বাহক নির্ণয়: থ্যালাসেমিয়া মহামারি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল, এ রোগের বাহকদের সনাক্ত করা। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বাহক নির্ণয়ের একটি বিষয় আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় শুধুমাত্র আদালতের নির্দেশে বা আইন প্রণয়ন করে এটি করা সম্ভব হবে না। আগে জনসচেতনতা তৈরীর পর আইন  প্রনয়নের বিষয়টি করা যেতে পারে। তার আগেই রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরন সহজলভ্য করতে হবে। অন্তত জেলা লেভেলে সরকারি পর্যায়ে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফরেসিস বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে করার ব্যবস্থা করতে হবে। ইলেকট্রোফরেসিস মেশিন ও রি-এজেন্ট সুলভ করা এবং মেশিন চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের টেকনোলজিস্টদের  প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. প্রি-নেটাল ডায়গনোসিস: যদি কোন কারণে দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে হয়েও যায়, তাহলে সন্তান গর্ভধারণের অনতিবিলম্বে বিশেষ ধরনের পরীক্ষা দ্বারা নির্ণয় করা যায় গর্ভস্থিত সন্তান সুস্থ হবে,  না কি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ঢাকার কিছু বেসরকারী সেন্টারে এই পরিক্ষার সুবিধা আছে। একে আরো সম্প্রসারিত করতে হবে। অন্তত বিভাগীয় পর্যায়ে প্রি-নেটাল ডায়গনোসিসের ব্যবস্থা থাকা উচিত। এটা গর্ভবস্থায় ১৬ সপ্তাহ বা এরপর করা যায়। এই পরীক্ষার ফলে যদি দেখা যায়, সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবে তবে অনাগত সন্তানের মারাত্মক পরিনতির কথা চিন্তা করে গর্ভপাত করানোর সুযোগ গ্রহন করা যেতে পারে।

শেষকথা:

থ্যালাসেমিয়াকে জাতীয় পর্যায়ে বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সরকারী এবং বেসরকারী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং বাহক চিহ্নিত করে তাদের মধ্যে বিবাহ নিরুৎসাহিত করতে হবে। এভাবেই একদিন থ্যালাসেমিয়ামুক্ত হবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর