ঢাকা      মঙ্গলবার ২১, মে ২০১৯ - ৭, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. আজাদ হাসান

সিওমেক , ২১তম ব্যাচ।


হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শাস্ত্রের বর্তমান প্রেক্ষিত

আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন যে, আচ্ছা হোমিওপ্যাথি মেডিসিন কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থা কেমন? আমি প্রশ্ন কর্তাকে সাফ জানিয়ে দেই। ১. দেখুন আমি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু জানি না, তাই আমি এ বিষয়ে কোনো মতামত দিতে পারবো না। ২. তবে, যেহেতু আমি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সম্পর্কে জানি না, তাই আমি নিজে কখনো কাউকে এই চিকিৎসা দেই না কিংবা কাউকে এই চিকিৎসা নিতে উৎসাহিতও করি না।

৩. আর একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, তা হলো- হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ব্যবস্থা যদি এতই উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা হবে তা হলে ওনারা কেনো ইন্ডিপেন্ডেন্টটি একটি (বা অনেকগুলো) হোমিওপ্যাথি হাসপাতাল কিংবা আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করে তাদের যোগ্যতার প্রমাণ তুলে ধরে না?

আমরা যদি আমাদের আশে পাশে সমাজে অবস্থানকারী বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ যেমন শিক্ষক কিংবা সাংবাদিক, সমাজের বিত্তবান বা শিল্পপতি, সরকারি আমলা কিংবা বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের দিকে লক্ষ্য করি, তা হলে দেখতে পাবো- তাদের অসুস্থতার সময় তারা সবাই আধুনিক মেডিকেল চিকিৎসা নিয়েছেন। একজন লোকও পাবেন না যিনি কিনা তার অসুস্থতার সময় হোমিওপ্যাথি কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার স্মরণাপন্ন হয়েছেন। সুতরাং সমাজে যেখানে কর্তাব্যক্তিরাই তাদের নিজেদের চিকিৎসার জন্য হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না, সেখানে আপনি কোন বুদ্ধিতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ওপর আস্থা রাখবেন?

সঙ্গত ভাবেই যারা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার উপর অগাধ আস্থাশীল তাদের প্রতি এই প্রশ্নটি রয়ে গেলো।

হয়তো অনেকে বলবেন সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজে তো এমবিবিএস ডাক্তাররাই ছাত্রদের পড়ান। আমি বলবো, এমবিবিএস ডাক্তাররাই ওখানে পড়ায়, ব্যস ঐ পর্যন্তই। ওনারা ওখানে পড়ান মানে ওখানে চাকরি করেন, মাসান্তে বেতন পান। কিন্তু কেউ কি কখনো প্রশ্ন করেছেন যে, উনি কিংবা ওনার পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে ওনি কি হোমিওপ্যাথি কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন নাকি আধুনিক মেসিডিন ভিত্তিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে থাকেন?

অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, তা হলে সরকার কেনো হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ কিংবা আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ পরিচালনা করছে? উত্তর হলো, সরকার অনেক সময় অনেক কিছু করে থাকে যা কিনা সব সময় আপনি যুক্তিতর্ক দিয়ে তার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারবেন না।

হোমিওপ্যাথি কিংবা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমার কেন যেন মনে হয়, কোন ডোনার এজেন্সির বিরাট অংকের ডোনেশন আছে। আর তারা কেন ডোনেট করবে? কারণ আপনি আমি জানি না, হয়তো ওরা আমাদের দেশের লোকদের গিনিপিগ বানিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে কিনা?

অনেকে আবার দাবি করে থাকেন, হোমিওপ্যাথি মেডিসিনের কোন সাইড ইফেক্ট বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। এ প্রসঙ্গে বলতে চাই, যার আদৌ কোনো উপকারী গুণাবলি আছে কিনা তা নিয়েই আমরা যেখানে সন্দিহান সেখানে সাইড ইফেক্ট নিয়ে ভাববার ফুসরত কোথায়?

প্রসঙ্গত, আধুনিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ঔষধের উৎস মূল হলো, গাছ, লতা-পাতা ও গুল্ম হতে সংগৃহীত নির্যাস কিংবা এনিমেল সোর্স। তবে, আধুনিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ঔষধসমূহ নানান স্তরে বিভিন্ন গবেষণা বা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এমন কি এনিম্যাল এবং হিউম্যান স্টাডির পর বাজারজাত করার এপ্রুভাল পেয়ে থাকে। আর একটি বিষয়ও এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো- প্রতিটি ঔষধ নির্দিষ্ট মাত্রায় এবং নির্দিষ্ট ফরমুলা মেনে কঠিন এবং কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে বাজারজাত করা হয়। তারপরও প্রতিটি ঔষধ কঠিন মনিটরিংয়ের অধীনে থাকে। এভাবে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত সংস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে এফডিএ। বস্তুতঃ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এফডিএয়ের এপ্রুভাব ছাড়া কোনো ঔষধ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিপনন কিংবা বাজার জাত করা যায় না। 

বাজারে কোনো মেডিসিন আসার পরও যদি উক্ত মেডিসিন এর কোনো ক্ষতিকর সাইড ইফেক্ট ধরা পড়ে, তা হলে সেই ঔষধটি তাৎক্ষণিক ভাবে বাজার হতে তুলে নেয়া বা উইথড্র করা হয়ে থাকে। এমন কি ক্ষেত্র বিশেষে অভিযুক্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বড় অংকের জরিমানা করা হয়।

এবার একবার ভাবুন তো, আজ পর্যন্ত হোমিওপ্যাথি কিংবা আয়ুর্বেদিক মেডিসিনের উপর এমন কোনো রিসার্চ কিংবা গবেষণার কথা কি তারা জানাতে পেরেছেন? সুতরাং ঐসব মেডিসিনের গুণাগুণ এবং সাইড ইফেক্ট সম্পর্কে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তাই ঐসব মেডিসিনের উপর নির্ভরশীলতাও প্রশ্নবিদ্ধ থাকছে। 

অনেক আগে আমি একবার একটি গল্প পড়েছিলাম। গল্পের নাম কিংবা লেখকের নাম এখন মনে নেই। শুধু গল্পটির মূল থিমটি বোঝানোর জন্য সংক্ষেপে গল্পটি বলছি। গল্পের মূল চরিত্রের নাম ছিলো তারিনি মাঝি। একজন দক্ষ নৌকার মাঝি এবং সাহসী ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় তার বেশ নাম ছিলো। আর তার এই খ্যাতির পেছনে যে কাহিনী ছিলো তা হলো, একবার ওর নৌকায় এক নব বিবাহিত দম্পতিকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। ঝড়ের মাঝে পড়ায় বাতাসের তোড়ে নৌকাটি মূহুর্তের মধ্যে উল্টে যায়। একদিকে প্রচন্ড বাতাসের তান্ডব আর নদীর স্রোতের ঘুর্ণির মাঝে সবাই মূহুর্তের মাঝে নদীর গর্ভে তলিয়ে যেতে থাকে। এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও তারিনি মাঝি একটুও দিশেহারা না হয়ে নিজ জীবনের রিস্ক বা ঝুঁকি নিয়ে নব বিবাহিত বধূকে উত্তাল নদীর ঘুর্নায়মান পানির কবল হতে অসীম সাহসিকতার সাথে উদ্ধার করে। তার এই অসীম সাহসিকতার জন্য এলাকায় তার নাম এবং খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

তারিনি মাঝি নদীর ধারেই বাস করতো। এর কিছুদিন পর হঠাৎ বন্যার প্রবাহে নদীর ভাঙ্গনের মাঝে তারিনি মাঝিকে তার স্ত্রী পুত্র সহ নদীতে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। স্ত্রী এবং পুত্রকে তারিনি মাঝি শক্ত করে আকড়ে ধরলো। নদীর পানির ঘুর্নির মাঝে একবার ভেসে উঠে তো আর একবার পানির গভীরে তলিয়ে নিয়ে যায়।

তারিনি মাঝি আগেও অনেকবার এরকম পরিস্থিতিতে পড়েছে কিন্তু আজকের পরিস্থিতির সাথে আগের পরিস্থিতি সে কোনোভাবে মেলাতে পারছে না। ঘুর্নিয়মান পানির মাঝে নাগড় দোলার মতো ডুবতে ডুবতে আর ভাসতে ভাসতে কিছুক্ষণের মাঝে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অবস্থা এতটাই সংকীর্ণ হয়ে পড়ে যে একান্ত অনিচ্ছা সত্বেও তার প্রাণ প্রিয় স্ত্রীর হাত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তবে তার ছেলেকে আকড়ে রাখে। এ ভাবে পানির তোড় থেকে আরো কিছুক্ষণ সে তার প্রাণের ধন, বুকের মানিক পুত্রকে বুকে জড়িয়ে রাখে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তার পক্ষে নিজের ভার বহনের ক্ষমতাও যেন ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে। একটা পর্যায়ে সে তার সন্তানকেও তার শরীর হতে বিচ্ছিন্ন করে দিলো। এরপর শরীরের শেষ বিন্দু শক্তি সঞ্চয় করে তীরে এসে সে তার জীবনকে রক্ষা করলো।

আসলে আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে, পৃথিবীর বুকে আপনি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন? আপনাদের মাঝে অনেকেই হয়তো বলবেন আমি আমার মাকে কিংবা বাবাকে, ছেলেকে কিংবা মেয়েকে অথবা আমার স্ত্রীকে সবচেয়ে ভালোবাসি। আসলে আপনি মিথ্যে বলছেন। কেননা মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তার নিজেকে। তারিনি মাঝিই তার উত্তম দৃষ্টান্ত। তারুণ্য দ্বীপ্ত যে তারিনি মাঝির শক্তিমত্তার ছিলো অনেক সুনাম, সেই তারিনি মাঝিও একটা পর্যায়ে নিজেকে ভালোবেসে নিজেকে বাঁচানোর জন্য স্ত্রী সন্তানের মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

তাই উপসংহারে আমি বলতে চাই, আপনিও নিশ্চিত ভাবে আপনার নিজকেই বেশী ভালোবাসেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে ওনাদের জীবন যেমন মহামূল্যবান আপনার কাছেও আপনার জীবন তদ্রুপ মহামূল্যবান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা প্রেসিডেন্ট পুতিন যদি অসুস্থ হন তা হলে ওনারা কিন্তু মর্ডান মেডিসিন দিয়েই চিকিৎসা করেন। ওনারা কিন্তু কেউ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার স্মরণাপন্ন হন না। তাই চটকদার বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত না হয়ে আপনিও আপনার এবং আপনার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবেন এটাই আমার প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 




জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর