ঢাকা      মঙ্গলবার ২১, মে ২০১৯ - ৬, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


ডাক্তার সমাজ: ছিন্ন মলিন বেশে এক মুকুটবিহীন সম্রাট!

ভর দুপুরে বহির্বিভাগের রোগীর লম্বা লাইন ঠেলে রুমে ঢুকলো রানা। সদ্য মাস্টার্স পাশ চটপটে রানা চাকরির দরখাস্ত করার জন্য কাগজপত্র সত্যায়িত করাতে এসেছে। একটু বিরক্তিই লাগছে! কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললাম উপজেলায় তো আরো অফিসার আছে তাদের কাছেও যেতে পারেন। চোখে চোখে তাকিয়ে আছে রানা। হ্যাঁ, এই ধরুন শিক্ষা অফিসার, মৎস্য অফিসার, হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা, এসি ল্যান্ড। নামগুলি শুনে কেমন যেন অবাক হয়ে গেল রানা।

কি যে বলেন আপনি, এইসব ছোট কাজে এত বড় বড় জায়গায় যেতে ভালো লাগে?

সামনে টেবিলে কাচের পেপার ওয়েটের নিচে চাপা দেয়া অনেকগুলো টিকেট। প্রয়োজনের চাইতে অনেক ছোট, প্রতিটি টিকেট পাঁচ টাকায় কেনা। এটাই ডাক্তার দেখানোর খরচ। দীর্ঘশ্বাস বেরোয়, হ্যাঁ, তাইতো আমিতো পাঁচ টাকার ডাক্তার। ছোট জায়গার ছোট্ট জায়গীরদার!

মনে পড়ে গেল অনেকদিন আগের একটা স্মৃতি। তখন হোমনা হেলথ্ কমপ্লেক্সে চাকরি করি। এক বয়স্ক ভদ্র মহিলা আসলেন আউটডোরে। বগলে একটা শাড়ি, পেটিকোট, গামছা, গোছলের সরন্জাম। ছিন্ন, মলিন একটা টিকেট আমার হাতে দিয়ে বললেন আমারে দাউদের অষুধ দেন। আমি বললাম দেখান, দেখে ঔষধ দেই। উনি বললেন দেখানো যাবে না।

আমি বললাম, দেখা দরকার দাউদ নাকি স্ক্যাবিজ? এবার তিনি ক্ষেপে গেলেন, "অসভ্য ডাক্তার। আমারে নেংটা কইরা দেখতে চায়!" আমি প্রমাদ গুনি। মাগো আপনার পায়ে পড়ি চিল্লাইয়েন না। আপনার ঔষধ দিতেছি। সত্যি করে বলেনতো আপনার কি আসলেই দাউদ আছে। এবার মহিলা মুখ খুললেন, আমি নদীতে গোছল করতে যাইতাছি। এক টিকেটে তিনবার অষুধ নেওয়া যায়। টিকেটটা নষ্ট হইয়া যাইতাছে। তাই দরকারি অষুধ নিয়া রাখি।

ডিজি নুরুন্নবী স্যারের একটা কথা মনে পড়লো, "Free treatment is a vogus business".

আমার পাশের চেম্বারের এক কার্ডিওলজিষ্ট বড় ভাই। এম ডি করা, বেশ ভালো ডাক্তার। ওনার প্রেসক্রিপশান, যেটা কুমিল্লার এক অখ্যাত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসে করা, নিয়ে আসলো এক রোগী। রুমে ঢুকেই রোগী বললো স্যার, একটা ছোট ডাক্তার দেখাইছিলাম। একটুও উপকার পাইনি। রোগীর সবকিছু দেখে বুঝলাম উনিতো চিকিৎসা ঠিকই দিয়েছিলেন!

আমিও ওনার মতোই ঔষধ দিলাম। কিছুদিন পর রোগী ফলোআপে আসলো। এখন সুস্থ, খুব খুশি।

আমার এসি রুমটায় বসে যখন রোগী দেখি, রোগী খুব ভদ্র ভাবে রুমে ঢুকে, জোরে কথা বলেনা, ভিজিট নিয়ে হইচই করে না। কিন্তু আউটডোরের গড়গড় শব্দ করা ফ্যানযুক্ত, প্লাস্টার খসে পড়া রুমটাতে যখন রোগী দেখি, রুমে ঢুকে হইচই করতে করতে। আর একগুচ্ছ সন্দেহ নিয়ে ব্যাবস্থাপত্রটি গ্রহণ করে।

ছোট্ট ময়লা কালারের আউটডোরের ব্যাবস্থাপত্রটিতে সকল ঔষধ লিখাও দুঃসাধ্য। এটি মানুষের সুদৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ। ভবিষ্যতে সংরক্ষণ করারও অযোগ্য এটি। এহেন পরিস্থিতিতে আর যাই হোক চিকিৎসাটা ঠিক মনমতো হয়না। দেহের সাথে যে মনের গভীর যোগাযোগ রয়েছে সেটা অনস্বীকার্য। সুতরাং রোগীও সেভাবে ভালো হয়না।

মানব চরিত্র বড়ই অদ্ভুত। রাস্তার পাশের হোটেল ভাত ঘরের ওয়েটারকে টিপস্ দেই পাঁচ টাকা। সেই আমিই এসি করা রসনা বিলাসে টিপস্ দেই পঞ্চাশ টাকা, তাও ভদ্রভাবে মৃদু হাসি দিয়ে মেনু বুকে ঢুকিয়ে দেই।

শেখ সাদীর সেই পোশাকের মর্যাদার গল্পটাই মনে পড়ে বারেবার। সেই গল্পের ভিলেন আমরা, ডাক্তার সমাজ, ছিন্ন মলিন বেশে এক মুকুটবিহীন সম্রাট।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩৯তম বিসিএসের পোস্টমর্টেম

৩৯তম বিসিএসের পোস্টমর্টেম

দেশের সকল খাতের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্যসেবাকেও যুগোপযোগী করে তুলতে অপ্রতুল জনবলের বিষয়টি…

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

যুক্তি-১ বিপক্ষ মতের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, একসঙ্গে এত চিকিৎসক নিয়োগের…

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ! জানি না আর কি কি খারাপ…

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের রক্তচাপ মাপতে গেলেই রোগীর বাবা-মা সবসময়ই যে প্রশ্নটি করেন সেটি হল…

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগের দুই মেয়াদে আওয়ামী…

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

আমার মা ২ সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। উনি গত আড়াই বছর ধরে…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর