ঢাকা      মঙ্গলবার ২১, মে ২০১৯ - ৬, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


মাশরাফি ইস্যুতে কাঁদা ছোড়াছুড়ি নিয়ে কিছু কথা

মাশরাফি ইস্যুতে আর কোনো কথা বলা উচিত না বলেই মনে করি। ডাক্তাররা বেশিরভাগই কিন্তু এ বিষয়ে নিরব হয়ে গেছে। থামেনি কেবল কিছু অতি উৎসাহী পাবলিক। তাদের কাছে মনে হয়েছে, উনি যা করেছিলেন ঠিক করেছেন। বেটা ডাক্তাররা কেন সেটার প্রতিবাদ করলো? বেটারা সরকারের টাকায় পড়েছে, বিসিএস দিয়ে সরকারের চাকর হয়েছে, এখন শুধু মুখ বুজে জনগণের সেবা করে যাবে। মাথা উঁচু করে আওয়াজ তুলে কেন? তারা কি মাশরাফি হতে পারবে? আরেকটা মাশরাফি বানাইতে পারবে?

ভাই, ঠিকই বলেছেন। আমরা মাশরাফি হতে পারবো না। কারণ, আমরা খেলি ‘যমের সঙ্গে’, বলের সাথে না। যে কারণে আরেকটা মাশরাফিও বানাতে পারবো না। আমরা বানাই আমাদের মতোই জীবন নিয়ে খেলা করার মতো মানুষ, যার কাজ মানুষের জীবন ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা, মাঠে খেলে মানুষকে আনন্দ দেয়া নয়।

আমাদের পুরো দেশ, দেশের হর্তাকর্তারা মাঠের খেলোয়াড়দের নিয়ে মাতামাতি করেন। খেলায় রানার আপ হলেও গাড়ি-বাড়ি দেয়। আমাদের জীবনের মাঠে খেলা খেলোয়াড়রা পেটে গুলি লাগা মায়ের পেট থেকে সুস্থভাবে বাচ্চা বের করার পরেও কিছু পায় না। বৃক্ষমানবকে স্বাভাবিক হাত দিতে পারলেও কিছু পায় না। সামান্য এক কনডম ব্যবহার করে হাজার হাজার মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের জীবন রক্ষাকারী মেথড আবিষ্কার করেও কিছু পায় না। কাজেই আমরা মাশরাফি হবো কি করে!

আপনারা যারা ডাক্তারদের অযৌক্তিকভাবে গালি দিতে থাকেন তাদের দেখে দুইটা স্মৃতি মনে পড়ে।

১. একদিন হাসপাতালে পায়ে ইনজুরি নিয়ে এক রোগী আসেন। ইমার্জেন্সি ডাক্তার সেলাই দিয়ে একটা ব্যবস্থাপত্র ধরিয়ে দেন। রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করার সময় গেটের উপরে ঝোলানো প্ল্যাকার্ড দেখে অভিযোগ করার নম্বরে একটা ফোন দিয়ে বলেন, এই হাসপাতালে তো কোনো ডাক্তার থাকে না। ডিজি অফিস থেকে প্রথম ফোন করে সবাইকে খুব বকাঝকা করা হলো। মেইল আসলো তদন্ত করার জন্য। হুলস্থুল কারবার। পরে সেই ছেলের নম্বর নিয়ে ফোন করে ডাকা হলো। জিজ্ঞেস করা হলো, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার পরও সে কেন এমন করলো? উত্তর দিল, 'মজা করেছি। ভাবলাম, দেখি সত্যিই কিছু হয় কি না!'

২. হাসপাতালে ডাইরেক্টর স্যার পরিদর্শনে এসেছেন। প্যারাপ্লেজিয়ার এক ছেলে ভর্তি ছিল, বেড সোর নিয়ে। ছেলেটাকে নিয়মিত ড্রেসিং করা হতো। ডাইরেক্টর স্যার দেখলেন, ছেলেটার পাশে একটা লোক দাঁড়ানো। বাবি সব এটেন্ডেন্টই বাইরে। সে কে? তাকে জিজ্ঞেস করতেই সে ডাইরেক্টর স্যারকে উত্তর দিল, সে নাকি কবিরাজ। নিয়মিত এসে সে ওই প্যারালাইজড রোগীর পিঠের ঘায়ের চিকিৎসা দেয়। এই বলে ছেলেটার পিঠে রাখা চাদর সরিয়ে সে দেখাল, সেখানে গোবর লাগানো। হাসপাতালের সবার চক্ষু চড়কগাছ। জীবনে কোনোদিন কেউ সেই লোককে দেখেনি। হঠাৎ ডাইরেক্টর স্যার আসার সময় কোথা থেকে এসে সে কিভাবে কি করলো, আল্লাহ মালুম। সেই লোককে আটক করার সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু লোক জমা হয়ে গ্যাঞ্জাম শুরু করে দিল। শুধুমাত্র হাসপাতাল প্রধানকে প্যাঁচে ফেলতেই কি সুন্দর একটা নাটক হয়ে গেল। পরে সেই অফিস প্রধানের কতটা খড়কুটো পোড়াতে হয়েছিল, সে গল্প আর নাই বললাম।

এই যখন দেশের পাবলিকের আচরণ—তখন তারা একটা ডাক্তারকে গাল দিতে দেখলে মজা পাবে, এটাই স্বাভাবিক। রোগী মরলেই ডাক্তার ধরে পিটায়। রোগী বাঁচলে মানত পূরণ করে। ডাক্তারকে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দেয় না। চুন থেকে পান কি খসে পড়ে পড়ে না, সাংবাদিকেরা ইচ্ছামতো হলদি মাখিয়ে নিউজ বানিয়ে ফেলে। পল্লী চিকিৎসক উল্টাপাল্টা কাজ করলেও হেডিং করে 'ডাক্তার কর্তৃক খুন/ধর্ষণ'। পল্লী শব্দ বাদ দিয়ে শুধু ডাক্তার লেখার কারণ, সাধারণ পাবলিক ডাক্তারের ফাউল দেখতে চায়। এগুলো পড়ে মজা পায়। ডাক্তারদের গালি দিয়ে এক ধরনের সুখ অনুভব করে।

এর কারণ কি হতে পারে?

এক. অনেকেই সারাজীবন ‘এইম ইন লাইফ' রচনায় লেখে এসেছেন ডাক্তার হতে চান। শেষে চান্স না পেয়ে অন্য দিকে মোড় ঘুরাতে হয়েছে 'এইম'। এদের ডাক্তার দেখলেই গা চুলকায়। আঙ্গুর ফল টক আর কি!

দুই. ডাক্তাররা রোগী দেখার সঙ্গে সঙ্গেই কাঁচা টাকা পায়। অনেকেই হিসাব কষতে বসে যান— ক'মিনিট রোগী দেখে ডাক্তার ক'টাকা পেল! দিনে এতগুলো রোগী হলে কত টাকা হয়!

এখন কথা হলো, কতটা কষ্ট করে একটা ছেলে বা মেয়ে ডাক্তার হয়, পোস্ট গ্রাজুয়েশন করে মাথার চুল পাকিয়ে ফেলে এসবের হিসাব কিন্তু কেউ করেন না। একটা ডাক্তারের চেম্বারে বসে চিকিৎসা করার যোগ্যতা অর্জন করার পেছনের গল্পটুকু কেউ জানেন না। 

এক পেডিয়াট্রিক সার্জনকে এক লোক বলেছিল, এই একটা অপারেশন করতে আপনি বিশ হাজার টাকা নেবেন? উনি উত্তর দিয়েছিলেন, আমি আপনাকে চল্লিশ হাজার দেবো, অপারেশনটা আপনিই করেন। দেখতে মনে হয়,পাঁচ-দশ মিনিটেই এক ডাক্তার এত টাকা নিল? কিন্তু এই পাঁচ-দশ মিনিটে রোগী দেখে রোগ নির্ণয় করার যোগ্যতা অর্জন করতে তাকে কত দিন, কত রাত, কত টাকা, কত আনন্দ, কত প্রাপ্য বিসর্জন দিতে হয়েছে—সে হিসাব কিন্তু আরেকজন ডাক্তার ছাড়া কেউ বুঝবেন না। একজন ডাক্তারকে যা তা বলে গালি দিলে সব ডাক্তাররা কেন একসাথে হৈ হৈ করে উঠে এইবার বুঝেছেন!

আমরা কিন্তু বলিনি, ডাক্তার কাজে ফাঁকি দিয়েছে, তবুও তাঁর শাস্তি হবে না। যেমনটা অন্য অনেক শ্রমজীবীদের মাঝে দেখা যায়। এজন্য মানুষ মেরেও একটা ড্রাইভারেরও শাস্তি হয় না। 

আমাদের পয়েন্ট কিন্তু ওইরকম একগুঁয়ে ছিল না। আমরা একটা কথাই বলেছি। যে ভুল করবে, নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু এভাবে নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করে সেটা ফেসবুকে ছেড়ে হিরো সাজার কি হেতু? যা হোক, উনি ভুল বুঝেছেন, সরি বলেছেন।  খুব ভাল। অনেকেই বলছেন, উনি ওনাদের শাস্তি ক্যান্সেল করিয়ে বিশাল হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছেন। এর উত্তরে বলি, উনি যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন সেটাই ছিল বিধি-বহির্ভূত।

যাই হোক, সমস্যা মিটে গেছে। আসুন, আমরা অন্য ইস্যু নিয়ে কথা বলি। খামকা ডাক্তার গালি দিয়ে রাতারাতি সেলিব্রেটি সাজার চেষ্টা পরিত্যাগ করেন ভাই। যাই করেন না কেন,আপনারা কেউ নিজেদের জীবনে ডাক্তারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারবেন না। যতো বড় মালদার পার্টিই আপনি হন না কেন! যতোই কথায় কথায় বিদেশে চিকিৎসা করতে দৌড়ান না কেন! দু'মিনিট পরেই হুট করে আপনাকে দেশের হাসপাতালে ছুটতে হবে না, একথা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না। 

একদিন খাবার না পেলেও আপনার চলবে, একদিন খেলা দেখতে না পারলেও আপনার কিছু হবে না, একবেলা কাপড়ের দোকান বন্ধ থাকলেও আপনি ভালই থাকবেন, একবেলা গাড়ি বন্ধ থাকলে আপনাদের দুর্ভোগ হবে বটে, তবে আপনার জীবন সঙ্কটাপন্ন হবে না। কিন্তু একবেলা হাসপাতাল বন্ধ থাকলে, চিকিৎসা বন্ধ রাখলে কি ঘটবে তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। আপনি সুস্থ-সবল মানুষ বলে ওই একবেলায় আপনারই যে কোন এমার্জেন্সি হবে না,ডাক্তারের প্রয়োজন হবে না সেটাও হলফ করে বলতে পারবেন না। 

কাজেই যারা নিরলসভাবে দেশের মানুষের একটা মৌলিক চাহিদা পূরণ করে চলেছে তাদের যখন-তখন যাচ্ছেতাইভাবে হয়রানি করা বন্ধ করুন। দেশীয় ভাষায় একটা নোংরা কথা আছে, 'যে থালায় খায়, সেই থালায়…!' আপনাদের অবস্থাও কিন্তু তাই হয়েছে আজকাল।

অসৎ মানুষ, অলস মানুষ, ফাঁকিবাজ মানুষ প্রতি সেক্টরেই আছে। স্বাস্থ্য সেক্টরের মূল সমস্যা কিন্তু ডাক্তার না। ওষুধ থেকে শুরু করে হাসপাতালের যাবতীয় মেইনটেইনেন্স কিন্তু ডাক্তারের হাত দিয়ে হয় না। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেবা দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ, যার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কিছু স্বীকৃতিও পেয়েছে। আমাদের দিকে আঙ্গুল তোলার আগে নিজের সেক্টরটা একবার দেখুন। আসুন, আমরা নিজেদের সেক্টর সাফ-শুদ্ধ করে অন্য সেক্টরে উঁকি দিই। কখনো শুনেছেন সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখার আগে টাকা দারি করেছেন কোনো ডাক্তার? অথচ দেশের বেশিরভাগ সরকারি অফিসে টাকা দেয়ার আগে পর্যন্ত আপনার ফাইল এক চুলও নড়ে না। কখনো তাদের লেনদেনের কোনো ভিডিও তো ভাইরাল হতে দেখলাম না! তাদের উপর কোন ঝাল ঝাড়তে তো দেখলাম না! শুধু ডাক্তার নিয়েই আপনাদের সমস্যা?

এমন ডাক্তার খুব কমই পাবেন যারা জীবনে কোনদিন কোন রোগী বাঁচানোর জন্য নিজের গায়ের রক্ত দেন নাই। এমন একটা ডাক্তারও পাবেন না, যে একটি রোগীও বিনা পয়সায় দেখেন নাই। ব্যবসায়ী বন্ধুর কাছে জিনিস কিনতে গেলে, উনি লাভ না রাখলেও পুঁজিটুকু কিন্তু ঠিকই নেন, মাগনা দেন না আপনাকে। কিন্তু আপনার ডাক্তার বন্ধুটি কি কখনো আপনার কাছে ভিজিট নিয়েছেন? ওদের কি কোন পুঁজি লাগেনি আজকের অবস্থানে আসতে? ভাই, সব মানবিকতার দায় কি কেবল ডাক্তারের? যাদের জন্য মানবিকতা দেখায় তারা নিজেরাই যখন সামান্যতেই আমাদের প্রতি অমানবিক আচরণ করে, তাহলে মানবিকতা আপনা থেকেই দূরে সরতে শুরু করে।

যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের আপামর জনতার জীবন-মরণ নিয়ে কাজ করছে, তাদের জন্য সার্বক্ষণিক বাঁশ-লাঠি-কাঠি রেডি করে রাখার আগে ভাবুন, ঠিক পর মুহূর্তেই আপনার তাদের দরকার পড়বে কি না! কেননা, আসল কল-কাঠি তো উপরওয়ালার কাছেই। আপনারা ভাই গাছের গায়ে যখনতখন ইচ্ছেমতো দা-বটি-কুড়াল দিয়ে কোপও মারবেন, আবার সময়মতো কোঁচড়ভরা সুমিষ্ট ফলও চাইবেন, তা তো হয় না! তাই না?

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩৯তম বিসিএসের পোস্টমর্টেম

৩৯তম বিসিএসের পোস্টমর্টেম

দেশের সকল খাতের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্যসেবাকেও যুগোপযোগী করে তুলতে অপ্রতুল জনবলের বিষয়টি…

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

যুক্তি-১ বিপক্ষ মতের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, একসঙ্গে এত চিকিৎসক নিয়োগের…

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ! জানি না আর কি কি খারাপ…

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের রক্তচাপ মাপতে গেলেই রোগীর বাবা-মা সবসময়ই যে প্রশ্নটি করেন সেটি হল…

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগের দুই মেয়াদে আওয়ামী…

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

আমার মা ২ সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। উনি গত আড়াই বছর ধরে…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর