শনিবার ২৫, নভেম্বর ২০১৭ - ১১, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৪ - হিজরী

আত্মজীবনীমূলক সাক্ষাৎকার

ব্যতিক্রমী চিকিৎসক-শিক্ষাবিদ - অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত

‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা, তোমরা এখন সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা!’

এখনকার সময়ে কমবেশি সবাই লেখাপড়া করে। তবে এরকম একটা সময় ছিল, যখন চারপাশে সব লেখাপড়া না করা মানুষ- কিন্তু নতুন প্রজন্মের ওপর দুনিয়া জয় করার প্রত্যাশা। চারপাশে অনেক সমস্যা, সর্বত্র নেই-নেই হাহাকার। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে সবার আশা, তারা সবকিছু পাল্টে দেবে। এরকমই একটা সময়ে কুমিল্লার চান্দিনায় জন্ম নেন তিনি, ১৯৫৩ সালে। কাল পরম্পরায় যিনি পরিচিত হয়েছেন অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত নামে। কালের প্রত্যাশা পূরণ করেছেন, শুধু তাই নয়, ছাড়িয়ে গেছেন কালের গণ্ডিটাও। স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত প্রথিতযশা এই চিকিৎসককে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। যদিও এই সাক্ষাৎকার থেকে পাঠক তাকে নতুন করে চিনবেন, এমন মন্তব্য জোর দিয়েই করা যায়। 

আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকারে সাধারণত ব্যক্তির জীবনালেখ্য বিস্তারিত বিবৃত হয়, তবে এই সাক্ষাৎকারটি একইসঙ্গে ইতিহাসের দলিল হিসেবেও বিবেচিত হবে। ডা. প্রাণ গোপাল তার ছেলেবেলার সময়, সমাজ, সংস্কৃতির বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন, তুলনা করেছেন বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে। দুই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার ফারাকগুলো দেখিয়ে দিয়েছেন। কথা বলেছেন চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্কট ও সমাধান নিয়ে। প্রয়োগ করেছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইংল্যান্ড, জার্মানি, আমেরিকা, সিঙ্গাপুরসহ উন্নত বিশ্বের অধ্যয়ন ও সফরের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত সেখানকার শিক্ষা ও চিকিৎসা কাঠামো সম্পর্কিত ধ্যান ধারণাও। বলেছেন সোভিয়েত সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়েও।

একাত্তরে তিনি ফ্রণ্টে ছিলেন, সবচেয়ে আলোচিত ছিল সেই ফ্রণ্ট। শেখ মণির নেতৃত্বাধীন মুজিব বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টর। লিখতেন গোপন চিঠিপত্র। সে হিসেবেও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তা তিনি। এই সাক্ষাৎকারে ‘ওরাল হিস্ট্রি’র বরাতে লেখা থাকছে যার অনেক কিছুই। হয়তো এক সময় তথ্যগুলো বিশেষ কোনো সত্যানুসন্ধানে কাজে লাগবে। সময় সুযোগের অভাবে পূর্ণাঙ্গ করা না গেলেও চুম্বক অংশটা ঠিকই ধরা পড়েছে। 

অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন দুই দফায়। এদেশে নাক কান গলার সবচেয়ে বড় ডাক্তার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে তিনি চিকিৎসা সেবা দেন, দিয়েছেন উল্লেখযোগ্য আরও অনেককে। অনেক কিছু থেকে অবসর নিয়েছেন, কিন্তু রোগী দেখছেন নিয়মিতই। বিভিন্ন সভা, সেমিনারে যাচ্ছেন, বক্তৃতা রাখছেন। বয়স বাড়লেও কাজ তার কমছে না। বলেছেন, এখনও মৃত্যুভাবনা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।  স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিসহ পরিবারও তার পাশে আছে সব সময়। তাই চিকিৎসা ও শিক্ষার বিকাশের জন্য নতুন অনেক পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত আছেন তিনি।

সাপ্তাহিক : আপনার জন্মের সময়কার কথা বলুন। তখন পারিবারিক অবস্থা কেমন ছিল?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : আমার জন্ম বাংলা ১৩৫৯ সনে। দিনটা ছিল রবিবার। আশ্বিন মাসের পাঁচ তারিখ ছিল সেটা। ইংরেজী তারিখটা হচ্ছে ১ অক্টোবর, ১৯৫৩। সময় ছিল সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট। এই সময় নির্ধারণটা ছিল মজার। আমাদের বাড়িতে তখন কেবল আমার এক দাদু ঘড়ি পরতেন। আমার জন্মের সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তাই সময় নির্ধারণ করা হয় ছায়া মেপে। পূর্ব ভিটার ঘরের ছায়া কোন জায়গায় পড়েছিল, সেখানটায় দাগ দিয়ে রাখা হয়। পরের দিন সেই দাগে ছায়া আসার পর ঘড়ি মিলিয়ে দেখা হয়। ভাগ্যিস, জন্মের সময় আকাশ মেঘলা ছিল না।

আমাদের পরিবারটা ছিল অনেক বড়, যৌথ পরিবার। অঢেল সম্পদ না থাকলেও এলাকার লোকজন আমাদের উচ্চমধ্যবিত্ত বা সচ্ছল পরিবার হিসেবেই জানতেন। ধনী জোতদার পরিবারই বলা যায়। গরু, কাজের লোক, অনেক জমিজমা, ডাক্তারখানা ছিল। কুমিল্লা জেলার চান্দিনার মহিচাইল গ্রামে ছিল আমাদের বাড়ি। আমার দাদু রামচরণ দত্ত ও তার চাচাতো ভাই অশ্বিনী কুমার দত্তের মধ্যে সম্পর্ক ছিল যমজ ভাইয়ের মতোই। শুনেছি, আমার দাদু তার এই ভাইকে পড়ানোর জন্য ছোটবেলায় তাকে কাঁধে চড়িয়ে প্রায় নয় মাইল দূরের ফুলতলী স্কুলে নিয়ে যেতেন। আবার তাকে সেই স্কুল থেকে কাঁধে করে বয়ে আনতেন তিনি। তাদের সম্পর্কটা তাই আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। এই দুই ভাইয়ের ছিল আট ছেলে ও দুই মেয়ে। আমার বাবা কালাচান দত্ত ছিলেন পরিবারের সবার মধ্যে বড়। সবাই মিলে একত্রে বাস করতেন। দাদু অশ্বিনীকুমার সে আমলের পাস করা ডাক্তার ছিলেন। তাই তখন থেকেই আমাদের বাড়িটা ডাক্তার বাড়ি নামে পরিচিত। 

পরিবারে আমার বাবা সবার বড় হওয়ায় তাকে একটু কম বয়সেই বিয়ে করানো হয়। বাবারা ছিলেন তিন ভাই ও এক বোন। বাবার বিয়ে হয় ২২ বছর বয়সে। আমার বড় ভাই ননী গোপাল দত্ত ছিলেন বিরাট এই যৌথ পরিবারের প্রথম নাতি। আমি ছিলাম দ্বিতীয়। এত বড় পরিবার হলে যা হয়, যত্নের কোনো কমতি ছিল না কখনও। বড় হয়ে শুনেছি, আমরা নাকি মাটিতে পড়িনি। এক কোল থেকে আরেক কোলে, এভাবেই বাল্যবেলা কেটেছে। জন্মের পরে কুষ্ঠি-ঠিকুজি নির্ণয় ও অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠান করার পারিবারিক রীতি ছিল। জন্মের ছয় মাসের মধ্যেই অন্নপ্রাশন, কুষ্ঠি পাঠ ও মুখে ভাত হয়ে গেল। 

সাপ্তাহিক : পড়াশোনার শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : আমাদের বাড়িতে ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত সকলের ক্ষেত্রেই হাতেখড়ি হতো সরস্বতী পুজোর দিনে। গ্রামের আরও অনেকেই একই রীতি অনুসরণ করতেন। বিদ্যাদেবীর পুজো শেষে ঠাকুর মশাই হাতে ধরে স্লেটে ‘অ’ লিখে দিতেন। সঙ্গে কিছু মন্ত্রপাঠও হতো। এই হাতেখড়ির পরেই শুরু হতো লেখাপড়ার নির্যাতন। নির্যাতন বলছি কারণ ওই বয়সে স্লেট নিয়ে বসে থাকার চেয়ে মজার মজার আরও অনেক কিছুই করার ছিল। সেগুলো বাদ দিয়ে একই অক্ষর স্লেটের গায়ে বারবার আঁকাটা কারই বা ভালো লাগে! তাছাড়া খেলাধুলার দিকে আমার ঝোঁক ছিল বেশি।

আমার প্রথম শিক্ষক ছিলেন ঠাকুমা। পড়ালেখা নিয়ে ঠাকুমা’র বিরাট গর্ব করার মতো একটা গল্প ছিল। তিনি যখন স্কুলে, তখন ইংরেজ ইন্সপেক্টর সাহেব একবার স্কুল পরিদর্শনে আসলেন। প্রথম শ্রেণীর পাঠকক্ষে গিয়ে তিনি ছাত্রদের কিছু একটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। ঠাকুমা ছাড়া কেউ তার জবাব দিতে পারেনি। খুশি হয়ে ইন্সপেক্টর সাহেব ঠাকুমাকে একটা স্লেট ও একসেট পেন্সিল উপহার দিয়েছিলেন। প্রথম শ্রেণী পাস করাটাই ছিল ঠাকুমা’র শিক্ষাগত যোগ্যতা। কিন্তু এই গল্পটা ছিল তার সারা জীবনের চলার পাথেয়। ঠাকুমা’র গর্ব করার মতো আরেকটা বিষয় ছিল। তিনি ছিলেন সেই আমলের উকিল রমনীমোহন পালের বোন। যে আমলে কিনা একটা পুরো জেলা চষে একজন বিএ পাস লোক পাওয়া যেতো না। ফলে প্রথম শ্রেণী পাস হলেও ঠাকুমা’র চলনবলন ছিল শিক্ষিত, সুসংস্কৃত মানুষদের মতোই। সে যুগে নারীদের লেখাপড়া করাটাকে ভালো চোখে দেখা হতো না। নইলে নিশ্চিত বলা যায় যে, সুযোগ পেলে ভাইয়ের চেয়ে কম যেতেন না তিনি। 

ঠাকুমা’র কারণেই বোধ করি, আমাদের বাবা-কাকারা সবাই মোটামুটি পড়ালেখা করেছিলেন। পরিবারে শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নতুন প্রজন্ম হওয়ায় আমাদের কাছে প্রত্যাশা ছিল বেশি। তাই ছেলেবেলা থেকেই লেখাপড়ার বেশ চাপ ছিল। 

আর সবার মতো আমিও ঠাকুমা’র কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছি। হাতেখড়ির পরে লেখাপড়ার যে নির্যাতনের কথা বলেছি, তার বড় অংশটা আসত ঠাকুমা’র কাছ থেকেই। ধরে নিয়ে পাটিতে বসিয়ে দিয়ে স্লেটে তিনি কিছু বর্ণমালা লিখে দিতেন। পুরো স্লেটে সেরকমভাবে লিখতে হতো। স্লেট ভরে যাওয়ার পর তাকে দেখানোটা ছিল বাধ্যতামূলক। দেখার পর তিনি সব মুছে আবার নতুন কিছু লিখে দিতেন। যতই বলতাম, আজ আর না, তিনি মানতেন না। বলতেন, আজ যদি আর পড়া দরকার না হয়, তাহলে দুপুরের খাওয়াও আজ আর না। এভাবেই প্রাথমিক বর্ণমালা পরিচয় ঘটেছিল। বেশ ভালোভাবেই যে তা হতো, সেটা বোঝা যেত স্কুলে যাওয়ার পর। স্কুলে প্রথম শ্রেণী পর্যন্ত আমাদের কারও কোনো অসুবিধা হতো না। কারণ আগেই বাড়িতে ঠাকুমা’র কাছে এসব পড়ে ফেলেছি। আমি আবার একটু দেরিতেই স্কুলে গিয়েছিলাম। কারণ গ্রামের রাস্তা ঘাটের অবস্থা তখন ছিল ভয়ানক শোচনীয়। মাটির রাস্তা বৃষ্টি হলে আর আস্তো থাকতো না। কাদা রাস্তায় গরু আর মানুষের হাঁটাচলার কল্যাণে বর্ষার পরেও সে রাস্তা থেকে যেত বাচ্চাদের চলাচলের অনুপযোগী। আমি তাই দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত যা বইপত্র, তা বাড়িতে বসেই পড়েছিলাম।

গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মানুষেরা ও আমার শিক্ষকেরা এখনও বলেন যে, আমি নাকি ছোট থেকেই লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলাম। কিন্তু আমার নিজের উপলব্ধি হচ্ছে, আমি আসলে তারা যতটা বলেন, তত ভালো ছাত্র কখনও ছিলাম না। গ্রামে যখন ছিলাম, তখন বুঝিনি। কিন্তু পরে যখন অনেক জায়গায় গিয়েছি, অনেক ছাত্রের সঙ্গে মিশেছি, তাদের দেখে বুঝেছি, আমি আসলে অত মেধাবী ছিলাম না। তা সত্ত্বেও গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলাম, আর সব সময়ই আমার রোল এক ছিল। যে দ্বিতীয় হতো, তার সঙ্গে আমার মার্কসের ব্যবধান থাকত অনেক। যদিও পণ্ডিত মশাই বলেছিলেন আমার পড়ালেখা হবে না।

তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় বাংলা নববর্ষে পণ্ডিত মশাই আমাদের বাড়িতে এলেন। পণ্ডিত মশাই এলে যা হয়- ভাগ্য গণনা, কুষ্ঠি বিচার নিয়ে দাদা ও কাকারা ব্যস্ত। আমিও পণ্ডিত মশাইয়ের পাশে আগ্রহ নিয়ে বসেছিলাম। এদিকে বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে। খেলতে যাওয়ার তাড়া ছিল। আমি ব্যস্ত হয়ে পণ্ডিত মশাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম, শুধু এটুকু বলেন খেলাধুলায় কি আমি পারদর্শী হতে পারব? পণ্ডিত মশাই আমার দিকে মনোযোগ দিলেন। বললেন, জন্মক্ষণে বিদ্যাদেবী নিদ্রিত ছিলেন। সুতরাং বিদ্যাস্থান শূন্য। তবে বৃহস্পতির একটা তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছিল। সে কারণে লেখাপড়া কিছু হতে পারে। ধনের দেবী লক্ষ্মী ধ্যানে ব্যস্ত ছিলেন। সুতরাং পর্যাপ্ত ধন হবে না। বিদ্যা ও ধন নিয়ে আমার তখনও কোনো আগ্রহ ছিল না। খেলার কথা জানতে চাইলাম আবারও। তিনি জানালেন ১২ বছর ও ১৮ বছর বয়সে দুটো কঠিন ফাঁড়া বা বিপদ আছে। তাই খেলাধুলায় বিপদের আশঙ্কা ব্যাপক। এরপর তো খেলাধুলার ওপর খড়গ নেমে এলো। ঠাকুমা খেলতে যেতে দেখলেই আটকাতেন। বাবা খেলার মাঠ থেকে ধরে নিয়ে আসতেন। নিষেধাজ্ঞা শোনার পাত্র আমি নই, মেডিকেলে পড়া পর্যন্ত খেলা চালিয়ে গেছি। তবে পণ্ডিতের বক্তব্য বাবার বুকে বিঁধে ছিল। যখনই দেখতেন নিয়মের বাইরে চলে যাচ্ছি, তখনই বলতেন পণ্ডিত তো বলেই দিয়েছে তোমার পড়ালেখা হবে না। পণ্ডিত মশাইয়ের একটা ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গিয়েছিল। ১২ বছর বয়সে ঠিকই আমি কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলাম। আমাদেরই পালিত একটা গরু তখন আমাকে বেশ ভালোভাবেই আহত করেছিল। এই ঘটনার পর পণ্ডিত মশাইয়ের কদর বেড়ে যায়। তবে আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, খেলাধুলার কারণে তো আর আহত হইনি। এরপর খেলাধুলার ওপর যে লালকার্ড ছিল, সেটা হাল্কা হয়ে গেল। গরুর গুঁতো আমার জন্য যেন শাপে বর হয়ে এলো। 

আমার মনে হয়, লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছেলেমেয়েদের উৎসাহ দেয়া উচিত। এতে করে ছাত্রদের মাদকাসক্ত বা বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। আজ যদি আমরা শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি এ ধরনের এক্সট্রা অ্যাকাডেমিক কাজ দিতে পারতাম, তাহলে যুবসমাজের বিকাশ আরও অনেক গঠনশীল হতো। তাদের বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক কমে যেত। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মনোজগতের বিকাশের এই দিকটাকে খুব গুরুত্ব দেয়া হতো। এ থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতে পারতাম, তাহলে সমাজটাকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা সহজ হতো। কিন্তু তা হয়নি। ফলে এখন যুবসমাজের কর্মকাণ্ড আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাপ্তাহিক : সে সময়ের সমাজ-সংস্কৃতি কেমন ছিল?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : আমাদের সময় আর এখনকার সময়ের মধ্যে বিরাট ব্যবধান। সমাজ-সংস্কৃতি আমাদের সময়ে ছিল জীবনেরই অংশ। এখন তো শিশুরা ঘরে বন্দি থাকে। সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক থাকে না। ফলে সমাজের প্রতি কোনো দায়িত্বশীলতাও গড়ে ওঠে না। নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে এখনকার ছেলেমেয়েদের সম্পর্ক খুবই কম। টিভি, ইন্টারনেট, মোবাইল, গেমস নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারা। ফলে দেশ, মাটি, মানুষ সম্পর্কে তাদের টান কম। বরং তারা বিদেশে যেতেই বেশি আগ্রহী। এর দায়টা অবশ্য ছেলেমেয়েদের না, সমাজে যারা কর্তৃত্ব করেন, এই দিকটায় তাদের মনোযোগ নেই। 

আমাদের সময়ে মানুষে মানুষে সম্পর্ক গভীর ছিল। এর মূলে ছিল সংস্কৃতি, আচার, উৎসব। ধর্মভেদে কোনো উৎসবের গুরুত্ব কারও কাছে কম, কারও কাছে বেশি হলেও যে কোনো উৎসবের সঙ্গেই সবার সম্পর্ক ছিল। পুজোর উৎসবে মুসলিমরাও আসতেন। ঈদ উৎসবের আনন্দে হিন্দুরাও অংশ নিতেন। তখনও ওয়াজ-মাহফিল হতো, কিন্তু ভিন্ন ধর্ম নিয়ে কটূ কথা বলার প্রচলন তখন ছিল না। আমরা দেখা যাচ্ছে খেলাধুলা করছি। দাদু এসে বললেন হয় বাড়ি যাও, নইলে ওই যে ওয়াজ হচ্ছে, ওখানে গিয়ে শোনো, হুজুর কি বলে। বা খেলার শেষে ফেরার পথে দেখলাম ওয়াজ হচ্ছে, দাঁড়িয়ে যেতাম। সেখানে নবীদের ইতিহাস, আউলিয়াদের ইতিহাস বলা হতো, সেগুলো তন্ময় হয়ে শুনতাম। কখনও শুনিনি ওয়াজে ভিন্ন ধর্মকে অপমান করা হচ্ছে। আমাদের সময় ওই এলাকায় যিনি ওয়াজ করে বেড়াতেন, তার নাম ছিল ইসমাইল হোসেন ব্যানার্জি। যিনি বাংলা ও ইংরেজিতে এম এ পাশ ছিলেন।

তখন সবার অনুষ্ঠান ছিল শীতের পিঠা, গ্রীষ্মের আম-কাঁঠাল, হেমন্তের ফসল ওঠার উৎসব আর বাংলা নববর্ষ। এসব অনুষ্ঠানে এক বাড়ির মানুষ অন্য বাড়িতে নিমন্ত্রণ পেত। নিমন্ত্রণ দেয়া-নেয়া হতো একটু বিত্তবানদের মধ্যে। অন্যদের নিমন্ত্রণের দরকার ছিল না, উৎসবে যে কোনো বাড়ি যাওয়া, খাওয়া ও শুভেচ্ছা বিনিময়টা ছিল সাধারণ রীতি।

উৎসবের সঙ্গে স্কুলেরও সম্পর্ক ছিল। যেমন পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন হতো। কে কয়জন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে এনে খাইয়েছি তা নিয়ে ভাই-বন্ধুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো। পরদিন স্কুলে যাওয়ার সময় উৎসব উপলক্ষে বাড়িতে তৈরি সন্দেশ, নাড়ু, লাড্ডু, মেলা থেকে আনা মণ্ডা, মিঠাই, চিড়া শিক্ষকদের জন্য নিয়ে যেতাম। শিক্ষকদের কাছে বছর শুরুর আশীর্বাদ বা দোয়াও চাইতাম সকলেই। কেউ কেউ মজা করে বলতেন, নাড়ু মজা হলেই দোয়া করবেন। শিক্ষকরা পুঁটলি করে সেগুলো বাড়ি নিয়ে যেতেন। পরদিন ওগুলো খেয়ে বাড়ির কে কি বলেছে, তা বলতেন। মা বানিয়েছে নাকি দাদী বানিয়েছে জিজ্ঞেস করতেন। অনেক প্রশংসা করতেন, ধন্যবাদ দিতেন।

গ্রামে বৈশাখী মেলা ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দের উৎসব। মেলায় কত কিছু উঠতো। মাটির নানা তৈজসপত্র, হাঁড়ি, ঘুড়ি, পুতুল, সন্দেশ, মণ্ডা, মিঠাই আর নানা ধরনের নতুন জিনিসপত্র ও খেলনা। মেয়েদের অলঙ্কার থাকতো। মাটির ব্যাংক বা তার বিকল্প বাঁশের কুঠুরি, ঢোল, বাঁশি, খেলাধুলার উপকরণসহ আরও কত কী! মেলায় যাওয়ার জন্য সবাই সারাবছর ধরে অপেক্ষা করতাম। গ্রামে গ্রামে ছোট ছোট অনেক মেলা বসত, আর কিছু মেলা হতো অনেক বড়। বড়গুলোর কোনো কোনোটা এমনকি পুরো মাস ধরেই চলত। এই বড় মেলাগুলোতে সার্কাস, যাত্রার দলও আসত। যাত্রাদলের পালা শুরু হওয়ার আগে, পরে কিছু গান পরিবেশন হতো। সেসব গানের কথা ছিল নানা শিক্ষামূলক কাহিনী ও নৈতিক শিক্ষা। যাত্রা দেখতে তখন টিকিট কাটার কোনো বালাই ছিল না। একটা গামছা নিয়ে যাত্রাদলের সহযোগীরা দর্শকদের সামনে দিয়ে হেঁটে যেত। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী গামছায় টাকা দিতেন। যদি অনুষ্ঠান ভাল হতো তাহলে সম্মানীও বেশি মিলত। সে সময় কিন্তু আমরা মেলায় অপ্রীতিকর কোনো খবর শুনতাম না। চাঁদা তোলা, নারী নিপীড়নের কথা তো কখনই শুনিনি। দু’একজনের টাকা হারানো বা পকেটমারের খবর শোনা যেত। আবার অনেকে সেসব কিভাবে ফিরে পেলেন, কোন ভালো মানুষ কত কষ্ট করে খুঁজে খুঁজে তাকে তা ফেরত দিয়ে গেছেন, সেই গল্পও শোনা যেত। তখনকার দিনে তো আর এরকম মোবাইল ছিল না, চাইলেও একজনকে খুঁজে বের করতে সময় লাগত অনেক। মেলাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের আনন্দের গল্প চলতে থাকত আরও অন্তত মাসখানেক।

সামাজিক সম্পর্কটাও ছিল তখন গভীর। মেলায় গিয়ে ছেলেরা কেউ হয়ত বিড়ি ফুঁকল, তা কেউ দেখে ফেললে আর রক্ষা ছিল না। এখন যেমন অপরিচিত লোক হলে ছেলেমেয়েরা তার তোয়াক্কা করে না, তখন ছিল এর বিপরীত। যে কোনো গুরুজনই ছোটদের শাসন করতে পারতেন। ছেলেমেয়েরাও কোনো অন্যায় করলে চুপসে থাকত। বড়রা কেউ যদি ছোটদের এরকম কিছু করতে দেখতেন, নিজে তো বাধা দিতেনই, আবার বাড়ি গিয়ে তার পরিবারকেও সতর্ক করে দিয়ে আসতেন। কেউ শাসন করেছেন এটা শোনার পর ওই পরিবারের লোকেরাও এমনকি তার বাড়ি গিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে আসতেন। সিগারেটের মতো ব্যাপার হলে তো রীতিমতো আদালত বসে যেত। শাসন হিসেবে নানা ধরণের শাস্তি চালু ছিল। তিরস্কার তো আছেই। যারা এর মধ্যে পড়ত তারা জীবনে আর সিগারেটের নামও মুখে নিত না।

মেলা থেকে সব সময়ই ছোটদের সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে হতো। শুধু মেলা না, খেলাধুলা বা যে কাজই থাক না কেন, সন্ধের আগে ছোটদের বাড়ি ফেরাটা ছিল সামাজিক রীতি। গ্রামের সামাজিকতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। আর তা কেবল কষ্টই বাড়াবে। এখন তো এক ঘরের মানুষ পাশের ঘরের মানুষকে চেনে না। কিন্তু আমাদের গ্রামসমাজ ছিল এর উল্টো। কারও বাড়িতে হয়তো বড়রা কেউ নেই, কিন্তু কিছু দরকার, তখন পাশের বাড়ির কারও ডাক পড়ত। কেউ হয়তো হাটে যাচ্ছেন, অন্য কেউ তাকে মাছ, বাজার, যা লাগে আনতে দিতেন। আবার অনেকের বাজার একত্রে করার পর বাড়ি এনে তা ভাগ করার পর দেখা যেত, সবাইকে একটু বেশি বেশি দিয়ে যিনি বয়ে এনেছেন, কষ্ট সয়েছেন, তিনি নিজের ভাগে কম রাখতেন। এই চর্চাটা ছিল। তোমার বোঝা আমি কেন বইব, বা আমি কী পাব? এমন প্রশ্ন কখনই উঠত না। আমাদের কৃষক সমাজে এই সামাজিকতা ও সংস্কৃতির প্রচলন এখনও খানিকটা রয়েছে, তারা তা ধরে রাখছেন খুব কষ্ট করেই। তাদের আমরা অশিক্ষিত বলে থাকি, কিন্তু আমাদের শহুরে শিক্ষিত সমাজ এই সংস্কৃতি কি কোনোদিন অর্জন করতে পারবে!

সাপ্তাহিক : জীবনগঠনে ছেলেবেলার শিক্ষকদের বিরাট ভূমিকা থাকে। আপনার মনে আজো জীবন্ত এমন শিক্ষকদের স্মৃতি থেকে কিছু বলুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ছেলেবেলার শিক্ষকরা আজো আমার জীবনের চলার পাথেয়। আজকের প্রাণ গোপালের যতটুকু অর্জন, তার পেছনে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব আমি বলব ওই শিক্ষকদেরই। গ্রামের স্কুলেই আমার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। প্রাথমিকের শিক্ষকদের মধ্যে আসগর আলী, সুরেন্দ্র কর, রাইহরণ গোস্বামী, আবদুর রহিম পণ্ডিত স্যারের কথা আজো মনে পড়ে। কারণ তাদের প্রত্যেকেরই কিছু বিশেষ গুণাবলী ছিল। সুরেন্দ্র কর স্যার অঙ্ক করাতেন। অঙ্কে ভুল হলে বা বাড়ির কাজ না করে স্কুলে গেলে তিনি ভয়ঙ্কর হয়ে যেতেন। গ্রীষ্মের ছুটি বা বার্ষিক পরীক্ষার পরের ছুটিতেও স্যার বাড়ির কাজ ধরিয়ে দিতেন- প্রতিদিন দশটা করে অঙ্ক। পরে যখন স্কুল শুরু হতো স্যারকে গিয়ে প্রথম দিনই সেই অঙ্কগুলো করে দেখাতে হতো। না করলে শাস্তি অবধারিত। শাস্তির জন্য তখন বেতের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। আমাদের এলাকায় বলত ঝিংলা, যা বাঁশের চিকন কঞ্চি কেটে তৈরি হতো। তবে সুরেন্দ্র স্যার ছাড়া অন্যরা ততটা বেতের ব্যবহার করতেন না। বেতের চেয়ে বেশি চলত বেঞ্চের ওপর কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা, কান ধরে ওঠবস করা। একজন কান ধরে ওঠবস করত, আরেকজনের দায়িত্ব ছিল তা গোনা। এভাবে লজ্জা দেয়া হতো, যাতে পরবর্তীতে বাড়তি সতর্কতা ও মনোযোগ তৈরি হয়। 

পণ্ডিত স্যার ছিলেন বাংলার শিক্ষক। কী যে সুন্দর হাতের লেখা ছিল তার। প্রতিদিনই খাতার ওপরে এক লাইন লিখে দিতেন, যা পৃষ্ঠা ভরে এনে তাকে দেখাতে হতো, আর তাও হতে হবে ঠিক তার লেখার মতো সুন্দর। পণ্ডিত নামটা গ্রামের মানুষ তাকে দিয়েছিল তার প্রজ্ঞা, বিবেচনাবোধ ও দায়িত্বশীলতার জন্য। গ্রামে এখনও এই বিষয়টা চালু আছে, প্রত্যেককেই তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গ্রামের মানুষরা একটা পদবী দেন। ভালো হলে ভালো, খারাপ হলে খারাপ। পণ্ডিত স্যার অসাধারণ আবৃত্তি করতেন। নিয়মিত ভালো কাজের উপদেশ দিতেন, স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য পরামর্শ দিতেন।

তবে প্রাথমিকের শিক্ষকদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল রাইহরণ গোস্বামী স্যার। তিনি সব বিষয় পড়াতেন। তখনকার স্কুলগুলোতে একটা বিষয় ছিল- যাদের ভালো ছাত্র মনে করা হতো, তাদের ওপর চাপটা ছিল অন্যদের তুলনায় বেশি। যাতে সে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে সেদিকে শিক্ষকরা বিশেষ নজর রাখতেন। রাইহরণ স্যার আমিসহ আরও কয়েকজনকে চারটায় স্কুল ছুটির পর দুই-এক ঘণ্টা বাড়তি পড়াতেন। আমাদের স্কুলটা ছিল বাজারের পাশে। স্কুল শেষে আমরা যখন পড়তাম তখন আছরের নামাজ হতো। হাটবারের দিন দেখতাম একজন মাঠের পশ্চিম পাশে একটি গামছা পেতে নির্দিষ্ট সময়ে আযান দিতেন। সঙ্গে সঙ্গে বাজারে একটা আলোড়ন তৈরি হতো। দোকান-পাট যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায় রেখে সবাই চলে আসতেন। খদ্দেররাও আসতেন। সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। স্যার সে সময় পড়ানো বন্ধ রাখতেন। তখনকার দিনে মসজিদ, মন্দিরের সংখ্যা ছিল কম। কিন্তু ভিন্ন ধর্মের লোকেরা একে অপরের ধর্ম সম্পর্কে শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। এখন মসজিদ, মন্দির বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অশ্রদ্ধাটাও বেড়ে গেছে। পরে রাইহরণ স্যার এরকমই এক কারণে মনের কষ্ট মনে চেপে ভিটে-মাটি সব ছেড়ে ত্রিপুরা চলে যান। শুনেছিলাম স্যার তার কোনো ছাত্রের কাছ থেকেই এই আঘাতটা পেয়েছিলেন। তার সঙ্গে এর পরও আমার দেখা হয়েছিল। জিজ্ঞেস করলে এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চাননি। কেবল বলেছেন, শিক্ষক ছাত্রকে শুধু দেয়ার জন্য, ছাত্রের কাছ থেকে কিছু নেয়ার জন্য নয়।

আসগর আলী স্যার ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ধর্ম ও ইংরেজী ছিল তার বিষয়, কিন্তু পড়াতেন সবই। তার শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল খুবই আধুনিক। একটা পিরিয়ডের নির্ধারিত সময়ের দুই ভাগ তিনি পড়াতেন, আরেক ভাগে পরীক্ষা নিয়ে নিতেন। আবার সপ্তাহের শেষ দিনে আগের পাঁচ দিনের পড়া মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে নিতেন। এতে করে ছাত্রদের ওপর অনেক পড়ার চাপ তৈরি হতো না। ক্লাশেই অনেক কিছু পড়া হয়ে যেত, পরীক্ষার আগে বাড়তি পড়ার চাপ থাকত না। প্রাইমারিতে পড়ার সময়েই আমার দাদুরা ভাগ হয়ে গেলেন। এটা ছিল সেই বয়সের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি। বাজারের ব্যবসা, জায়গা-জমি ভাগ হলো। কিন্তু ভাগাভাগির পর আমরা সমস্যায় পড়ে গেলাম। কারণ ওই দাদুর ছেলেমেয়েরা সবাই তখন রোজগারের সঙ্গে জড়িত। তার ছোট ছেলেটাও তখন স্কুল মাস্টার, আর আমার ছোট কাকা তখন আমার সঙ্গেই স্কুলে পড়ছে! তবে না খেয়ে থাকার অবস্থা হয়নি। হয়তো নগদ টাকার টানাটানি ছিল। কিছু দরকার হলে ধান, পাট, পান, বিক্রি করতে হতো। কিছুটা পরিমাণ জায়গাও সম্ভবত বিক্রি করতে হয়েছিল। সঠিক মনে পড়ছে না এখন। এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম সন্ধিক্ষণ।

সে সময়ের একটা ঘটনা আছে, যা আমি কখনও ভুলব না। তখন ফাইভে পড়ি, কিছুদিন পরেই বৃত্তি পরীক্ষা। আমার তখন দুই দিস্তা কাগজ আর রকেট কালির দরকার ছিল। দুই দিস্তা কাগজের দাম তখন ১২ আনা, আর কালি চার আনা, মোট ১৬ আনা, অর্থাৎ এক টাকা দরকার। আমার বাবার কাছে তখন টাকা ছিল না। বাবা ওই দাদুকে বললেন, কাকা আমাকে একটা টাকা দেন, আগামী হাটবারের দিন দিয়ে দেব। কিন্তু কাকা দিলেন না। এটা জানার পর যে দোকান থেকে কাগজ-কালি কিনতাম, বাবাকে না বলেই আমি সেই দোকানে চলে গেলাম। দোকানের মালিক ছিলেন সতীশবাবু। তাকে বললাম, জ্যাঠা মশাই আমার তো কাগজ-কালি দরকার, ক’দিন বাদেই পরীক্ষা। কিন্তু বাবার কাছে টাকা নেই। আপনি যদি আমাকে কাগজ-কালি দেন, তাহলে আগামী হাটবারের দিন আমি টাকাটা ফেরত দিতে পারব। লেখাপড়ায় ভাল ছিলাম বলে সবাই আমাকে স্নেহ করত। জ্যাঠা বললেন, তোমার যা যা লাগে নিয়ে যাও। তোমার বাবা যখন পারে দেবে, কোনো সমস্যা নাই। আমি কাগজ-কালি কিনে বাসায় ফিরলাম। বাসায় আসার পর শুনলাম, বাবা ঠাকুমা’কে বলছেন, ওর কাগজ-কালির দরকার ছিল, কিন্তু আমি তো দিতে পারলাম না। আমি তখন বললাম, কাগজ-কালি তো নিয়ে এসেছি। জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় পেলে? সব খুলে বললাম। শুনে তো বাবা ভয়ঙ্কর রকম রেগে গেলেন। তিনি আমাকে খুব শাসন করলেন, কেন আমি বাকিতে এটা কিনতে গেলাম। এমনকি আমাকে প্রথম চোটেই দু’ তিনটা থাপ্পড়ও দিলেন। বাড়িতে আমার ভরসার জায়গা ছিল ঠাকুমা। তিনি বাবাকে বকাঝকা করে তার কাছ থেকে আমাকে নিয়ে গেলেন। আমি তখন বুঝতে পারলাম, বাবা টাকা ধার না পাওয়ার জন্যই রেগে ছিলেন। সেটা আমার ওপর দিয়ে গেছে। কিন্তু গ্রামে তো কিছু গোপন থাকে না। এই কথা জানাজানি হয়ে গেল। পরদিন সকালেই আমাদের বাড়িতে সতু জ্যাঠা মশাই হাজির। তিনি এসে বাবাকে খুব বকাঝকা করলেন। বাবা বললেন, ও বাকিতে আনতে গেল কেন? তাও আবার আমাকে না জানিয়ে! জ্যাঠা মশাই বললেন, বুঝলাম ও তোমার ছেলে, কিন্তু আমাদেরও তো দায়িত্ব আছে। ও লেখাপড়ায় এত ভাল, অথচ কাগজ-কালির জন্য ওর পড়ালেখায় কষ্ট হবে, এটা আমরা থাকতে কিভাবে ঘটতে পারে? পরে বাবা অনুশোচনা করেছিলেন আমাকে মারার জন্য। তবে এটাও বুঝিয়ে বললেন, বাকিতে কেনাকাটা করার অভ্যাস গড়ে উঠলে মানুষের কি ক্ষতি হয়। পকেটে টাকা না থাকলেও অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার বাতিক তৈরি হয়। এতে একজন মানুষের ক্ষতি বৈ কোনো লাভ হয় না। পরবর্তী জীবনে এই শিক্ষাটা মেনে চলার চেষ্টা করেছি। মেডিকেলে যখন পড়ি, তখন বাড়ি থেকে ডাকে টাকা পাঠানো হতো। কখনও হয়তো ডাক পৌঁছতে দেরি হয়ে যেত। কিন্তু আমি ঋণ করা বা বাকিতে কেনাকাটা করে খরচ করা থেকে বিরত থাকতাম। মেসে সাত তারিখের মধ্যে টাকা দেয়ার নিয়ম ছিল, না দিতে পারলে মিল বন্ধ হয়ে যেত। কোনো মাসে টাকা পৌঁছতে দেরি হলে আমি মেসে খেতাম না। প্রয়োজনে না খেয়ে থাকতাম, তবু ধার বা বাকি করতাম না।

সাপ্তাহিক : হাই স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে কার কার কথা মনে পড়ে?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ১৯৬৩ সালে মহিচাইল হাই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আবদুল কাদির মজুমদার স্যার। তার কথা ভোলা সম্ভব নয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৩৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন করেন। সেই আমলে এই মাপের শিক্ষা দিয়ে অনেক বড় বড় পদে যাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু কাদির স্যার শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিলেন। শুধু তাই নয়, নিজ গ্রামে এসে তিনি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাদান শুরু করলেন। স্যার ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন ও সুঠাম দেহের অধিকারী। স্কুলের বারান্দা দিয়ে হাঁটলে মনে হতো যেন, একজন দেবতা চলছেন। আমি ছিলাম তার খুবই প্রিয় ছাত্র। যদিও আমার মনে আজ অবধি একটা কাঁটা বিঁধে আছে, আমি মনে হয় স্যারকে কষ্ট দিয়েছি। ঘটনাটা নবম শ্রেণীতে ওঠার সময়কার। যেহেতু আমার এক দাদু ডাক্তার ছিলেন, বাড়ির সবার আকাঙক্ষা ছিল, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব। তাই আমাকে অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে হবে। কিন্তু আমাদের স্কুলে তখন বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না। ফলে আমাকে স্কুল পরিবর্তন করতে হবে। গন্তব্য ছিল আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় আট মাইল দূরের চান্দিনা পাইলট হাই স্কুল। কিন্তু স্যার কোনোমতেই রাজি না। তিনি তার স্কুল থেকে আমাকে ছাড়বেন না। সেটা কোনো ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য নয়, গ্রামের অন্যদের শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার জন্য।

স্যার আমাকে অনেক বোঝালেন। স্যারের বক্তব্য ছিল, আমি নিশ্চয়ই মেট্রিকে ভালো ফলাফল করব। তা দেখে গ্রামের অন্যরাও স্কুলে তাদের সন্তানদের ভর্তি করাতে আগ্রহী হবে। ছাত্রদের মধ্যে ভালো ফলাফল করার আগ্রহ বাড়বে। এর মাধ্যমে গ্রামে শিক্ষার একটা গুরুত্ব তৈরি হবে। কিন্তু আমি তো সায়েন্স পড়তে চাই। স্যার আমাকে কিছুতেই টিসি দেবেন না। তিনি বোঝালেন, মেট্রিকে আর্টস পড়েও তো ইন্টারে সায়েন্স পড়ে মেডিকেল পড়া যাবে। কিন্তু আমার বাবা বললেন, এতে আমি পিছিয়ে যাব। শেষে স্যার আমাকে টিসি দিলেন, এর মধ্যে দুই মাস পার হয়ে গেল। স্যারের সম্মান এরকম ছিল যে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বাবা তো দূরে থাক, এমনকি দাদুও কথা বলার সাহস পেতেন না। এজন্য এত সময় লেগে গিয়েছিল।

কাদির স্যারের গল্প বলে শেষ করা যাবে না। এইট থেকে নাইনে ওঠার সময় সেকেন্ড বয় নূরুল ইসলাম ও আমার মার্কসের ব্যবধানটা খুবই কম ছিল, আমি ছয় নাম্বার বেশি পেয়েছিলাম। ইংরেজীতে আমি সেবার একটায় ৮০ ও অন্যটায় ৮২ পেয়েছিলাম। ইংরেজীর শিক্ষক ছিলেন ফণীভূষণ স্যার। নূরুল ইসলাম আবার ছিলেন ওই স্কুলেরই এক শিক্ষকের ভাই। ওই স্যার কাদির স্যারের কাছে অভিযোগ করলেন, ফণীভূষণ বাবু আমাকে হিন্দু বলে বেশি নাম্বার দিয়েছেন যেন আমি ফার্স্ট হতে পারি। এই হিন্দু-মুসলিম বিভেদটা সে সময় আস্তে আস্তে বাড়ছিল, সম্ভবত রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা পাকিস্তানী শাসকদের নানা অপপ্রচারের ফলেই। যাই হোক, কাদির স্যার সব শুনলেন। তার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সবার অভিযোগই গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন এবং বিচার, বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত দিতেন। তিনি কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন ন্যায়বিচারের প্রতীক। তার বিচারিক যোগ্যতা আমি বলব যে, বর্তমানের অনেক বিচারকের চেয়েও ভাল ছিল। তিনি ইংরেজী খাতা দুটো চেয়ে পাঠালেন, নিজে দেখে নতুন করে নাম্বার দিলেন। আমি এবং নূরুল ইসলাম তখন স্যারের রুমের বাইরে বসা। ফণীভূষণ স্যারকে ডেকে পাঠানো হলো। এটা দেখে আমি ভাবলাম, আমাকে নিশ্চয়ই স্যার বেশি নাম্বার দিয়েছেন, নইলে তাকে কেন ক্লাস বন্ধ রেখে ডেকে পাঠানো হবে! কাদির স্যার তখন ফণীভূষণ স্যারকে বললেন, আমি খাতা দেখলাম, আপনি যে প্রাণ গোপালকে ৮০ দিলেন, এখানে তো সে ৮৬ পাবে। আর নূরুল ইসলাম ওই খাতায় পেয়েছিল ৭৮। স্যার খাতা কেটে তার চার নাম্বার কমিয়ে ৭৪ করে দিলেন। এরপর ফণীভূষণ স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে বলুন, কেন একজনকে প্রাপ্য মার্কস কমিয়ে দিলেন, আর অন্যজনকে বাড়িয়ে দিলেন? ফণীভূষণ স্যার বললেন, আমি দেখেছি যে গোপাল আরও বেশি মার্কস পায়, আর নূরু কিছু কম পায়। কিন্তু যেহেতু আমরা দু’জনেই হিন্দু, তাই প্রাণ গোপাল বেশি মার্কস পেলে এ ধরনের কথা উঠতে পারে ভেবেই তাকে কমিয়ে দিয়েছি। কাদির স্যার তখন তাকে শিক্ষকের দায়িত্ব বোঝালেন। কে কি ভাবল তার কাছে মাথা নত না করে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিলেন।

নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার দিন দাদুকে সঙ্গে নিয়ে ভয়ে ভয়ে কাদির স্যারের কাছে বিদায় নিতে গেলাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন, দোয়া করলেন। স্যারের বড় ভাই স্কুলের হেড মৌলভী রহিম বক্স মজুমদার হুজুর কোরান শরীফের বিভিন্ন অংশ থেকে সূরা পড়ে মাথায় ফুঁ দিয়ে আমাকে দোয়া করলেন। প্রায় আধ ঘণ্টা সময় ধরে চলেছিল এই দোয়া পর্ব। এই শিক্ষকদের কাছ থেকেই আমি শিক্ষকের কর্তব্য এবং অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা পেয়েছিলাম। রহিম বক্স মজুমদার হুজুর স্কুলে আরবি পড়াতেন। যদি কোনোদিন বাংলা স্যার না আসতেন তিনি সেদিন বাংলা পড়াতেন। এরকমই একদিন হুজুর আমাদের কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা পড়াচ্ছিলেন। সেই কবিতাটা- ‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান’। তখন আমার ছোটবেলার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু খালেক মজুমদার স্যারকে একটা প্রশ্ন করল। সে আমাদের চেয়ে একটু বড় ছিল বয়সে, আমরা তো স্যারদের উটকো প্রশ্ন করার সাহস করতাম না। খালেক বলল, হুজুর হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, সবাই কি আসলে সমান? মুসলমানরা কি অন্যদের চেয়ে উন্নত নয়? হুজুর তখন একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝালেন। বললেন, প্রত্যেকটা মানুষই একই কাজ করে, খায়, ঘুমায়, বিয়ে করে, কাজ করে, জীবন যাপন করে। সবাই কেন একই রকম কাজ করে? কারণ তাদের সবাইকে একজন স্রষ্টাই সৃষ্টি করেছেন। এখন ধর গোপাল আর তুমি তো জানি দোস্ত। যদি গোপালের জন্ম হতো খালেক মজুমদারের মায়ের পেটে, তাহলে সে কিন্তু দস্ত না হয়ে মজুমদারই হতো। আর তুমি খালেক যদি ডাক্তার বাড়িতে জন্ম নিতে তাহলে তোমার নাম গোপাল কিংবা এরকম কিছুই হতো। তিনি আরও বললেন, ধর্মটা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত! এই পরিচয়টা আবার পাল্টেও যায়। সৃষ্টিকর্তা তাকে পাঠাচ্ছেন মানুষ হিসেবে। সে এসে কি করছে, তার কর্ম দিয়েই স্রষ্টা তাকে বিচার করে। চিন্তা করেন, একজন আরবি শিক্ষক এভাবে দেখতেন এটা কি আজ ভাবা সম্ভব? আজকাল তো ধর্মীয় অনুষ্ঠান মানেই অন্য ধর্মকে তুলোধুনো করা, গালিগালাজ করা। সাঈদীর মতো লোকদের ওয়াজ তো রীতিমতো অশ্লীল। এটা যে একা মুসলিমরা করে তা নয়, হিন্দুদেরও এরকম সংগঠন আছে! বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কেউই এর বাইরে নয়। মৌলবাদীরা সবখানেই আছে। কিন্তু সবাই মৌলবাদী নয়, হতে পারে না।

সাপ্তাহিক : এটা কবে থেকে লক্ষ্য করলেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিষোদগারের এই প্রবণতা?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ১৯৬০ সালে আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ওয়াজ-মাহফিল শুনেছি। কিন্তু কখনই এরকম কোনো কথা কোনো হুজুরকে বলতে শুনিনি। মারেফতিদের অনুষ্ঠানে গিয়ে কবিগান শুনতাম। কখনও বাধা দিত না। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে গানে গানে তর্ক হতো। সেখান থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল। আমার অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশ সামরিক শাসনের খপ্পরে পড়ার আগে অর্থাৎ ৭৫ সালের আগ পর্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়ায়নি আমি অন্তত কোথাও দেখিনি। শহর এবং শহরতলিগুলোতে অবশ্য একাত্তরের সময়ই এসব করার মতো কিছু লোক তৈরি হয়েছিল। ৮৯ সালের দিককার একটা ঘটনা বলি। তখন আমি পিজিতে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে অবস্থিত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে যাচ্ছিলাম শেষ পর্বের পরীক্ষা নিতে। মাইক্রো কারে চড়ে যাচ্ছিলাম। সঙ্গে অন্য শিক্ষকরাও ছিলেন। গাড়ি চলছে, ড্রাইভার সাঈদীর একটা ক্যাসেট বাজিয়ে দিল। আমি হিন্দু, এটা জেনেও স্যাররা তা শুনছিলেন। অথচ সাঈদী তখন প্রতিটা ধর্ম নিয়ে নোংরা, অশ্লীল কথা বলছিলেন, এটাকে ওয়াজ বলা যায় না। কিন্তু তারা তা শুনছিলেন। আমি কিছু বলিনি। কারণ তাদের বিবেক যখন এটাকে গোনায় ধরেনি, আমি বললে তা হাস্যরসের খোরাক ছাড়া আর কিছু হবে না। সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। ধর্মীয় সম্প্রীতির যে শিক্ষা আমি আমার শিক্ষকদের কাছ থেকে পেয়েছিলাম, তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে হয়তো আমরা এই সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত উপড়ে ফেলতে পারব।

সাপ্তাহিক : ছেলেবেলার গণ্ডি পেরিয়ে ঘরের বাইরে অনেক দূরে। চান্দিনার স্কুলে যাওয়ার কথা বলছিলেন, সেখানে কেমন ছিলেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : চান্দিনা পাইলট হাই স্কুলের কোনো হোস্টেল ছিল না। স্কুল থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে ছিল আমার মামা বাড়ি। সেই বাড়িতেই আমার আস্তানা হলো। ছোট মামা তখন মেট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছেন। তিনি আর দাদু-দিদিমা অর্থাৎ নানা-নানী থাকতেন সে বাড়িতে। সেখান থেকে প্রতিদিন তিন মাইল পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম। চান্দিনা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন আমার বাবার আপন মেসতুতো ভাই। তার নাম ছিল সুকুমার দত্ত। দাদু তাকে বলে গিয়েছিলেন আমাকে একটু দেখে রাখতে, যাতে ভালো রেজাল্ট করতে পারি। স্যার বলেছিলেন, মহিচাইল স্কুলে আপনার নাতি ফার্স্টবয় ছিল। আমাদের এখানেও সে ফার্স্ট হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। হবে না, এটাই ধরে রাখেন। তবে দশের মধ্যে থাকলে সে মেট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন পাবেই। তার এই কথা শুনে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়িয়ে দিলাম। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় আমি থার্ড হলাম। দুই মাস পরে ভর্তি হয়েও সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম। দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা এবং বার্ষিক পরীক্ষায়ও আমি থার্ড হলাম। ক্লাস টেনে ওঠার পর প্রি টেস্টে আমি সেকন্ড হই। টেস্টে হই ফার্স্ট। আর মেট্রিক পরীক্ষায় সবার চেয়ে বেশি নাম্বার পেয়েছিলাম।

চান্দিনা স্কুলের স্যারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মনিরুল ইসলাম স্যার, সুকুমার স্যার, মণীন্দ্র স্যার, দেবেন্দ্র স্যার, সাত্তার স্যার, চুন্নু স্যার, অবিনাশ স্যার। অখিল স্যার ভূগোল পড়াতেন। ক্লাসে ঢুকেই তিনি প্রথমেই বোর্ডে পুরো পৃথিবীর মানচিত্রটা এঁকে ফেলতেন। এরপর পড়ানো শুরু করতেন, কোথায় কোন দেশ, কার পাশে কোন দেশ, সমুদ্র থেকে সেগুলো কত দূরে, মানচিত্র দেখিয়ে এক নিমিষেই বুঝিয়ে দিতেন। আমাদের কাছেও কিছু জটিল লাগত না। যেমন বিশ্বযুদ্ধের ধারণা দিতে তিনি কোন কোন দেশ শত্রুপক্ষ ছিল, কোন কোন দেশ মিত্রপক্ষ ছিল, সেগুলোকে ভিন্ন চিহ্ন দিয়ে দেখিয়ে দিতেন। এতে করে জটিল ইতিহাস ও তার ভূগোল একেবারে সহজ হয়ে যেত। বাড়িতে বসে বসে ঘাড় দুলিয়ে মুখস্থ করার কোনো দরকার হতো না।

সাইন্সের শিক্ষক ছিলেন অবিনাশ স্যার। স্কুলের কাছেই মাত্র দুই রুমের একটা বাসায় থাকতেন তিনি। টেস্ট পরীক্ষার পর স্যার আমাকে প্রায় জোর করে তার বাসায় নিয়ে যান। যাতে আমি সময় নষ্ট না করি। স্যারের তত্ত্বাবধানে যেন ঠিকঠাক পড়ালেখা করে ভালো রেজাল্ট করতে পারি। আমি খুব খেলাপাগল ছিলাম, ফলে টেস্টে ফার্স্ট হওয়ার সাফল্য ধরে রাখতে পারব কিনা, এটা ছিল স্যারের দুশ্চিন্তার বিষয়। তার থাকার অসুবিধা, বাড়তি শ্রমের কষ্ট, কিছুকেই পরোয়া করেননি তিনি। তখনকার দিনে টিউশনি বলে কিছু ছিল না। স্যাররা নিজ থেকেই ঘুরতে বের হতেন সন্ধ্যার পর। বাড়ির পাশে চুপিচুপি গিয়ে দেখতেন কোন ছাত্র কী করছে! কাউকে বাইরে দেখলে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। পরদিন স্কুলে তাকে নিয়মানুবর্তিতার বিষয়ে শিক্ষা দিতেন, কিছু শাস্তিও বরাদ্দ থাকত। ছুটির দিনের দুপুরেও স্যাররা এভাবে বের হয়ে দেখতেন, কে খাওয়ার পর বিশ্রাম না নিয়ে লাটিম ঘুরাতে ব্যস্ত, এগুলো দেখতেন। ছাত্রদের শাসন করতেন, বাড়িতে পাঠাতেন। শিক্ষকদের এই যে ত্যাগ শিক্ষার জন্য, শিক্ষার্থীর বিকাশের জন্য, এটা এখন আর দেখা যায় না।

শিক্ষাটা তখন প্রকৃত অর্থেই শিক্ষা ছিল। স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি চলত নৈতিক শিক্ষা, আদব-কায়দার শিক্ষা। পাশাপাশি চালু ছিল শরীর চর্চা ও খেলাধুলা। গেম টিচার প্রত্যেক স্কুলেই ছিল। আন্তঃস্কুল খেলা হতো। ভলিবল, ফুটবল, হাডুডুর প্রচলন ছিল বেশি। যদিও ক্রিকেট আমার এখন খুবই পছন্দের খেলা, কিন্তু গ্রামে তখন এই খেলাটা ছিল না। বিতর্ক, রচনা লিখন, আবৃত্তির প্রতিযোগিতা চলত। রচনা ও বিতর্কের কমন বিষয় ছিল, যুদ্ধ নাকি শান্তি, লেখনি নাকি অস্ত্র। বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। প্রত্যেক স্কুলেই তখন এক জোড়া তবলা আর একটা হারমোনিয়াম থাকত। শিক্ষকরা কেউ কেউ হারমোনিয়াম, তবলা বাজাতে পারতেন। ছাত্রদের যারা কম বেশি বাজাতে পারত তাদের উৎসাহ দিতেন, শেখাতেন। অর্থাৎ একজন ছাত্রের দৈহিক, মানসিক, চিন্তার গঠন, মেধা ও নৈতিকতা- সবকিছুরই পরিচর্যা হতো স্কুলে। ফলে ছাত্রদের ফিজিক্যাল ফিটনেস ভালো হতো। মানসিক প্রফুল্লতা থাকত। আদর্শ, ন্যায়ের প্রশ্নে সতর্কতা থাকত। ছাত্ররা সাংস্কৃতিক চর্চায়ও যুক্ত থাকত। স্কুল থেকেই এগুলোর সূচনা হওয়ায় বড় হয়ে এই ছাত্ররা প্রকৃত মানুষ হওয়ার দিকে এগিয়ে যেত, সেটাই স্বাভাবিক। কেউ কেউ যে নানা কারণে বখে যেত না, তা নয়। তবে স্কুল থেকে শিক্ষা নেয়ার মনোভাব একবার গড়ে উঠলেই আর কোনো আশঙ্কা নেই। কিন্তু এখন তো এমন দায়িত্বশীল স্কুলই পাওয়া যাবে না। যদিও দু’একটা পাওয়া যায়, সেখানে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লাগবে। আর এত টাকা খরচ করে যারা পড়বে, তারা এসব শিক্ষা কেবল টাকা হলে পাওয়া যায় অর্থাৎ টাকাই বড়, এটাও শিখবে। আর যখন কোনো শিশু মনে করবে টাকাই বড়, তখন তাকে অন্য যে শিক্ষাই দেয়া হোক, তার আর কোনো মূল্য থাকবে না।

সাপ্তাহিক : একটু পেছনে যেতে চাই। ছেলেবেলার যে সমাজের বর্ণনা দিলেন, তার আর্থ-রাজনৈতিক দিকটা সম্পর্কে যদি বলতেন, মানুষের অবস্থা কেমন ছিল?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : তখনকার দিনে মানুষ প্রচণ্ড অভাবী ছিল। কোনো কোনো পরিবার শুধু আটার রুটি খেত। কেউ কেউ শুধু কাউন দিয়ে জাউ রেঁধে খেত। অনেক পরিবার কাউন আর চাল মিলিয়ে এক ধরনের ভাত রান্না করে খেত। কারণ কাউনের দাম কম ছিল। অনেককে আমাদের বাড়িতে আসতে দেখতাম ভাতের মাড় নেয়ার জন্য। তারা ভাতের মাড় খেয়ে দিন কাটিয়ে দিত। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল ধোপাবাড়ি, শীলবাড়ি। তাদের অভাব, অনটন ছিল মারাত্মক। প্রায় দিনই সেসব বাড়িতে কান্নার শব্দ শোনা যেত। কারণ জিজ্ঞেস করলে জানা যেত, বাড়িতে কিছু রান্না হয়নি। আমার ঠাকুমা তাদের যা পারতেন দিতেন, বাড়িতে এলে খাওয়াতেন। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেও সামাজিক বন্ধন ছিল অটুট। মানুষে মানুষে বিশেষ সম্পর্ক ছিল, যার বর্ণনা আগেই দিয়েছি। তখন একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসত। একজন এগিয়ে যাচ্ছে দেখে তার ক্ষতি করতে হবে, এমন প্রবণতা কম ছিল। বরং দেখেছি, আমাদের বাড়িতে কেউ দাদুর সঙ্গে কোনো পরামর্শ করতে এলে পরামর্শের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের জন্য কিছু সাহায্যও পেত। যেমন, একজন কৃষক এসে বলল, ছেলেটা মেট্রিক পাস করেছে। এখন কলেজে ভর্তি হতে চায়। আমাদের তো এত সঙ্গতি নেই, কিভাবে পড়াব। এখন কি করা যায়? দাদু হয়তো বোঝাতেন, আরেকটু কষ্ট করে কলেজটা পাস করতে পারলে কি কি সুবিধা হবে। পাশাপাশি হয়তো বললেন, যাও কলেজে ভর্তির টাকাটা আমি দিয়ে দেব। তুমি অন্য খরচের জন্য চেষ্টা কর। মোটকথা, ভালোকে সবাই ভালোবাসত। এমনকি আমি দেখেছি, আমরা যখন মেট্রিক পাস করেছি, তখন গ্রামের অনেক পরিবার তাদের বাড়িতে আমাদের নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছে। আবার একজন পড়ালেখায় ভালো হলে সে যখন কোনো বাড়ির পাস দিয়ে যেত তাকে বাড়িতে ডেকে বলা হতো, আমার ছেলেটাকে একটু দেখিয়ে দাও, ও অঙ্কে বা ইংরেজীতে কাঁচা। স্কুলে যখন আমরা স্যারকে বলতাম, ইংরেজী কম পারি, একটু আলাদাভাবে পড়তে চাই। স্যার স্কুলের পর বাড়তি সময় পড়াতেন। কিন্তু টাকা নিতেন না। বৃত্তি পরীক্ষার সময় কয়েকজন স্যার মিলে বৃত্তির ছাত্রদের আলাদাভাবে পড়াতেন। এজন্য কোনো ফি দিতে হতো না।

তখনকার দিনে দেখেছি, ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচন হতো। গরিবরা তখন কোনো রাজনীতিই করতেন না। রাজনীতি, নির্বাচন- এগুলো ছিল বিত্তশালীদের ব্যাপার। তবে শুধু বিত্ত থাকলেই হতো না। সামাজিক সুনাম ও পরোপকারী মনোভাবের শিক্ষিত লোক ছাড়া কেউ প্রার্থী হতো না। চেয়ারম্যান চেয়ারে বসলে তাকে মানাতো। এখনকার মতো চাঁদাবাজ, নারী নিপীড়ক, বদমাশরা কেউ চেয়ারম্যান প্রার্থী হতো না। তারা অনেকে মুসলিম লীগ ছিল। কিন্তু মানুষ হিসেবে এখনকার অনেক বিএনপি-আওয়ামী লীগ নেতাদের চেয়ে তারা ভালো ছিল। মুসলিম লীগ করলেও তাদের অনেকের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা দেখিনি। যেমন আমাদের এলাকায় গণি মিঞা মজুমদার নামের একজন চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি মুসলিম লীগ করতেন। কিন্তু একাত্তরে তাকে কোনো বিতর্কিত ভূমিকায় লিপ্ত হতে দেখিনি। চান্দিনায় চেয়ারম্যান ছিলেন সৈয়দ লুৎফর রহমান। সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। দেখলেই মনে হতো, এই লোক একদল মানুষের প্রতিনিধি। নির্বাচিত হওয়ার পর এদের সম্পদ বাড়েনি, উল্টো কমেছে মানুষকে দিতে দিতে। এখন তো কেউ চেয়ারম্যান বা এমপি হলে হু হু করে তার সম্পদ বাড়ে। তখন এমন ছিল না। এ থেকে চারপাশের মানুষ শিক্ষা নিত। এখনকার মানুষ কি শিখছে সমাজ থেকে তা তো আমরা পত্রিকার পাতা খুললেই দেখতে পাচ্ছি। সমাজের সব কিছুই পণ্য, এমনকি ঘরের মানুষও অর্থের জন্য বিনিময়যোগ্য। সবকিছুই এখন অর্থ দিয়ে মাপা হয়। এই বাণিজ্যিকিকরণটাই মনে হয় দুই সময়ের পার্থক্য।

সাপ্তাহিক : সে বয়সে স্কুলের বইয়ের বাইরে কি ধরনের বইপত্র পড়তেন? পড়তে দিত?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে বই পেতাম। উপরের ক্লাসের বড় ভাইরাও দিতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লুকিয়ে পড়তে হতো। পড়ার ক্ষতি হবে ভেবে পরিবারের লোকেরা বাধা দিতেন। আবার ভাবতেন, বাচ্চারা বড়দের বই পড়ে অল্প বয়সে ইঁচড়ে পাকা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও বড় বাধাটা ছিল রাষ্ট্রীয়। তখনকার সময়টা তো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জোয়ারের যুগ। অধিকাংশ বই ছিল চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা। আমাদের দেশীয় প্রকাশনা শিল্প তখন খুবই ছোট। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র- এই তিনটেই বেশি পাওয়া যেত, এগুলোই পড়া হতো। কিন্তু কমিউনিস্টদের বইপত্র প্রকাশ্যে পড়া যেত না। কারণ কমিউনিস্ট পার্টি ছিল নিষিদ্ধ। তাদের মতের সঙ্গে যায় এমন যে কোনো ধরনের বই পেলেই গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আমাদের এলাকার কলেজ পড়ুয়া কিছু ছেলে তখন বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। তারা ছুটিতে গ্রামে এলে এসব বইপত্র নিয়ে আসতেন।  

সাপ্তাহিক : ওই বয়সেই তো পার করছিলেন উত্তাল ষাট দশক। সে বিষয়ে কিছু বলুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : চান্দিনা স্কুলে যখন ভর্তি হই, দেশের পরিস্থিতি তখন খুবই উত্তপ্ত। আমরা তখন ছোট ছিলাম। তখনও বুঝিনি যে, দেশটা আর কিছুকালের মধ্যেই স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এলাকার যেসব বড় ভাইরা আওয়ামী লীগ বা বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা কিন্তু এটা বলতেন। আমরা শুনতাম, আন্দোলিত হতাম। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে দেশের স্বাধীনতার সম্ভাবনা আছে, এটা বুঝতাম না। তখনও গ্রামাঞ্চলে বঙ্গবন্ধুকে শেখ সাহেব বলেই ডাকা হতো। এখনও গ্রামের মানুষ তাকে এই নামেই ডাকে। আমরা তখন বড়দের বলতে শুনতাম এবং নিজেরাও বলতাম, শেখ সাহেব এখন ধাক্কা দিলে এখনই পাকিস্তান সরকার পড়ে যাবে। পুরো দেশ অচল হয়ে যাবে। বাস্তবে কিন্তু একাত্তরে এসে তাই ঘটল। 

আমার বন্ধুরা আগে থেকেই ছাত্র ইউনিয়ন করত। কিন্তু আমি কিভাবে যেন গোড়া থেকেই ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। চান্দিনায় মেট্রিক পড়ালেখার সময় থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে আমার ওঠবস শুরু। আমাদের স্কুলের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হাজী রমিজউদ্দীন সাহেব, আর কালীপ্রসাদ বকশি ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তারা একবার স্কুলে এসে ছাত্রদের বাস্তব অবস্থার ধারণা দেয়ার চেষ্টা করলেন। পাশাপাশি বলে গেলেন, দেশের তরে আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত হও। পাকিস্তানি নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। এই কথাগুলো আমাকে আকর্ষণ করেছিল। এর পর থেকে আমি ছাত্রলীগের ভাইদের সঙ্গে চলাফেরা করতে শুরু করি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত, সব সময়ই আমি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছি। কিন্তু কখনই নিজের কাজকে অবহেলা করিনি। যখন ছাত্র ছিলাম, তখন পড়ালেখায় গুরুত্ব কমাইনি। যখন শিক্ষকতা, ডাক্তারি বা কোনো দায়িত্ব পালন করেছি, রাজনীতি করতে গিয়ে সেই দায়িত্বে কখনও অবহেলা করিনি।

যাই হোক, সে বিষয়ের একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা আমার এখনও মনে আছে। ১৯৬৮ সালে মেট্রিক পরীক্ষা দেয়ার পরের কথা। মোনায়েম খাঁ তখন ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাবেন। তাই রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়া হচ্ছিল। আমরা চান্দিনা স্কুলের ছাত্ররা মিলে রাস্তায় ব্যারিকেড দিচ্ছিলাম। পুলিশ এসে সবাইকে পিটিয়ে সরিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু আমি রাস্তায় শুয়ে ছিলাম। তখন কুমিল্লার এসডিও বা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন হাসান আহমেদ সাহেব। তিনি এসে পুলিশকে থামিয়ে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন স্কুলে। হেডমাস্টার স্যারের হাতে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। স্যারকে অনেক বকাঝকাও করলেন সেইসাথে। পাকিস্তান সরকারের আমলা হলেও দেখুন, তখন কিন্তু তিনিও চাননি ছাত্রদের ওপর নিপীড়ন চালাতে। এরকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আমরা যাচ্ছিলাম।

তখন এসবের মধ্য দিয়েই আমাদের রাজনৈতিক বোধ পরিপক্ব হচ্ছিল। কিছুদিনের মধ্যেই ফলাফল বের হয়, স্কুলজীবন শেষ করি। আগে যারা স্ট্যান্ড করতেন, তারা দুই বিষয়ে লেটার মার্কস পেতেন। আমাদের সময়েই প্রথম আমরা পাঁচজন ছাত্র পাঁচটি বিষয়ে লেটার মার্কস পাই। মেট্রিক পাস করে আমি ভর্তি হলাম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে।

সাপ্তাহিক : স্কুলজীবন তো শেষ করলেন। কলেজ জীবনে নতুন কী পেলেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : কলেজ জীবনটা ছিল একইসঙ্গে স্বাধীনতার, আবার নতুন জীবন গড়ে তোলার প্রস্তুতিও। ভিক্টোরিয়া কলেজে আমরা যখন ভর্তি হই, তখন কোনো পরীক্ষা দেয়া লাগেনি। যারা ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিল, সবাই মেধাতালিকা অনুযায়ী ভর্তির সুযোগ পাই। আমি যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হই, কাকা তখন কুমিল্লা শহরে থাকতেন। তার পরেও আমাকে হোস্টেলে দেয়া হলো। সেটা কলেজেরই হোস্টেল ছিল, টমসম ব্রিজের কাছে অবস্থিত কুমিল্লা নিউ হোস্টেল। সেখানে হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য ভিন্ন দুটো ব্লক ছিল। হিন্দু ব্লকের ১২টি রুমে আমরা ৪৮ জন ছাত্র থাকতাম। হোস্টেল সুপার ছিলেন অমরকৃষ্ণ পাল। দুই বছর পর পর তখন সুপারেন্টেন্ডেন্ট বদলি হতো। তার বদলির পর আমরা পেয়েছিলাম সুবীর কুমার চক্রবর্তীকে, তিনি ছিলেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। তখনও মেস পরিচালনা করত ছাত্ররা। কিন্তু হল সুপারের তদারকি ছিল মারাত্মক। মাঝে মাঝেই রান্নার সময় তিনি গিয়ে বাবুর্চিদের কাজ দেখতেন। খাবারের মান যাতে অক্ষুন্ন থাকে। খাওয়ার সময়ও ডাইনিং রুমে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখতেন কী পরিবেশন হচ্ছে, কে কিভাবে খাচ্ছে। রাতের খাওয়ার সময় ছিল সাড়ে সাতটা থেকে আটটা। দুপুরের খাওয়া দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে। এর বাইরে গেলে খাবার না পেলে কিছু বলার থাকত না। এগুলোর মধ্য দিয়ে নিয়মানুবর্তিতা শেখানো হতো। রাত দশটার দিকে স্যার করিডোর দিয়ে হেঁটে বেড়াতেন। কে কি করছেন, তা নজরে রাখতেন। একজন আরেকজনের রুমে গিয়ে বসে আছে কিনা! রুমে চারজনের বেশি কিনা এটা খেয়াল রাখতেন। আমরা করতাম কি, যদি কেউ কোনো কাজে বাইরে যেতাম, বা সিনেমা দেখতে যেতাম, তাহলে বিছানায় কাঁথার নিচে বালিশ দিয়ে রাখতাম, যাতে মনে হয় কেউ ঘুমিয়ে আছে। অথবা অন্য কাউকে ডেকে এনে বসিয়ে রাখতাম। কিন্তু স্যাররা বেশি ভালো ছাত্র ও বেশি খারাপ ছাত্রদের অবস্থান, বৈশিষ্ট্যের খোঁজ খবর রাখতেন। কে কখন কি করতে পারে, স্যারদের সেই ধারণা ছিল। ফলে নিয়মের বাইরে কিছু করতে গেলেই ধরা পড়তাম। তার পরও বলব, কলেজ জীবনটাই ছিল সবচেয়ে মধুর জীবন এবং উত্তেজনাপূর্ণ।                                                                                                                                                                                                              
আমাদের জীবনটা গেছে মার্শাল ল’য়ের মধ্য দিয়ে। যখন মেট্রিক পরীক্ষা দেই, তখন ছিল আইউব খানের মার্শাল ল’, ১৯৭০ সালে যখন ইন্টার পরীক্ষা দেই, তখন চলছিল ইয়াহিয়া খানের মার্শাল ল’। ১৯৭৬ সালে যখন এমবিবিএস পরীক্ষা দেই, তখন জিয়াউর রহমানের মার্শাল ল’। মার্শাল ল’য়ের সময় স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষায় বাড়তি কড়াকড়ি থাকত। আমাদের মধ্যেও ভয়-ভীতি, উদ্বেগ-আতঙ্ক থাকত। ফলে পড়ালেখায় নিবিড় মনোযোগ দেয়াটা কঠিন ছিল। তার মধ্য দিয়েই আমরা পড়ালেখা করেছি। যাই হোক, বলছিলাম কলেজ জীবনটা ছিল মধুর। শিক্ষকরা ছিলেন অসাধারণ। বাংলা পড়াতেন ছয়জন শিক্ষক, সপ্তাহে একেকজনের ক্লাস একেকদিন। অমর পাল স্যার পড়াতেন জসীম উদ্দীনের নিমন্ত্রণ। আমীর আলী স্যার পড়াতেন রবীন্দ্রনাথের কঙ্কাল। নূরুল ইসলাম স্যার পড়াতেন রবীন্দ্র কাব্য। ফজলুল হক স্যার পড়াতেন নজরুল। অশোক মুখার্জী পড়াতেন মাইকেল মধুসূদন। মোবাশ্বের আলী স্যার পড়াতেন নাটক ও উপন্যাস। তারা এমনভাবে পড়াতেন যে, পরে গিয়ে আর কিছু পড়তে হতো না। আমির আলী স্যার যখন কঙ্কাল পড়াতে গিয়ে বললেন গভীর রাতে কঙ্কালটি হি হি করিয়া হাসিয়া উঠিল, সে সময় তিনি যে বিকট হাসি দিতেন, তা এখনও আমার কানে বাজে। অশোক স্যার যখন মধুসূদন পড়াতেন বোর্ডে কপোতাক্ষ নদ, পাশের ঘাট সব এঁকে ফেলতেন। তারপর সেগুলো দেখিয়ে বোঝাতেন। অর্থাৎ সেটা শুধু গল্প পড়া ছিল না, সে সময়ের সমাজ, মানুষ ও চিন্তা, সবকিছু সম্পর্কে একটা বিশদ ধারণা জন্মাতো, আর তা ভোলা সম্ভব ছিল না। অধিকাংশ শিক্ষকদের পাঠপদ্ধতিই ছিল এরকম। এনজি রায়, লায়লা নূর আর লুৎফর রহমান স্যার পড়াতেন ইংরেজী। এনজি রায় স্যার যখন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ পড়াতেন, তিনি বোর্ডে এঁকে ফেলতেন এই লেক, এই বাড়ি, এই ড্যাফোডিল ফুল, ইত্যাদি, ইত্যাদি। ম্যাথ করাতেন রজ্জব আলী স্যার, কে কে রায় আর সুশীল পোদ্দার স্যার। রজ্জব আলী স্যার পড়াতেন সলিড জিওমেট্রি। প্রথমদিন ক্লাসে এসে তিনি বলেছিলেন, সলিড জিওমেট্রি হচ্ছে ইমাজিনেটরি! যেমন আমরা একটা মুখের ছবি দেখে ভাবি নাকটা উঁচু। আসলে ছবিতে কিন্তু উঁচু কিছু নেই, পুরোটাই সমতল। তার মানে এটা পুরোই ডাইমেনশনের খেলা। এভাবে পড়ানোর ফলে সহজে বুঝতে পারতাম আমরা। কে কে রায় স্যার খুবই দ্রুত রোল কল করতেন। কেউ যদি বলত হাজিরা দিতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছে, তিনি পরে আর হাজিরা নিতেন না। উল্টো বলতেন, এক্সপ্রেস ট্রেন নেভার ওয়েটস ফর থার্ড ক্লাস প্যাসেঞ্জার। শিক্ষকদের তখন একটা মান ছিল। যেই ভিক্টোরিয়া কলেজ সরকারি হয়ে গেল, শুরু হলো তার মান পতনের। আগে তারাই শিক্ষক হতেন, যাদের বোঝানোর ক্ষমতা ছিল। তারা যা পড়াতেন নিজেরা তা বুঝতেন। এখন তো অনেক শিক্ষক সম্পর্কে ছাত্ররা বলে যে, তিনি কী পড়ান বুঝি না। এর অর্থ দাঁড়ায় শিক্ষকতার যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষক নির্বাচন হচ্ছে না।

সাপ্তাহিক : এর আগের প্রশ্নের জবাবের শুরুতেই বলছিলেন, কলেজ জীবনটা ছিল পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি! সে বিষয়ের যদি একটু গভীরে যেতেন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : আমি বলতে চেয়েছি যে, ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীকে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার। কারণ সমাজ, প্রতিবেশ, ভবিষ্যৎ নিয়ে তখন তার উদ্বেগ থাকে না। সঠিক ধারণাও থাকে না। ফলে কোনটা জরুরি কাজ, তা সে বুঝে উঠতে পারে না। সাময়িক বিনোদনকে সে বেশি প্রাধান্য দেয়। এ সময় পরিবার, শিক্ষক ও প্রতিবেশীদের দায়িত্ব হচ্ছে, তাকে পরবর্তী জীবনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে চলার মতো প্রস্তুত করে গড়ে দেয়া। ওই যে হল সুপারের তৎপরতার কথা বললাম, এরকম পরিচর্যা না থাকলে কিন্তু আজকে আমি এখানে আসতে পারতাম না। অনেক মানুষই বলেন, আমার হাতে তারা জীবন পেয়েছেন, এটুকু করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। সে সময় স্যারদের যত্নের কারণেই আমার আজকের এই অবস্থান। এজন্য আমার কাছে সব সময় মনে হয়, ইন্টার পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করা উচিত, শাসনও করা উচিত। যদিও এখন শিক্ষাক্ষেত্রে বেত উঠে গেছে, আমি মনে করি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটাও থাকা দরকার। কারণ অন্যায় করলে আপনি একজনকে অনেক বোঝাতে পারেন। কিন্তু তার পরেও যদি সে না শোনে, অন্যায় করে, নিজের কাজ না করে, তাহলে তাকে শাসন করাটা দায়িত্ব। আমি শাসন করার পক্ষে। শাসন করার অর্থ সব সময় বেত চালনা নয়। আরও অনেক ভাবেই তা করা যায়। আমি মনে করি, অন্তত ইন্টার পর্যন্ত এর দরকার আছে। যদি অন্য ছাত্রদের সামনে কৃতকার্যের জন্য কাউকে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, তাহলে কিন্তু তার লজ্জা হয়। আর তাতে করে আত্মশুদ্ধির চেষ্টাটা তার নিজের ভেতরেই জন্ম নেয়। তা না করেও শাস্তি দেয়া যায়। ক্লাসের পরে ৫০টা অঙ্ক বা কোনো কাজ করতে দেয়া যায়। তাতে তার উপকারও হয়, শিক্ষাও হয়। ব্যথা বা লজ্জা কোনোটাই লাগে না। কিন্তু আত্মশুদ্ধির তাগিদ তৈরি হয়। আবার ছাত্রের সেই শাস্তিমূলক অঙ্ক করা বা পড়া শেষ হওয়া অবধি শিক্ষককেও অপেক্ষা করতে হবে, তাকেও দায়িত্ব নিতে হবে। এটাও কিন্তু ছাত্রটা খেয়াল করবে। সুতরাং শাসনের দরকার আছে। তবে শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে।

একটা ঘটনা বলি। তখন আমরা উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা দেখার জন্য পাগল ছিলাম। আমি কিন্তু এখনও পাগল। যাই হোক, তখন ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর ভারতীয় কিছু সিনেমা আমাদের এখানে আটকা পড়ে গিয়েছিল। সেই সিনেমাগুলো তখন সেনাবাহিনীর ব্যারাক সংশ্লিষ্ট গ্যারিসনের সিনেমা হলগুলোতে দেখানো হতো। আমরা তো কয়েক বন্ধু পদার্থবিজ্ঞানের প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস বাদ দিয়ে চলে গেলাম সিনেমা দেখতে। সিনেমা চলছে, হঠাৎ দেখা গেল পর্দায় লেখা উঠেছে, প্রাণ গোপাল, নিখিল, অশোক, তোমরা বেরিয়ে আসো। তোমাদের অভিভাবক বাইরে অপেক্ষা করছেন। আমাদের তো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার দশা! ঘটনা হলো কি, পদার্থবিদ্যার স্যার ক্লাসে গিয়ে আমাদের না পেয়ে রিকশা নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট চলে এসেছিলেন। তিনি তো সিনেমার কলা-কৌশল সম্পর্কে সবই জানতেন। স্লাইডের ওপর ওটা লেখে লাইটের ওপর লেখাটা উল্টো করে ধরেছিলেন। পর্দায় সুন্দর করে ভেসে উঠল ‘সমন’! আমরা বেরিয়ে এলাম। পরে কলেজে নিয়ে গিয়ে চার ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। এই গাইডেন্সটা না থাকলে ছেলেমেয়েদের সঠিক লাইনে রাখা মুশকিল। টিনেজ বয়সে সবকিছু রঙিন লাগে। আমরা যখন নিউ হোস্টেল থেকে বেরিয়ে কলেজে আসতাম, সোজা একটা রাস্তা ছিল কান্দিরপাড় হয়ে। আমরা কি করতাম, মাঝে মাঝেই সোজা রাস্তা না ধরে কুমিল্লা সদর হাসপাতাল ঘুরে মহিলা কলেজের সামনে দিয়ে বিরাট পথ পার করে কলেজে আসতাম। ওই বয়সে এটা ছিল একটা থ্রিল, এরকম ঘটেই। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলেই বাঁধে বিপত্তি।

আবার শিক্ষকরা ছিলেন দায়িত্বশীল। একটা খাতা নিয়েই কলেজে চলে যাবে, তেমনটা হওয়ার কোনো উপায় ছিল না। স্যাররা বকাঝকা করতেন। আবার সুশাসনটা তারা নিশ্চিত করতেন পরিবারকে এর সঙ্গে যুক্ত করে। যে ছেলেটা ফাঁকিবাজি করছে, তার অর্থের উৎস তো পরিবার। সেই পরিবারকে যদি নিয়মিত সবকিছু জানানো হয়, বা তাদের ডেকে এনে ছাত্রের সামনে দাঁড় করিয়ে ছাত্রকে দিয়েই সব বলানো হয় যে সে কি করে, তাহলে সে কিন্তু পরবর্তীতে তা আর করতে পারবে না। কারণ, তাহলে বাড়ি থেকে টাকা আসবে না বা আরও অনেক সমস্যা হবে। এটা তখন করা হতো। আমি মনে করি, যত বড় শিক্ষালয়ই হোক, এটা সর্বোচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা উচিত। এখন তো বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলে ছেলেমেয়েরা যা খুশি তা করে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখেন, অধিকাংশ ছেলেমেয়েই কিন্তু পরিবারের কাছে গেলে সেই ভদ্র ছেলে সেজে থাকে। তাহলে সেই ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী করছে, এটা তার পরিবার জানলে তো সে বুড়ো বাপ-মা’র কথা ভেবে হলেও মাদক, আড্ডাবাজি থেকে বিরত থাকত। আমাদের সময় এটা ছিল বলেই পড়ালেখার ভিত্তিটা মজবুত হয়েছিল। 

সাপ্তাহিক : আপনার কলেজ জীবনের সময়টা তো ছিল আরও উত্তাল। ’৬৯ সালে পড়ছিলেন প্রথম বর্ষে। গণঅভ্যুত্থান ও সে সময়ে আপনার রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতি থেকে কিছু বলুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ১৯৬৮ সালে আমাদের ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল জয়ী হয়। ওমর ফারুক-মাসুদ প্যানেল নামে তারা নির্বাচন করেছিল। কিন্তু আমি তখন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। চান্দিনা স্কুলে থাকতেই জেলা ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে রেজা ভাইয়ের নাম অনেক শুনেছিলাম। কিন্তু তাকে কখনও দেখার সুযোগ ঘটেনি। তিনিও ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র ছিলেন। কলেজে এসে তার নামে আরও অনেক গল্প শুনলাম। তখন তিনি কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। বেশ কয়েকবার জেল খেটেছেন। রাজনীতি করার দায়ে তাকে তখন সরকারি চাপে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আরও অনেককেই করা হয়েছিল, এটা ছিল সে সময়কার সাধারণ ব্যাপার। তাকে প্রথম দেখলাম, ১৯৬৯ সালে কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সময়। কিন্তু অতৃপ্ত রয়ে গেলাম। কারণ কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় তিনি সেখানে কোনো বক্তৃতা দিলেন না। কিন্তু কল-কাঠি নাড়ানোর অর্থাৎ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার যে মন্ত্রণা দিয়ে গেলেন, তার ফলে ছাত্রলীগ মনোনীত পাখি-রুস্তম পরিষদ জয়ী হয়ে গেল।

’৬৯ এর অভ্যুত্থানের কথা আমরা শুনেছিলাম রেডিওতে। তখন হলের বিভিন্ন রুমে জটলা করে আলাপ হতো। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের টিম ছিল, তারা আশেপাশের রাস্তা ঘাটের খবর রাখত। সব সময়ই আতঙ্ক ছিল কখন সেনাবাহিনী এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিরাপত্তাহীনতা ছিল, উদ্বেগ ছিল, আর ছিল নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা। সেই সময়টাই ছিল অন্যরকম।

ওই বছরই তোফায়েল ভাইকে দেখেছিলাম কুমিল্লায়। আমাদের কলেজে এবং মহিলা কলেজে আয়োজিত সমাবেশে তিনি প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নেন। তাকে দেখতে পাব, এই অনুভূতিটা এত আনন্দের ছিল যে, মনে হবে যেন কোনো দেবতা আসছেন, আর আমরা তার জন্য অপেক্ষা করছি। বঙ্গবন্ধু কুমিল্লা আসবেন জেনে কী অনুভূতি হয়েছিল তা আজ আর ভাষায় ব্যক্ত করতে পারব না। আমরা তখন পড়ালেখার চাপের মধ্যে ছিলাম। শুনলাম, তিনি আসবেন। আওয়ামী লীগ বিরাট জনসভার ডাক দিয়েছে। কলেজের শীর্ষ ছাত্রনেতারা কাজে লেগে গেলেন। তখনও মুসলিম লীগ ও তার ছাত্র সংগঠন এনএসএফের অনেক দাপট ছিল। তাদের হামলার ভয় ছিল। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাকসামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে জড়ো হলো, যেন এনএসএফ কোনো ঝামেলা করতে না পারে। তখন আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে মিজানুর রহমান চৌধুরী, জহিরুল কাইয়ূম, আবদুল আজিজ, ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে আফজাল ভাই, রউফ ভাইদের সক্রিয় থাকতে দেখেছিলাম। আমরাও তখন পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতাম। আমার হাতের লেখা ভাল ছিল, তাই প্ল্যাকার্ড লেখার দায়িত্বটা সব সময়ই আমার কাঁধে চলে আসত।

যাই হোক, সেবারই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে দেখলাম। কুমিল্লা টাউন হলের মাঠে তিনি বিশ মিনিটের মতো ভাষণ দিলেন। অনর্গল বলে চললেন, কোনো উঁ-অ্যাঁ নেই। সে যে কী সবল উচ্চারণ! সেই ভাষণে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্যের বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করেন। যে ক’জন লোক ওই ভাষণ শুনেছিলেন, তাদের পক্ষে আর কোনোদিন পাকিস্তানকে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। বৈষম্যের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি পকেট থেকে একটা ম্যাচবক্স বের করেন। ম্যাচটা বাম হাতে নিয়ে ডান হাতের তর্জনি উঁচিয়ে তিনি বলেন, এই ম্যাচবক্সটা আমার চট্টগ্রামে তৈরি হয়। কিন্তু আমরা এটা কিনি চার আনা দিয়ে। ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে এটা বিক্রি হয় এক আনায়। তার সেই ভাষণদানের ছবিটা আমার কাছে ছিল। কিন্তু পরে কিভাবে যেন হারিয়ে ফেলেছি। সেটাই স্বাভাবিক, এর মধ্যে একাত্তর গেছে, পঁচাত্তর গেছে, মার্শাল ল’ গেছে! এত ঘটনার কারণেই মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা জীবন সময় খুব বেশি না হলেও তার তুলনায় অনেক বড় হয়ে গেছে। যাই হোক, এরকম উত্তেজনার মধ্য দিয়েই ১৯৭০ সালে পরীক্ষা দেই। পরীক্ষা শেষ হলে ফিরে আসি বাড়িতে।

সাপ্তাহিক : বিষয় থেকে দূরে গিয়ে একটা প্রশ্ন করতে চাই। ভাষা আন্দোলনের পরের বছরই তো আপনার জন্ম। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আপনাদের অল্প বয়সের ধারণাগুলো কেমন ছিল। আর তেভাগা সম্পর্কেই বা কী জানতেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে পরিবার থেকেই। পরে স্কুলের শিক্ষকদের মুখে শুনেছি। বাংলার শিক্ষক, ইংরেজী ও সমাজের শিক্ষকরা ভাষা ও মানুষের ভাবের আদান প্রদানে মাতৃভাষার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে এই বিষয়টা সামনে নিয়ে আসতেন। কিন্তু তেভাগা সম্পর্কে ওভাবে আমরা বিশেষ কিছু শুনিনি। বাম রাজনীতি যারা করতেন তাদের মুখে এ বিষয়ে শুনেছিলাম। আমাদের এলাকায় এ আন্দোলনের কোনো ছাপও দেখিনি। বড় হওয়ার পর বইপত্রে এ আন্দোলন সম্পর্কে জেনেছি।

সাপ্তাহিক : উচ্চ মাধ্যমিক পড়া শেষ হওয়ার পর গ্রামে গিয়ে কী করলেন? 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : পরীক্ষা দিয়েই আমি গ্রামে চলে গেলাম। মেট্রিক পরীক্ষার পরেও আমি গ্রামে ছিলাম ফলাফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত। সে সময়টাতে গ্রামের স্কুলে ছাত্রদের সহযোগিতা করেছি, সেটাকে শিক্ষকতা বলব না। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক দেয়ার পর তখন আমি আরও বড়, আরও পরিণত। সে সময়েও স্কুলে পড়ানো শুরু করলাম। এবারেরটাকে কিন্তু শিক্ষকতাই বলব। আগেরবার ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল ঘনিষ্ঠ। কিন্তু এবার শহর থেকে আসা মেধাবী ছাত্র আমি। প্রিয় কাদির স্যারের নির্দেশেই আমি স্কুলে অংক এবং বিজ্ঞান পড়াতাম। কারণ স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষকের অভাব ছিল। সে সময় স্কুলের ছাত্রদের পড়াতে, তাদের সাহায্য করতে ভালো লাগত। যে সমস্ত কথা স্যাররা আমাদের বলেছেন, সেগুলো ছাত্রদের বলতাম। সেই সময়টা ছিল বেশ আনন্দের। ওদিকে নির্বাচন নিয়ে নানা শঙ্কা, আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে রাজনীতিতে অস্থিরতা, এসবও ছিল। তবে তখনও আমরা ভাবিনি যে ক’মাস বাদেই বিরাট একটা যুদ্ধ লাগতে যাচ্ছে। আমি তখন চিন্তায় আছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব। তখনকার দিনের সব সংগ্রামের প্রধান একটা কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের আলোচিত মেধাবী ছাত্ররাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়তেন। নামকরা লেখক, সাহিত্যিক, পণ্ডিতরা অধিকাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। যাদের লেখা বই পড়েছি। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়টাই ছিল আমার লক্ষ্য। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল ভিক্টোরিয়া কলেজের রসায়নের শিক্ষক গোলাম সোবহান স্যারের অনুপ্রেরণা। রসায়ন সম্পর্কে স্যার বলতেন, যতই পড়িবে ততই ভুলিবে, তবুও তোমাকে পড়িতে হইবে। তিনি রসায়নের প্রতি বিশেষ একটা আগ্রহ তৈরী করে দিয়েছিলেন। আমার ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে পড়ব, গবেষণা করব। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। সেখানে ভর্তি হওয়ার জন্য আমি এমন কিছু নেই যে করিনি। তার পরেও বাবার জেদের কাছে পরাস্ত হয়েছি। বাবার ইচ্ছা ছিল আমি ডাক্তার হই।

সাপ্তাহিক : মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন বাধ্য হয়ে? 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : হ্যাঁ। আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না। আগেই বলেছি, আমাদের বাড়িটা ছোট দাদুর কারণে ডাক্তার বাড়ি নামেই পরিচিত ছিল। বাবা আগে থেকেই বলতেন, বড় হয়ে ডাক্তার হতে হবে। তাছাড়া আমার একমাত্র পিশেমশাই ছিলেন হোমিওপ্যাথির ডাক্তার। তিনি গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বাবা তার চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা, ঢাকা করে শেষ অবধি বোম্বে পর্যন্ত গিয়েছিলেন। অনেক ডাক্তারের সংস্পর্শে এসে এ পেশার প্রতি বাবার মধ্যে একটা বিশেষ সম্মানবোধ তৈরী হয়েছিল। বাবার সহপাঠি ছিলেন অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম। তিনি থাকতেন ঢাকার গ্রীন রোডে। মেডিকেলে ভর্তির জন্য বাবা আমাকে তার কাছে নিয়ে এলেন। তিনি আমার রেজাল্ট শুনে বললেন, চিন্তার কিছু নেই, ও ভর্তি হবেই। বাবা আমাকে মেডিকেলে ভর্তির টাকা পয়সা দিয়ে গেলেন। কিন্তু আমি তো মেডিকেল ভর্তি হতে চাই না। বন্ধুদের সঙ্গে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রসায়নে ভর্তির চেষ্টা করলাম এবং টিকেও গেলাম। শুধু যে টিকেছি তা নয়, তৃতীয় হলাম। রসায়নে ভর্তি হয়ে আমি বাড়ি চলে এলাম। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ভর্তি হয়েছি কিনা। বললাম যে, ঢাকা ভার্সিটিতে রসায়নে ভর্তি হয়েছি। বাবা রেগে গিয়ে বললেন, আমি তো তোমাকে কেমিস্ট্রিতে ভর্তি হতে টাকা দেইনি। আমিও আমার সিদ্ধান্তে অটল, ডাক্তারি পড়ব না। মধ্যস্থতা করলেন ঠাকুমা। আমাকে খুব করে বোঝালেন, বাবার ইচ্ছাকে মূল্য দিতে বললেন। শেষে আমি মনোকষ্ট নিয়েই রাজি হলাম। বাবা আমাকে নিয়ে আবার ঢাকায় ফিরোজা ফুফুর বাসায় এলেন। তিনি প্রথমে বাবাকে বললেন, ক্যামিস্ট্রি তো ভালো সাবজেক্ট। ও যদি ডাক্তারি না পড়তে চায়, তাহলে ক্যামিস্ট্রি পড়ুক না। কিন্তু বাবা বললেন, না, আমি আমার ছেলেকে ডাক্তারি পড়াতে চাই। এটা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। ফিরোজা ফুফু সব শুনে আমাকে বোঝালেন, বাবার দোয়া ছাড়া মানুষ হওয়া যায় না। বাবার স্বপ্নপূরণই তো সন্তানের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এসব শুনে আমি আরেকটু নরম হলাম। তারপর বললাম, কিন্তু আপনাদের ওখানে তো ভর্তি শেষ। এটা বললাম, যেন আর চাপাচাপি না করে। কিন্তু ফিরোজা ফুফু বললেন, হ্যাঁ, ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির সময় শেষ। বাবাকে বললেন, আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যেতে। সেখানে তখনও ভর্তিপ্রক্রিয়া চলছিল। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেলের অধ্যাপক এম এ মান্নান সাহেবের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে বাবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, সময় নষ্ট না করে দ্রুত চট্টগ্রাম যাও। বাবা আমাকে নিয়ে গ্রীন অ্যারো মেইলে ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম পৌঁছলেন। তিনি তখন হাসপাতালে রাউন্ডে ছিলেন বোধহয়। আমাদের দেখে বললেন, আপনারা বিকেলে চেম্বারে আসেন। চট্টেশ্বরী রোডে তখন মান্নান স্যারের চেম্বার। বাবা বললেন, আমরা তো রোগী না। ফিরোজা একটা চিঠি দিয়ে পাঠিয়েছে। ফিরোজা ফুফুর নাম শুনে তিনি আমাদের তার রুমে নিয়ে গেলেন। সব শুনে এবং আমার রেজাল্ট দেখে তিনি একজনকে ডেকে পাঠালেন। তাকে বললেন, এই নাও ওর মার্কশিট। দরখাস্ত আনো, ওর স্বাক্ষর নাও। বাবাকে বললেন, আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। ভাইভার দিন ওকে নিয়ে আসেন, ও ভর্তি হতে পারবে। ভাইভাতে বাবা আমাকে নিয়ে এলেন, টিকে গেলাম। তখন বাবা টাকা নিয়ে আসেননি। স্যার নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে আমাকে ভর্তি করালেন। পরে অবশ্য বাবা সেই টাকা দিয়ে দেন। এভাবেই নাছোড়বান্দা বাবার পাল্লায় পড়েই মেডিকেলে ভর্তি হয়ে গেলাম। ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাবা যেন পরিত্রাণ পেলেন। কিন্তু আমি তখনও মেনে নিতে পারিনি। যদিও অনেক পরে এসে আমার উপলব্ধি হয়েছে, বাবাই সঠিক ছিলেন। আজ আমি পরিচিত, অপরিচিত কত মানুষকে চিকিৎসার মাধ্যমে সাহায্য করতে পারছি। মানুষের সেবা করতে পারছি। অন্য কোনো পেশায় গেলে এত ব্যাপকভাবে সমাজের উপকার করতে পারতাম না।

সাপ্তাহিক : অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভর্তি হলেন, আস্তে আস্তে নিশ্চয়ই মানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম দিককার দিনগুলো কেমন ছিল? 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : প্রথম দিকে পড়তে ভালো লাগত না। আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাসে। মেডিকেলের হোস্টেলে তখন সিট সঙ্কট। ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রণেন দাশগুপ্ত তখন জেলে ছিলেন। ছাত্র ইউনিয়ন করব ভেবে সংগঠনের নেতারা আমাকে তার সিটে তুলে দিলেন। পরে যখন বুঝলেন আমি ছাত্রলীগ করি, তখন তারা একটু যেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন। রণেন দা জেল থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পাসে যোগ দেয়ার পর সেই রুম ছেড়ে দেই। তারপর আরও কয়েকটি রুমে ছিলাম। মাঝখানে কিছুদিন থাকতাম ডা. মিনার ভাইয়ের রুমে। তিনি তখন ৫ম বর্ষে। বেশ সিনিয়র, কিছুদিনের মধ্যেই তাকে শিক্ষক হিসেবে পেতে পারি। আমি তো ভয়ে তটস্থ থাকতাম। তিনি ছিলেন খুবই সংস্কৃতিমনা। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। মেডিকেল পড়ার সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি তিনি গান-বাজনা, নাটকের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তখন দেখতাম যে, তিনি রিহার্সেল শেষে রুমে ফিরতে একটু আধটু দেরি করতেন। মজার লোক ছিলেন। আমি যদি কখনও তার আসার আগে ঘুমিয়ে যেতাম, তাহলে রুমে ঢুকেই বলতেন, এই ঘুমাচ্ছো কেন? এরকম ঘুমুলে কিন্তু ডাক্তার হতে পারবে না। সারা জীবন ঘুমিয়েই কাটাতে হবে। আবার দেখা গেল কোনোদিন আমি ভাবছি যে, আজ বেশ রাত অবধি পড়ব। মিনার ভাই ঘুমুতে যাওয়ার সময় বলতেন, লাইট বন্ধ করে ঘুমাও। এতো পড়তে হবে না। পড়ালেখা অতিরিক্ত করলে সাধারণ বোধ-বুদ্ধি লোপ পেতে পারে। তখন তার নির্দেশে আবার ঘুমুতে যেতাম। 

শেষে ১৬/বি-তে আমার সিট হয়। তার ঠিক উপরেই ২৪/বি-তে থাকতেন যতীন দা। তার বাড়ি ছিল সন্দ্বীপে। আমাদের তিন বছরের সিনিয়র ছিলেন। বাবা প্রায়ই আসতেন, এসে যতীন দা’কে বলে যেতেন আমার দিকে খেয়াল রাখতে। যেন পাগলামি করে পালিয়ে না যাই। তিনি দেখলেন, আমি পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারছি না। আমাকে বললেন এত চাপ না নিয়ে পড়ালেখা কর, খেলাধুলা কর, গান শোনো। আমি তাকে বলতাম, মেডিকেলে সারাক্ষণই পড়া লাগে। তিনি এরপর বাবা এলে তাকে বললেন আমাকে একটা টু-ইন-ওয়ান ও কিছু ক্যাসেট কিনে দিয়ে যেতে। যাতে বিরক্ত না লাগে ও রুমে থাকার অভ্যাস করতে পারি। বাবা যতীন দা’কে সঙ্গে নিয়ে নিউ মার্কেটে গেলেন। সেই সময়ের ১১০০ টাকা দিয়ে আমাকে একটা সনি ব্র্যান্ডের টু-ইন-ওয়ান কিনে দিলেন। রুমমেটদের কাছে আমার কদর বেড়ে গেল। এর মধ্যেই ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় হলো। ঘূর্ণিঝড়ের পর কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। মেডিকেল টিম যাবে দুর্গত বিভিন্ন এলাকায়। আমি তো সোজা বাড়িতে চলে এলাম। আমি ভেবেছিলাম, বাড়ি গিয়ে ঠাকুমা’কে বুঝিয়ে বলব, আমার মেডিকেল পড়তে ভাল লাগে না। ঠাকুমা’কে বুঝিয়ে বলতে পারলে নিশ্চয়ই বাবাকেও ম্যানেজ করা যাবে। কিন্তু দুই দিন পরেই মনে হয় দৈনিক সংবাদের হেডলাইনে দেখলাম লেখা হয়েছে, ‘ভিক্ষে দাও গো পুরোবাসী’। খবরের ভেতরে শহরের মানুষ যারা ক্ষতির শিকার হননি, দুস্থদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে তাদের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্দশার বিশদ বর্ণনাও তুলে ধরা হয় খবরে। এটা ছিল একটা টার্নিং পয়েন্ট। আমি বুঝতে পারলাম, মেডিকেল পড়াটা আসলেই জরুরি। ১০ দিনের ছুটি ছিল। এর পরে ক্যাম্পাসে ফিরে আমি পড়ালেখায় মনোযোগ দিলাম। আমার সত্যিকারের মেডিকেলের একজন ছাত্র হয়ে ওঠার পেছনে ১২ নভেম্বরের ওই দুর্যোগের বিরাট অবদান ছিল।

আরেকটা ঘটনা বলি এ প্রসঙ্গে। আমি প্রথমে মেডিকেলে ভর্তি হয়ে বাড়ি চলে এসেছিলাম। এরপর ক্লাস শুরুর সময় যখন ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছিলাম, আমার ছোট দাদু ডা. অশ্বিনীকুমার দত্ত আমাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে স্যার উইলিয়াম অসলারের মেডিসিন বইটা খুলে বললেন, এই বাক্যটা লিখে নাও। বাক্যটা ছিল, অ্যা ডক্টর ইজ অ্যা স্টুডেন্ট টিল হিজ ডেথ, অ্যান্ড হোয়েন হি ফেইলস টু বি অ্যা স্টুডেন্ট হি ডাইজ! বললেন, এটা তোমার পড়ার টেবিলের সামনে লিখে রাখবে। ঘূর্ণিঝড়ের ছুটিতে বাড়ি আসার পর দাদু আবার আমাকে ডাকলেন। এবার দেখলাম, ওই বাক্যটা একটা দামি কাগজে খুব সুন্দর ডিজাইন করে শৈল্পিকভাবে তিনি লিখে রেখেছেন। সেটা আমাকে দিয়ে বললেন, এটা নিয়ে যাও। আমি কিন্তু দু’বারই তার নির্দেশ পালন করেছিলাম। সেই কাগজ আমার টেবিলে টানানো থাকত। গ্রামে কিন্তু এখনও এটা চলে। ছাত্রদের পড়ার টেবিলের সামনে উপদেশ, নীতিকথা লেখা থাকে। এই যে দাদু আমার ডাক্তারি পড়ার জন্য এটা করছেন, এগুলো আমাকে বাধ্য করল ডাক্তারি পড়ায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে। 

সাপ্তাহিক : সত্তরের নির্বাচন তো এই ঘূর্ণিঝড়ের কিছুদিন পরেই অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনের সঙ্গে কি যুক্ত হয়েছিলেন? 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : তা তো বটেই। নির্বাচনী প্রচারণা তো ঘূর্ণিঝড়ের আগেই শুরু হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত এলাকাগুলো বাদে নির্বাচন হয়েছিল। তখন চট্টগ্রামে মুসলিম লীগের দু’জন হেভিওয়েট প্রার্থী ছিলেন। একজন ছিল সাকা চৌধুরীর বাবা ফকা চৌধুরী। আরেকজন ছিলেন আমীর খসরু চৌধুরীর বাবা নবী চৌধুরী। তিনি আমাদের ক্যাম্পাস এলাকার প্রার্থী ছিলেন। আমাদের এলাকায় তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইন করতে এসে ফজলুল কাদের চৌধুরী বক্তৃতা দিয়েছিল। আমি যদ্দূর দেখেছি, তুলনা করলে ফজলুল কাদের চৌধুরীর তুলনায় নবী চৌধুরী ছিলেন বেশ বিনয়ী, মার্জিত ও সংযত। ফজলুল কাদের চৌধুরী ছ্যাঁচড়া ভাষায় কথা বলত। জনসভায় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গালাগালি করত। নবী চৌধুরী ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই ভদ্রলোক। তার চেহারা ও আচরণের মধ্যে আভিজাত্যের ছোঁয়া ছিল। এদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন জহুর আহমেদ চৌধুরী ও এম এ আজিজ সাহেব। সে সময় আমরা ক্লাসের মধ্যে ফাঁকা থাকলে বা ছুটির দিনে নির্বাচনী প্রচারণায় যেতাম। যথারীতি আমাকে প্ল্যাকার্ড লিখতে হতো। মেডিকেলের ছাত্র হওয়ায় পড়ার চাপ ছিল প্রবল। ফলে সার্বক্ষণিক রাজনীতি যুদ্ধের সময়টা ব্যতিত আর কখনই করা হয়নি। নির্বাচনের পর তো শুরু হয়ে গেল হরতাল, তারপর অসহযোগ। তখন লেখাপড়াও প্রায় বন্ধ।

সাপ্তাহিক : সে সময় ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি কি? আপনারা তখন কিভাবে সংগঠিত হচ্ছিলেন? 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : তখন ক্যাম্পাসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। সবাই এখানে ওখানে দলে দলে জটলা করে আলোচনা করছে, দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে আর থাকার কোনো প্রয়োজন নেই, এই ধ্বনিটা সবার মুখেই উচ্চারিত হতো। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চট্টেশ্বরী রোডের হোস্টেলটাকে আমরা রীতিমতো একটা অস্ত্রের কারখানা বানিয়ে ফেললাম। হোস্টেলের ভেতরে তখন হাতবোমা, বিস্ফোরক দ্রব্য, অর্থাৎ স্থানীয় পদ্ধতিতে যা যা বানানো যায় আমরা তা বানাতে লাগলাম। তখন বুঝে গেছি, যুদ্ধ লাগতে বেশি বাকি নেই। ক্র্যাকডাউনের খবর আমরা পেলাম রাত দুটোর দিকে। যদিও ক্যাম্পাস এলাকায় কোনো গোলাগুলি হয়নি। পরদিন আমরা দেখলাম, প্রবর্তকের মোড়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের বাঙালি অফিসার ও জওয়ানরা জড়ো হচ্ছেন। জিয়াউর রহমান, কর্নেল অলীরা সেখানে ছিলেন বলে শুনলাম। সাধারণ জনগণও তাদের সঙ্গে সেখানে জড়ো হচ্ছিলেন। মেডিকেলের ছাত্রদের মধ্যে তখন ইউসূফ ভাই, মাহফুজ ভাই, সুলতান ভাই, সুভাষ দা, আমিন ভাই, সালাউদ্দীন ভাই, মিজান ভাই, বেলায়েত ভাই, বোরহান ভাই, মঈনুল ভাইসহ ক্যাম্পাসের নেতৃবৃন্দ যারা ছিলেন তারাও এগিয়ে গেলেন। অস্ত্রের দোকানগুলো দখল করছিলাম বড় ভাইদের নেতৃত্বে। আমরা তো তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি, বড় ভাইদের পেছনে পেছনে হাঁটতাম, তাদের হুকুম তামিল করাটাই ছিল কাজ। বোতল সংগ্রহ করতাম পেট্রোল বোমা তৈরির জন্য। 

তখন বাঙালি-বিহারী দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছিল। চট্টেশ্বরী মোড়ের বিহারী এলাকায় আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। তখনও পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা ছাড়া আর কোনো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। বিহারীরা এর আগে বাঙালিদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছিল। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে আমি আহত বাঙালিদের দু’বার রক্ত দিয়েছিলাম। তখন জানতাম না যে, একবার রক্ত দিলে তিন মাস আর রক্ত দেয়া যায় না। যাই হোক, ক্র্যাকডাউনের পর জনতা ক্ষেপে গিয়ে বিহারিদের ওপর হামলা চালায়। বিহারি এলাকায় হামলার আরেকটা কারণ ছিল, অস্ত্র সংগ্রহ করা। তাদের কাছে অস্ত্রের মজুত ছিল। চট্টেশ্বরী মন্দিরের পাশের খালেক বিল্ডিংয়ে আগুন দেয়া হয়েছিল সেগুলো দখল করার জন্য। যদিও সে চেষ্টা সফল হয়নি। কিন্তু বিহারীদের অনেকেই মারা গিয়েছিল। এরপর তো কালুরঘাটের বেতারকেন্দ্র দখল ও সেখানে ৩০ তারিখ পর্যন্ত অবস্থান। এরপর সেই এলাকা যখন সবাই ছাড়ছেন আমরা কয়েক বন্ধু সরে গেলাম বাঁশখালীর দিকে। তখন আমরা ভাবলাম, আমাদের বাড়ি তো কুমিল্লায়। আমরা এদিকে যাচ্ছি কেন? এপ্রিলের তিন বা চার তারিখের দিকে আমরা কুমিল্লার দিকে রওনা দিলাম। দুই দিন বাদে বাড়ি এসে পৌঁছলাম। এসেই শুনলাম, বাবার ছোট ভাই আমার কাকা সতীশচন্দ্র দত্ত, যিনি কিনা কুমিল্লায় সার্ভেয়ার হিসেবে কাজ করতেন, তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাকে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এরপর তিনি আগরতলা অর্থাৎ ত্রিপুরা গিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। 

সাপ্তাহিক : যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, জানি। কিভাবে যুক্ত হলেন? 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : বাড়িতে আসার পর দাদু বললেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে পাকিস্তান আর্মি যুবকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে থাকা ঠিক হবে না। সে সময় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের ওপর আর্মির রাগটা একটু বেশি ছিল। কারণ পূর্ববঙ্গের ছাত্র আন্দোলন সব সময় পাকিস্তানি জান্তা শাসকদের ডিস্টার্ব করত। কুমিল্লা শহরে কাকা যখন গুলিবিদ্ধ হন, তখন তার পাশের বাসা থেকে প্রিয়লাল ঘোষকে তুলে নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে আর্মি। তিনি ছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। এই লোকটা ছিলেন এক কথায় বডি বিল্ডার। দাদু বোঝালেন, এখানে থাকলে অকালে মারা পড়তে হবে। বাবা বললেন, ত্রিপুরা চলে যেতে। সেখানে তখন মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হচ্ছিল। বাবা বলেছিলেন, সেখানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কোনো একটা কাজে লেগে যেতে।                                      

                                                    
বাবার নির্দেশে আমি, বড় ভাই আর আর ছোট কাকা রওনা দিলাম, ত্রিপুরার উদ্দেশে। ত্রিপুরা গিয়ে সোনামুড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানার খোঁজ পেলাম। এসডিও হিলসের নিচে গোপাল চৌকিদারের বাড়িটা ভাড়া নেয়া হয়েছিল। সেই বাড়িতে এসে পেলাম রেজা ভাইদের। রেজা ভাই তখন মুজিব বাহিনীর ইস্টার্ন সেক্টরের আঞ্চলিক ছাত্র লিয়াজোঁ অফিসার। অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান। যিনি এখন গ্রেনেড হত্যা মামলার এক নম্বর সরকারি প্রসিকিউটর। আরও পেলাম অধ্যাপক আব্দুল মান্নান চৌধুরী, সৈয়দ আহমেদ ফারুক, মনিরুল হক চৌধুরী ও মাঈনুল হুদাসহ ভিক্টোরিয়া কলেজের অনেককেই। ক্যাম্পাসের নির্বাচিত নেতাদের মধ্যে সেই পাখি-রুস্তম, বাহার, আকবর, রফিকসহ অনেকে ছিলেন। কেউ কেউ বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার খেতাবও পেয়েছিলেন পরে। এই রফিক ভাই কিন্তু পরে দেশের বাইরে চলে যান। বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। সেই ছোট্ট বাড়িটা তখন অনেকগুলো মানুষের আস্তানা। ঠিকমতো বসারও জায়গা নেই, শোয়া তো দূরের কথা। খাওয়ার সমস্যা ছিল প্রকট। কিন্তু ত্রিপুরায় খুবই কম দামে তখন ফল পাওয়া যেত। আমরা প্রচুর ফল খেয়েছিলাম ওই কয় মাস। প্রচুর গাছপালা ছিল সেখানে, কিন্তু জনবসতি ছিল না। ফল-ফলাদি সেখানকার মানুষরা গরুকে খাওয়াত। সেখানে জিনিসপত্রের দামও ছিল পাকিস্তানের তুলনায় কম। একটা সিঙ্গারা খেলে পেট ভরে যাবে, সোনামুড়া বাজারে এরকম একটা সিঙ্গারা মিলত চার পয়সায়।

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি দিকে রেজা ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে থাকা আমাদের সোনামুড়ার ওই বাড়িতে টাকা-পয়সার ব্যাপক সঙ্কট তৈরি হলো। তখন সীমান্ত থেকে যাদের বাড়ি কাছাকাছি, তাদের দেশে গিয়ে কিছু অর্থ সংগ্রহ করতে পাঠানো হলো। আমি তখন আরেকজনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলামা আমাদের বাড়ির দিকে। বাড়িতে এসে বাবাকে সব বললাম। বাবা তখন এদিক-ওদিক থেকে ম্যানেজ করে হাজারখানেকের মতো টাকা জোগাড় করে দিলেন। ফিরে যাওয়ার সময় মনে হলো, চান্দিনায় একটা সোনালী ব্যাংক আছে। সেখানে তো টাকা থাকার কথা। ব্যাংকের ম্যানেজার ইয়াকুব সাহেব তো আওয়ামী লীগ করতেন। যেই ভাবা, সেই কাজ। চলে গেলাম তার কাছে। তিনি বললেন, একটা কাজ কর, রাতে এসে তোমরা দরজা-জানলাগুলো ভেঙে ফেলবা। আমি লকার খোলা রেখে যাব। রাতে আমরা যখন হামলা চালালাম, তখনও তিনি সঙ্গে ছিলেন। দেখিয়ে দিলেন কি কি ভাঙতে হবে। সেখান থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো পেয়েছিলাম। এই অপারেশনটা আমরা সফলভাবে করতে পেরেছিলাম। টাকা নিয়ে ত্রিপুরার সোনামুড়াতে আসার পর তো সবাই আনন্দে বুকে জড়িয়ে নিল।

আমাদের পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের প্রধান ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি ভাই। আবার তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তিনি এলেন আরও কিছুদিন পরে। শুনলাম যে, বিশেষ পলিটিক্যাল কম্যান্ডো দল গঠিত হয়েছে। নাম ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট। যা পরে মুজিব বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। ছাত্রলীগ যারা করে, বা ছাত্রলীগ নেতারা যাদের নাম সুপারিশ করতেন, এমন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের রিক্রুট করা হতে লাগল। এদের অস্ত্র ও ট্রেনিং দেয়ার বিষয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে একটা চুক্তি হয়েছিল। 

আমাদের লোকজনের প্রশিক্ষণের জন্য একটা বাড়ি যুদ্ধের আগেই চিত্তরঞ্জন সূতার ভাড়া নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। তিনি জেলে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কলকাতার ভবানীপুরের নর্দার্ন পার্কের পাশের বাড়িটি তিনি ভাড়া নিয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত সরকারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগ হয়েছিল। যাকে এখন আমরা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে জানি। তখন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধেই এরকম একটা জায়গা ঠিক করা হয়, যেখানে আওয়ামী লীগ মনোনীত যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। যাদের দায়িত্ব হবে বাংলাদেশ গঠনের পর প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনার দায়িত্ব নেয়া। অর্থাৎ নতুন একটা রাষ্ট্র পুরনো লোক দিয়ে চালাতে গেলে সেটা পুরনো রীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তাদের পরিকল্পনা ছিল পুরো ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজাবেন। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু জেলখানায় চলে গেছেন। তার এত লোক থাকতেও তিনি জেলে বসে আসামীদের মধ্য থেকেই চিত্তরঞ্জন সূতারকে তার প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। সূতার সাহেব পরে ভারতে এসে এই বাড়িটি ভাড়া নেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রস্তুতি নেয়ার আগেই।

যুদ্ধ শুরুর পর সেই বাড়িতে তোফায়েল ভাইরা ওঠেন। এদিকে মণি ভাই উঠলেন ত্রিপুরার বিশালঘরের একটা বাড়িতে। এপ্রিলের একেবারে শেষের দিকে তিনি এসেছিলেন। আমরা যারা রিক্রুট হলাম, সেখানে গিয়ে উঠলাম। প্রথমেই ছিল ট্রেনিং। মুজিব বাহিনীর ট্রেনিংয়ের জায়গা ছিল দু’টো। একটা ছিল শিলং-এর হাফলং, আরেকটা উত্তরপ্রদেশের দেরাদুনের টান্ডুয়া। মে মাসে মণি ভাইয়ের নেতৃত্বে প্রথম ব্যাচের সদস্যরা ট্রেনিং নিতে চলে যায়। দুই জায়গায় দুই টিম যায়। প্রতি টিমের সদস্য সংখ্যা কত ছিল, এখন মনে নেই। কিন্তু কম হবে না, একেক ব্যাচে ১৫০ জনের মতো ছিল। আমি গিয়েছিলাম সেপ্টেম্বর মাসে, ৮৭ জনের ব্যাচে। সে সময় রেজা ভাইয়ের কাজটা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র জনসংযোগ ছিল তার দায়িত্ব। মুজিব বাহিনী যেহেতু বিশেষ বাহিনী ছিল, এর মধ্যে যেন শেখ মুজিবের আদর্শের বাইরে চিন্তা করে এমন কেউ না ঢুকতে পারে, তা বেশ কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। নানান রকম ফিল্টারিং চালু ছিল।

এর মধ্যে একবার আমরা কয়েকজন মণি ভাইয়ের সঙ্গে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন সিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। কারণ কলকাতায় যারা আছেন তারা তো থাকার জায়গা পেয়েছেন। এদিকে আমাদের এখানে এত লোক আসছে, তাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। অবস্থা খুবই খারাপ। তাকে দেখে অবাক হলাম, কোনো দিক থেকেই বিলাসী কিছুর চিহ্ন নেই। সাধারণ গৃহস্থের বাড়ির মতো। বাইরে বাড়তি নিরাপত্তা কেবল সীমান্তে উত্তেজনার জন্য। আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন একটা খুবই সাধারণ পাঞ্জাবি ও ধুতি পরে। খুবই সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। জায়গা তিনি দিয়েছিলেন তো বটেই, এমন একটা কথা বলেছেন, যা আমি কখনও ভুলব না। তিনি বললেন, আমরা ১৯৪৭ সালে নিজেদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে চলে এসেছিলাম। এখন তোমরা সেই দেশটা নিজেদের হাতে নেয়ার জন্য প্রতিরোধ যুদ্ধ করছ। আমি তোমাদের কাছে মাথা নত করছি। এ ছিল এক অসাধারণ প্রেরণাদায়ক উপলব্ধি!

সাপ্তাহিক : বিরোধী বা ভিন্ন কোনো পক্ষের কাউকে কি ধরা পড়তে দেখেছিলেন?  

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : না, তখন এরকম কোনো ঘটনার মুখোমুখি হইনি। তবে তাদের ফিল্টারিং যে নিখুঁত ছিল না, এটা পরে বুঝেছি। কারণ মুজিব বাহিনী করা লোকদের পরে আমি জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে দেখেছি। যা নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরুদ্ধে যায়। যেহেতু তারা এই পরিচয় নিয়েই সমাজে আছেন, নাম বলতে দ্বিধা করব না। এলএমজি মাহবুব ভাই বলে যাকে আমরা যুদ্ধের সময় ডাকতাম, তিনি পরে মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এরকম আরও অনেকের নামই বলা যাবে। সময়ের ঘুরপ্যাঁচে এমনটা হতে পারে। কিন্তু আদর্শটা যে তাদের শক্তিশালী ছিল না, এটা তো প্রমাণিত। কারণ মানুষ আদর্শের জন্য জীবন দিয়ে দেয়। যদি তা না করে, কেউ বিরোধী শিবিরে যোগ দেয়, তাহলে তো বলতেই হয় যে, তার আদর্শের দীক্ষা পরিপূর্ণ ছিল না। জাসদের নেতারা তো সকলেই মুজিব বাহিনীর। তারা তো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে কসুর করেনি। কিন্তু মৌলবাদীদের সঙ্গে তাদের তুলনা করা যাবে না। 

সাপ্তাহিক : আপনি কেন ট্রেনিংয়ে এত দেরিতে যান? প্রথম দিকে কারা গিয়েছিল?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : আমার যেতে দেরি হওয়ার পেছনে ভিন্ন কারণ ছিল। তবে সাধারণত প্রথম দিকে যেতেন অগ্রগামী ছাত্রনেতারা। কাজী আরেফ, হাসানুল হক ইনুদের মতো আলোচিত ছাত্রনেতারা ছিলেন সেই ব্যাচে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের পর, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতারা ক্রমান্বয়ে ট্রেনিং নিতে যান। সে সময় পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টরের ব্যাপ্তি ছিল, বৃহত্তর নোয়াখালী, বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বৃহত্তর কুমিল্লা, সিলেট ও ভৈরব, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর। চারটা সেক্টর ছিল, আমাদেরটায় স্বয়ং মণি ভাই, আরেকটায় ছিলেন সিরাজুল আলম খান দাদা ভাই, আরেকটায় ছিলেন তোফায়েল ভাই, আরেকটায় ছিলেন রাজ্জাক ভাই।

আগরতলা শহরের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরি বলে একটা জায়গা ছিল, সেই গ্লাস ফ্যাক্টরিতে সর্বশেষ প্রস্তুতির কাজগুলো করা হতো। এই জায়গাটা ছিল একেবারে আর্মি ক্যাম্পের মতো। নানা ধরনের নিয়ম-কানুনে ঠাসা। অনুমতি ব্যতিত বের হওয়া যেত না। আর্মির মতো রেডি থাকতে হতো সারাক্ষণ। পুরো এলাকাটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই এলাকায় তখন সার্বক্ষণিক থাকতেন মেজর সুরৎ সিং। ট্রেনিং থেকে ফিরে এসে সবাই সমবেত হওয়া ও বিভিন্ন ট্রুপে বিভক্ত হয়ে দায়িত্ব বুঝে নিত এই ক্যাম্প থেকে। এটাই ছিল মুজিব বাহিনীর প্রি ইন্ডাকশন ক্যাম্প। এখান থেকে বেরিয়ে তারা দেশে ঢুকতেন অপারেশনের জন্য। 

এর মধ্যেই তো একটা ব্যবস্থাপনা দাঁড়িয়ে গেল। প্রথম ব্যাচ যাওয়া, পরবর্তী ব্যাচ রেডি হওয়া। বিভিন্ন দপ্তর ও পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, এরকম অনেক কাজ শুরু হয়ে গেল। তখন তো কম্পিউটার ছিল না। টাইপ মেশিনেরও অভাব। পেলেও চালানোর মতো লোক নেই। চিঠিপত্র তাই হাতেই লেখা হতো। আগেই বলেছি, ছেলেবেলায় ঠাকুমা’র কাছে লেখা শিখেছিলাম। স্কুলের স্যাররাও সুন্দর হাতের লেখা শিক্ষা দিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে আমার দায়িত্ব পড়ল, মুজিব বাহিনীর চিঠিপত্র লেখা। এই দায়িত্বের কারণেই আমার ট্রেনিংয়ে যেতে দেরি হয়। মুজিবনগর সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, অস্থায়ী সরকারের প্রধান ও আরও অনেকের উদ্দেশে চিঠি পাঠানো হতো। সেগুলো আমি লিখতাম। ভারত সরকারের দিক থেকে মেজর জেনারেল উবান ছিলেন মুজিব বাহিনীর দায়িত্বে। তার কাছেও চিঠি লিখেছি, বিভিন্ন তালিকা পাঠিয়েছি। সুরৎ সিং, কর্নেল পুরকায়স্থ, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ অনেকের কাছেই লিখেছি। আবার অনেক চিঠি কার কাছে গেছে, আমি তা জানি না। প্রাপকের জায়গাটা খালি থাকত। মণি ভাই নিজের হাতে বসিয়ে নিতেন। 

এখন শুনলে মনে হবে চিঠি লেখাটা ছিল রোমাঞ্চের কাজ। প্রথম দিকে আমারও তেমনই লেগেছিল। কিন্তু এটা যুদ্ধের একটা অংশ ছিল, তাই এর যন্ত্রণাও কম ছিল না। সারা দিন-রাত বসে বসে চিঠিপত্র লিখতে হতো। আদেশ, নির্দেশনা, কি লাগবে তার তালিকা, কত লোক আসছে তাদের তালিকা, কাকে কি দেয়া হচ্ছে, কোথায় কি পাঠাতে হবে, কোথা থেকে কি আসছে, কোন এলাকার কি রিপোর্ট, তা প্রস্তুত করা- এরকম অনেক কাজ। লিখতে লিখতে হাত, ঘাড়, পিঠ ব্যথা হয়ে যেত। আঙুল টনটন করত। যদিও ক্রলিং করে বন্দুক নিয়ে এগুনোর মতো নয়, তবু সেই কাজটা সঠিকভাবে করার জন্য এই পেছনের কাজগুলো ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

আমি যখন ট্রেনিংয়ে গিয়েছিলাম, তখনও মণি ভাই ছিলেন। সেই ব্যাচটাকে বলা হতো এইটটি ফোর লিডারস! ট্রেনিংটা ছিল সাত দিনের। অস্ত্রশস্ত্র চেনা, চালানো শেখা। নিরাপত্তার নিয়ম কানুন জানা। এগুলো তো আমরা ক্যাম্পে থাকতেই শিখে ফেলেছিলাম। ভয়ঙ্কর ছিল ট্রেনিং শেষে প্রি ইন্ডাকশন ক্যাম্প শেষ করার পর দেশে ঢোকার সময় বা অরিজিনাল ইন্ডাকশনের সময়টা। জুলাই মাসের শুরুতে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা দেশে প্রথম প্রবেশ করে। আগস্ট মাসের দিকে একটা ট্রুপ ইনডাকশনের সময় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ভিপি নাজমুল হাসান পাখির নেতৃত্বে তারা নৌকায় চড়ে শালদা নদী বেয়ে এগুচ্ছিল। এ সময় তাদের ওপর অ্যাটাক হয়। পাকিস্তান আর্মি কোনোভাবে ইন্ডাকশনের খবর পেয়েছিল। তারা শালদা নদীর তীরে অ্যামবুশ করে। নৌকা দেখামাত্র শুরু হয় ব্রাশফায়ার। তিনজন সেখানেই শহীদ হন। অনেকে আহত হন, যাদের মধ্যে পরে মনে হয় আরও কয়েকজন শহীদ হয়েছিলেন। পাকিস্তান আর্মি তো প্রথমেই দেশের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে। এরপর তারা অল্পদিনের মধ্যেই সীমান্তগুলো নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্ডার সিল করে রেখেছিল তারা। যাতে ভারত থেকে কেউ ভেতরে না ঢুকতে পারে। এজন্য দেশের ভেতরে ঢোকাটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। দেশে ঢুকে যুদ্ধে জড়ানোর আগেই এত বড় দুর্ঘটনা এর আগে-পরে আর ঘটেনি।

সাপ্তাহিক : যে অস্থায়ী সরকারকে চিঠি লিখতেন, তার প্রধানদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : হ্যাঁ, সেই সৌভাগ্য আমার ঘটেছিল। এমনকি তাদের কারও কারও সঙ্গে কাজ করার সুযোগও পেয়েছিলাম। প্রথম ব্যাচ ট্রেনিং থেকে ফেরার পর আমি সব সময় মণি ভাইয়ের আশপাশে আমাকে থাকতে হতো। তিনি কিছু একটা ডিকটেট করতেন, আমি তা লিখতাম। মণি ভাই, এমপি মমতাজ আপা, রেজা ভাই ও তার সহোদর আজিজ ভাইয়ের সঙ্গে বিশালঘরের একটা বাড়িতে থাকতাম। সেখান থেকে মণি ভাই জীপে চড়ে গ্লাস ফ্যাক্টরিতে যেতেন অফিসিয়াল বাহিনীর ড্রেস পরে। রেজা ভাই থাকতেন পেছনে তার ৫০ সিসির সেই বিখ্যাত হোন্ডায়। আমি তার পেছনে চড়ে যেতাম। ভয় হতো, কারণ রেজা ভাই মাঝে মাঝে ছোটখাটো অ্যাকসিডেন্ট করতেন। যদিও এটাকে তিনি গায়ে মাখতেন না। ঠিকই পূর্ণোদ্যমে বাইক হাঁকাতেন। দু’জনের কাছে নিরাপত্তার জন্য ছোট দুটো অস্ত্র থাকত।                                                                                       
একবার অক্টোবর মাসে মণি ভাইয়ের সঙ্গে কলকাতা যাই। সেখানে গিয়ে যে বাড়িতে উঠি, সেটা তোফায়েল ভাইয়ের বাসা। ওখানে তার ছদ্মনাম ছিল, তপন দা। নর্দার্ন পার্কের পাশে অবস্থিত সেই বাড়িটার নাম ছিল সানি ভিলা। অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি জননেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম তখন কলকাতায়। তার কাছে গেলে মণি ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার চিঠিগুলো কার হাতের লেখা? তিনি আমাকে দেখিয়ে দিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্যার বললেন, তাহলে ওকে রেখে যাও। ক’দিন ধরে আমার স্টেনোর খোঁজ নেই। দু’দিন আমি সেখানে ছিলাম, তার ডিকটেশন নিয়ে বিভিন্ন দলিলপত্র লিখলাম। তিনি তো চাইলেন আমাকে নিজের কাছে রেখে দিতে। কিন্তু মণি ভাই এলে তাকে চেপে ধরলাম আমাকে নিয়ে যেতে। অজুহাত দেখালাম, ওখানে থাকলে মাঝ মাঝে বাড়ি যেতে পারি, আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হয়। আসলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্যারের যে ইংরেজীর জ্ঞান আমার পক্ষে তার সঙ্গে কাজ করাটা কষ্টসাধ্য ছিল। কোনোরকমে ডিকশনারি দেখে কাজ চালাতাম। তার সঙ্গে কাজ করতে গেলেও বিশেষ যোগ্যতা দরকার। কলকাতার ওই বাড়িতে আমি মুজিব বাহিনীর চার কম্যান্ডারেরই দেখা পাই। পরে শুনেছি, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম আর্কাইভে আমার হাতে লেখা সেসব চিঠির অনেকগুলোই সংরক্ষিত আছে। কিছুদিন আগে ছাত্রলীগের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরী আমাকে এই তথ্যটা জানিয়েছেন। 

সাপ্তাহিক : যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন কি?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : তা তো আছেই। তবে সবচেয়ে দুঃখের ঘটনাটা বলি। একবার একজন ভারতীয় সাংবাদিককে আমার সঙ্গে দেয়া হলো। তিনি এসছিলেন গ্রাম-শহরের ধ্বংসলীলার ছবি তুলতে। আমার কাজ ছিল তাকে আমাদের এলাকাটা ঘুরিয়ে দেখানো। বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণাটা যেন তিনি পান। আমরা হাতিমারা, বুড়িচং হয়ে কুমিল্লায় ঢুকি। যাওয়ার সময় আমরা পাকিস্তান আর্মির কাছে ধরা পড়লাম। তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন। আমাদের সঙ্গে স্থানীয় একজন গাইড ছিলেন রাজাকারের পরিচয়পত্রসহকারে। ওটা তাদেরই ভুল ছিল। তারা আমাদের জানিয়েছিল ভোরের আলো ফোটার আগে আর্মি বের হয় না। আসলেও হতো না। তারা অন্ধকার ও বৃষ্টি-পানি ভয় পেত। কিন্তু সেদিন তারা ভোর রাত পাঁচটার দিকেই টহলে নেমেছিল। আমরা রিকশায় করে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মোড় ঘোরার পর হেডলাইটের আলো দেখলাম, আর কানে ভেসে এল একটা শব্দ- হল্ট! আমরা থামলাম। পাকিস্তান আর্মি আমাদের জিজ্ঞেস করল, তুম কোন হ্যায়? মুসলমান হ্যায়, আউর হিন্দি হ্যায়? রাজাকার বললেন, ইয়ে হামারা ভাই হ্যায়, মুসলমান হ্যায়! আর্মি এরপর বলল, আব ক্বালমা বাতাও! সে তো বলতে পারল না। এবার তারা রূদ্রমূর্তি ধারণ করল। আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি পারলাম। তবু সন্দেহ হলো তাদের। আমাকে বলল, আপকা নাম ক্যায়া হ্যায়। মেরা নাম আবু উসমান বুখারী হ্যায়। এতে তারা সন্তুষ্ট হলো। একজন বলল, বহুত আচ্ছা নাম হ্যায়। কারণ একদিকে খলিফার নাম আছে। আবার বুখারী ছিলেন তখনকার দিনে পাকিস্তান আর্মির এক টেরর ক্যাপ্টেনের নাম। যিনি কুমিল্লা অঞ্চলকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিলেন। তার এক হাতে মদের বোতল থাকত, আরেক হাতে এসএমজি। ফলে আমাকে তারা তখনই ছেড়ে দেয়। কিন্তু ওই সাংবাদিককে ধরে নিয়ে যায়। সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। বহু রাত আমি ঘুমুতে পারিনি! আমার অসতর্কতার কারণে দূর দেশের একজন মানুষ আমাদের সাহায্য করতে এসে শহীদ হয়েছেন। এ যে কী দুঃখের তা বলে বোঝানো যাবে না।

তাছাড়া সেপ্টেম্বরে একবার আমাকে দেশে ঢুকতে হয়েছিল। সারা দেশে তখন উত্তাল অবস্থা। কাদের সিদ্দিকীর লোকেরা আমাদের বাহিনীর কিছু লোককে ভৈরব এলাকা থেকে অস্ত্রশস্ত্রসহ আটক করেছিল। তারা পরিচয় দিয়েছিল, কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে, কিভাবে ঢুকেছে। কিন্তু তবু তারা ছাড়া পেল না। মণি ভাই তখন আমাকে দিয়ে একটা চিঠি লেখালেন। তারপর সেই চিঠিতে স্বাক্ষর, সিল লাগিয়ে আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা নিয়ে বাজিতপুরে যাও, ওদের ছাড়িয়ে আনো। সেই সেপ্টেম্বরে দেশে ওই চিঠি নিয়ে ঢুকে নিজের লোকদের ছাড়িয়ে আনা, সেটা ছিল ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। যাই হোক, কাজটা সফলভাবেই সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম। এছাড়া কয়েক দফায় কাউকে কাউকে নিজ এলাকা থেকে পার করে ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পালন করেছি। এই যে এখন এমপি লিটন, ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী, তার স্ত্রী, মণি ভাইয়ের স্ত্রী ও সেরনিয়াবাত সাহেবের স্ত্রী ও আরও কিছু শিশুকে মাদারীপুর থেকে পার করে ত্রিপুরায় পৌঁছে দিতে হয়। আমার দায়িত্ব ছিল তাদের চান্দিনা থেকে হাতিমারা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া। দিনের বেলায় কয়েক ঘণ্টা তাদের পানের বড়ার মধ্যে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল। বাচ্চাগুলো কান্নাকাটি করছিল। এর মধ্যে যে আমরা রাজাকার ও পাকিস্তানি আর্মিদের ফাঁকি দিতে পেরেছিলাম, সেটা ছিল বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার। সে সময় এমনিতেই হিন্দুদের বিপদ বেশি ছিল। তার পরেও এগুলো করতে হতো। এর মধ্যে দেশে ঢুকলেই বাড়ি এসে ঘুরে যেতাম। মণি ভাই আমাকে খুব বিশ্বাস করতেন। তার নির্দেশে একবার কলকাতা থেকে তোফায়েল ভাই তিন ব্যাগ টাকা দিলেন আমাকে বিশালঘর নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি তো বিরাট আতঙ্কে। এত টাকা! কোনো বিপদ হলে তো কেউ বিশ্বাস করবে না, ভাববে যে টাকাটা মেরে দিয়েছি। যাই হোক, সেই দায়িত্বও সফলভাবে পালন করতে পেরেছিলাম।

একবার তো এরকম বাড়ির সবার সঙ্গে দেখা করে ফেরত এলাম। কিভাবে যেন রাজাকাররা খবর পায় আমি বাড়িতে আছি। বাড়িতে তো আমি ছিলাম ঠিকই, কিন্তু তাদের আসার আগের রাতেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। তারা খবর পেয়েছিল যে, মফিজ ভূঁইয়া, ইব্রাহিম মজুমদার, হাবিবুর রহমানসহ আমাদের এলাকার যে মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা, তাদের সঙ্গে আমি আছি। কিন্তু আমাদের কাউকে না পেয়ে শেষে আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। তার ওপরে বেদম অত্যাচার চালানো হয় শারীরিকভাবে। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে রাজাকার ক্যাম্পে আমার বন্ধুরা একটা খবর পাঠায়। তাতে বলা হয়, কালাচান দত্তকে কারা ধরে এনেছে আমরা জানি। তার কিছু হলে তোমাদের সকলের বংশ নির্বংশ করে দেয়া হবে। ফলে একপ্রকার ভয়েই তারা তাকে হত্যা করেনি, ছেড়ে দেয়। কিন্তু ওই নির্যাতনের ফলেই পরদিন ১৩ নভেম্বর বাবা রক্তবমি ও রক্ত পায়খানা করে মারা যান। যদিও পরবর্তীতে আমরা তাকে যুদ্ধে শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করিনি। কিন্তু আসলে তিনি শহীদই ছিলেন, রাজাকারদের নির্যাতনের ফলেই বাবা মারা যান। এর কিছুদিন বাদেই দেশ স্বাধীন হয়। চান্দিনা মুক্ত হয়ে গিয়েছিল ১০ ডিসেম্বরের মধ্যেই। ১৩ ডিসেম্বর বাবার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানের সময় আমরা বাড়িতেই ছিলাম। 

সাপ্তাহিক : সর্বোপরি মুজিব বাহিনী নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি? এই বাহিনী সম্পর্কে তো ব্যাপক নেতিবাচক আলোচনা আছে!

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : মূলত এটা ছিল একটা রাজনৈতিক ফোর্স। আগেই বলেছি, বাংলাদেশ স্বাধীনের পর দেশ পরিচালনার জন্য এই বাহিনীর সদস্যদের প্রস্তুত করা হচ্ছিল। মাঝে মাঝে আলোচনা হতে শুনেছি, দেশ স্বাধীনের পর অমুক থানার কম্যান্ডার ও তার অধীনস্তরা কে কোথায় কি দায়িত্ব পালন করবে। তখন এরকম আভাস পেয়েছি। ভেতরে আর কী গূঢ় ব্যাপার স্যাপার ছিল, তা আমি জানতাম না। সেটা হয়তো ঊর্ধ্বতন নেতারা জেনে থাকতে পারেন। কিন্তু যে পরিকল্পনার কথা আমরা জেনেছি, তা যে হয়নি সেটা তো দেখাই যাচ্ছে। তবে তাদের মধ্যে নিবিড় ঐক্য ছিল না। আগে থেকেই আমরা দুই গ্রুপের অস্তিত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম। কাজী আরেফ ভাই আর সৈয়দ রেজা ভাই এই দুই গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন। তাদের দু’জনকে আড়ালে-আবডালে ‘ক্লিক মাস্টার’ বলে ডাকা হতো। কাজী আরেফ ভাই ছিলেন সিরাজুল আলম খানের অনুসারী। আর রেজা ভাই ছিলেন মণি ভাইয়ের অনুসারী। ট্রেনিংয়ে যাওয়া, ফিরে আসার পর দায়িত্ব বণ্টন, এসবের মধ্যে গ্রুপিংয়ের ছাপ দেখা যেত। দেশ স্বাধীনের পর এই গ্রুপিংয়ের কারণেই কিন্তু দুই পক্ষই কিছু অস্ত্র সংরক্ষণ করেছিল। সব অস্ত্র জমা দেয়া হয়নি। অস্ত্র কিভাবে মাটির নিচে রাখা যায়, সেই ট্রেনিং দুই পক্ষেরই ছিল। তবে দেশের রাজনীতি যেভাবে দ্রুত পট-পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, তাতে এটা তো দেখা গেল, মণি ভাইয়ের অনুসারীরা সেসব কাজে লাগাতে পারেনি। কিন্তু সিরাজুল আলম খানরা যখন জাসদ করলেন, তখন তারা হয়তো এর কিছু ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। যাই হোক, এ বিষয়টা দেখার জন্য ঐতিহাসিকরা আছেন। আমি আর এ নিয়ে কিছু বলব না। কেবল জেনারেল উবানের মন্তব্যগুলো স্মরণ করব। তিনি মুজিব বাহিনীর চার প্রধান সম্পর্কে চারটি মন্তব্য করেছিলেন। এর মধ্যে জ্ঞানীজনরা ইঙ্গিত পাবেন। জেনারেল উবান বলেছিলেন, মণি ইজ অ্যা গুড অর্গানাইজার, তোফায়েল ইজ অ্যা গুড ওরেটর, রাজ্জাক ইজ অ্যান ইন্টিলিজেন্ট পারসন, অ্যান্ড সিরাজুল আলম খান- আই কুড নট ইনভেন্ট হিম! যাই হোক, জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে আমরা অস্ত্র জমা দেই। অস্ত্র জমাদান অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তোমাদের শূন্য হাতে তোমরা এখন কলম আর বই তুলে নাও এবং যারা ছাত্র নও বা ছাত্রত্ব শেষ করেছ তারা কোদাল আর লাঙ্গল তুলে ধর। এরপর আবার মেডিকেলে ফেরত গেলাম। 

সাপ্তাহিক : যুদ্ধশেষে পিতার মৃত্যুর বোঝা কাঁধে নিয়ে দেশগঠন ফেলে আবার মেডিকেল পড়ালেখায় কিভাবে মনোযোগ দিলেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : খুবই কষ্টের ছিল সেই সময়টা। একে তো যুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনীতি, তার ওপর বাবার মৃত্যু। পরিবারের অবস্থা খুবই নাজুক। সব কিছুর দাম বাড়তির দিকে। বাড়িতে সবাইকে বললাম, আমি আর পড়ালেখা করতে চাই না। একটা চাকরি খুঁজে নেই। বাড়িতে তো আয় উপার্জন দরকার। ঠাকুর্দা, ঠাকুমা তখনও বেঁচে ছিলেন। দাদু বললেন, তোর চাকরি করা লাগবে না। প্রয়োজনে জায়গা-জমি সব বিক্রি করে দেব। তবু ডাক্তার তোকে হতেই হবে। যাই হোক, সবার চাপের মুখে পড়ে রাশি রাশি দুশ্চিন্তা নিয়ে মেডিকেলে পৌঁছলাম। গিয়ে তো হতাশা আরও বেড়ে গেল। যুদ্ধে তো আমরা গিয়েছি গুটিকয়েক। আমাদের ক্লাস থেকে ১০-১২ জনের মতো। বাকিরা তো ক্যাম্পাসেই ছিল, তারা তো এই সময়ে অনেক এগিয়ে গেছে। ক্লাস হয়েছে। সে সময়ে বিনোদনের কোনো উপায় ছিল না। ফলে তারা পড়ালেখাও করেছে বেশি বেশি। অথচ আমাদের প্রায় এক বছরের গ্যাপ। কিভাবে পারব এত বড় ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে। তার পরেও বাবার ইচ্ছার কথা ভেবে জোর করে পড়ালেখায় মনোযোগ দিলাম। 

’৭২ সালের মাঝামাঝি ছিল ফিজিওলজির সেমিস্টার পরীক্ষা। কারও প্রস্তুতিই পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। অধ্যাপক এম আর বি স্যার তার রুমে একত্রে আটজনকে ঢুকালেন। একেকজনকে কাছে ডেকে একটাই প্রশ্ন, পারবে কি পারবে না? সবাই উত্তর দিলেন পারব না। কেবল আমি বলেছিলাম, পারব। তিনি আমাকে পাঁচটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনটার উত্তর সঠিক হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, অন্যরা সবাই ফেল করবে। কিন্তু ফলাফলে দেখলাম, আমি ছাড়া সবাই পাস। কী যে কষ্ট পেলাম মনে, তা আজ আর বলতে পারব না। মনে হলো আমার বিরুদ্ধে অন্যায় হয়েছে। এজন্যই বোধহয় বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম। রাগে, দুঃখে সিদ্ধান্ত নিলাম। মেডিকেলে আর পড়ালেখা করবই না। এমনিতেই বাবার জোরাজুরিতে পড়তে এসেছি। বিছানাপত্র আর বইখাতা ট্র্যাঙ্কে ঢুকিয়ে নিয়ে চড়লাম বাহাদুরাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনে। ট্রেন ছাড়ার কয়েক মিনিট আগে যতীন দা ও অনিল দা এসে তন্নতন্ন করে প্ল্যাটফর্ম চষে ফেললেন। শেষে আমাকে পেলেন ট্রেনের খাবার রুমে। বিছানাসহ আমাকে নামাতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। কিন্তু ট্র্যাঙ্ক চলে গেল। পরে অবশ্য আমাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে রেল কর্তৃপক্ষ সেটা হোস্টেলে পৌঁছে দিয়েছিল। যতীন দা হোস্টেলে এনে বুঝালেন। পুরো একটা দিন রিকশা নিয়ে চিটাগাং শহরে ঘুরলেন এবং হ্যাপি লজে নিয়ে খাওয়ালেন। বাবার স্মৃতি থেকে বারবার নানা ঘটনা তুলে ধরলেন। বোঝানোর চেষ্টা করলেন, বাবা যেহেতু মারা গেছেন, তার স্বর্গীয় আত্মাকে আমার কষ্ট দেয়া উচিত হবে না। আমি বরাবরই বিশ্বাসী। মন গলে গেল। আবার পড়ালেখায় কঠোর মনোযোগ দিলাম।

ক্যাম্পাস তখনও বেশ উত্তেজিত। যেসব ছাত্ররা পাকিস্তানিদের পক্ষে ছিল, যুদ্ধের সময় সাধারণ ছাত্রদের ওপর হম্বিতম্বি করেছে, আর্মিকে সাহায্য করেছে, তাদের বিচার হতে লাগল। সেই হাঙ্গামাও চলেছিল অনেক দিন ধরে। আমি এগুলোতে আর যাইনি। এরপর চতুর্থ বর্ষে ওঠা অবধি আমি অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছাড়া কোনো কিছুতেই যুক্ত হইনি। নইলে যুদ্ধের সময় আমি যাদের স্নেহভাজন ছিলাম, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে হয়তো এখন আর অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে পেতেন না। রাজনীতিবিদ বা মন্ত্রী প্রাণ গোপালের দেখা পেতেন। যাই হোক, মেডিকেল পড়ালেখাকে ব্রত হিসেবে নিয়ে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত চোখমুখ বন্ধ করে পড়ে গেলাম। ডাক্তার হওয়াটা তাই বলি, একান্তই বাবার অবদান। যতদিন বেঁচে ছিলেন, নিজেই লেগে ছিলেন। আর মরার পর আমার পেছনে লেগে ছিল তার ভূত! ডাক্তার আমাকে তিনি বানিয়েই ছেড়েছেন।

সাপ্তাহিক : চতুর্থ বর্ষে উঠে কি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : সক্রিয় বলতে অতটা না। চতুর্থ বর্ষে যখন উঠলাম, তখন আমি থার্ড হলাম। দেখলাম যে, আমার সেই গ্যাপটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এখন কিছু পরিমাণে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা যায়। সে বছরই ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শাখার প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হলাম। তার পরের ঘটনা তো আর বলার কিছু নেই। আবার দেশে কালো ছায়া নেমে এল। পঞ্চম বর্ষে পড়ার সময় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটে গেল সেই ভয়ঙ্কর পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এরপর তো দেশে আর আমাদের রাজনীতি করার সুযোগই থাকল না। আওয়ামী লীগ তো তখন এক রকম নিষিদ্ধ দল।

সাপ্তাহিক : ১৫ আগস্টের ঘটনার খবর কখন পেলেন? আপনাদের ভূমিকা কি ছিল?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ঘটনা তো ঘটল ভোরে। অল্পক্ষণের মধ্যেই সারা দেশে চাউর হয়ে গেল। এটা যে কত বড় দুঃসংবাদ ও কতটা ভীতিকর, আশ্চর্যজনক ও উদ্বেগের, তার মাত্রা আজ বর্ণনা করা যাবে না। পরিবারসুদ্ধ যেভাবে স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা করা হয়েছে, নিকট ইতিহাসে তার কোনো নজির ছিল না। সবাই ভাবলেন, সমস্ত আওয়ামী লীগের নেতাদেরই মনে হয় পর্যায়ক্রমে হত্যা করা হবে। যে যেভাবে পারলেন আত্মগোপনে চলে গেলেন। স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা ছিল এমন লোকেরা তখন যারা মাথা নিচু করে হাঁটতো, নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য সমাজে যারা ঘৃণিত ছিল, নিজেরাও যারা ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তারা কিন্তু তখন পুরো উল্টে গেল। তারা বলতে লাগল, আমরাই সঠিক ছিলাম। তাদের মধ্যে তখন দেখা গেল বিরাট উৎফুল্লতা। তারা জনগণের মধ্যে এই ধারণা দেয়ার চেষ্টা করল যে, দেশটা আবার পাকিস্তান হয়ে যাচ্ছে। নাম বলব না, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ সরকারের বিজ্ঞ-প্রসিদ্ধ নেতাদের কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, দেয়ার ওয়াজ নো ওয়ে টু সেভ দ্যা কান্ট্রি, এক্সসেপ্ট দ্যা অ্যাসাসিনেশন অব শেখ মুজিবুর রহমান। এরাই কিন্তু আবার বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের লোক ছিল। আমাদের দেশে নানাভাবে নীতিহীন রাজনীতির বিকাশ ঘটেছে। এটা সিরাজউদ্দৌলার আমল থেকে শুরু হয়েছে। গান্ধিজী বলেছিলেন, পলিটিক্স উইদাউট প্রিন্সিপাল ইজ অ্যা ডেডলি সিন! এটা কিন্তু আমরা দেখেছি, এখনও দেখছি। আওয়ামী লীগ করছে চিরকাল, এমন নেতাদের তো আমরা দেখেছি নমিনেশন না পেয়ে সুধা সদন থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে গুলশান গিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নমিনেশন নিল। অর্থাৎ ৩০-৪০ বছর ধরে যে আদর্শের পক্ষে তারা গলা ফাটাল, তার কোনো মূল্যই রইল না।

সাপ্তাহিক : মেডিকেল পড়ার কী হলো? আপনার শিক্ষকদের কথাও বলুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ৭৬ সালে এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা হলো। আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে সপ্তম হলাম। তবে আমার এই সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের অবদানটাই ছিল প্রধান। এমন সব ব্যক্তিত্বের দেখা পেয়েছি, যারা মানুষকে শুধু সুস্থ করাই না, বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখতেন। দেবপ্রসাদ বড়ুয়া ছিলেন সৌম্য শব্দের একটা প্রতিরূপ। এনাটমির শিক্ষক ছিলেন তিনি। ক্লাসে ঢুকলে মনে হতো স্বয়ং ভগবান বুদ্ধ ঢুকেছেন। কথা বলতেন প্রতিটা শব্দ আলাদা করে। তখন তো আর ভাবতাম না যে, ইএনটি পড়ব। মনে করতাম, তার মতো এনাটমির একজন অধ্যাপক হতে পারলে জীবন স্বার্থক। তখন মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পড়াতেন ডেমোনেস্ট্রেটররা। এখন এই পদটাকে লেকচারার করা হয়েছে। তাদের কীযে দেয়ার আগ্রহ ছিল- সারাক্ষণ শেখাতেন। এটা দেখো, এটা বোঝো, ওটা পড়। কোন জায়গায় কী হয়, কেন হয় তা বারবার করে বোঝাতেন। যেন কেউ কিছু না ভুলে যায়। তখন মনে হতো অধ্যাপক হতে না পারলেও অন্তত ডেমোনেস্ট্রেটর হব। তারা কিন্তু প্র্যাকটিস করতেন না। কেবল পড়িয়েই যা আয় করতেন। তা সত্ত্বেও তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি এত চিত্তাকর্ষক ছিল যে, তা একজনের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিত। রুস্তম স্যার হিস্ট্রোপ্যাথলজি পড়াতেন। তিনি মাঝে মাঝেই বাইরের দিকে তাকিয়ে পড়াতেন। দেখে মনে হতো জানলার বাইরে কেউ বইটা ধরে রেখেছে। বায়ো ক্যামিস্ট্রির শিক্ষক ছিলেন জাফর স্যার। তিনি যখন বোর্ডে হাত চালাতেন, দেখে মনে হতো, সবকিছু বোর্ডে আঁকাই আছে, তিনি শুধু হাত ঘুরাচ্ছেন। 

নূরুল ইসলাম স্যার ছিলেন আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন শিক্ষক। তিনি মেডিকেল জুরিসপ্রুডেন্সের বিষয়গুলো পড়াতেন, হোমিসাইড না সুইসাইড, কোন জখম কোন ধারা! পাশাপাশি ফিজিওলজির ডেমোনেস্ট্রেটর ছিলেন। প্রত্যেকটা ছাত্রেরই চোখের মণি ছিলেন তিনি। আন্দরকিল্লার একটা বাসায় থাকতেন। ছাত্ররা অসুস্থ হলে মেডিসিনের প্রফেসরের কাছে যেত না। যেত নূরুল ইসলাম স্যারের কাছে। শুনেছিলাম, নোয়াখালীর এক পীর বংশে তার জন্ম হয়েছিল। চাপ দাড়িতে মুখভর্তি ছিল। দেখে মনে হতো আল্লাহ তা’আলার প্রেরিত কোনো দূত। নূরানী চেহারা যাকে বলে আর কি! আচার-আচরণও ছিল সেরকম। এই শিক্ষকদের কাছ থেকে আমি মাথা ঠাণ্ডা রাখার শিক্ষা পেয়েছিলাম। তারা কিছুতেই চটে যেতেন না। এই জিনিসটা আমিও রপ্ত করার চেষ্টা করি। যে যাই বলুক আমি রাগ করি না। ভাবনা চিন্তা করি, মতামত দেই কিংবা এড়িয়ে যাই। কিন্তু রেগে গিয়ে বকাঝকা করি না। এমনিতে বকতে পারি কোনো কাজ আদায়ের জন্য। কিন্তু চটে যাই না, স্যারদের কাছ থেকেই আমি অমূল্য এই সম্পদটার খোঁজ পেয়েছিলাম। যিনি রাগবেন না, তার জীবনের অর্ধেক সঙ্কট ও বিপদ এমনিতেই কেটে যাবে। 

আমার শিক্ষকদের মধ্যে আরও ছিলেন আনোয়ার স্যার। তিনি পরে বারডেমের ডিজির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্যাথলজির মান্নান স্যারও ভালো পড়াতেন। ফার্মাকোলজির কাশেম স্যারও ছিলেন অসাধারণ একজন শিক্ষক। তার নৈতিকতা নিয়ে সব ছাত্ররা আলোচনা করত। মেডিসিনে পেয়েছিলাম এসজিএম চৌধুরী ও ইউনূস স্যারকে। সার্জারিতে নূরুল হক সরকার, ফজলুল করিম স্যার, এ এস মিঞা স্যার। উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে আরও ছিলেন মির্জা মাজহারুল ইসলাম, নূরজাহান ভূঁইয়া, জাহানারা বেগম, তারা সবাই কিন্তু অধ্যাপক। ইএনটিতে পেয়েছিলাম, অধ্যাপক নূরুল আমিন স্যারকে। তাকে দেখেই আমি নাক-কান-গলার ডাক্তার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। ৭২ সালে স্যার আমার নাকে অপারেশন করেছিলেন একবার। তখন পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল ও চট্টগ্রাম মেডিকেলে খ্যাতিমান শিক্ষকরা পড়াতেন। আমাদের শামসুজ্জোহা স্যার তো জগদ্বিখ্যাত ছিলেন। লুইস ফার্মাকোলজির ইন্টারন্যাশনাল বইয়ে তার নাম আমরা পড়তাম। তখন ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে তুলনা হতো। অন্য অনেক মেডিকেল তখনও পূর্ণাঙ্গ রূপই পায়নি। সেসব ক্যাম্পাসে অধিকাংশ শিক্ষকই ছিলেন নতুন। আমার সৌভাগ্য যে, ঢাকা মেডিকেল মিস করলেও চট্টগ্রামের ট্রেনটা অন্তত ধরতে পেরেছিলাম।                                                                                                                                                    
মেডিকেল পরীক্ষা শেষে নূরুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে আমার একটা ঘটনা আছে। পরীক্ষা দিয়ে ফিরছিলাম। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, পরীক্ষা কেমন হয়েছে? বললাম যে, স্যার মনে হয় আরেকবার পরীক্ষা দিতে হবে। তখন জিয়ার আমল। কারফিউ ছিল। বাইরে থেকে যে পরীক্ষক আসেন, তিনি দেরিতে পৌঁছেছিলেন এবং আমি প্রথম তার সামনে পড়েছি। এমনিতেই রাগান্বিত ছিলেন, কী দেয় কে জানে। স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি তো বাড়ি চলে যাই। স্যার সেবার টেবুলেশনের দায়িত্বে ছিলেন। ফলাফলের তালিকা করার সময় তিনি দেখলেন আমি ওপরের দিকেই আছি। ক্যাম্পাসে আমার হবু স্ত্রী জয়াকে ডেকে বললেন তুমি কি প্রাণ গোপালের ঠিকানা জানো? সে লজ্জায় লাল হয়ে বলেছিল, স্যার সুজিত জানে। ওরা একই এলাকার ছেলে। স্যারের উদ্বেগটা দেখেন, তিনি ভেবেছিলেন আমি মনে হয় দুশ্চিন্তায় আছি। তিনি সুজিতের মাধ্যমে ঠিকানা নিয়ে খবর পাঠালেন যে, আমি উতরে গেছই এবং রীতিমতো মেধা তালিকায় আছি। স্যাররা তখন ছাত্রদের মানসিক শান্তি দেয়ার জন্য নিজেরা কষ্ট সইতে দ্বিধা করতেন না। 

সাপ্তাহিক : ৭৫ সালের পর আপনার দলের তো বেহাল দশা। তখন কিভাবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ১৫ আগস্ট আমাদের চলৎশক্তি কেড়ে নিয়েছিল অনেকদিনের জন্য। ৭৭ সালে যখন ঢাকা এলাম, ঢাকায় যাব মনে করতেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে, বঙ্গবন্ধু, মণি ভাই, কেউ নাই। সবাইকে নৃশংসভাবে মেরে ফেলেছে। ঢাকা আসার পর বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের সামনে এলাম। এ সময় ডিবির এক লোক আমাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। পরিচয় দিলাম যে, আমি ডাক্তার। চট্টগ্রামে থাকি। জিজ্ঞেস করল কোথায় যান? আমার হবু স্ত্রীর বড় বোনের বাসা ছিল আসাদ গেইটে। বললাম, সেখানে যাচ্ছি। সে তো হম্বিতম্বি শুরু করে দিল, আসাদ গেইট কি এদিক থেকে যায়? অনেক কথা বলল। তারপর আমাকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে গেল রমনা থানায়। আমিও গোড়া থেকে এরকম একটা আচরণ করার চেষ্টা করলাম, আমি একজন নিরীহ ডাক্তার, জীবনে কোনোদিন রাজনীতি করিনি। ঢাকাও ভাল করে চিনি না। আমাকে প্রায় রাত ১২টা অবধি বসিয়ে রাখল। আমি যেহেতু সঠিক নাম বলেছি, হিন্দু হিসেবে ট্রিট হলাম। একেকজন রুমে ঢোকে আর বলে, ইন্ডিয়ান স্পাই হতে পারে। একে মাইর লাগাও, এসব যা তা বলল। যাই হোক, মনে হয় মুরুব্বিদের দোয়াতেই ছাড়া পেলাম। এর মধ্যে লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। তখন তিনি ভারতে। আমার এক আত্মীয়ের বাসায় তিনি গিয়েছিলেন। তখন আত্মীয়দের মাধ্যমে আমার সঙ্গে তিনি চিঠিপত্র মারফত যোগাযোগ রাখতেন। লতিফ সিদ্দিকী ও কাদের সিদ্দিকী সাহেব তাদের বেশ কিছু অনুসারী নিয়ে ভারত গিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতির পালাবদলের কারণে তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হয়নি। 

সাপ্তাহিক : এত বড় দল আওয়ামী লীগ মাত্রই কয়েক বছর আগে তারা দেশের স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৫ আগস্টের পর সেই দল কোনো প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হলো কেন? 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : আমাদের মতো ছাত্রদের পক্ষে তো আর এটা করা সম্ভব ছিল না। যারা দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিল, তাদের কাছ থেকেই এই ডাকটা আসা উচিত ছিল। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, ক্ষমতায়নের ফলে নৈতিকতায় ভাটা পড়েছিল। এ কারণেই কাদের সিদ্দিকীরা আবার যুদ্ধের ডাক দিয়েও কিছু করতে পারেননি। এক্ষেত্রে আমি কার্ল মার্কসকে স্মরণ করব, তিনি বলেছিলেন, এক বিপ্লবীকে দিয়ে দুইবার বিপ্লব হয় না। এটা হয় না কেন? আমার মতে, ক্ষমতায় গেলে তাদের মধ্যে কোন্দল তৈরি হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। এজন্যই তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তাছাড়া ছাত্রলীগ দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার সময় কিন্তু সংগঠনের মেধাবী অংশটা জাসদে চলে গেল। যেমন গোফরান ভাই ছিল আমার ক্যাম্পাসের এক বছরের সিনিয়র। তিনি দুর্দান্ত মেধাবী ছিলেন। তারপর মাহফুজ ভাই, ইনু ভাই, আরেফ ভাই, মাহবুব ভাই, তারা সবাই কিন্তু জাসদে চলে গেল। ফলে আমাদের সঙ্গে যারা রয়ে গেল, তারা কিন্তু সংগঠনকে সঠিক ধারায় দাঁড় করিয়ে রাখতে ব্যর্থ হলেন। আমি কিন্তু এটা বলতে পারি, ২০১৩ সালের ১৫ আগস্টের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যে লোক হয়েছিল, ২০১৫ সালের ১৫ আগস্টে কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ হয়েছে। তখন দল ক্ষমতায় আর থাকছে না, এই রব ওঠার পর সুবিধাভোগী চক্রটা দূরে সরে গিয়েছিল। এখন আবার তাদের দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, রাজনৈতিক দলে এখন নীতির চর্চা নেই। যদি আমি বলি যে, দলের ভেতর গণতন্ত্র নেই, তাহলে আদর্শটা তো আর আমার ভেতর থেকে চলে যেতে পারে না! যেমন রাজশাহীর কবির ছিল বিএনপির লোক। রাতারাতি সে হয়ে গেল আওয়ামী লীগ। মোটকথা, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা জাতিরাষ্ট্র গঠনের পর উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। এ কারণেই তাদের অবনতি ঘটে। তবে তার চেয়েও বড় কারণটা ছিল বহুমুখী চক্রান্ত।

সাপ্তাহিক : কি ধরনের চক্রান্তের কথা বলছেন? জনতা কেন আওয়ামী লীগের পক্ষ নিল না?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : চক্রান্তের একটা উদাহরণ দেই, লবন যাচ্ছে জাহাজে করে, তা সমুদ্রে ফেলে দেয়া হলো। নানা কায়দা করে দুর্ভিক্ষের খবর রটানো হলো। আমেরিকা তার গমের জাহাজ ফেরত নিয়ে গেল। অর্থনীতিতে নানাভাবে আঘাত হানা হলো। যে ব্যবসায়ী চিনি আমদানি করেছেন, তার যা দাম প্রাপ্য, তার চেয়ে বেশি দিয়ে চিনি সাগরে ফেলে দিতে বলা হলো। পাটের গুদামে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো। আমাদের ঐক্য থাকলে কিন্তু এগুলো মোকাবেলা করা যেত। 

আরেকটা নমুনা তুলে ধরতে চাই। মাহমুদুর রহমান মান্না তখন সম্ভবত চাকসুর ভিপি। তিনি এক বক্তৃতায় বললেন, দেশ স্বাধীনের ফল হলো, পুরুষ হলেও তিনটা মুজিব সমান একটা ইন্দিরা। বুঝছেন আপনারা? মানুষ বলল না। তিনি বোঝালেন, একটা একশো টাকার নোটে একটা মুজিবের ছবি থাকে। এরকম তিনটা ১০০ টাকার নোটের সমান মুদ্রামান হলো ইন্দিরা সরকারের মহাত্মা গান্ধীর ছবিঅলা একটা ১০০ টাকার নোট। তাহলে কি তিন মুজিব সমান এক ইন্দিরা হলো না? ঠিক এভাবে মানুষের অনুভূতিকে কাজে লাগানো হয়েছিল। রফিক আজাদ লিখেছিল, ভাত দে নইলে মানচিত্র খাব। দেখেন তারা কিন্তু এটা বিবেচনা করেনি যে, একটা দেশ স্বাধীনতার পর এরকম একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে কিছু সময় যাওয়াটাই স্বাভাবিক। অনেকে বলে রক্ষিবাহিনীর জন্য এটা ঘটেছিল। আমি তা বলব না। আমি মনে করি, সেনাবাহিনীটা পুনর্গঠন করা দরকার ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সবাইকে নিজের সন্তানের মতো করে দেখতেন। এজন্য তিনি আগের লোকদের রেখে দিয়েছিলেন। যদিও অন্য দেশের বিপ্লবগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, তারা কিন্তু পুরনো সেনাবাহিনীকে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে ফেলেছিল। বঙ্গবন্ধু তার অতিমানবিক মহত্বের কারণে এদের উৎখাত করেননি। সবাই জানেন, তিনি বাঙালি মাত্রই মনে করতেন তার সন্তানের মতো। ফলে সবার বিরোধিতা সত্ত্বেও সাধারণ রাজাকারদের তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর তার আশপাশের কারও কারও সম্পর্কে তাকে তথ্য দেয়া হয়েছিল, তিনি গায়ে মাখেননি। অসম্ভব উদার মানুষ ছিলেন। পিতাকে যেমন সন্তানের বিষয়ে কিছু বললে পিতা তা আমলে নেন না, বাঙালির ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ছিল তেমনই। আর এ কারণেই তারা সুযোগটা নিতে পেরেছিল। 

তবে মুজিব বাহিনী ভাগ না হয়ে যদি তারা বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকত, তাহলে চিত্রটা আজ ভিন্ন হতো। বঙ্গবন্ধু যদি থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশে গরিব মানুষের স্বার্থটা আজ রক্ষা হতো। হয়তো সোভিয়েত মডেল হতো না, তবে এক ধরনের সমাজতন্ত্র এখানে হতোই, কারণ তিনি মনেপ্রাণে শোষিত মানুষের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু মুজিব বাহিনী ভাগ হয়ে সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়। যে মুজিব বাহিনীকে তৈরি করা হয়েছিল দেশের হাল ধরার জন্য, বিশৃঙ্খলা মোকাবেলা করার জন্য, সেই আমরাই কিন্তু দেশে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনি। আর এর সুযোগ নেয় স্বাধীনতাবিরোধীরা। তারা জাসদের পক্ষে দাঁড়াল। যারা পাকিস্তান বিভাজন মেনে নেয়নি, তারা বিকল্প শক্তির ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়ে নিল। এ কারণে জাসদের সমাবেশে তখন বিশাল জনসমাগম হতো। অনেক ক্ষেত্রে তা আওয়ামী লীগের জনসভার আকারকে ছাড়িয়ে যেতে দেখা গেল। এখানে আমাদের দিক থেকে ব্যর্থতাটা ছিল, রাজনৈতিকভাবে আমরা তখন করণীয় নির্ধারণ করতে পারিনি। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মনে করতেন, আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, জনগণ সব সময়ই আমাদের পাশে থাকবে। অর্থাৎ ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন অক্ষের কাছে আমরা হেরে যাই। তাদের পরিকল্পনার বিপরীতে আমাদের ভালো কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তারপর ওই যে বলেছি, লাভের গুড় খেতে আসা লোকের অভাব ছিল না। ফলে আমরা পর্যুদস্ত হলাম। কিন্তু সত্যিকারার্থে যদি নিজেদের অন্যায়ের জন্য, দুঃশাসনের জন্য আওয়ামী লীগ পরাস্ত হতো, তাহলে কিন্তু তারা আর কখনই ফিরে আসতে পারত না। তাদের রাজনীতির কবর ঘটে যেত। কিন্তু ঘটনা তা ছিল না। আমরা ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটনের চক্রান্তের কাছে পরাস্ত হই। আবার ওই যে আমাদের ভেতর ঢুকে পড়া সুবিধাবাদীদের কথা বললাম। আমরা যদি নৈতিকভাবে অটল থাকতে পারতাম, তাহলে কিন্তু চক্রান্তগুলো মোকাবেলা করা যেত। একাত্তরে যদি সব এমপিরা চলে যেতে পারেন, তাহলে ৭৫ সালে তারা কেন গেলেন না? যাদের গ্রেপ্তার করেনি, কেন তারা সবাই পালিয়ে গিয়ে সরকার গঠন করে যুদ্ধের ডাক দিল না? তারা গেলে মোশতাক কাকে নিয়ে সরকার গঠন করত? কাদের সিদ্দিকী তো আবার যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা যাননি। নেতারাই প্রস্তুত হতে পারল না। জনতা কিভাবে প্রস্তুত হবে!

সাপ্তাহিক : ডাক্তারি পাসের পর কি প্র্যাকটিসে ঢুকলেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : সাধারণত ডাক্তারি পাসের পর ছাত্ররা প্র্যাকটিস শুরু করে দেয়। কিন্তু আমি আগে থেকেই ক্যারিয়ার সচেতন ছিলাম। শিক্ষক ও বড় ভাইদের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছিল। ফলে আমার লক্ষ্যটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। আমি কিন্তু এখানে ওখানে বসা থেকে দূরে থাকলাম। ইন্টার্নিশিপের সময়েই আমি ছয় মাস ইএনটিতে ছিলাম। কারণ নূরুল আমিন স্যারের প্রেরণায় আমি ইএনটিকেই গন্তব্য ঠিক করেছিলাম। ইএনটির জটিল সমস্যাগুলোকে প্র্যাকটিকালি বোঝার জন্য আমি তখন থেকে কঠিন অধ্যাবসায় শুরু করি। ভোর ছয়টার মধ্যেই হাসপাতালের ওয়ার্ডে চলে যেতাম। গিয়ে স্যারের অধীনে থাকা রোগীদের অবস্থা বুঝে নিতাম। স্যার ওয়ার্ডে অথবা তার রুমে চলে আসতেন সাতটার মধ্যেই। এসেই আমার কাছ থেকে জেনে নিতেন কোন রোগীর কি অবস্থা, কারও অবস্থার অবনতি হয়েছে কিনা! অপারেশন থাকলে স্যারের সঙ্গে থাকতাম। রোগীকে কিভাবে বেডে পজিশনিং করতে হয়। কোনো কোনো সমস্যার জন্য আবার বিশেষ পজিশনিংয়ের দরকার পড়ে। এগুলো করতাম। অপারেশন দেখতাম। 

হাসপাতালে ডাক্তারদের সময়টা নির্ধারিত ছিল দুইটা পর্যন্ত। রোগীর ডেসপাস, পরের দিন অপারেশন থাকলে যা দরকার তার তালিকা বানিয়ে অর্ডার করা, এগুলো করতে করতে তিনটা বেজে যেত। তারপর বিকেলে চলে যেতাম স্যারের চেম্বারে। কিভাবে রোগী দেখেন, কোন সমস্যাকে প্রাধান্য দেন, দেখতে সাধারণ হলেও কোন সমস্যা আসলে খুব জটিল, এরকম বিষয়গুলোর দিকে নজর রাখতাম। কোন সমস্যার কি ওষুধ দেন, কখন নির্ধারিত ওষুধ দেয়া যায় না, কিভাবে কান দেখেন, গলার কাঁটাটা কিভাবে বের করেন, নাকে একটা ফরেন বডি মানে বাইরের জিনিস ঢুকে আছে, সেটাকে জটিল অপারেশনে না গিয়ে কিভাবে সহজে বের করা যায় এগুলো স্যারের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আর স্যারকে সাহায্য করতাম। নাক-কান-গলা মানবদেহের খুবই স্পর্শকাতর অংশ। এতে কাজ করাটা এক ধরনের শৈল্পিক বিষয়। একটু এদিক ওদিক হলেই বিরাট বিপদ। স্যারের পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি এগুলো শিখেছি, আয়ত্ত করেছি।

চাকরিতে ঢুকলাম ১৯৭৭ সালে, তাও বঙ্গবন্ধুর দান। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়নে ডিগ্রি নিতে গিয়েছিলাম ৮০ সালে। সেখান থেকে ফিরে, অর্থাৎ ৮৪ সালের আগে আমি কোনো প্র্যাকটিস করিনি। আমার কোনো এক্সট্রা ইনকাম বা বাড়তি আয় ছিল না। চাকরিতে ঢোকাটাকে বঙ্গবন্ধুর দান বললাম এজন্য যে, তার আমলে গৃহীত সিদ্ধান্তের বলে প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমরা ডাক্তারির চাকরি পাই। তখন স্কেল ছিল ৪৭৫ টাকা, সর্বসাকুল্যে পেতাম ৬২০ টাকা। তা দিয়েই চলতে হতো। সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা বলি। আগেই বলেছিলাম, আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক ছিলাম, ১৫ আগস্ট আমাদের মধ্যে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত একটা ট্রমার মতো ছিল। শেখ হাসিনা ফেরার পরই আমরা যেন একটু পরিত্রাণ পাই। ওই ৭৭ সালেরই ঘটনা। আগস্ট মাসের দুই তারিখে বেতন পেয়েই একটা রবিন’স প্যাথলজি নামে একটা বই কিনলাম ৩০০ টাকা দিয়ে। বেতনের অর্ধেকটা চলে গেল। ১২ তারিখের দিকে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কয়েকটা ছেলে এসে বলল, দাদা কিছু টাকা দেন। আমরা রঙ, তুলি, কাগজ কিনব। ১৪ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই, খুনিদের রক্ষা নাই, এরকম স্লোগান লিখে পুরো ক্যাম্পাস ভরে ফেলব। আমি অন্য দিকগুলো বিচার করার কথা বললাম। তারুণ্যের যা হয়, তারা যেভাবেই হোক করবে। কিন্তু এত কথা বলছিলাম, কারণ আমার কাছে আসলে টাকা নাই। টাকা নাই শুনে ওরাও বিমর্ষ হলো। এ সময় একটা ছেলে ঝকঝকে প্যাথলজির বইটা দেখে সেটা উলটে পালটে বলল, দাদা বইয়ে তো নাম লেখা নেই। এটা ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে আসি? যেই বলা সেই কাজ! বই ফেরত নিল ২৮০ টাকায়। ওরা সবকিছু কিনে আবার আমার কেবিনে হাজির। এবার আরেক আবদার। দাদা, আপনার রুমটা আমাদের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত ছেড়ে দিতে হবে। রাজি হয়ে গেলাম। কারণ এগুলো লিখতে দেখলে জেল তো নিশ্চিত, এমনকি মার খেয়ে মরেও যেতে হতে পারে। ১৪ তারিখ রাতে ঠিকই ক্যাম্পাস ভরে গেল। ১৫ আগস্ট সকালে উঠে সবাই দেখল, পুরো ক্যাম্পাস বঙ্গবন্ধুর বিচারের দাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাভাবিকভাবেই ফলাফল হলো তীব্র দমন। সমস্ত রুম তল্লাশি হলো। গোয়েন্দা বাহিনীর লোকজন ক্যাম্পাসে নানান উপায়ে ছড়িয়ে পড়ল। দারোয়ান, নাইট গার্ডদের গ্রেপ্তার করল। প্রিন্সিপাল স্যারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিন্তু আমাদের কারও টিকিও খুঁজে পেল না। এ থেকে দুটো জিনিস বুঝতে পারবেন। এক হচ্ছে, সততা, ত্যাগ ও নিষ্ঠা থাকলে যেকোনো কঠিন কাজই সম্পাদন করা যায়। আর দুই হচ্ছে, অনেক মডারেট বিএনপি কর্মী আজকাল বলে থাকেন, জিয়া নাকি বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করতেন। আসলে সত্যটা হচ্ছে, জিয়ার আমলে বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নিলেও তার পরিণাম ছিল ভয়াবহ। এ বছরেরই আরেকটা ঘটনার বর্ণনা তো আমি আগেই দিয়েছি। সেই যে, ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ইন্ডিয়ান স্পাই অভিযোগে রাত ১২টা পর্যন্ত আটক থাকা। মোটকথা, জিয়ার শাসনামলটা ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য ছিল অন্ধকার যুগ! এরশাদের সময়ও এটা অব্যাহত ছিল।

সাপ্তাহিক : এই পর্বে এসে মাঝে মাঝেই আপনার হবু স্ত্রীর কথা আসছে! সম্পর্ক কেমন ছিল? বিয়ে কবে করলেন? পরিবার সম্পর্কে বলুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ১৮ জুন, ১৯৭৯-তে আমাদেরই ক্যাম্পাসের ছাত্রী জয়শ্রী রায় জয়া ও আমার বিয়ে হয়। জয়া যখন ক্যাম্পাসে ভর্তি হয় তখন আমি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। সে খুবই মেধাবী ছিল। কুমিল্লা বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিকে সে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে মেধাতালিকায় ২০ নম্বর স্থান দখল করেছিল। ৭৪ সালের দিকে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়। পরিচয় সূত্রে আলাপ, পড়ার বিষয়ে শেয়ারিং, এর মধ্য দিয়েই সম্পর্ক। এখনকার ছেলেদের মতো সেই সম্পর্ক ছিল না। তখন ক্যাম্পাসে দেখা হলেও কথা বলতাম হয়তো দূরে গিয়ে। আড্ডা বলতে হয়তো বইপত্র নিয়ে বসা, অথবা একত্রে খাওয়া দাওয়া করা। আবার আমি যেহেতু রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম, তাই স্বাভাবিকভাবেই যা খুশি করাটা মানাতো না। রাজনীতি সচেতন হলে কিন্তু সামাজিক বিষয়ে দায়িত্বশীলতা গড়ে ওঠে। তাছাড়া ওদের বাড়ি ছিল মিরেরসরাইতে। চট্টগ্রাম শহরে তাদের পরিচিত লোকজনের অভাব ছিল না। তাছাড়া পিতা-মাতার প্রতি তার ভক্তি ও অনুরাগ ছিল অসীম। বিয়ের পরে আমি যখন সোভিয়েত দেশে, তখন তার জন্য একটা স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু বাবা-মা’কে ফেলে সে যেতে রাজি হয়নি। এরকম নানা কারণ ও আমার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ফলে বন্ধুত্বপূর্ণ আচার-আচরণের মধ্যে দিয়েই প্রেম জীবন পার হয়ে গেছে। পরে সে গাইনি বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছে। অধ্যাপক পদে কর্মরত অবস্থায় মেয়াদ শেষের তিন বছর আগেই আমার অনুরোধে অবসর গ্রহণ করে।
 
১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে আমাদের প্রথম সন্তান অনিন্দিতা দত্তের জন্ম হয়। সে হলিক্রসে স্কুল-কলেজ পর্ব পার করেছে। আমার মতে, আমার চেয়েও মেধাবী। দিল্লীর লেডি হার্ডিঞ্জ কলেজ থেকে পাশ করেছে। রেডিওলজি তার বিভাগ। বিয়েও দিয়েছি। তার জামাতাও ডাক্তার, পার্থ প্রতিম দাশ। সেও অত্যন্ত মেধাবী। তাদের দুই সন্তান, দেবারতি দাশ ও আয়ূষমান দাশ। আমার একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। সে এখন ‘এ’ লেভেলে পড়ে। তার নাম অরিন্দম দত্ত। ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছা ছেলের নেই। দেখা যাক কী হয়। তার একটা গতি হলেই আমি নির্ভার বোধ করব। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনার বিশেষ কিছু নেই। আমি মনে করি, মানুষের সামাজিক অবদানের মধ্যেই তার ব্যক্তিজীবনের ছায়াটা দেখা যায়। আমার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য।

সাপ্তাহিক : সোভিয়েত ইউনিয়ন যাত্রার স্মৃতি বলুন। 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ২০, জানুয়ারি, ১৯৮০ সালে আমি স্কলারশিপ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে যাত্রা করি। সেখানে গেলে প্রথমে একটা মাস্টার্স করতে হয়, তারপর পিএইচডি। পাঁচ বছর লাগে এতে। ওই বছরই সেখানে অলিম্পিক হওয়ার কথা ছিল। আমি তো খেলাপাগল মানুষ। পড়ালেখা করতে যাচ্ছি বটে! কিন্তু অলিম্পিক দেখব সেটাও কম উচ্ছ্বাসের বিষয় ছিল না। পরে তো ক্যাপিটালিস্ট দেশগুলো অলিম্পিক বর্জন করে। কিন্তু সোশ্যালিস্ট দেশগুলো অংশ নিয়েছিল। অলিম্পিকের অনেক ইভেন্টই দেখতে গিয়েছি, টিভিতে দেখেছি। ক্যাপিটালিস্টরা না আসলেও রঙ-চঙ ও উৎসবের আমেজ একটুও কম ছিল না। প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ছিল তুমুল। আমার কাছে মনে হয়েছে, তারা সফলই ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়ে শুরুতেই আমি রুশীদের আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচিত হই। প্রথমে মস্কোতে পৌঁছলাম। সেখান থেকে ট্রেনে করে ওডেসা। ট্রেনের কামরায় একজন বয়স্ক মহিলা ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি বিদেশি এবং নতুন। প্রথমে আমাকে ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন রুশী বুঝি কিনা। কিছু শব্দ আমি বুঝতাম, সেগুলো বলার পর তিনি বললেন, তুমি তো সবই পার। আমি বললাম যে, তা নয়। তিনি আমাকে তখন সবচেয়ে মৌলিক বিষয়টার সঙ্গে পরিচিত করালেন। রুবল আর কোপেক বের করে দেখালেন। সেগুলোর বর্ণনা দিলেন। কত কোপেকে রুবল হয়, এক রুবলে কত পথ যাওয়া যায়, কী পাওয়া যায়, এসব ধারণা দিলেন। খাওয়ার সময় তার খাবার থেকে খেতে দিলেন। একেবারেই নতুন পদের খাবার আমার জন্য, কিন্তু খেয়ে খারাপ লাগেনি। এরপর ট্রেন থেকে যখন তিনি নামছেন, তখন পাশের সিটে বসা ছেলেটা মহিলাকে বলল তোমার ছেলেকে রেখেই চলে যাচ্ছো? মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর হু হু করে কেঁদে উঠলেন। পরে বুঝেছিলাম, হয়তো যুদ্ধে তিনি সন্তানদের হারিয়ে থাকতে পারেন। রাশিয়া থাকার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাস্তব অবস্থাটা জানতে পেরেছিলাম। ক্যাপিটালিস্টরা এই যুদ্ধে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টা এড়িয়ে যায়। কিন্তু ওই যুদ্ধে শুধু রাশিয়ারই প্রায় দুই কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। আর তাদের বেশিরভাগই পুরুষ। যুদ্ধের পর রুশী নারীরা বিয়ে করার মতো পুরুষ খুঁজে পেতেন না। অনেক নারী দেখেছি, যারা অবিবাহিত ছিলেন। যাই হোক, ভদ্রমহিলার কান্না দেখে আমি এগিয়ে গিয়ে তার পায় ধরে সালাম করলাম। তিনি অবাক হয়ে সরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী করছো? আমি বুঝিয়ে বললাম, এটা আমাদের দেশে মুরব্বিদের সম্মান করার রীতি। তারপর আমার মঙ্গল কামনা করে তিনি চলে যান।

ট্রেন থেকে ওডেসায় নামার পর একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। রঞ্জু আমাকে নিতে আসে। সে ছিল ওডেসার বাঙালি ছাত্রসমাজের নেতা। প্রথমে সে আমাকে তার ডরমিটরিতে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের রুমে ঢুকেই ভয়টা আমাকে আঁকড়ে ধরে। রুমটা ছিল বেশ ধোঁয়াটে। আলো-আঁধারি, তার মধ্যে সিগারেট ও অন্য নেশার ধোঁয়া। মদের বোতল ছিল অনেকগুলো। ছেলে ও মেয়েরা একসঙ্গে ছিল। কেউ কেউ বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল। আমি ভাবলাম, রাশিয়া সম্পর্কে যেসব নেতিবাচক কথা শুনেছি, সেগুলো কি আসলেই সত্যি? কিন্তু এরকম কথা তো শুনিনি। ছেলেমেয়েরা কি এখানে এসে পড়ালেখা করে না? পরে বুঝেছিলাম, ওখানে স্বাধীনতার সুযোগ আছে, কিন্তু পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বশীলতা ছিল চরম। যারা ভালো করতে চায়, তাদের জন্য সেখানে অনেক কিছু আছে। যাই হোক, রঞ্জু আমাকে তার সঙ্গে থাকতে বলল। কিন্তু নিজের জন্য নির্ধারিত স্থানেই আমি যেতে চাইলাম। সেখানে গিয়ে আবার সব শঙ্কা দূর হয়ে গেল। বেশ গোছানো এবং সুন্দর পড়ালেখার পরিবেশ। 

ওডেসা শহরটা কৃষ্ণ সাগরের তীরে অবস্থিত। রাশিয়ার শহরগুলো এমনিতেই ভীষণ সুন্দর। পুরনো আভিজাত্য আর কমিউনিস্ট আমলের গণমুখী নানা পদক্ষেপ মিলিয়ে দেশটার প্রায় সব অঞ্চলই শুধু দেখতে সুন্দর নয়, আধুনিকও বটে। তার ওপরে কৃষ্ণ সাগরের তীরে হওয়ায় ওডেসা ছিল দেখার মতো। সেখানকার মানুষজনের আন্তরিকতা ভোলার মতো নয়। রুশীরা, ইউক্রেনীয়রা, কসাকরা খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারে। আমাদের গ্রামের মানুষদের মতো। পার্থক্য হচ্ছে, আমাদের মানুষগুলো শিক্ষিত না, ফলে আধুনিক আদব-কায়দার জ্ঞান তাদের নেই। যেটা আবার রুশীদের মধ্যে ছিল।  

পরদিন রঞ্জুকে অনুরোধ জানাই, ডিনের কাছে নিয়ে যেতে। ডিন অফিসের কাজ শেষে যাই রুশী ভাষা শিক্ষালয়ে। আমার স্কলারশিপের ভেতর এই কোর্সটাও ছিল। কারণ রাশিয়ায় তখন ইংরেজিতে কিছু পড়ানো হতো না। তাই রুশী ভাষা ঠিকমতো না শিখতে পারলে পড়ালেখা করাই সম্ভব না। রুশী ভাষা শিক্ষার ইনস্টিটিউটটা ছিল খুবই আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত। আমি যে সাবজেক্ট পড়তে এসেছি, অর্থাৎ নাক-কান-গলা সংশ্লিষ্ট একটা সিলেবাস আমাকে অনুসরণ করতে হতো। আর রাশিয়ায় চলাফেরার জন্য আরেকটা সিলেবাস।

আমার পিএইচডি গাইড ছিলেন পুরো রাশিয়ার মধ্যে ইএনটির জন্য বিখ্যাত। ইউক্রেনের আঞ্চলিক হাসপাতালের ইএনটির প্রধান ছিলেন তিনি। রাশিয়ায় কিন্তু ইনস্টিটিউট বা পেশা দেখে কাউকে মূল্যায়ন করা যেত না। হয়তো আপনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলে গিয়ে দেখলেন একজন শিক্ষক। ভাবলেন এরকম একজনের আর কীইবা গুরুত্ব থাকতে পারে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, তিনি হয়তো টানা তিন বছর সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান লেনিন পদক পেয়েছেন। যেহেতু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা, তাই বিশেষজ্ঞরা কেবল বড় শহরেই থাকবেন, এই পুঁজিবাদী পদ্ধতিটা সেখানে ছিল অকার্যকর। আবার হয়তো কোনো অফিসের সামনে দেখলেন একজন বয়স্ক নাইট গার্ড। যার সারা দিনের দায়িত্ব হচ্ছে, সাকুল্যে মাত্র চার ঘণ্টা ডিউটি করা। গিয়ে জিজ্ঞেস করলে জানা যেত, হয়তো তিনি বড় একজন প্রকৌশলী বা ব্যবস্থাপক ছিলেন। শেষ বয়সে এসে চাইলে শ্রম না দিয়েও থাকা যেত, কিন্তু শ্রম দেয়াটা ছিল সেখানে শ্রদ্ধার ও সম্মানের। 

আমার প্রফেসরের নাম ছিল ভ্লাদিমির দিমিত্রিয়েভিচ ড্রাগমিরেস্কি। তিনি ছিলেন ডিএসসি অর্থাৎ ডক্টর অব সাইন্স। তিনি এত নামকরা বিজ্ঞানী ছিলেন যে, ২৫ জনেরও বেশি পিএইচডিধারী কর্মকর্তা তার অধীনে কাজ করতেন। আর পিএইচডি করছিলাম আমরা পাঁচজন। একেক বছর তিনি নতুন একজন করে ছাত্র নিতেন। আমি সর্বকনিষ্ঠ ও প্রথম বর্ষের হিসেবে নতুন যোগ হলাম। প্রথমে তো তিনি আমাকে পাত্তাই দিলেন না, সেটা অবশ্য তার ব্যস্ততার কারণেই। বেশ কয়েকদিন লাগল তার দেখা পেতে। একদিন রুশ ভাষার ক্লাস বাদ দিয়ে ভোর সাড়ে সাতটার দিকে গিয়ে আমি তাকে ধরতে পারলাম। জিজ্ঞেস করলেন, কি চাই? আমি পরিচয় দিলাম। তিনি সোজা বলে দিলেন, ছয় মাস পরে এসো। এখন যাও ভাষা শেখো। আমিও নাছোড়বান্দার মতো বললাম, তুমি তো অনেক বড় বিজ্ঞানী, তোমাকে সব সময় পাওয়া যাবে না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাকে এমন একজন শিক্ষক দাও, যার কাছ থেকে আমি সার্বক্ষণিক সহযোগিতা পেতে পারি। তিনি বুঝতে পারলেন এবং আমার সার্বক্ষণিক পরামর্শক হিসেবে মানুতা আলেক্সান্দা ইলিনিচনাকে নিযুক্ত করলেন।

মানুতা প্রফেসরের অধীনে দসেন্ত অর্থাৎ রিডারের পদে কাজ করতেন। একটু বয়স্ক একজন ভদ্রমহিলা। আমাকে তিনি পছন্দ করে ফেললেন। একেবারে মায়ের মতো স্নেহ করতেন। তার সহযোগিতা ও প্রফেসরের নিবিড় তত্ত্বাবধানের কারণে আমি দ্রুত পিএইচডি শেষ করতে পেরেছিলাম। পাঁচ বছরের কোর্স আমি সাড়ে তিন বছরে শেষ করতে সক্ষম হই। শ্রমের প্রতি আমার আগ্রহই আমাকে প্রফেসরের নজরে পড়তে সাহায্য করে। তাকে আমি বলেছিলাম, শনি ও রবিবার তো আমাদের রুশ ভাষার ক্লাশ বন্ধ থাকে। এ সময় হোস্টেলে থাকলে তো আমি আড্ডা দেব। কিন্তু এ সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ তো খোলা থাকে। আমি সেখানে ওই দুই দিন কাজ করতে চাই। শুক্রবার কাজের শেষে আর হোস্টেলে যাব না। একবারে সোমবারের কাজ সেরে হোস্টেলে যাব। তিনি খুশি মনেই রাজি হলেন এবং আমার ঘুমানোর জন্য ছোট্ট একটা জায়গাও করে দিলেন। হাসপাতালে ডিউটি করত রাশিয়ান পিএইচডিধারীরাই, যারা কিনা বিশেষজ্ঞ। আমি তাদের সঙ্গে থাকতাম। প্রয়োজনে সাহায্য করতাম। তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। শেখার তো কোনো শেষ নেই। আমি হয়তো একজনের কানের লতি ধরি কান দেখার জন্য। ওখানে হয়তো একজন কানের পাশটা ধরে। কোনটা ধরলে কানের ভেতরটা ভালো দেখা যাবে, এটাও কিন্তু শেখার জিনিস।

প্রফেসরের সঙ্গে আমার সখ্যতার ঘটনাটা বলি। একদিন আমি হাসপাতালে ডিউটি করছি, তখন আমি পিএইচডির পূর্বশর্ত হিসেবে এমএস করছিলাম। সিগোলোভিচ নামে একজন ডাক্তার ছিলেন, আমার প্রফেসরের অধীন কাজ করতেন তিনিও। সম্ভবত তিনি ইহুদি ছিলেন, প্রচুর সিগারেট খেতেন। তিনি আমাকে বললেন, এই তুমি কি ট্র্যাকিউস্টোমি দেখেছো? গলার ভেতর দিয়ে কেটে আলগা শ্বাসনালী করে দেয়া। আমি বললাম, জ্বি স্যার, দেখেছি। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, কোনো ডাক্তারকে অ্যাসিস্ট করেছো? হ্যাঁ বললাম। জিজ্ঞেস করলেন, নিজে করেছো? তাও হ্যাঁ বললাম। বললেন, চলো আমার সঙ্গে। আমি তো এই কাজ দেশে বসে দু’ তিন মিনিটের মধ্যে করে ফেলতাম। এটা পারতাম, কারণ ওই যে হাসপাতালে আমি দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। যারা পিএইচডিতে আসে, তারা সাধারণত হাসপাতালে এসব কাজ না করেই আসে। কিন্তু আমার তো অভিজ্ঞতা আছে। তিনি আমাকে বললেন, চলো। আইসিইউতে পাঁচজন রোগী আছে, তারা মাশরুম পয়জনিং-এর শিকার। লাংসে পানি জমে গেছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এখন ভেন্টিলেশনে রাখা আছে। এদের ট্র্যাকিউস্টোমি করতে হবে। গেলাম তার সঙ্গে। তিনি করিডোরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, আমি সিগারেটটা শেষ করে আসছি। তুমি গিয়ে একটা রোগীকে পজিশনিং কর। আমি সিস্টারকে আর বলিনি যে, আমাকে পজিশনিং করতে বলেছে। তাকে বললাম, ক্যান ইউ অ্যাসিস্ট মি? সে বলল, শিউর! আমি তো স্যারের এক সিগারেট শেষ হওয়ার আগে তিনজনের ট্র্যাকিউস্টোমি করে ফেললাম। তিনি এসে দেখলেন, তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর খুবই খুশির ভঙ্গিতে বললেন, নু লাদনা, তুমিই কর। তিনি চলে গেলেন। পরে আবার ফোনে খবর নিলেন রোগীরা কেমন আছে। সিস্টাররা জানালেন, রোগী ভালো আছে। তিনি আবার আমার প্রফেসরকে এটা জানালেন। তার বক্তব্য ছিল, এই ছেলে তো সব পারে। এ কেন এখানে হাসপাতালে পড়ে থাকে! 

সোমবার যেহেতু তিনদিন কাজ করার পর আমি হোস্টেলে ফিরতাম, তাই মঙ্গলবার আমি হাসপাতালে একটু দেরি করে যেতাম। সেদিন যখন আমি হাসপাতালে গেলাম, প্রফেসর দিমিত্রিয়েভিচ আমাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি দেশে বসে কি কি অপারেশন করেছো? আমি যা যা পারি বললাম। তিনি বললেন, তাহলে এখানে তুমি এসেছো কেন? বললাম, আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমি পিএইচডি ডিগ্রি করব। আর কানের মাইক্রো সার্জারিটা আমাদের দেশে এখনও ডেভেলপড হয়নি, সেটাও শিখতে এসেছি। তিনি বললেন, তাহলে তুমি সরাসরি পিএইচডিতে চলে যাও, এমএস করার তো দরকার নেই। জবাবে বললাম, আমি তো চাইলেই যেতে পারব না। আমি যে এমএস কোর্স শেষ করেছি সেজন্য তোমাকে সার্টিফিকেট দিতে হবে। এটা তো তোমাকেই করে দিতে হবে। তিনি আর কিছু বললেন না, আমাকে বিদায় দিলেন।

এরপর আমি ক্রিসমাস-নিউ ইয়ার মিলিয়ে দিন দশেকের ছুটিতে দেশে এলাম। তখন এক বাঙালি ছাত্র আমাকে খবর পাঠাল যে, তোমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে এমএস কোর্স কমপ্লিট লিখে তোমার বস চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছে। তুমি আসার সময় মস্কোতে বিদেশি ছাত্রদের ইনস্টিটিউটে গিয়ে সালাভিয়েভের সঙ্গে দেখা করবে। যাই হোক ১৯৮১ সালে আমার এমএস ও এমসিপিএস শেষ হলো। এভাবেই আমি প্রফেসরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলাম। আর আমার পাঁচ বছরের কোর্স সাড়ে তিন বছরে শেষ হওয়ার সূত্রটাও এটাই। এখানে আরেকটা ঘটনা বলি। মস্কো থেকে ওই যে ফোন আসার কথা বললাম, এটা কিন্তু কঠিন ছিল খুব। আমি তো বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে রাশিয়া যাই। সেখানে গিয়ে একবার ইচ্ছা হলো প্রিয়তমা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলি। স্থানীয় টেলিফোন সেন্টারে গেলাম। অপারেটর ভদ্রমহিলা একটি কলবুক করলেন। তখন টেলিফোন কলের রাস্তাটা ছিল ওডেসা-মস্কো, মস্কো-লন্ডন, লন্ডন-ঢাকা, ঢাকা-চট্টগ্রাম। মস্কো, লন্ডন ও ঢাকার অপারেটর মিলে ১০ ঘণ্টা চেষ্টা করেও চট্টগ্রামে নেটওয়ার্ক পেলেন না। শেষে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাই! যাওয়ার সময় অপারেটর ভদ্রমহিলা বললেন, সিনক্, মস্কো গেলে কথা বলতে পারবে। রুশী নারীরা স্নেহের পুত্রদের সিনক্ বলে ডাকেন। তার পরামর্শমতো ২২ ঘণ্টার ট্রেন সফর করে মস্কো গেলাম। তবুও চট্টগ্রামের লাইন পেলাম না। এরপর আবার ২২ ঘণ্টা ট্রেনে চড়ে ওডেসা ফিরলাম। ফেরার পথে শপথ করলাম, দেশে আর ফোন করব না। 

সাপ্তাহিক : পিএইচডি পর্বের অভিজ্ঞতাগুলো যদি কিছু বলতেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : আমার প্রফেসর সম্পর্কে বলি। তিনি কেবল বিজ্ঞানীই ছিলেন না, একজন নীতিনিষ্ঠ মানুষও ছিলেন। দেশ থেকে ফিরে যাওয়ার পর তো আমি তার আশেপাশেই থাকতাম। তিনি একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পরিবারে কে কি করে? বললাম, বাবা মারা গেছেন, দাদা, কাকারা কে কি করে তার বর্ণনা দিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা কি করে? আমি জবাব দিলাম, তিনি কিছু করেন না। প্রফেসর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিছুই না? বললাম, গৃহিণী! তিনি তাজ্জব বনে গিয়ে বললেন, বলো কী? ওটা তো সবচেয়ে কঠিন কাজ। তোমরা এতগুলো ভাই, তিনি তাদের পালন করেন, তার নিশ্চয়ই এখন সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে। এরপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, নারীর জীবনে সবচেয়ে কঠিন কাজ কোনটি? অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। তার সামনে তখন আর আমার কথা বলার শক্তি নেই। বললেন, সন্তান প্রসব। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, প্রসব বেদনাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়? মেডিকেল শিক্ষা অনুযায়ী বললাম, প্রসব বেদনাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। যিনি এই কষ্ট পান, তিনি ছাড়া আর কারও পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব না। এই উত্তরটা শোনার পর তার মুখ স্বাভাবিক হলো। তিনি হাসলেন এবং খুশি হলেন। 

এই কথোপকথন থেকে তিনি আমার পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেন। আমার ঘরে বাবা নেই, বয়স্ক মা, বাড়িতে ছয় ভাইবোন, তার ওপর আরেক শহরে রেখে এসেছি নববধূ! তিনি বুঝতে পারেন, পিএইচডিটা যত দ্রুত শেষ হয় এবং ভালো হয় ততই আমার মঙ্গল। তিনি আমাকে বললেন, শনি ও রবিবার তোমার আর হাসপাতালে থাকার দরকার নেই। রাশিয়ায় তখন জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পণ্ডিত ব্যক্তিদের সামাজিক সম্পদ গণ্য করে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হতো। তারা বিশ্রাম বা নিবিড় অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য রেস্টহাউজ পেতেন। এগুলোর অবস্থান হতো সমুদ্রতীরে। বেশ জায়গা নিয়ে চত্বর, কিন্তু বাড়িগুলো হতো ছোট। অসম্ভব সুন্দর এ বাড়িগুলোকে দাচা বলা হতো। দিমিত্রি আমাকে বললেন, তুমি শনিবার ভোরে আমার সঙ্গে দাচায় যাবে। সেখানে আমরা তোমার পিএইচডির কাজ করব। এটা শুরু হলো ৮১ সালের শেষ দিকে। ল্যাবরেটরি রিপোর্ট, রিসার্চ ডাটা, রেফারেন্সের বইপত্র নিয়ে আমরা বারবার করে সেগুলোকে বিচার করতাম এবং নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিদ্ধান্ত নিতাম। তার কিন্তু আরও চারটা পিএইচডি স্টুডেন্ট ছিল। কিন্তু তিনি কেবল আমার সঙ্গেই শনি-রবি, দুই দিন কাটাতেন। তার এবং মানুতার ঐকান্তিক চেষ্টা ও সহযোগিতায় আমি পিএইচডির পরীক্ষা বোর্ডের সব পরীক্ষকের কাছ থেকে ভোট আদায়ে সক্ষম হই। রাশিয়ায় নিয়ম ছিল বোর্ড বসত। এর ভেতর রাষ্ট্রীয়ভাবে দু’জন থাকতেন, যাদের কাজই হচ্ছে খুঁত ধরা। থিসিসটা ভাইভার তিন মাস আগে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতে হতো। যাই হোক, থিসিস পেশ করার পর অনেক প্রশ্নবাণে জর্জরিত হলেও শেষ পর্যন্ত ফলাফলে দেখলাম, সবাই আমাকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেছেন। ৭ জুলাই, ১৯৮৩ সালে আমি পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরি। এর আগে সেখানে পার্টি দিতে হলো। অনেকেই অনুরোধ করল ড্রিংকস করার জন্য। কিন্তু আমার স্ত্রী আমাকে বিদেশ যাওয়ার আগে শপথ করিয়েছিল, আমি যেন মদ না খাই। আমি ওদের বললাম, সাড়ে তিন বছর রাশিয়ায় থেকেও যেহেতু আমি মদ স্পর্শ করিনি, সুতরাং আজো না হয় এটা অধরাই থাক! তারাও আর পীড়পীড়ি করল না। 

সাপ্তাহিক : সোভিয়েত সমাজটাকে কেমন দেখেছেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : আমি কিন্তু ছাত্র ইউনিয়ন করিনি। ছাত্রলীগ করেছি, বঙ্গবন্ধুকেই আজ অবধি নেতা মান্য করি। তার পরেও আমার কাছে এখনও মনে হয়, সোভিয়েত সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত সুন্দর একটা সমাজ ব্যবস্থা ছিল। আমি পরবর্তীতে উচ্চতর পড়ালেখা করতে লন্ডন গিয়েছি, জার্মানি গিয়েছি। কিন্তু সোভিয়েত এদের চেয়ে অনেক সুসংহত, সুন্দর ও মানবিক ছিল। আমি লন্ডন ও জার্মানিতে ভিক্ষুক দেখেছি। কিন্তু সোভিয়েত দেশে কোনোদিন কোথাও কোনো ভিক্ষুক আমার চোখে পড়েনি। সে দেশে কোনো ব্রোথেল বা পতিতালয় ছিল না। কোথাও কখনও কোনো যৌনকর্মী দেখিনি। সোভিয়েত দেশে সরকার ব্যাপক নিপীড়ন চালাত বলে পশ্চিমা পুঁজিবাদীরা গত এক শতাব্দী ধরে প্রচার করে আসছে। কিন্তু আমি গিয়ে দেখেছি এর উল্টো। মানুষ আইনকে সামাজিক বিধি হিসেবে গণ্য করত। আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা মনে করতেন যে, দেশে যেসব আইন চালু আছে, তা তাদের সমাজের বিকাশের জন্যই দরকার। মোটকথা, আইনকে মানুষ শ্রদ্ধা করত। মানুষ কোনো সমস্যায় পড়লেই রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হতো। আমি একবার গভীর রাতে একটা ট্রামে করে ফিরছিলাম অ্যানিমেল হাউজ থেকে। যেসব পশুর ওপর আমার থিসিসের পরীক্ষা হতো সেগুলোর রক্তের নমুনা নিয়ে। তো কয়েকজন অ্যালকোহলিক যুবক আমার পাশে এসে আমাকে ঘিরে বসল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তারা আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করল। ডাক্তারি করি শোনার পর তারা আমার হাত ধরে দেখল। একে অপরকে বলল, ম্যাককায়া! অর্থাৎ কোমল হাত। বুঝাতে চাইল আমি কায়িক শ্রম করি না, এক প্রকার বুর্জোয়া আর কি! এটা হয়তো খুব কোনো অপরাধ না। কিন্তু ড্রাইভার এটা দেখে রেগে বলল, ওকে ডিস্টার্ব কর না। আমি কিন্তু মিলিশিয়াদের জানাব। ওরা পরের স্টপেজেই নেমে গেল। দুই মাতাল একবার আমাদের হাসপাতালের এক নার্সকে ধর্ষণ করে তাকে হত্যা করেছিল। সেই মেয়েটি ছিল অসম্ভব সুন্দরী। ধর্ষণ ও হত্যার সাজা ছিল ওপেন ফায়ার। আসামিদের খুঁজে বের করে বিচার করতে মাত্র ২১ দিন লেগেছিল। সামাজিক অপরাধ আমি তেমন একটা দেখিনি। কত জায়গা থেকে কত জায়গায় গিয়েছি। কোনোদিন আমার একটা পয়সাও চুরি হয়নি। কেউ কোনোদিন ছুরি ধরেনি, ঘুষ নিতে বলেনি। উল্টো দেখেছি, তারা একে অপরকে সাহায্য করতে উৎসাহী ছিল। মাংসটা সেদেশে সিরিয়াল ধরে কিনতে হতো। রুশীরা সামনে থাকলে আমাদের এগিয়ে দিত, কারণ লাইনের শেষ পর্যন্ত মাংস না পাওয়া যেতে পারে। পুরুষরা নারীদের এগিয়ে দিত, বড়রা শিশুদের, তরুণরা বৃদ্ধদের। এই প্র্যাকটিসটা কিন্তু সব জায়গায়ই দেখেছি। কোথাও কোনো স্থান পরিদর্শনে গেলাম। হয়তো বাইরে ঠাণ্ডা, দ্রুত ভেতরে যেতে পারলেই শান্তি। লাইনে তখন একই রকম হতো। অক্টোবর বিপ্লবের সময় সেদেশে চালের কেজি ছিল ৮০ কোপেক। ১৯৮৩ সালেও আমি সেই দামই দেখে এসেছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কোনো নিয়ম সেখানে ছিল না। 

রুশ জনগণকে আমার কাছে শান্তিপ্রিয়, মমতাময় ও ভারিক্কি চালের অর্থাৎ কম কথার প্রাজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ মনে হয়েছে! আমাদের মতো চটুল না আর কি। একদিন ট্রাম বিকল হয়ে গেল। আমি হাঁটছিলাম, আমার হাতে কিছু জিনিসপত্র ও ব্যাগ ছিল। একজন বৃদ্ধ নারী এসে বললেন, সিনক্, আমি তোমাকে সাহায্য করি, ব্যাগটা আমাকে দাও, আমার হাত খালি আছে। আমি রাজি হলাম না। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আমাকে তোমার মায়ের মতো মনে কর না? আমি থমকে গেলাম, তার হাতে ব্যাগটা দিলাম। আরও একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি। সাধারণত আমাদের মতো পদের মানুষরা কেউ মিথ্যা বলেন না এবং প্রচণ্ড দায়িত্বশীল। 

তারপর ধরুন, আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় ডাক্তারদের সম্মান কোথায় বেশি। আমি তো জার্মানি, ইংল্যান্ড, রাশিয়া তিনটাই দেখেছি- এক কথায় বলব সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেখানে রোগীরা এসে বলবে, তুমি যা খুশি করতে পার, আমার দায়িত্ব তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম। আমার হাসপাতালে দেখেছিলাম, এক রোগীর কানে নয়বার অপারেশন হয়েছিল, নয়বারই আমরা ব্যর্থ হই। ডাক্তাররা তাকে বললেন, তুমি মস্কো যাও। সেখানে তো চিকিৎসার জন্য কারও কোনো ব্যয় ছিল না। সবই রাষ্ট্রের দায়িত্বে। কিন্তু সে গেল না, বলল তুমি প্রয়োজনে আরও ১০ বার কর। আর যেকোনো রোগী সুস্থ হওয়ার পর তার ডাক্তারকে তিনটি ফুল ও এক বোতল ভদকা উপহার দিত। আমিও পেতাম, প্রথমে আমার দেশিরা এসে সেগুলো খেত। কিন্তু খাওয়ার পরে যে হৈ হল্লা করত, এটা আমার ভালো লাগত না। আমাদের একজন গার্ড আমাকে একদিন বললেন, তুমি এই যন্ত্রণা সহ্য কর কেন? আমি বললাম, এগুলো কি করব? সে বলল, আমাকে দিও, আমি বিক্রি করে তোমাকে রুবল এনে দেব। আগেই বলেছি, রাশিয়ায় জিনিসপত্রের দাম কম ছিল। আমি ওই মদ বিক্রির টাকায় দেশে ফেরার সময় এক কন্টেইনার ভর্তি করে ফ্রিজ, টিভি, সেলাই মেশিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংসারিক জিনিসপত্র সবই কিনে এনেছিলাম। মেডিকেল ইথিকস অনুযায়ী রোগী সুস্থ হয়ে ফিরে গেলে তার দেয়া উপহার ডাক্তার নিতে পারেন, এটা অনৈতিক নয়। 

আরেকটা ঘটনা বলি। আমি একটা অপারেশন করছিলাম, আমার বস দিমিত্রি মাইক্রোস্কোপের অবজার্ভার টিউবে বসা। আমি কানের মধ্য থেকে একটা স্টেপিস উঠাব, উঠাতে গিয়ে তার নিচের লেবিরিনটা একটু ফেটে গেল। লেবিরিন ফাটলে সেখান থেকে একটা ফ্লুইড বেরিয়ে আসে। তিনি রোগীকে জিজ্ঞেস করে বুঝলেন, মাথা ঘুরাচ্ছে! বললেন, হ্যাঁ এ সময় একটু মাথা ঘোরাতে পারে। আমাকে সরিয়ে তিনি কানের অন্য অংশ থেকে একটু ফ্যাট নিয়ে লেবিরিনটা সিল করে দিলেন। পরে রোগীকে বললেন, তোমার এই কানে আমরা অপারেশন করতে পারব না, আমরা ফেইলড হয়েছি। কিন্তু আমাকে বকা দেয়া, গালি দেয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। অন্য সময়েও কোনো ডাক্তারকে এরকম কিছু করতে দেখিনি। ওই রোগীও কিন্তু বলেননি যে, এই বাংলাদেশির কারণেই এমনটা হলো কিনা! মানুষগুলো এমনই ছিল। 

অথচ দেখেন বাইরের বিশ্বে একটা বিপ্লব ও একটা চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের বরাতে এই সরল মানুষগুলোর কেমন একটা বিধ্বংসী পরিচয় দাঁড়িয়ে গেছে। এ থেকে আমি প্রোপাগান্ডার শক্তি টের পাই। আগেই বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কী ধরনের চক্রান্ত হয়েছিল! সোভিয়েতও একই পরিণতি ভোগ করেছে। পুঁজিবাদী বিশ্বের চক্রান্তকে তারা মোকাবিলা করতে পারেনি। চীনা সমাজতন্ত্র দেখিনি, তাই তাদের আলাপ বাদ দিয়েই বলব, বাস্তবে সোভিয়েতের মতো আধুনিক সমাজ পৃথিবীতে এখনও একটাও হয়নি। 

সাপ্তাহিক : সোভিয়েত শিক্ষা, মেডিকেল শিক্ষা নিয়ে তো নানা আলাপই জারি আছে। আপনি তো ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও পড়ালেখা করেছেন। সোভিয়েত শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে এর একটা তুলনা করুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ওখানে আমাদের দেশ থেকে সাধারণত উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ছেলেমেয়েরা যেত। আমি গিয়েছি এমবিবিএস পাস, আরও তিন বছর চাকরির অভিজ্ঞতা ও বিয়ে করার পর। ফলে আমার একটা ম্যাচিউরিটি ছিল। মানুষের দেখার চোখটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নে জিন্স কাপড় ছিল না। কিন্তু ওদের কাছাকাছি মানের আরেকটা কাপড় ছিল, আমাদের কাপড়ের চেয়ে যার গুণগত মান অনেক ভালো। আমরা যখন জিন্স পরে যেতাম, রুশীরা আমাদের সঙ্গে কাপড় বদলাতো। ওদের তিনতা প্যান্ট দিয়ে আমাদের কাছ থেকে একটা জিন্স পেতে চাইতো। সেখানে হয়তো বিভিন্ন ডিজাইনের কাপড় কম ছিল, বিলাসদ্রব্যও কম পাওয়া যেত। এখন এটা দেখে কেউ যদি মনে করে, সোভিয়েতে মানুষের স্বাধীনতা ছিল না, তাহলে সেটা তার দেখার সমস্যাই বলব। কারণ, চালের ৮০ কোপেকটা কেন তার নজরে পড়ছে না?

পৃথিবীর কোনো পুঁজিবাদী দেশও এটা বিশ্বাস করে না যে, সোভিয়েত শিক্ষাপদ্ধতি খারাপ বা দুর্বল ছিল। বরং সোভিয়েত চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তারা উচ্চধারণাই পোষণ করেন। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষকেই কেবল সোভিয়েত শিক্ষা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করতে দেখেছি। এর একটা কারণ হচ্ছে, সোভিয়েতে পড়ালেখা করতে টাকা লাগত না। আর আমাদের মানুষেরা পয়সা ছাড়া কিছু পেলে তার মূল্য দেয় না, এটা তো জানা কথাই। আমাদের দেশের যেসব ডাক্তার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে পড়ালেখা করে এসেছে, তারা এটা বলে ও বিশ্বাস করে যে, সোভিয়েতের মেডিকেল পড়ালেখা ভালো ছিল না। কারণ ওটাই, টাকা ছাড়া পড়লে কি আর পড়ালেখা হয় নাকি! ল্যারিঞ্জেমি নামে গলার ক্যান্সারের একটা অপারেশন আছে, সিগোলোভিচকে আমি ওটা করতে দেখেছি দেড় থেকে পৌনে দুই ঘণ্টার মধ্যে। ইংল্যান্ডে দেখেছি, তিন থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। তবে এটা ঠিক যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কেউ কেউ পড়ার নামে রাশিয়া গেলেও তারা আসলে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। তারা হতাশার মধ্যে ছিলেন, পড়ালেখাটা তাদের উদ্দেশ্যও ছিল না। এদের কাউকে দেখে এরকম ধারণা তৈরি হতে পারে। আবার শেষদিকে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনায় সোভিয়েত ইউনিয়নও অস্থির ছিল। কিন্তু যারা পড়তে গিয়েছে, তাদের ওরা পড়িয়েছে। আর তাদের শিক্ষাপদ্ধতি ছিল একটু বেশি ব্যবহারিক, অন্যদিকে ইউরোপের শিক্ষাপদ্ধতি বেশি তাত্ত্বিক। তাছাড়া শুধু আমাদের দেশের মানুষরা ওখানে পড়ত তা তো নয়! সমাজতান্ত্রিক বলয়ে থাকা সব ইউরোপ, ল্যাটিন, এশিয়ার দেশগুলো এবং ল্যাটিন, এশিয়া ও আফ্রিকার নিপীড়িত রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষার্থীদের তারা নিত। অন্যদের তারা নিত না। তাদের নীতি ছিল গরিবদের শিক্ষা দেয়া, আর যেহেতু শিক্ষা ফ্রি, তাই ধনী দেশের মানুষদের তারা নিত না। সোভিয়েত দেশের যে মানুষদের বর্ণনা আমি দিলাম, শিক্ষার্থীকে কিছু শেখানোর না থাকলে তারা কখনই সেসব শিক্ষার্থীকে সে দেশে ডেকে নিত না। এত অনৈতিক হলে আমরা ওরকম মানুষের দেখা পেতাম না।

সাপ্তাহিক : কর্মজীবন শুরু হলো কীভাবে? অধ্যাপনার স্মৃতি থেকে কিছু বলুন!

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : পিএইচডি শেষে ফিরেই আমি মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করলাম। আবারও আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়োগ দেয়া হলো, সহকারী অধ্যাপক পদে। সেখানে গিয়ে কাজকর্ম শুরু করলাম ৮৩ সালের জুলাই মাসে। তখন এরশাদের আমল। ৮৫ সালের কথা। হঠাৎ করে এরশাদ সাহেব আদেশ জারি করলেন, যারা গবেষণা বা শিক্ষা সূত্রে বিদেশে গিয়েছেন, তাদের চাকরি বাতিল। এর মধ্যে আমাকেও ফেলা হলো। এটা হয়েছে, কারণ আমার ফিরে আসার কথা ছিল ৮৫ সালে। তারা ৮৫ সালে কে কে ফেরত এসেছে, সেই তালিকায় আমার নাম না পেয়ে চাকরি বাতিল করে দিলেন। আমি তো যোগ দিয়েছি সেই ৮৩ সালেই। হঠাৎ একদিন সকালে গিয়ে দেখি, এমএলআর-৯-এর অধীনে দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে আমার চাকরি চলে গেছে। দেখে তো থ’ হয়ে গেলাম! আমি মন্ত্রণালয়ে গেলাম। তারা বললেন, এখন এসে জিজ্ঞেস করলে কী হবে? সময়মতো ফিরলেন না কেন? বললাম, আমি তো আগে এসেছি। ৮৪ সালে পিএসসি দিয়ে আবার অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হয়ে নতুন করে নিয়োগ পেলাম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই। তাহলে দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে আমার চাকরি কীভাবে যায়? সরকারি আইন কানুনের ঝামেলা অনেক। চাকরি সহজে যায় না, কিন্তু ভুল করে গেলেও সেই ভুল সংশোধন করে আবার চাকরি ফিরে পাওয়াটা খুবই কঠিন। যাই হোক, অনেক জল ঘোলা করে আবার চাকরি ফেরত পেলাম।

অধ্যাপক হিসেবে আমি কেমন তা আমার ছাত্ররাই বলবে। তবে ছাত্ররা তরুণ বয়সে দুষ্টুমি করতে পছন্দ করে। আমিও বাদ পড়িনি। আমরা কুমিল্লার লোকরা তো ‘ও’ বলতে পারি না, ‘উ’ বলি। কোনো কোনো বেয়াড়া ছাত্র হয়তো বলত, স্যার উটিতে যাবেন না? এরকম কিছু কিছু অভিজ্ঞতা আছে, যেগুলো নিয়ে অনুভূতি মিশ্র। তবে ছাত্ররা যদি ভালো করে, সব শিক্ষকেরই আনন্দ হয়। তা সেই ছাত্র যত দুরন্তই হোক। অনেক ছাত্রের কাছ থেকেই ভীষণ সম্মান পেয়েছি, যাতে মনে হয়েছে শিক্ষক জীবনটা সার্থক। কোনো কোনো ছাত্র দূর দেশ থেকে ফোন করে কৃতজ্ঞতা জানায়, স্যার আপনি ছিলেন বলে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। এগুলো শুনলে মন ভরে যায়। এখন মনে হয়, অনেক কিছুই হয়তো পারিনি। কিন্তু সফলতা এখানেই যে, ছাত্ররা কোনোদিন এই অভিযোগ করেনি যে, স্যারের পড়ানো ভালো না, বা বোঝাতে পারেন না। বরং ছাত্ররা সব সময় উল্টোটাই বলেছে- স্যার যা পড়ান, তা আর ভোলা যায় না, এমন প্রশংসায়ও ভেসেছি। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। তবে শেষ পর্যন্ত যে অধ্যাপক হয়েছি, উপাচার্য হয়েছি, এখানে আমার পরিবারের অবদান অনেক।

সাপ্তাহিক : ঘটনাটা একটু খুলে বলুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : ঘটনার শুরু ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে। পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো, মেডিসিনে শতভাগ, গাইনিতে ৫২ ভাগ ও সার্জারিতে ৫৮ ভাগ। গড় পাসের হার দাঁড়াল ৫৫.৬ ভাগ। ছাত্ররা রাতে মেডিসিনের পরীক্ষকদের রুমের সামনে ফুলের তোড়া দিল এবং সার্জারি ও গাইনির পরীক্ষকদের রুম ভাঙচুর করল। পরদিন এ নিয়ে শিক্ষকদের একটা সভা হচ্ছিল। ছাত্ররা তখন মিছিল করে এগিয়ে আসছিল, আরও ভাঙচুরের আশঙ্কা। আমিসহ আরও তিনজন শিক্ষক এগিয়ে গেলাম ছাত্রদের থামানোর জন্য। বাকি তিনজন ছিলেন আমার অতি শ্রদ্ধেয় ডা. এহসান সোবহান চৌধুরী, ডা. হাসানুজ্জামান ভূঁইয়া ও স্নেহাস্পদ অনুজ ডা. এমরান বিন ইউনূস। আমরা ভাবলাম, এরা তো আমাদেরই ছাত্র, আমরা সামনে গিয়ে দাঁড়ালে এই ছাত্ররা নিশ্চয় অপ্রীতিকর কিছু ঘটাতে পারবে না। আমরা গেলাম এবং তাদের থামালাম। এটার ভিন্ন অর্থ তৈরি হলো। সরকারপন্থি কিছু শিক্ষক বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করলেন এভাবে যে, আমরাই ছাত্রদের ক্ষেপিয়ে এখানে এনেছি, এজন্যই তারা আমাদের কথা মোতাবেক ফেরত গিয়েছে।

আজ যিনি যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত সেই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিলেন তখনকার এরশাদ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি আমাদের চারজনকে বদলির আদেশ দিলেন। আমি ও ডা. হাসানুজ্জামান ভূঁইয়াকে রংপুর মেডিকেল কলেজে আর বাকি দু’জনকে পাঠানো হলো রাজশাহী মেডিকেলে। নূরুল আমিন স্যার সব শুনে মন্তব্য করলেন, ব্রিটিশদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে। যা তোমার সিনিয়র জানে না, তা তুমি জানলেও সমাধান করো না। বুঝলাম যে এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি। ২৫ মার্চ বদলির আদেশ এলো, তাও নিয়ম ভঙ্গ করে। সাধারণত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বদলির আদেশ হলে এর মধ্যে সাত থেকে ১০ দিনের ট্রানজিট দেয়া হয়। কিন্তু আমাদের বলা হলো, ৩০ মার্চের মধ্যে যোগদান করতে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, অধ্যাপনা ছেড়ে দেব। এইসব অন্যায়কারী লোকের অধীনে চাকরি করব না। এতে করে ওই অন্যায় ও মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদও হবে। সাকা চৌধুরীর ভগ্নিপতি ছিলেন আমার রোগী, আমি তার মাকে দেখতাম। বৃদ্ধা যখন শুনলেন যে, আমার বদলি হয়েছে, সাকাকে অনুরোধ করলেন বদলির আদেশ ফিরিয়ে নিতে। সে রাজি হলো না। উল্টো তার দুলাভাইকে বলল, ডেঁডার পোয়া চাঁটগার সব পইসা ইন্ডিয়াত লই যায়। মানে হিন্দুর বাচ্চা চট্টগ্রামের সব টাকা ভারতে নিয়ে যাচ্ছে। পরে ভদ্রমহিলা আমাকে জানালেন, ডাক্তার সাহেব যদি চাকরি করতে চান, তাহলে রংপুর যান, মন্ত্রী আদেশ পাল্টাবে না। আমি চাকরি না করার সিদ্ধান্তে আরও অটল হলাম।

পরে যখন আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, কেন রংপুর যাব না, তখন তাকে সব যুক্তি দিলাম। কিন্তু সে মানল না। বলল, আমাদের একটা মেয়ে আছে। সে কিছুদিন পরে বড় হবে। মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। চাকরি ছেড়ে দিলে তখন কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে মেয়ের বাবা ডাক্তার। আর চাকরিটা করলে বলবে অধ্যাপক। কোনটা ভালো? সারা রাত ভাবলাম, তারপর মেয়ের বাবার জয় হলো। রওনা দিলাম রংপুরের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে আরিচা ফেরিঘাট। ভোর সাতটায় পৌঁছে দেখি, ৪০০ বাস-ট্রাকের পেছনে আমার গাড়ি। মনে মনে ভাবলাম, এজন্যই শাস্ত্রে বলা হয়েছে স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী! ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি ঘোরাও। ড্রাইভার গাড়ি ঘোরাতে যাচ্ছে, এমন সময় এক পুলিশ সার্জেন্ট এসে ড্রাইভারকে বলল, লাইসেন্সের কাগজপত্র দেখান। আমি খেই হারিয়ে ফেললাম, চিৎকার করে বললাম, ড্রাইভার লাইসেন্স দেখাবে না। অমনি দেখলাম সার্জেন্ট আমাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, স্যার কোথায় যাচ্ছেন? তাকে চিনতে পারলাম না। সে বলল, স্যার পাঁচলাইশ থানায় চাকরির সময় আমার যমজ দুই সন্তানকে নিয়ে আপনার কাছে যেতাম। ছেলে দুটো আপনার চেম্বার তোলপাড় করে ফেলত, আপনি কিছু বলতেন না। একদিন আমার স্ত্রী তাদের ধমক দিলে আপনি আমার স্ত্রীকে বলেছিলেন, বাচ্চারা দুষ্টুমি করছে এটা তো ভালো, বাচ্চার বাবা দুষ্টুমি করলে কি ভালো হবে? তারপর সার্জেন্ট বলল, স্যার আমরা এই গল্প সবাইকে বলে বেড়াই। আমার তখনও রাগ কমেনি। তাকে ধমক দিয়ে বললাম, আমার বদলি হয়েছে, আজই রংপুর মেডিকেলে জয়েন করতে হবে। আপনি কি আমাকে ফেরিতে তুলে দিতে পারবেন? সে বলল, স্যার এটা কোনো ব্যাপারই না, আপনি গাড়িতে বসেন। এরপর আমাকে বদলির জন্য সরকারের শাপ-শাপান্ত করতে লাগল, যেন আমি না থাকলে চট্টগ্রামের মানুষ সব মরে ভূত হয়ে যাবে। এরপর সে অতি সহজেই সব নিয়ম ভেঙে আমাকে খুব দ্রুত ফেরিতে তুলে দিল। ‘আকাশের যত তারা, পুলিশের তত ধারা’ এবং ‘পুলিশের থাবা, ক্ষমতার বাবা’ প্রবাদ দু’টির প্রমাণ পেলাম সেদিন।

সাকা চৌধুরীর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কারণে সেদিন আমাকে কেবল কর্মক্ষেত্রই পাল্টাতে হয়নি, জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আমার স্ত্রী জয়া তখন অন্তঃসত্ত্বা। রংপুর মেডিকেলে যখন গিয়েছিলাম, তখনও সিদ্ধান্ত নেইনি যে, সেখানে থাকব। কিন্তু সেখানে গিয়ে অধ্যাপক টিএ চৌধুরী, অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, অধ্যাপক শফিউল্লাহ, অধ্যাপক হাবিবুর রহমান ও অধ্যাপক এনআই খানদের মতো জায়ান্টদের দেখে ভাবলাম, তারা যদি এখানে থাকতে পারেন, আমি কেন পারব না। ভাবলাম ডেলিভারির পরেই জয়াকে নিয়ে আসব। কিন্তু ডেলিভারির সময় আমি থাকতে পারলাম না। আমার বাচ্চাটা কর্ড অ্যারাউন্ড দ্যা নেক-এর ফলে মারা গেল। ভয়ঙ্কর রকমের ভেঙে পড়লাম। সাত দিনের ছুটি নিয়ে চট্টগ্রাম চলে এলাম। মানসিক অবস্থা শোচনীয়। সাতদিনের মধ্যে রংপুর যেত পারলাম না। রাষ্ট্র সব সময়েই শাসনে উৎসাহী। খুব দ্রুত অনুমতি বহির্ভূত অনুপস্থিতির দায়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হলো। এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা! কত ডাক্তার মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কর্মস্থলে থাকে না, আর আমি এই বিপদের দিনে আসামি হলাম। মনে মনে ভাবলাম, চাকরি ছেড়ে দেব। আমাদের চারজনের মধ্যে এহসান ভাই কিন্তু চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার মতো মেধাবী ছাত্ররা তখন রেডিওলজিতে যেত না। কিন্তু তিনি গিয়েছিলেন। সাকা চৌধুরীর সেই অন্যায় সিদ্ধান্তের ফলে ছাত্ররা অসাধারণ গুণী একজন শিক্ষককে হারিয়েছিল। এহসান ভাইয়ের পথ অনুসরণ করব ভাবলাম।

এর মধ্যেই একদিন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, এমন সময় আমাদের শিক্ষক অধ্যাপক নূরজাহান ভূঁইয়া ম্যাডামের বাসার সামনে তার স্বামী আমিন-উজ্জামান সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি জোর করে বাসায়  নিয়ে গেলেন। ম্যাডামকেও বদলি করা হয়েছিল বরিশালে। আমিন-উজ্জামান সাহেব সব শুনে বললেন, স্ত্রীর এ সময়ে তার পাশে থাকা তোমার উচিত, কিন্তু চাকরি ছাড়াটা উচিত নয়। আমি তো সিদ্ধান্তে অটল। এর পর তিনি এমন এক মন্তব্য করলেন, যা আমার পক্ষে কখনই ভোলা সম্ভব না। তিনি বললেন, তুমি যদি চাকরিতে থাক, তাহলে এক সময় অধ্যাপক মতিন সাহেবদের মতো মন্ত্রীও হতে পার, কিন্তু তোমার মন্ত্রী আত্মাহুতি দিলেও একজন প্রফেসর হতে পারবে না। তার কথায় আমি মত পরিবর্তন করলাম। 

রংপুরে যাওয়ার আগে স্ত্রীর বদলির জন্য ডিজি অফিসে গেলাম। সেখানে একজন কেরানির সহায়তায় তার বদলি হলো। তিন বছর চাকরি করার পর ঢাকায় আমার বদলি হয় ১৯৮৯ সালে। তবে রংপুরের চিকিৎসক জীবনের কথা আমি ভুলব না। সেখানে গিয়ে মাটির মানুষদের দেখা পেয়েছি। রাশিয়ায় যেমন বলেছিলাম, রোগীরা সুস্থ হলে ডাক্তারের জন্য উপহার আনতেন। রংপুর গিয়ে দেখলাম, আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলেও সেই সংস্কৃতি আছে। কৃষকরা ডাক্তারের জন্য কলার কাঁদি কাঁধে করে নিয়ে আসেন। কেউ হয়তো নিয়ে এলেন একটা মুরগি বা লাউ। অর্থমূল্যে দেখা যাবে একজন ডাক্তারের কাছে এর তেমন কোনো দাম নেই, কিন্তু এই যে ডাক্তারের প্রতি ভালোবাসা! এর কোনো তুলনা নেই। রংপুর থেকে ঢাকায় বদলির ঘটনাটা খুবই আনন্দের। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা সেই হাসান আহমেদ সাহেবের সঙ্গে। যিনি আমাকে কলেজে পড়ার সময় পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। আমি তাকে চিনতে পারিনি। আমার প্রতি যে অন্যায় হয়েছিল, সেটা তিনি বুঝলেন এবং আমাকে তৎকালীন পিজিতে ট্রান্সফার করলেন। আমার প্রতি এই মানুষটা সুবিচার করলেন ১৯৬৮ সালের পুলিশি নির্যাতনের কথা মনে রেখে।

সাপ্তাহিক : ডাক্তারি জীবনের সুখ-দুঃখের কথা কিছু বলুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : সুখ-দুঃখের ঘটনা তো অনেক। সবচেয়ে কষ্টের ঘটনাটা শুরুর দিককার। আমি তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক। নূরুল আমিন স্যারের স্নেহভাজন হিসেবে প্র্যাকটিস বেশ ভালোই চলছে। একদিন রাত সাড়ে আটটায় চেম্বার বন্ধ করে বাসায় যাব, এমন সময় দেখলাম, একটা বাচ্চাকে নিয়ে দুটো রিকশায় করে কয়েকজন লোক আমার চেম্বারের সামনে নামলেন। বাচ্চাটা কানের ব্যথায় চিৎকার করছে। আমি চারটা তালা খুলে আবার চেম্বারে ঢুকে সব যন্ত্রপাতি বের করে রোগীকে দেখে দিলাম। রোগী দেখা শেষে হেঁটে বাসায় যাচ্ছি, তখন তারাই রিকশা করে যাচ্ছেন। রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের একজন আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললেন, আরে যতবড় ডাক্তারই হোক না কেন, একশ টাকার লোভ কি ছাড়তে পারে। মনে খুব কষ্ট পেলাম। এত কষ্ট পেলাম  যে, কয়েকদিন ঠিকমতো খেতে পারলাম না, কোনো কাজে মনোযোগও দিতে পারিনি। 

ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো, সপ্তাহ দুয়েক পরে। একইভাবে চেম্বার বন্ধ করে বাসায় যাব, তখন একজন রোগী আমাকে দেখাতে আসলেন। তেমন জরুরি মনে হলো না। তাই আমি তাকে বললাম, আগামী দিন আসুন। এ কথা বলে আমি হেঁটে স্টাফ কোয়ার্টারের বাসার দিকে যাচ্ছি, ভদ্রলোক রিকশায় যাচ্ছেন তার সঙ্গীদের সঙ্গে। এ সময় তাকে বলতে শুনলাম, আরে অনেক পয়সা হয়ে গেছে, তাই এখন আর একশ টাকার প্রয়োজন নেই। আমি বুঝে উঠতে পারলাম না করণীয় কি? পরে ছোটবেলার শিক্ষক রাইহরণ স্যারের কথা মনে পড়ল। তিনি বলেছিলেন, শিক্ষকের কাজ হচ্ছে শুধু দেয়া, পাওয়ার কথা চিন্তা করা উচিত নয়। ভাবলাম, ডাক্তারের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য।

২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম আলোতে হাসপাতাল সম্পর্কিত জনৈক পাঠকের একটা লেখা দেখলাম। তিনি সরকারি হাসপাতালে তিন দিনের অভিজ্ঞতার একটা বয়ান দিয়েছেন। হার্টের চিকিৎসার জন্য তিনি একটি সরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পরদিন তার প্রেসার বেড়ে গেল। তিনি যে প্রফেসরের অধীনে ভর্তি হয়েছেন, তাকে বা তার কোনো সহকারীকেও খুঁজে পেলেন না। তখন একজন তরুণ ডাক্তার ওয়ার্ডে এলেন অন্য রোগী দেখতে। ওই রোগীর এক স্বজন ডাক্তারকে অনুরোধ করলেন তার প্রেসার মেপে দিতে। এক প্রফেসরের রোগী আরেকজন দেখতে পারবে না, এই যুক্তি দেখিয়ে তিনি বললেন, আমি পারব না। রোগী নিজে উঠে ছোট ছোট পা ফেলে সিস্টারদের ডেস্কের দিকে এগিয়ে যান। তিনি ওই ডাক্তারকে বলেন, আমি আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। ডাক্তার বললেন, আমি বলব না। তিনি আবারও বললেন, ডাক্তার সাহেব আমি একজন রোগী। আমার একটি কথা দয়া করে শুনুন। ডাক্তার দাঁত খিচিয়ে জবাব দিলেন, আমি শুনব না। আপনার ডাক্তার আপনাকে দেখবে। রোগী উত্তেজিত হয়ে হাঁপাতে থাকেন। কিন্তু ডাক্তার চলে যান, ফিরেও তাকান না। এই ঘটনার বয়ান দিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, মানুষের কিছুতেই কি কিছু যায় আসে না?                                                                                                                                       
ওই রোগীটা ছিল বাইপাসের রোগী। হৃদরোগের ওয়ার্ডে ভর্তি। যেভাবে ভদ্রলোক আমার অনুজ ডাক্তারের ব্যবহারে উত্তেজিত হলেন, সে মুহূর্তে আরেকটি হার্ট অ্যাটাক হয়ে তার মারা যাওয়াটা একেবারে অসম্ভব ছিল না। ভদ্রলোক যদি আমাদের কারও বাবা হতো, তাহলে ডাক্তারের এই আচরণে আমাদের কী প্রতিক্রিয়া হতো? এর ফলে হাতাহাতি এবং মারামারি হতে পারত। তাতে করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট হতো। শুধু একটু ব্লাড প্রেসারটা মেপে দিলেই কিন্তু সব চুকে যেত। ভদ্রলোক যে মিথ্যে বলেননি এটা বুঝেছি তার লেখা পড়েই। তিনি হাসপাতালের একজন ওয়ার্ডবয়ের যথেষ্ট প্রশংসা করেছিলেন। এই ঘটনাটা আমাকে আজও পীড়া দেয়।

অনেক সময় ডাক্তাররা রোগীদের নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করেন না। এটা এখন একটা সাধারণ ঘটনা। কিন্তু কখনও কখনও এর ফলাফল কত ভয়াবহ হতে পারে, তার উদাহরণ দেই। ১৯৭৯ সালের ঘটনা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তারদের কেবিনে থাকি। ৩ নম্বর ওয়ার্ড অর্থাৎ নাক কান গলা ওয়ার্ডে প্রায় রাত্র ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ইমার্জেন্সি সব কাজ শেষ করে রুমে এসে ঘুমুতে যাচ্ছি। এমন সময় ওয়ার্ডবয় নরেশ হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল, স্যার একটা ভিআইপি রোগী এসেছে গলায় হাড় বিঁধে। নরেশ আরও বলল, স্যার রোগীর সঙ্গে ৭-৮ জন লোক এসেছে, ভালো পোশাক পরিহিত এবং ইংরেজিতে কথা বলছে। সবাই বয়সে আপনার চেয়ে অনেক বড়। যার গলায় হাড় তিনি চট্টগ্রাম কলেজের পদার্থ বিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওয়ার্ডে গেলাম। ক্লিনিক্যালি বোঝার জন্য রোগীকে বললাম, হালকা করে একটু ঢোক গেলেন দেখি। রোগীর ঢোক গেলার সময় মুখের অভিব্যক্তি দেখে বুঝে নিলাম শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিত যে হাড় গলায় আছে। রোগীদের সঙ্গে কথা বলে যা জানলাম তারা সবাই চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষক। ঈদের পর দিন, একটা ফ্যামিলি গেট টুগেদারের মতো রাত ১০টায় খেতে বসেছেন, দুর্ভাগ্যক্রমে তার গলায় হাড়টা ঢুকে গেছে। তাদের বক্তব্যে বুঝলাম, একটু সিনিয়র কাউকে দিয়ে তারা অপারেশনটা করাতে চাচ্ছেন। নরেশকে বললাম, ননীদাকে ডাকলে কি আসবে? কারণ একটু আগেই তিনি সার্জারি, ইএনটি ও গাইনির ইমার্জেন্সি অপারেশনগুলো শেষ করে রুমে ফিরেছেন। 

যাই হোক, রোগীকে ওটিতে নিয়ে গিয়ে অপারেশন টেবিলে শুইয়ে, আইভি ড্রিপ লাগিয়ে প্রথমেই টেলিফোন করলাম আমার বন্ধু অ্যানেসথেটিস্ট মরহুম ডা. হারুনকে। বললাম, দোস্ত, ননীদার আজকে জরুরি ডিউটি আমি জানি, কিন্তু উনি যদি না আসেন, তুই একটু আসিস, আমি একটা ভিআইপি রোগী নিয়ে বিপদে আছি। সেও বলল, কাল সকালে করলে হয় না? আমি তাকে রাগতস্বরে বললাম, তাহলে আমি তোকে টেলিফোন করলাম কেন? দেখি ননীদা আসে কি-না, না হলে তোকেই আসতে হবে। ননীদা ছিলেন আমাদের সিনিয়র, আবার একটু রাগী। তাই টেলিফোনে না বলে, নরেশকে পাঠিয়ে দিলাম ডেকে আনার জন্য। ননীদা আসলেন। উনি আসতে বাধ্য হলেন। কেননা নরেশের বিনম্র অনুরোধ কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। এই নরেশ আনোয়ারাতে তার নিজ বাড়িতে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে গভীর রাতে ডাকাতের গুলিতে অল্প বয়সেই মারা যায়। রোগীর প্রতি নরেশের মমত্ববোধ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার ছিল অতুলনীয়। তার মতো মানবিক ও বিচক্ষণ মানুষ জীবনে কমই দেখেছি। নরেশকে দিয়ে যে কাজ আমরা ১০ মিনিটে করাতে পারতাম, অন্যদের দিয়ে সেটা এক ঘণ্টায়ও করানো যেত না।

ননীদা আসলেন, রোগীর পরিচয় দেয়ার আগেই যা-তা বলতে লাগলেন। আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, কাল সকালে করলে কী হতো? রাক্ষসের মতো খেলে তো এ রকম হবেই। এরকম অনেক কিছু বলতে বলতে তিনি তখন আইভি চ্যানেলে অজ্ঞান করার ওষুধপত্র দিচ্ছেন। রোগী তখন বলে উঠলেন, ননী, হোয়াট ইজ লটেড, ক্যান নেভার বি ব্লোটেড! ননীদা তো শুনে আঁতকে উঠলেন। গলা শুনেই তিনি রোগীকে চিনতে পারলেন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় এই রোগীই ননীদার পদার্থবিদ্যার শিক্ষক ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ননীদা তার পায়ে ধরে সালাম করে ক্ষমা চাইলেন। এরপর তাকে আশ্বস্ত করে অজ্ঞান করে দিলেন, আমিও মুহূর্তের মধ্যে মাংসসহ হাড়টা বের করে দিলাম। ডা. হারুন অপারেশনের মাঝামাঝি সময়ে এসে হাজির হলে, ননীদা বললেন, হারুন একটু আগে এলে তো আমি এ বিড়ম্বনায় পড়তাম না। অর্থাৎ উনার শিক্ষকের কাছে উনি লজ্জিত হতেন না। এই ঘটনাটা সব ডাক্তারের জন্যই শিক্ষণীয়।

মজার ঘটনাও আছে অনেক। ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকের ঘটনা। রাত প্রায় ১০টার দিকে ইএনটি ওয়ার্ডের জরুরি ডাক এলো। ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি ১৮-১৯ বছরের একটি মেয়ে বাঁধানো দাঁত গলায় বিঁধিয়ে নিয়ে এসেছে, তার খুব কষ্ট হচ্ছে। নাক কান গলা বিশেষজ্ঞদের জন্য বাঁধানো দাঁত খুবই বিপজ্জনক। কারণ দাঁতগুলো তার দিয়ে ফিক্স করা থাকত। তারগুলো এমন হয় যে, এটা একবার পেঁচিয়ে গেলে বের করা খুবই কঠিন। এক্স-রে ফিল্মটা দেখে বন্ধু অ্যানেসথেটিস্ট হারুনকে টেলিফোনে বললাম, একটা ডেনচারের রোগী এসেছে। জরুরিভাবে বের করতে হবে, মেয়েটার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। টেলিফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়ের বড় ভাই এবং তার আরও ২ জন বন্ধু আমাকে ঘিরে ধরে বলল, আমার বোনকে আপনি কেন ড্যান্সার বললেন?  যতই বলি, আমি তা বলিনি, তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন। ইতোমধ্যে ডা. হারুন এসে হাজির। পরিবেশ ঠাণ্ডা করার জন্য হারুন, তার বাঁধানো দাঁত দুটো বের করে তাদের বললেন, এটা হলো ডাক্তারি ভাষায় ডেনচার। আর তোমরা যে ড্যান্সার শব্দটার কথা বলছো, ওটার বানান আলাদা! 

সাপ্তাহিক : চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকটের কথা আপনার বক্তব্যে বেরিয়ে আসছে। এর সমাধান কি?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : চারদিকে এখন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ ও ক্লিনিকের ছড়াছড়ি। এক সময় গুটিকয়েক সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করতে হতো ছাত্রদের। ফলে মেধাবীদের উঠে আসার সুযোগ ছিল। এখন এই শিক্ষা বিত্তবানরা টাকার জোরে নিতে পারেন। আগে যেসব মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ছাত্ররা গ্রাম থেকে উঠে আসত, তারা তাদের গ্রামের মানুষদের, স্বজনদের দুরবস্থার কথা জানত। ফলে সেবার আদর্শকে তারা বড় করে দেখত। কিন্তু শহুরে ছেলেগুলো যখন টাকার জোরে বড় কোচিংয়ে পড়ছে এবং সহজেই চান্স পাচ্ছে, না পেলে প্রাইভেট মেডিকেলে টাকা দিয়ে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে, তারা কিন্তু দেশের মানুষকে চেনে না। ফলে গ্রামে যখন তাদের পোস্টিং হয়, তখন তারা সেখানে যায় না। গেলেও বেশিরভাগ সময় ঢাকায় ঘুরতে থাকে বদলির জন্য। সবার কথা বলছি না, কিন্তু এই অংশটাই বিরাট। এর ফলে কিন্তু ডাক্তারিটা হয়ে যাচ্ছে বিবিএ পড়ার মতো। সেবার চেয়ে পেশাটাকে বেশি দেখা হচ্ছে অধিক আয়ের মাধ্যম হিসেবে। ক্লিনিকগুলোও একই পদ্ধতিতে এগুচ্ছে। তারা পুঁজি বিনিয়োগ করছে, মুনাফা করার জন্য। সরকারও এটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এ কারণেই সরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যার তুলনায় এখন বেসরকারি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা তিনগুণ বেশি। আবার বেসরকারি হাসপাতালে একটা মেশিনে সমস্যা হলে দিনে দিনে তা ঠিক করে ফেলা যাচ্ছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের একটা মেশিনে সমস্যা হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে সেটা ঠিক করতে কখনও কখনও বছরও লেগে যাচ্ছে। এ কারণে আবার মানুষ সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে সেবাটা দ্রুত পাচ্ছে। যদিও কম আয়ের মানুষদের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোই এখনও ভরসা। এর ফলে কিন্তু ধনীরা চিকিৎসার জন্য বেসরকারি ও বিদেশি চিকিৎসাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। 

এসব সমস্যার কথা আমাদের জানা। আমার কাছে অবশ্য সবাই সমাধানই জানতে চান। আমার মতে, সমাধানটা সুদূরপরাহত। এখনকার ব্যবস্থাপনায় কিছু নিয়ম বদলে এটাকে হয়তো কিছুটা উন্নত ও গ্রহণযোগ্য করা যায়। কিন্তু সুষ্ঠু চিকিৎসা সেবা পেতে গেলে পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। কিছুদিন আগে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এসে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, শিক্ষা ও চিকিৎসা যদি পণ্য হয়, তাহলে এর গুণগত মান থাকে না। কয়েকটা শব্দ মাত্র, কিন্তু আমাদের সমস্যা কোথায় ও করণীয় কি, তার সবটাই কিন্তু তিনি এর মাধ্যমে বলে গেছেন। আমি মনে করি, ডাক্তার যদি রোগীকে পিতা-মাতা বা সন্তানের দৃষ্টিতে না দেখেন, তাহলে তার পক্ষে চিকিৎসা করা সম্ভব কিন্তু চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব না। এটা হচ্ছে না বলেই আবার আমাদের সমাজে চিকিৎসকদের মর্যাদা নেই। রোগীর অবস্থা বিবেচনা না করে আমরা ডাক্তাররা তাদের জিম্মি করে নিজেদের দাবি আদায় করার জন্য ধর্মঘট ডাকি। অনেক ডাক্তার রোগীর পথ্য নিয়ে ব্যবসা করেন, মুনাফা করেন।  এরকম অনেক কিছুই ঘটছে। আবার এটাও তো ঠিক যে, একটা ছেলে পড়ালেখা শেষ করে যখন গ্রামে পোস্টিং পাচ্ছে, তখন সে কিন্তু তার বন্ধুদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে যাচ্ছে। জুনিয়র ডাক্তারদের কিন্তু স্বাভাবিক জীবন যাপন করার মতো আয় নেই। সে তখন নানা জায়গায় ধরনা দিতে গিয়ে তার নৈতিক দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলছে। ডাক্তারদের রাজনীতি তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেজুড়বৃত্তিতে পরিণত হয়েছে। এখানে অনেক কিছু করতে হবে। 

যদি চূড়ান্ত সমাধানের কথা বলি, তাহলে বলব চিকিৎসা শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবাকে বিনামূল্যে দিতে হবে। যতক্ষণ তা না করা যায়, ততক্ষণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া যায়। আশু সমাধানও আছে, তবে সমস্যার জট যেহেতু অনেক দিনের তাই এর সমাধানও সময়সাপেক্ষ। প্রথমে নীতির পরিবর্তন দরকার। মেডিকেল ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও গবেষণা আলাদা করে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা পণ্য হতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ নতুন করে নেয়া যাবে না। পুরনো সমস্যাগুলো আস্তে আস্তে দূর করতে হবে। যেমন, ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকা যাবে না। আমি বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে এদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের পর দেখেছিলাম, তারা রোগী হয়ে টিকিট কেটে ঢুকছে। এটা বন্ধ করতে হলে কড়া উদ্যোগ নিতে হবে। ড্রাগ ইনস্টিটিউটে তারা তাদের নতুন ওষুধ জমা দিবে। ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে সেই ওষুধের সমস্ত তথ্য থাকবে। চাইলে যে কোনো সিনিয়র ডাক্তার সেখান থেকে একবার স্যাম্পল সংগ্রহ করতে পারবেন। ডাক্তারদের তালিকা করে যিনি যে এলাকার লোক, সেখানে ন্যূনতম দুই বছর কাজ করাটা বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে। এতে করে কোন এলাকায় ডাক্তারি শিক্ষা ও সেবা বিস্তৃত হচ্ছে না, তা চিহ্নিত হবে। যেসব এলাকায় ডাক্তার কম, সেখানেই মেডিকেল কলেজ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। ডাক্তারদের বিসিএস দেয়ার দরকার নেই। তাদের জন্য আলাদা একটা ভাইভা বোর্ড বসাতে হবে। সেখানে তাদের ব্যবহারিক এবং তাত্ত্বিক একটা পরীক্ষা হবে।  সব রোগীর অন্তর্ভুক্তির তথ্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে রাখতে হবে। ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসের সময় সীমিত করে, পর্যায়ক্রমে এটা উঠিয়ে দিতে হবে। এর বিপরীতে রেফারেল ব্যবস্থা চালু করতে হবে, হাসপাতাল থেকে রোগীকে যার কাছে রেফার করা হবে, প্রথমে সেখানেই তাকে যেতে হবে। চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে একমুখী নিয়ম নীতির অধীনে আনতে হবে। একজন ডাক্তার ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন, কিন্তু ডাক্তারদের প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা ফোরামগুলোর কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকা চলবে না। এগুলো করা খুব কঠিন নয়। কিন্তু আমি জানি না, এই কথাগুলোতে মনোযোগ দেয়া সংশ্লিষ্টদের পক্ষে সম্ভব কিনা!

সাপ্তাহিক : বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেককেই চিকিৎসা দিয়েছেন। তাদের কাকে কেমন দেখেছেন, সে বিষয়ে কিছু বলুন।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : তিনি শুধুই প্রধানমন্ত্রী নন। তার সামান্য সংস্পর্শ পেয়ে এটা বুঝেছি যে, রাজনীতিবিদ হওয়ায় ব্যক্তি শেখ হাসিনার মতো একটা বিশাল চরিত্র আসলে আড়ালে পড়ে গেছে। এই তো কিছুদিন আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক অধিবেশনে যাবার আগে গণভবনে গিয়েছিলাম পরামর্শ নিতে। দরকারি অনেক কথা বলার পর বললেন, যাওয়ার আগের দিন দেখা করে যেও। যথারীতি যাবার আগের দিন গণভবনে গেলাম। সুন্দর করে মোড়ানো একটি প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বললেন, এখানে এক সেট কাপড় আছে, এটা পুতুলকে দিও।  তিনি যদিও ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে আলাপ করাটা পছন্দ করেন না, তবু কিভাবে তার কাছ থেকে শিখেছি এমন একটা ঘটনা না বলে করে পারছি না। 

তখন তিনি বিরোধী দলের নেত্রী, সুধা সদনে থাকেন। তাদের এক অতি নিকটজনের গলায় কাঁটা বিঁধেছে। আমি সব যন্ত্রপাতি এবং লোকাল এ্যানেসথেসিয়া নিয়ে গেলাম। যাতে ব্যর্থ না হই। রোগীর গলা দেখে কাঁটা দেখতে পেলাম, কিন্তু খুব নিচে হওয়ায় কাঁটা বের করতে পারছিলাম না। রোগীও বিরক্ত হয়ে বললেন, ঠিক আছে বাদ দেন। হোমিওপ্যাথি খেলেই চলে যাবে। এমন সময় তিনি হাত লাগালেন, রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে গলার নিচের দিকে হাত দিয়ে উপরের দিকে ঠেলে ধরলেন, সহজেই কাঁটা আমার নাগালের ভেতরে চলে এল। এই টেকনিক সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই শিখলাম। আজও যখন কাঁটা নিয়ে একই সমস্যায় পড়ি, ঠিক তখনই সেই টেকনিক ব্যবহার করি আমার কোনো সহকারীর মাধ্যমে।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পরে, তিনি সুধা সদনে পৌঁছানোর পরই টুটুলের মাধ্যমে খবর পেলাম, ভয়ানক সেই দুর্ঘটনার কথা এবং নেত্রী অসুস্থ। দৌড়ে সুধা সদনে পৌঁছে সেদিন তার যে বিমর্ষ চেহারা দেখলাম, তা ভোলার নয়। মনে হলো, নিশ্চয়ই উনি গুরুতর অসুস্থ। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বললেন, আমাকে দেখতে হবে না, ঢাকা মেডিকেলে যাও, পারলে আমার কর্মীদের জন্য কিছু করো। নির্দেশমতো সেখানে চলে গেলাম। পরদিন তার কানের শ্রুতিহীনতার জন্য আমাকে ডাকা হলে আমি সব যন্ত্রপাতি নিয়ে সুধা সদনে গেলাম। সব পরীক্ষা শেষে বললাম, আপনার ডান কানের শুনানি তীব্রভাবে কমে গেছে পরামর্শ দিলাম, দ্রুত সিঙ্গাপুর যেতে হবে, নইলে শ্রবণশক্তি হারাবেন। তিনি বললেন, আমি চলে গেলে এসব আহতদের চিকিৎসার দেখাশুনা কে করবে? এবং তিনি গেলেন না। প্রায় এক মাস পর যখন গেলেন, অতদিনে আর করার কিছু নেই। আমি যা বলেছিলাম, সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা তাই বলল। সব শুনে প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমার প্রাণ গোপাল যা বলেছে এখানেও তো তাই বলল। নিজের দেশের একজন চিকিৎসককে তিনি বিদেশিদের সামনে এমনভাবে তুলে ধরলেন। এখান থেকে আমি তার তীব্র দেশপ্রেমের পরিচয় পেলাম। আরও অনেককেই চিকিৎসা সেবা দেয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কাজী জাফর আহমেদ, মিজানুর রহমান চৌধুরীর মতো উল্লেখযোগ্য অনেক এমপি, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও সচিবকে আমি চিকিৎসা দিয়েছি। 

সাপ্তাহিক : উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছিলেন দুই মেয়াদে। গুণী ডাক্তারদের প্রশাসনিক পদে যাওয়াটাকে কীভাবে দেখেন? এতে কি মানুষের ক্ষতি হয় না?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : উপাচার্যের দায়িত্ব নিয়ে আমি এমন কিছু কাজ করতে পেরেছি, যা আসলে চিকিৎসক ছাড়া কোনো প্রশাসনিক লোক দিয়ে সম্ভব নয়। আমি হয়তো উপাচার্য না হলে আরও কিছু রোগী দেখতে পারতাম। কিন্তু আমার সঙ্গে যেহেতু সমাজের নানা স্তরের মানুষের সংযোগ আছে, ফলে উপাচার্য হয়ে আমি বিশেষ কিছু দিতে পেরেছি, যার মূল্য কম নয়। রোগীদের সুবিধার্থে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো হাসপাতালে আসা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সেজন্য কিছু বাস দরকার ছিল। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় না গিয়ে ব্যক্তিগত সংযোগগুলো কাজে লাগালাম। চারটি ব্যাংক থেকে চারটি বাস সিএসআরের আনুকূল্যে পেয়েছি এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুদান হিসেবে পেয়েছি দুটি বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের উন্নয়নের জন্য এভাবে প্রায় ২৫ কোটি টাকার সম্পদ পেয়েছি। সব সময়ই দাতাদের বলেছি, আপনারা কিছু দেন তবে নিজেরাই কিনে দেন। ১০ কোটি টাকা পেয়েছিলাম ব্যাংক এশিয়া থেকে। এটা তারা দিতে চাইলে বললাম, টাকাটা না দিয়ে আমাদের জন্য একটা নার্সিং হোস্টেল তৈরি করে দেন। 

২৪ মার্চ ২০০৯ নিয়োগ প্রাপ্তির সপ্তাহ দুয়েক আগেই জানতে পারলাম যে, আমাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তাই নিয়োগ প্রাপ্তির আগেই জনাব ইরশাদুল হক, সিএসপির কাছে পরামর্শ নিতে গেলাম। তিনি বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ১৯৭৫ সালে সিলেটের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। যার জন্য জিয়া আমলে তাকে ইন্দোনেশিয়ায় চাকরি নিয়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমার প্রশ্ন শুনে তিনি আমাকে বললেন, অবশ্যই দায়িত্ব নেবে। প্রত্যেক সৎ মানুষই-সাহসী এবং সাহসী মানুষ চ্যালেঞ্জ নিতে পিছপা হয় না। বলেই তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. এপিজে আবদুল কালামের একটি বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দিলেন। সেটা হচ্ছে, আমি সব সময় বিশ্বাস করি কাপুরুষ কখনও ইতিহাস রচনা করতে পারে না। ইতিহাস সৃষ্টি করে মানুষ, যাদের মধ্যে সাহস এবং প্রাজ্ঞতা আছে। সাহসিকতা একক, তবে প্রাজ্ঞতা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। ইরশাদুল হক স্যার আরও বললেন, তুমি অবশ্যই আমাদের আমলাদের মতো বা সেনাবাহিনীর মতো দায়িত্ব পালন করতে যেও না। কেননা আমাদের মধ্যে এক দিনের সিনিয়র হলেও স্যার বলে সম্বোধন করতে হয়। আমাদের এবং সেনাবাহিনীর চাকরি হলো রেজিমেন্টেড। মানে কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার মাধ্যমে পরিচালিত। তোমাদের মধ্যে হলো ভাই কালচার। তুমি আমাদের মতো আচরণ করলেই, সব ডাক্তার তোমার বিরুদ্ধে এক হয়ে যাবে। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনায় আনবে না। এমনকি তুচ্ছ কারণে তোমার অপসারণ চাইতেও দ্বিধাবোধ করবে না।

উপাচার্য থাকাকালীন আমার খুব ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে। পুরাতন সবগুলো মেডিকেল কলেজে আমি গিয়েছি, ছাত্র-শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেছি। নিজেকে অনেক সমৃদ্ধ করেছি, তাদের বুদ্ধি ও পরামর্শ নিয়ে। অতীতে কোনো উপাচার্য তা করেছেন বলে আমার মনে হয় না। ঢাকায় ছিলাম এমন একটি শুক্রবার নেই, যেদিন আমি এই বিশ্ববিদ্যালয় আসিনি। রোগীও দেখেছি। উপাচার্যের কক্ষের এক পাশে কিছু যন্ত্রপাতি বসিয়েছিলাম। সকাল আটটার মধ্যে হাসপাতালে উপস্থিত থেকেছি।

সাপ্তাহিক : সরকারি কোনো চাপের মুখে পড়েছিলেন?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : সেরকম তেমন কিছু ঘটেনি। একটাই ঘটনা আছে। সংসদীয় কমিটির সভায় গিয়েছিলাম। সভাপতি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাহেব বললেন, ভিসি সাহেব, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরুন। তা করতে গিয়ে আমার কাছে দৃশ্যমান উন্নতিগুলো তুলে ধরছিলাম। বললাম, আমরা সরকারের কাছ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ১২ বিঘা নতুন জায়গা পেয়েছি, অবশ্য ১০ ভাগ দামে কিনে নিয়েছি নিজস্ব অর্থ দিয়ে এবং এ ব্লকের নিচতলার ওষুধের দোকানগুলো যা কিনা ১৯৭৫ সালের পর থেকে অন্যরা ভোগ দখল করেছেন, সেগুলো আদালতের রায়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি হয়েছে। অমনি মাননীয় সাংসদ ড. টিআইএম ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলে উঠলেন, আপনি যেভাবে ভূমি দখলের কথা বলছেন, মামলা করে জায়গা পেয়েছেন, তাতে আমার মনে হয় আপনি একজন মামলাবাজ ভিসি। আপনাকে আমি এবং ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরসহ আপনার অফিসে গিয়ে আমার মেয়ের একটা সিভি দিয়েছিলাম, আপনি তো ওই চাকরিটা দিলেন না। আরও অনেক কিছু বললেন। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এরকম কোনো কথা হতে পারে, আমি আগে ভাবিনি।

শুধু যে আমি হতভম্ব হলাম তা নয়, সংসদীয় কমিটিতে উপস্থিত প্রত্যেক কর্মকর্তাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। এমন সময় সাংসদ ইমাজউদ্দীন প্রামাণিক মুখ খুললেন। তাকে আমি আগে কখনও দেখিনি। আমার রোগী ছিলেন বলেও মনে হয় না। তিনি ফ্লোর নিয়ে বললেন, আমি বিস্মিত, আমার মতোই একজন এমপি নিজের মেয়ের চাকরির জন্য একজন উপাচার্যকে এভাবে কি অপমান করতে পারি? এ ব্যাপারটা কার্যবিবরণীতে থাকা উচিত না। তিনি যেভাবে সাহসের সঙ্গে কথাগুলো বললেন, তাতে আমি মনে মনে তাকে প্রণাম জানালাম। সাংসদের বক্তব্যের পর সাহস করে আমি যুক্তি দিচ্ছিলাম, কেন আমি চাকরি দিতে পারিনি, তখন ফজলে রাব্বি চৌধুরী আবারও বললেন, তিনি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কী কী উচ্চপদে আসীন ছিলেন, কত বছর একাডেমিক কাউন্সিল বা সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন, ইত্যাদিসহ যোগ্যতার ফিরিস্তি।

এর কোনো জবাব দিতে পারলাম না। তবে আজ আমি এটুকু বলতে পারি, উপাচার্য হিসেবে আমার সময়ে আমি দুই শতাধিক মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দিয়েছি। আমার মেয়ে, দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করেছে। তাকে আমি চাকরি দেইনি। সে পরীক্ষায় আরেকজনের সঙ্গে সমান নম্বর পেয়েছিল। মেয়েকে বাদ দিয়ে তাকেই নেয়া হয়েছিল। কষ্টে মেয়ে আমার সঙ্গে কিছুদিন কথা বলেনি। আমার পুত্রবৎ জামাই ঢাকা মেডিকেলের গ্রাজুয়েট। বঙ্গবন্ধুতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দরখাস্ত করেছিল, ইন্টারভিউ দিয়েছিল, আমি তাকে নিতে দেইনি। আমার স্ত্রী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে সহযোগী অধ্যাপক গাইনি ছিল, তাকে ইচ্ছা করলেই আমি বঙ্গবন্ধুতে অধ্যাপক হিসেবে চাকরি দিয়ে ৬৫ বছর পর্যন্ত চাকরি করাতে পারতাম বরং এই সরকারের আমলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যখন তার পদোন্নতি হয়নি, তখন চাকরি শেষ হওয়ার তিন বছর আগে তাকে অবসর নিয়ে চলে আসতে বলি। সে আমার কথা রেখে অবসর নেয়ায়, আমি কৃতজ্ঞ। যাই হোক, এটাকে আমি চাপ মনে করি না। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা একটা দুর্ঘটনা। 

সাপ্তাহিক : আগামী জীবনের পরিকল্পনা কি? বর্ণাঢ্য জীবনের সফলতাকে কীভাবে দেখেন, ব্যর্থতা কোনগুলোকে মনে করেন? 

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : প্রধানমন্ত্রী তনয়া পুতুলের প্রত্যক্ষ পরামর্শে ডিফারেন্টলি অ্যাবল চিলড্রেনদের নিয়ে বেশ কিছুকাল ধরেই কাজ করছি। এটাকে আমি আরও এগিয়ে নিতে চাই। পুতুলের প্রশংসা না করে পারব না। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও আমাদের অনেকের শ্রমের ফলে দেশের মানুষের কাছে আমরা অটিজম আক্রান্ত এবং অন্য কিছু রোগ যেমন অন্ধত্ব, বধিরতার মতো রোগে আক্রান্ত শিশুদের পক্ষে বিরাট সচেতনতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। অটিজম আছে এমন ব্যক্তিদের আর্থ-সামাজিক বাধা মোকাবিলায় ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ভূমিকা নিয়ে আমরা কাজ করছি। করণীয় নির্ধারণ করে প্রচার চালানো হচ্ছে। অটিজম স্পেকট্রাম ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও জরুরি পদক্ষেপ নিতে কাজ চলছে। এই কাজগুলোকে এগিয়ে নিতে চাই। অনেকেই আমাকে বাস্তব স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে গবেষণা করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। এটা নিয়েও আমার আগ্রহ আছে। যোগ্য সহযোগী পেলে এই কাজটিও এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখি।

সফলতার কথা আগেই বলেছি। মূল সফলতা হচ্ছে একজন অধ্যাপক হতে পারা, ছাত্রদের প্রিয়ভাজন হতে পারা। তবে আমরা যারা ষাট দশক ও মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, সেই মহান সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, স্বাধীনতা শব্দটা আমাদের কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান রাখার জন্য ২০১২ সালে যখন স্বাধীনতা পদকের জন্য মনোনীত হয়েছি শুনলাম, সেটা আমাকে এমন আনন্দ দিয়েছিল যে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সেদিন শুধু বাবার কথা মনে পড়েছিল। বাবার জন্যই আজ আমি ডাক্তার। কিন্তু বাবা আমাকে ডাক্তার হিসেবে দেখে যেতে পারলেন না। আমি স্বাধীনতা পদক পেয়েছি জানলে তিনি কতই না খুশি হতেন! আর ব্যর্থতা তো অনেকই আছে। বড় ডাক্তার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি, কিন্তু নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পারলাম না, এটা আজও আমাকে কষ্ট দেয়। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আদৌ কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তনও আনতে পারিনি, যদিও অত যোগ্যতা আমার নেই। তবু মনে হয়, তাহলে আর কী করলাম।

সাপ্তাহিক : মৃত্যুভাবনা কি কখনও আপনাকে নাড়া দেয়?

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত : মৃত্যুর কথা আমি ভাবি না। একদিন মরতে হবে এটা জানি। যা জানি তা নিয়ে আমি বিচলিত বা দুশ্চিন্তায় থাকতে চাই না। তবে ছেলেটাকে নিয়ে চিন্তা হয়, তার একটা সুগতি দেখে যেতে পারলে পিতার কর্তব্য পালন করতে পেরেছি ভেবে শান্তি পেতাম। এখনও যেসব কাজ করার স্বপ্ন দেখি, সেগুলোকে এগিয়ে নিতে চাই। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য, দেশের গরিব মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সারা জীবন কাজ করে যেতে চাই। এখনও লেগে আছি, সেই কাজেই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি। সবার কাছে আশীর্বাদ ও দোয়া চাই যেন এ কাজে লেগে থেকেই জীবনপর্ব শেষ করতে পারি।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান                     

ছবিঃ কাজী তাইফুর ও সংগ্রহ

প্রকাশঃ ২৮/০৮/২০১৬ইং                                                                                                                                                                                                                      

সূত্রঃ সাপ্তাহিক

                                                                       

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত


আরো সংবাদ


তিনি একজন কার্ডিয়াক সার্জন

তিনি একজন কার্ডিয়াক সার্জন

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ১৫:৪১









জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর