ঢাকা      রবিবার ২৫, অগাস্ট ২০১৯ - ১০, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডাঃ রোকনুজ্জামান

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ। 


নবীন ডাক্তারদের জন্য কিছু পরামর্শ

আপনাদেরকে নিয়ে অনেকেই অনেক পরামর্শ দিচ্ছেন। সকলের একই উদ্দেশ্য। আমাদের জুনিয়ররা যেন ভালো থাকে। প্রিয় ভাই বোনেরা, এতটুকু ভেবে অন্তত খুশি হতে পারেন যে, এই এত বড় একটা ডাক্তার সোসাইটির অনেক ব্যস্ত মানুষ আপনাদেরকে ভালোবাসেন! আপনাদেরকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন! আপনাদের প্রতি সহমর্মিতা আছে! যে যতটুকু পারছেন আপনাদেরকে পরামর্শ দিচ্ছেন।

আমরা জানি আপনাদের কিছু হতাশা, দুঃখ, কষ্ট আছে। আমাদেরও আছে। এখন তো সবাই কমবেশি ভুক্তভোগী। কিন্তু আশার কথা হলো, চিকিৎসকরা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। এটা আপনাদের জন্য আশার আলো। আপনি সমস্যায় পড়লে চাইলেই কাউকে বলতে পারছেন। এটাকে ছোট করে দেখবেন না। বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম একজন ব্যাক্তি মাশরাফির আচরনের প্রতিবাদে এই পর্যন্ত চিকিৎসকরা যা করেছেন সেটা হয়তো খুব বেশী না। কিন্ত এটাও জেনে রাখেন যে, এখন থেকে পাঁচ বছর আগে চিকিৎসক খুন হলেও আমরা এতটা করতে পারিনি।

কিভাবে চলবেন, কিভাবে বলবেন, কী পরবেন, কিভাকে হাটবেন, বসদের কিভাবে ম্যানেজ করবেন.... এগুলো নিয়ে অনেক পোস্ট দেখেছেন। আমি ওদিকে যাচ্ছি না। আমি আমার জীবন থেকে নেয়া দুই একটা কথা বলছি। এগুলোকে উপদেশ ভাবার দরকার নেই। একজন সিনিয়রের বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবেই দেখতে পারেন। তবে চাইলে অনুরোধ হিসেবেও নিতে পারেন।

১. কর্মস্থলে নিয়মিত হতেই হবে। দুইটা বছর মানুষকে সেবা দেন। এটার প্রতিদান পাবেনই। 

২. অফিস টাইমে আসা এবং শেষে যাওয়া। আপনি হয়তো কাউকে দেখবেন এসব নিয়ম না মেনেও আরামে আছে। তারা আপনাকে ইনসিস্ট করলেও কান দিবেন না।

৩. আউটডোরে একসাথে একজনের বেশী রোগী দেখবেন না। আপনার রুমে একজনের বেশী রোগী থাকবে না। প্রথম দিকে সমস্যা হবে। আর যারা একসাথে দশজন করে দেখছেন তারা ডিমোরালাইজ করার চেষ্টা করবে। তবে একটু কষ্ট করে যদি তিন মাস এটা করতে পারেন, আমি নিশ্চিত রোগীরাই এটা বুঝে যাবেন আপনি তাদের ভালো চান। এরপর রোগীরাই আপনাকে সাহায্য করবেন।

৪. আপনার টেবিলের সামনে যে চেয়ার আছে ওটা রোগী কিংবা ভিজিটরদের বসার জন্য। যে লোকই আসুক আপনি তাদেরকে বসতে বলবেন। আপনার সামনের চেয়ার ফাঁকা থাকলে কেউ যেন দাঁড়িয়ে কথা না বলে। আপনার সামনে একজন লোক দাঁড়িয়ে কথা বলছেন; এতে গর্বিত হওয়ার কিছুই নেই। ‘আপনি বসুন’ কিংবা,  ‘দাঁড়িয়ে কেন; বসে কথা বলুন’ -এই একটু কথাতেই রোগী সম্মানিত বোধ করবেন। শুধু এতটুকু কথাই ওদেরকে হয়তো সারাজীবনে কেউ কোনোদিন বলেননি! এতে করে আপনাকে সম্মান দিতে তারা কার্পণ্য করবে না।

৫. সবসময় মনে রাখা উচিত, আপনার রোগী এবং আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা এক নয়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আপনাকে অসংখ্য মানুষের চেয়ে ভালো রেখেছেন। কত মানুষকে আপনার দারস্থ করে দিয়েছেন। তাদেরকে নীচু মনে করা অহংকার। তার চাইতে আপনার বিনয়ী হওয়া বেশী উচিত। আপনি বিনয়ী হলে রোগীরাও বিনয়ী হয়ে যাবে। এটা নিশ্চিত থাকতে পারেন।

৬. কোম্পানির লোকদেরকে অবশ্যই সম্মান করবেন। ওদের বেশীর ভাগই ভদ্র এবং মার্জিত। একটা মাস্টার্স পাশ ছেলে তার চাকরির কারনেই আপনার দরজায় এসেছে। কখনোই তাদেরকে অপমান করে খারাপ ভাবে তাড়িয়ে দিবেন না। তবে ওদের সাথে কতটুকু মিশতে হবে এটা নিজেকেই বুঝতে হবে।

৭. ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে বেশী সম্পর্ক রাখার দরকার নেই। কোনো রোগীকে কখনো বাইরে পরীক্ষা দিতে হলে এবং রোগী জানতে চাইলে শুধুমাত্র একটার নাম না বলে মোটামুটি কয়েকটার নাম বলতে পারেন। তবে সবার শেষে- "আমি সবাইকে জানিনা। আপনি যেখানে ইচ্ছা যেতে পারেন" কথাটা বলা যেতে পারে। 

রোগীকে বাইরে পাঠালে কিছু ডিসকাউন্ট লিখে দিতে পারেন। এটা নিয়ে অনেক যুক্তি তর্ক থাকতে পারে। তবে আমার কাছে এটাকেই সবচেয়ে মার্জিত মনে হয়।  আপনি যদি এটা প্র্যাকটিস করতে পারেন, সর্বোচ্চ ছয় মাসেই  প্রতিটা সেন্টারের সবচেয়ে খারাপ লোকটাও অল্প কয়েক দিন পর থেকেই আপনাকে সম্মান করতে শুরু করবে।

যদি জরুরি কোনো রোগীকে কখনো 'ফ্রী' লিখে দেন, ওরা অনেকেই ফ্রী করে দিবে। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লোকদের সাথে রাগারাগি করার দরকার নেই। কেউ আসলে বলতে পারেন- "ভাই। আমার রোগী গেলে আপনারা একটু ডিসকাউন্ট দিবেন পারলে।"

সবশেষে আরও কয়েকটি কথা:

এক. বর্তমানে চিকিৎসকরা কোণঠাসা। আপনি চাইলেই মানুষের এই ধারণা রাতারাতি পাল্টাতে পারবেন না। তবে আপনার নিজের সম্পর্কে রোগীর ধারনা খুব সহজেই পজিটিভ করতে পারেন। এটুকুই করেন আপাতত! আর, বিভিন্ন প্রপাগাণ্ডায় রোগী আমাকে খারাপ মনে করতে পারে। আপনাকে যেন খারাপ না ভাবে। 

দুই. আমার লেখা নিয়ে কারও অভিযোগ থাকলে দয়া করে বাজে কথা বলবেন না। কারও খারাপ লাগলে, একজন আনস্মার্ট এবং বোকার প্রলাপ বলে এড়িয়ে যাবেন। 

তিন. এদেশের বেশিরভাগ লোকই চিকিৎসকদের ব্যাক্তিগতভাবে সম্মান করেন। ফেসবুকের কমেন্ট কিংবা পোস্ট বেশিরভাগ লোকের কথা নয়। ফেসবুকের বাইরেও একটা বড় জগৎ আছে। আর ফেসবুকে যারা বাজে ভাষায় আক্রমণ করে ওরা হয়তো ওদের মা বাবাকেও গালি দেয়। ওদের কমেন্ট পড়ে সবাইকে শত্রু ভাবার দরকার নেই।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:

পারলে মনে রাখবেন, সম্পর্কটা আপনার সামনে বসা নির্দিষ্ট রোগীটির সাথে নিতান্তই আপনার নিজের ব্যাক্তিগত সম্পর্ক! ফেসবুকের সবার সাথে নয়। ফেসবুকের সবাই আপনাকে বিচার করছে না। আপনার সামনে ঠিক এই মুহুর্তে যিনি বসে আছেন, তিনি প্রথম দর্শনেই আপনাকে চিনে ফেলছেন হয়তো। এটা ভাবা খুবই জরুরী।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবস্থাপনায় মশারীর বিকল্প প্রস্তাব

ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবস্থাপনায় মশারীর বিকল্প প্রস্তাব

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য সব সরকারি হাসপাতাল এবং কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল…

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কিছু প্রস্তাবনা

বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি প্রক্রিয়া ও কিছু প্রস্তাবনা

কিছুদিন পরেই সকল সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজসমূহে ভর্তি পরীক্ষা। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সাথে সাথে…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর