ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


অবৈধ আয় আর নেশায় বুঁদ সবাই!

তিন জন লোকের প্রবেশ, বয়স এভারেজ ৩৭ কি ৩৮। এরমধ্যে একজন আমার পূর্ব পরিচিত, ওনার স্ত্রী ও বাচ্চাকে আগে দেখিয়েছেন, আমাকে খুব পছন্দ করেন। তিনিই তার দু বন্ধুকে নিয়ে এসেছেন। আউটডোর ভীড় শেষে সবাই চলে গেলে তারা তাদের সমস্যা বলা শুরু করেন। সমস্যা গোপন, গুরুতর তো বটেই! তারা সবাই ইয়াবাসক্ত!

নিজের মুখেই স্বীকার করলেন। প্রত্যেকে বিবাহিত, ছেলেময়েও আছে। আমার কাছে আসলেন যে সমস্যা নিয়ে সেটা হল, 'দিনের বেলা প্রচুর ঘুম পায়, ক্লান্ত থাকেন অনেক, ঘুমের চাপে স্বাভাবিক কাজ পর্যন্ত করতে পারেন না, তাই ঘুম কিভাবে তাড়ানো যায় আর ক্লান্তি কমবে কিসে?'

Narcolepsy! সব শুনে প্রথম কথা, "ইয়াবা বাদ।" শুরুতেই তাদের এক গল্প শোনাই, এক স্যারের গল্প, প্রফেসর প্রাণ গোপাল দত্ত স্যার। তার জীবনের গল্প। বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফেরার সময় বন্ধুর পাল্লায় পড়ে রিকসায় দুজন সিগারেট ধরিয়েছিলেন। উল্টো পথে আসা তার বাবা সেটা দেখে ফেলেন। বাবা এসে আজ পিটিয়ে তক্তা বানাবেন! ভয়ে তাই লুকোন গিয়ে দাদীর কাঁথার তলে৷ দাদী বাবার সামনে স্যারের হাত নিজের মাথায় নিয়ে শপথ করান আর কোনদিনও ধূমপান না করার! ব্যস সেই প্রথম, সেইই শেষ, জীবনে আর কোনদিন ধূমপান করেননি।

বাড়িতে গিয়ে বাচ্চার মাথায় হাত দিয়ে শপথ করবেন, আর কোনদিন ইয়াবা খাবেন না। শরীরের যত যা সমস্যা এর জন্যই হচ্ছে, এটা বন্ধ তো সব কিছু ঠিকঠাক।

শহরের মত মফস্বলগুলোতেও নেশার অবস্থা ভয়াবহ। মাদক দ্রব্যের সহজলভ্যতা যার জন্য মূলত দায়ী। দোকান থেকে কিছু কিনতে গেলে প্রায়শই কোনা পুড়ানো বিশ টাকার নোট পেতাম, পরে শুনি এগুলো নাকি ইয়াবা সেবনে ব্যবহৃত! হাসপাতাল এরিয়ার ভিতর নির্জন জায়গাগুলো সন্ধ্যার পর মাদক সেবনের নিরাপদ জায়গা! এগুলোর সাথে জড়িত থাকে এলাকার উঠতি বয়সি বখাটে আর কিছু আতি পাতি নেতা, যাদের ছত্রছায়ায় বিস্তৃত হয় মাদকের রাজ্য!

অনেক মানুষ দেখি গাল ভাঙা, চোখ ঠাসা, হ্যাংলা পাতলা, ঝিমুনি ভাব আর তিরিক্ষি মেজাজের। এদের শরীরের বাইরের অবস্থা এমন, না জানি ভিতরের অবস্থা কেমন! MI, stroke, HTN, liver kidney disease, anxiety, depression, psychoses এ আক্রান্ত হচ্ছে, হচ্ছে অকাল মৃত্যু, শেষ হচ্ছে কতশত পরিবার। মহামারীর মত একজন থেকে অন্যজনে বিস্তৃত হচ্ছে নেশা। অনেক নেশাকারী নেশার জমজমাট ব্যবসাও ফেঁদে বসেছেন। সমাজ সংসার নিয়ে যাদের কোন চিন্তা ভাবনা নেই, অবৈধ আয় আর নেশায় বুঁদ সবাই!

আর একটা সহজলভ্য নেশা হল গাঁজা। হাসপাতালের পিছন দিয়ে কোয়ার্টারে যাওয়ার পথে পুরনো বিল্ডিং এর কোণায় প্রায়শই কিছু ছেলেপেলে দেখি আর সাথে বিশ্রি গন্ধ! এই ছেলেগুলো এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় বাইক দিয়ে হাসপাতালের গেট আটকে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রতিবাদ করায় সে কি আগ্রাসী মূর্তি, conjunctival injection হয়ে সব কটার লাল লাল চোখ! কথা বার্তায় থোরাই কেয়ার, euphoria is in it's highest level! সাইকোসিস হয়ে মারমুখি ভাব! কিসের কি, কোথাকার কোন ছার, hallucination এর রাজ্যে তারা নিজেরাই সব রাজা! রাজা হতে হতে এ ছেলেগুলো যে একদিন Schizophrenia তে আক্রান্ত হবে না তা বলা মুশকিল!

নেশার বিস্তৃতি রোধে প্রয়োজন যথাযথ নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা। আমরা আমাদের ভাই বোন সন্তানকে পরিবার থেকেই যেন এ শিক্ষাটুকু দিই, খেয়াল রাখি তাদের দিকে। আর চিকিৎসক হিসেবে এসবের ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে তাদের কাউন্সেলিং করাটাও আমাদের দায়িত্ব। ধন্যবাদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর