ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১২ ঘন্টা আগে
ডা. মাহিদ

ডা. মাহিদ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ


২৮ অগাস্ট, ২০১৬ ১০:৫৫

"স্যার, বি ভাইরাস হইলে কিডনি দেওন যাইবো না?"

স্যার, বি ভাইরাস হইলে কিডনি দেওন যাইবো না?

"স্যার, বি ভাইরাস হইলে কিডনি দেওন যাইবো না?"
রুমে ঢুকেই রোগীর প্রথম প্রশ্ন।

আমি হাসতে হাসতে তার নাম ধাম জিগেস করে তারপর বললাম, কিডনী নিয়ে এত গবেষনা করতে কে বলেছে? আপনার শারীরিক সমস্যাগূলো বলেন, আগে আপনার সমস্যা সমাধান হোক, তারপর কিডনী নিয়ে কথা বলব।

"স্যার আমি সুস্থ্য, আমার কোন সমস্যা নাই"
-তাহলে ডাক্তারের কাছে?......
"স্যার অসুস্থ্য তো আমার বাবা, আমি না। "
- রোগীকে আনেন নাই যে? আর তাইলে এতক্ষন আপনার নাম লিখলাম কি মনে করে? আপনার বাবার নাম বলেন।

"স্যার, বাপ তো হাসপাতালে ভর্তি। বাপের কিডনী ড্যামেজ। আমি নিজের একটা কিডনী বাপেরে দেওয়ার জন্যে পরীক্ষা করতে গিয়ে শুনি আমার হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আছে। আমি কিডনী দিতে পারুম কিনা এটা জানতে আপনেগো এইখানে পাঠাইসে"

আমি কিছুক্ষন এর জন্য বোবা হয়ে গেলাম।
লোকটার বয়স ৩৫ বছর, বাবার বয়স প্রায় ৭০।
লোকটার চোখ ছলছল করছে, কিন্তু কাঁদছে না।

বললাম, আপনি ইয়াং মানুষ, অনেক বছর আপনার জীবন পড়ে আছে, আপনি এভাবে নিজের জীবনকে রিস্কে ফেলছেন.....
আমার কথা শেষ না হতেই লোকটা জবাব দেয়া শুরু করলো..

"স্যার, হায়াত ময়ুত আল্লাহর হাতে। আমি যে কাইলকা পর্যন্ত বাঁইচা থাকুম তার তো কোন গ্যারান্টি নাই। কিন্তু আমার দুইটা কিডনী পইড়া থাকবো আর আমার বাপ একটা কিডনীর অভাবে মারা যাইবো? আমার শইল্লে রক্ত মাংস সব ই তো বাপ মার। হেরাই যদি না থাকে, আমি থাইকা লাভ কি কন স্যার?"

এতক্ষনে আর লোকটার চোখ শুকনো নেই। অঝোরে কাঁদছে। যেন চোখ থেকে বানের পানি বাঁধ ভেংগে বেরিয়ে আসছে। আমি বোবা হয়ে গেলাম। সান্তনা দেয়ার ভাষা ও ভুলে গিয়েছিলাম।

পাপাচার অনাচারের পৃথিবীটা দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের এত পাপের পর ও খোদা কেন দুনিয়ায় আজাব না দিয়ে এত দিব্যি ভাল থাকার সুযোগ দিয়ে রেখেছেন।
এই মানুষটাকে দেখে মনে হল, এমন কিছু ভাল মানুষ বেঁচে আছে বলেই পৃথিবী নামক গ্রহটি এখনো টিকে আছে, এমন কিছু মানুষের জন্যই বাবা মায়েরা জীবনভর যে কষ্ট করেন তা স্বার্থকতা পায়।

সব কিছু মনযোগ দিয়ে শোনার পর হিস্ট্রি কমপ্লিট করে স্যারের কাছে লোকটাকে পাঠিয়ে যখন বিদায়ী সালাম দিলাম, কি মনে করে আবার পেছনে এসে আমার ডান হাত ধরে আবার ও কেঁদে উঠলো, "স্যার, আমার বাপের জন্য দুয়া কইরেন, আমার চোখের সামনে যেন বাপটাকে মরতে না হয়। আমার কিডনী টা যাতে স্যারেরা নেয়। আমার আর কোন চাওয়া পাওয়া নাই"

আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু মন থেকে দুয়া করলাম। আপনারা দুইজনই বেঁচে থাকুন আরো অনেকদিন। যেন আপনাদের দেখে আমরাও ধরনীতে অর্থবহ জীবনের প্রেরনা পাই....

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত