ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ৩১, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. এবিএম কামরুল হাসান

এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি এন্ড মেটাবলিজম), 
সহকারী রেজিস্ট্রার, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

 


ডায়াবেটিস রোগীর রোজা-পর্ব: ৩

রোজায় ডায়াবেটিসের ওষুধ সমন্বয়

রোজায় খাবার গ্রহণের সময়, ধরণ এবং পরিমাণে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এ অবস্থায় সঙ্গত কারণেই ডায়াবেটিসের ওষুধের সমন্বয় করা জরুরি। খাবার গ্রহণের সময়ের সঙ্গে মিল রেখে ওষুধ গ্রহণের সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওষুধের মাত্রা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওষুধের ধরণ পরিবর্তন করতে হয়। 

রক্তে সুগারের আধিক্য বা স্বল্পতা কোনোটিই কাম্য নয়; রোজায় ডায়াবেটিসের ওষুধ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে  সুগার-স্বল্পতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। তাই যে সকল ডায়াবেটিস রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি বেশি—তাদের এমন ওষুধ দিতে হবে, যার হাইপোগ্লাইসেমিয়া করার প্রবণতা কম; এ কাজটি রোজার কয়েক সপ্তাহ পূর্বেই করতে হবে। আর রোজার ঠিক আগে সুগার কতটুকু নিয়ন্ত্রণে আছে, সে বিষয়টিও রোজায় ওষুধ নির্বাচন ও সমন্বয়ের সময় বিবেচনায় রাখতে হবে। রমজানের প্রথম ও শেষ দিনে ওষুধকে সমন্বয় করে নিতে হবে, কারণ এই দুদিনেই খাবার ও জীবনযাত্রার বিশেষ পরিবর্তন হয়ে থাকে।

মেটফরমিন: 
মেটফরমিনে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে। রোজায় মেটফরমিনের ডোজ কমাতে হয় না। যারা রোজার আগে সারাদিনে একবার মেটফরমিন খেতেন (বিশেষ করে এক্সটেন্ডেড রিলিজ মেটফরমিন), তারা সমপরিমাণ ডোজ ইফতারের সময় খাবেন। দিনে দু’বার খেয়ে থাকলে তা ইফতার ও সেহরিতে খাবেন, দিনে তিনবার খেয়ে থাকলে সারাদিনে যে ডোজ লাগে রোজার সময় তার ২/৩ ভাগ ইফতারের পর এবং বাকি ১/৩ ভাগ সেহরির পর খেতে হবে। 

সালফোনাইল ইউরিয়া:
সালফোনাইল ইউরিয়া গ্রুপের হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি বেশি, বিশেষ করে প্রথম জেনারেশন (যেমন: গ্লিবেনক্ল্যামাইড) ওষুধের ক্ষেত্রে। আধুনিক সালফোনাইল ইউরিয়াতে (যেমন: গ্লিমেপেরাইড, গ্লিক্লাজাইড এমআর) হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম, তবে একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নয়। 
যারা দিনে একবার সালফোনাইল ইউরিয়া ওষুধ (যেমন: গ্লিমেপেরাইড, গ্লিক্লাজাইড এমআর) খান, তারা একই ওষুধ ইফতারের শুরুতে (রোজা ভাঙার সময়) একটু কম করে খেতে পারেন।
যারা দিনে ২ বার সালফোনাইল ইউরিয়া ওষুধ (যেমন: গ্লিক্লাজাইড এবং গ্লিপিজাইড) খান, তারা একই ওষুধ সকালের মাত্রাটি ইফতারের শুরুতে (রোজা ভাঙার সময়) এবং রাতের মাত্রাটি অর্ধেক পরিমাণে সেহরির আগে খেতে পারেন। 

ডিপিপি-৪ ইনহিবিটরস বা গ্লিপ্টিন: 
ভিলডাগ্লিপ্টিন, সিটাগ্লিপ্টিন ও লিনাগ্লিপ্টিন জাতীয় ওষুধ একই মাত্রায় রাতের যে কোনো সময়ে খেতে পারেন, তবে ইফতারের সময় খাওয়াই ভাল। এটি আহারের আগে বা পরে যে কোনো সময় সেবন করা যায়। এই ওষুধগুলোতে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি কম।

রিপাগ্লিনাইড, নেটিগ্লিনাইড:
এ ধরণের ওষুধ রোজার আগের সমপরিমাণ সকালের ডোজ ইফতারের শুরুতে ও রাতের ডোজের সমপরিমাণ (একটু কম খাওয়া যেতে পারে) সেহরির আগে খেতে পারেন। সন্ধ্যা রাতে খাবার খেলে তার আগেও এই ওষুধ খেতে হবে। এই ওষুধগুলোতে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি আছে, তবে তা সালফোনাইল ইউরিয়া জাতীয় ওষুধের তুলনায় কম।

পায়োগ্লিটাজোন:
এই ওষুধ একই মাত্রায় রাতের যে কোনো সময় খেতে পারেন, তবে ইফতারের সময় খাওয়াই ভালো; এটিও আহারের আগে বা পরে যে কোনো সময় সেবন করা যায়। এই ওষুধে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে।

ভগ্লিবোজ, একারবোজ:
এ ধরণের ওষুধ রোজার আগের ডোজের সমপরিমাণ রোজার সময় সেবন করা যায়।  বিশেষ করে ইফতারের সময় বেশি খাওয়ার ক্ষেত্রে এ জাতীয় ওষুধ ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। রোজার দুই মূল খাবার, ইফতার ও সেহরিতে এটি সেবন করা যেতে পারে।

ফ্লজিনস: 
এম্পাগ্লিফজিন, ডাপাগ্লিফ্লজিন ও কানাগ্লিফ্লজিন জাতীয় ওষুধ পানিশূন্যতা করতে পারে, বিশেষ করে যারা একইসাথে ডাইইউরেটিক জাতীয় ওষুধ সেবন করেন। রোজায় এ ওষুধ ব্যবহারে নিষেধ নেই, তবে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যাদের পানিশূন্যতার ঝুঁকি আছে, তাদের ব্যবহার না করাই ভালো। যারা সেবন করে যাবেন, তারা ইফতারের সময় এটি সেবন করবেন; ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত একটু বেশি পরিমাণ পানি ও অন্যান্য তরল পানীয় পান করতে হবে। এই ওষুধগুলোতে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি কম।

ইনসুলিন:
যে সকল রোগী ইনসুলিন গ্রহণ করেন, রোজার আগেই তাদের ইনসুলিনের ধরণ ও মাত্রা ঠিক করে নিতে হবে। ইনসুলিন গ্রহণকারী রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আগের দিনের হিউম্যান ইনসুলিনের চেয়ে আধুনিক এনালগ ইনসুলিনগুলোর হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তাই রোগীর আর্থিক সামর্থ থাকলে রোজার সময় হিউম্যান ইনসুলিনের পরিবর্তে এনালগ ইনসুলিন ব্যবহার করা যেতে পারে। রোজায় বিভিন্ন ধরণের ইনসুলিনের মাত্রা বিভিন্নভাবে সমন্বয় করতে হয়।

ব্যাজাল (দীর্ঘমেয়াদি) ইনসুলিন: 
এর মধ্যে রয়েছে: ডিগ্লুডেক (ট্রেসিবা), গ্লারজিন (ল্যান্টাস), ডেটিমির (লিভেমির), এনপিএইচ (ইনসুলাটার্ড)। যারা দিনে একবার এই ধরণের ইনসুলিন নেন, তারা রোজার আগের ডোজের ১৫-৩০% কম ডোজ ইফতারের সময় নিবেন। যারা দিনে দুইবার এই ধরণের ইনসুলিন নেন তারা রোজার আগের সকালের ডোজের সমপরিমাণ ইফতারের সময় এবং রাতের ডোজের ৫০% সেহরির সময় নিবেন। এ ধরণের ইনসুলিন খাবার গ্রহণের সময়ের সাথে সম্পর্কিত নয় এবং আহারের আগে বা পরে যে কোনো সময় নেয়া যায়।

রেগুলার ইনসুলিন (একট্রাপিড) ও অতিদ্রুত কার্যকরি ইনসুলিন এনালগ, যেমন: এসপার্ট (নভোর্যাুপিড), লিসপ্রো (হিউমালগ), গ্লুলিসিন (এপিড্রা) প্রতিবার খাবার আগে নিতে হয়। রোজার আগের সকালের ডোজের সমপরিমাণ ইনসুলিন ইফতারের শুরুতে এবং রাতের ডোজের ২৫-৫০% কম ডোজ সেহরির শুরুতে নিতে হবে। ইফতারের পর আগের রাতে খাবার খেলেও তার আগে এ ধরণের ইনসুলিন নিতে হবে। এক্ষেত্রে ডোজ নির্ভর করবে খাবারের পরিমাণ ও ধরণের উপর। তবে সেটা রোজার আগের দুপুরের ডোজের চেয়ে একটু কম হতে পারে।

প্রি-মিক্সড ও কো-ফরমূলেশন ইনসুলিন, যেমন: হিউম্যান প্রি-মিক্সড ৩০/৭০ বা ৫০/৫০ (মিক্সটার্ড), এনালগ প্রি-মিক্সড (নভোমিক্স ৩০, হিউমালগ মিক্স ২৫/৭৫ বা ৫০/৫০), কো-ফরমুলেশন ইনসুলিন রাইজোডেগ। যারা দিনে একবার এই ধরণের ইনসুলিন নেন, তারা রোজার আগের ডোজের সমপরিমাণ ইফতারের আগে নিবেন। যারা দিনে দুইবার এই ধরণের ইনসুলিন নেন, তারা রোজার আগের সকালের ডোজের সমপরিমাণ ইফতারের আগে এবং রাতের ডোজের ২৫-৫০% কম সেহরির আগে নিবেন।

প্রি-মিক্সড, রেগুলার, এবং অতিদ্রুত কার্যকরি এনালগ ইনসুলিন অবশ্যই আহারের আগে নিতে হবে। অতিদ্রুত কার্যকরি ইনসুলিন, এনালগ প্রিমিক্সড ও কো-ফরমূলেশন ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই খাওয়া শুরু করা যায়, তাই রোজায় এটি অধিক গ্রহণযোগ্য। 

হিউম্যান প্রি-মিক্সড ও রেগুলার ইনসুলিন আহারের অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইঞ্জেকশন নিতে হয়, যা ইফতারের সময় একটু কঠিন মনে হতে পারে। অনেকেই রোজা রেখে ইনসুলিন নিতে চাইবেন না, যদিও চামড়ার নিচে ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না বলে আলেমগণ ফতোয়া দিয়েছেন। আবার ইফতারের বেশি আগেই ইনসুলিন নিয়ে ফেললে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ইফতারের সময় শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরণের ইনসুলিন নিয়ে পানি ও অন্য পানীয় পান করে মাগরিবের নামাজ পড়ে তারপর বাকি খাবার খাওয়া যেতে পারে।

প্রথম যে রাতে সেহরি খেতে হবে অর্থাৎ ১ম রোজার আগের দিবাগত রাতের ডিনারের আগে ইনসুলিন অন্যদিনের চেয়ে একটু কম করে নিতে হবে (অর্ধেক নেয়া যেতে পারে), আর সেহরির সময় রোজার সময় নির্দেশিত ডোজ নিতে হবে, যা আগেই আলোচনা করা হয়েছে।

রোজায় সুগার টেস্ট ও ইনসুলিন দেয়া নিয়ে বিজ্ঞ আলেমদের অভিমত:
ডায়াবেটিস রোগীরা দিনের বেলাতেও প্রয়োজনে সুগার টেস্ট করতে পারবেন এবং চামড়ার নিচে ইনসুলিন নিতে পারবেন। সারা বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদগণ এটিকে বৈধ বলে ফতোয়া দিয়েছেন; এতে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।

কখন সুগার পরীক্ষা করতে হবে?
দিনে-রাতে কতবার সুগার পরীক্ষা করতে হবে তা অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। মুখে খাওয়ার ওষুধের খাওয়ার চেয়ে ইনসুলিন ইঞ্জেকশনের ক্ষেত্রে বেশি ঘনঘন সুগার পরীক্ষা করতে হয়। ইফতারের ১ ঘণ্টা আগে ও ২ ঘণ্টা পর, সেহরির ১ ঘণ্টা আগে ও ২ ঘণ্টা পর, দিনের আগের ভাগে, এবং দুপুরের পর রক্তের সুগার পরীক্ষা করা যেতে পারে। যখনই হাইপোগ্লাইসেমিয়ার উপসর্গ দেখা দিবে, তখনই সুগার পরীক্ষা করতে হবে।

রোজা ভেঙে ফেলতে হবে, যদি:
১. সুগারের পরিমাণ কমে যায় (৩.৯ মিলিমোল/লিটার বা তার কম), 
২. সুগারের মাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে (১৬.৭ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশি) প্রস্রাবে কিটোন বডি পরীক্ষা করতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, 
৩. হঠাৎ অসুস্থতায়, যা জীবনহানির কারণ হতে পারে, 
৪. হাইপোগ্লাইসেমিয়ার উপসর্গ দেখা দিলে এবং যদি গ্লুকোমিটারে সুগার মাপার ব্যবস্থা না থাকে,
৫. অতিরিক্ত পানিশূন্যতা দেখা দিলে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ: আমার দেখা একটি বিভৎস ঘটনা

শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ কাজ করাকে পেডোফেলিয়া বলে। আর যাদের এই আকর্ষণ…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর