ঢাকা      সোমবার ২৪, জুন ২০১৯ - ১০, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


মানুষের মুখে হাসি ফুটানোই চিকিৎসকের নেশা  

শখ করে ইরানি মিষ্টি, উচ্চ ফলনশীল জাতের আঙ্গুর লাগালাম আমার ছাদবাগানে। কিছু দিনের মধ্যেই থোকা থোকা আঙ্গুর ধরতে শুরু করলো গাছে। আহ্, কি চমৎকার দৃশ্য!পাড়া-প্রতিবেশীরাও ভিড় জমাতে থাকলো আমার বাসায়। সবাইকে আঙ্গুর খাওয়াতে হবে। তর যেন আর সইছে না।

ক'দিন পরই আঙ্গুর পাকতে শুরু করলো। বিসমিল্লাহ বলে মুখে পুরলাম। নিজের অজান্তেই চোখ বন্ধ হয়ে এলো। গা শিরশির করে উঠলো। সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে কেমন মিষ্টি।

আমি চুলশূন্য মাথাটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললাম, দেখোতো কয়টা চুল পড়লো? টক কতটুকু হতে পারে! খাওয়ার অযোগ্য।  একজন পরামর্শ দিল টক রান্না করে খাওয়া যায়। আসলেই শোল মাছ দিয়ে আঙ্গুরের টকের মজাই আলাদা!

ভাবলাম, বড় আশা করে মিষ্টি ও উচ্চ ফলনশীল জাতের আঙ্গুর লাগিয়েছিলাম, অথচ সেই আঙ্গুর টকের কারণে মুখেই নেওয়া যাচ্ছে না।  তাহলে কী এটা বীজের দোষ? নাহ্। মাটিই সব শেষ করে দিলরে ভাই।

এদেশের মানুষগুলো বদ, ম্যনার জানে না, কাজে ফাঁকি দেয়, ঘুষ খায়, মোনাফেকি করে! এই মানুষগুলোই যখন বিদেশে কাজ করে সুনামের সঙ্গে করে। দেশের বাইরে বাঙালির কদর অনেক!

আমার মেডিকেলের বড় ভাই এবং আমার সহপাঠী অনেক ডাক্তার দেশের বাইরে ডাক্তারি করছেন। ডা. বি এম আতিকুজ্জামান ভাই, ডা. তিতাস ভাই, ডা. ফেরদৌস খন্দকার, ডা. মোস্তাক চৌধুরী, ডা. নাসরীন চৌধুরী, ডা. ফারজনা খান লতা, ডা. সালমা আকতারসহ আরো অনেকের সাফল্যের খবর যখন পাই।  আর এদেশে বসে তখন বুকটা গর্বে ভরে উঠে। মনে পড়ে তারা আমারই ভাই। চকিতে বিষন্ন হয়ে যাই, আমরাতো তাদেরই মতো ছিলাম।

আসলে, আঙ্গুর ফলের টক এদেশে খুব জনপ্রিয় খাবার। এদেশে চিনির কেজি সত্তুর টাকা, গুড়ের কেজি একশো টাকা। এখন ব্যবসায়ীরা এক কেজি চিনি ভিজিয়ে দুই কেজি গুড় বানায়! এতে সামান্য কেমিক্যাল ফ্লেভার মিথ্যা মিশায় অবশ্য। তাতে কি, গুড়তো খেলাম।

একজোড়া ডাবের দাম একশো টাকা। যত্ন আত্মি করে, পেলে পোষে সময় লাগিয়ে যেই নারিকেল হলো দাম কমে গেল। জোড়া ষাট টাকা! এই নারিকেল দিয়ে মিষ্টি লাড্ডু বানায়, নারিকেলের মালা দিয়ে শো পিস বানায় বটে, দামটা ঠিক বুঝতে পারে না।

নির্মম সত্য হলো—এমবিবিএস শেষে যেই না আপনি ডিগ্রি করলেন, চাকুরিতে আপনার দামটা তখনই কমে গেল ঠিক নারিকেলের মতো। 

যে ছেলেটাকে কোলেপিঠে করে ডাক্তার বানিয়েছিলেন সে এখন আপনার বস। উপজেলায় আপনি কনসালট্যান্ট আর তিনি আপনার প্রশাসনিক বস, আপনি তাকে স্যার বলে ডাকবেন!

আমার প্রতিবেশী ডা. আলাল ভাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেই ব্যবসা শুরু করলেন। প্রথমেই শুটকির ব্যবসা, পরে জায়গার ব্যবসা, এক সময় ক্লিনিক ব্যবসা শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে তিনি অনেক টাকার মালিক হন। বিসিএস না হওয়াতে আরেকটা উপকার হলো তার। তিনি সংসদ সদস্যও হয়ে গেলেন একসময়। এখন কত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ওনার ক্লিনিকে বসেন, কত ডাক্তার ঘুরেন ওনার পিছনে!

আমার পরিচিত অনেক ডাক্তার এখন পুলিশে, প্রশাসনে ও পররাষ্ট্রে কাজ করে। ডাক্তারি পেশার ভবিষ্যৎ নাই, তাই এই ভিন্ন চিন্তা। আরে ভাই, ডাক্তারিটাতো পেশা না নেশা হওয়ার কথা ছিল। মানুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়ের সাক্ষী হবার নেশা, প্রচণ্ড যন্ত্রনায় কাতর মানুষটার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটানোর নেশা। রোগীর আত্মীয়-পরিজনদের ডাক্তারকে জড়িয়ে ধরে হু হু কান্নাজড়িত স্পর্শ অনুভব করার নেশা, মানুষের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ডাক্তারকে দেওয়া গাছের প্রথম ফলটা, চাকের মধুটা গ্রহণ করার নেশা।

সেই নেশা এখন কর্পূরের মতো উবে গেছে। পরে আছে দেহ, লাশকাটা ঘরে; কে যেন করে গেছে ব্যবচ্ছেদ, নিঃসীম অন্ধকারে।
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এতোদিন ভাবতাম ডাক্তার হিসাবে আমি ‘ব্যতিক্রম’

এতোদিন ভাবতাম ডাক্তার হিসাবে আমি ‘ব্যতিক্রম’

আজ ১৭ই জুন, ২০১৯। সর্বভারতে আজ চিকিৎসক ধর্মঘট। পশ্চিমবঙ্গের নীলরতন সরকার হাসপাতালের…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর