ঢাকা      শনিবার ২১, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৫, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. আজাদ হাসান

সিওমেক , ২১তম ব্যাচ।


সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটের কারণ ও প্রতিকার

বর্তমানে দেশে সরকারি হাসপাতালে জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন সাব-সেন্টার মিলিয়ে কতজন মেডিকেল অফিসার এবং বিভিন্ন পর্যায়ের স্পেশালিষ্টদদের পদ খালি আছে তার একটি পরিসংখ্যান বের করা আবশ্যক। প্রশ্নটি এ কারণে রাখছি যে, সরকার সময় সময় ঘোষণা দিচ্ছেন কখনো ১০ হাজার ডাক্তার নিয়োগের কথা বলা হচ্ছে, কখনো ৬হাজার ডাক্তার নিয়োগের কথা বলা হচ্ছে, আবার কখনো ৪ হাজার ৭০০ চিকিৎসকের কথা বলা হচ্ছে।

এখন এসব আশ্বাস বাণীর মাঝে একটি তথ্য আমার কাছে পরিস্কার নয় যে, এই যে নতুন ডাক্তার নিয়োগের কথা বলা হচ্ছে, সেটা কি নব সৃষ্ট পদ নাকি বিরাজমান রাজস্ব খাতের পদ? কারণ, রাজস্ব খাতের পদ হলে সেটার জন্য সরকারকে আলাদা করে মন্ত্রণালয় হতে অর্থ ছাড় করতে হয় না, কারণ ঐ পদগুলো অলরেডি স্যান্কশান্ড (Sanctioned) পোস্ট। ঐ সব পদগুলোর জন্য সরকারী খাত হতে অলরেডি বাজেট বরাদ্দ থাকে। তাই কোনো "বিশেষ বিসিএস"-এর মাধ্যমে নিয়োগের বা এডহক ভিত্তিতে ডাক্তার নিয়োগ দিলেও রাজস্ব খাতের বিনিয়োগের সাথে কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ্য, দেশ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকার ইন-সার্ভিস ট্রেনিং প্রথা চালু করেছিলেন। অর্থাৎ যেদিন হতে একজন ডাক্তার ইন-সার্ভিস ট্রেনিংয়ে যোগ দিবেন সেদিন হতেই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের চাকুরী সরকারি চাকুরী হিসেবে গণ্য হবে এবং পেনশনের সময় উক্ত সময়কালও পেনশন যোগ্য চাকুরীকাল হিসেবে গণনা হবে। এভাবে ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত যেসব চিকিৎসক ইন্টার্নশীপ ট্রেনিংয়ে জয়েন করেছেন, তাদের চাকুরী ইন-সার্ভিস ট্রেনিং হিসেবে গন্য হয়। এরপর ১৯৮৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের সময় উক্ত ইন-সার্ভিস প্রথা বাতিল করা হয়।

ইতিমধ্যে প্রায় ১৭ টি ব্যাচে প্রায় (১২০০x১৭)= ২০হাজার ৪০০ জন ডাক্তার ইন-সার্ভিস ট্রেনিং প্রাপ্ত সরকারি চাকুরীতে সরাসরি যোগদানের সুযোগ লাভ করেন। কিন্তু যদি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং প্রথাটি আর অন্তঃত ৭/৮বছর কন্টিনিউ করা যেতো তা হলে প্রতি বছর ২৫বছর চাকুরীকাল সম্পন্ন করার কারণে যারা পেনশনে যাবেন তাদের সম-পরিমান পোস্ট শূন্য হতো এবং ততজন নবীন চিকিৎসককেও নতুন ভাবে চাকুরীতে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হতো। এখানে উল্লেখ্য, তখন দেশে ৮টি মেডিকেল কলেজে গড়ে ১৫০ জন করে সর্ব মোট ১২০০ ছাত্র ভর্তি করা হতো।

ইন-সার্ভিস ট্রেনিং প্রথাটি বাতিল হয়েছে আজ হতে প্রায় ৩২ বছর আগে। অর্থাৎ আলোচনার জন্য যদি ধরে নেই একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট ২৫ বছর বয়সে এমবিবিএস পাশ করে থাকেন, তাহলে তিনিও এই ৩২ বছর চাকুরী করে আজ রিটায়ার্ড করেছেন।

এখন আলোচনার জন্য যদি ধরেও নেই যে, এই ৩২ বছরে ডাক্তারদের জন্য আর কোনো নতুন পদ সৃষ্টি হয়নি, তাহলেও এই ২০হাজার ৪০০ জন ডাক্তার নিয়োগ দিতে পিএসসিকে প্রতি বছর গড়ে ৬৩৮ জন ডাক্তার নিয়োগ দিতে হতো শুধু মাত্র শূন্য পদ পূরণের জন্য। কিন্তু পরিসংখ্যান কি বলে?

যখনই কোনো উপজেলা হাসপাতাল বা জেলা সদর হাসপাতালে যান দেখবেন সেখানে ডাক্তার স্বল্পতা এবং এজন্য যারা কাজ করছেন তারা সবাই ওভার লোডেড। তবে হ্যাঁ, পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্সের জন্য সব সময়ই আমাদের পেশার কিছু ডাক্তার প্রশিক্ষণে থাকবেন এটা স্বাভাবিক কিন্তু সে জন্য সর্বত্র ডাক্তার সংকট থাকার কথা নয়।

আমার ধারণা এখানে কোথাও একটা গ্যাপ আছে। আর এর জন্য সম্ভাব্য যে কারণগুলো দায়ী হিসেবে আমি মনে করি তা হতে পারে:

১. পিএসসি হতে যখন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে শূন্যপদের সংখ্যা চান, তখন মন্ত্রণালয় যথাযথ সময়ের মধ্যে সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেন না।

২. সংস্থাপন মন্ত্রণালয় যখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে শূন্যপদের সংখ্যা চান, তখন মন্ত্রণালয় যথাযথ সময়ের মধ্যে সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেন না।

৩. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যখন স্বাস্থ্য  অধিদপ্তরের কাছে শূন্যপদের সংখ্যা চান, তখন অধিদপ্তর যথাযথ সময়ের মধ্যে সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেন না।

৪. অধিদপ্তর যখন সিভিল সার্জন অফিস কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও প:প: কর্মকর্তার কাছে শূন্যপদের সংখ্যা চান, তখন সংশ্লিষ্ট জেলার স্বাস্থ্য বিভাগীয় প্রশাসন বা উপজেলার স্বাস্থ্য বিভাগীয় প্রশাসন যথাযথ সময়ের মধ্যে সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেন না।

৫. অথবা পিএসসি কিংবা মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তর এত অল্প সময়ের নোটিশে এই সব রিপোর্ট চান, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তা যথা সময়ে যথাযথ ভাবে সাবমিট করতে পারেন না। আর একারণে মাঠ পর্যায়ের সাথে অধিদপ্তর কিংবা মন্ত্রণালয়ের কাজে সমন্বয়হীনতা চোখে পড়ার মতো।

আর এ জন্যই পিএসসি শূন্যপদের সম সংখ্যক পদে ডাক্তার নিয়োগ করার জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারেন না, যার ফলশ্রুতিতে মাঠ পর্যায়ে বছরের পর বছর শূন্যপদ থেকে যায়। তাই প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ের সাথে অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় এবং পিএসসির মাঝে সমন্বয় সাধন। যাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগে মন্ত্রনালয় এবং পিএসসি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ডাক্তারদের ডাটা আপডেট করার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে তবুও সেটা আরো আপডেট এবং প্রতি ৬ মাস অন্তর অন্তর হেলথ কমপ্লেক্স ও জেলা সদর সহ মেডিক্যাল কলেজের জনবল আপডেট করা আবশ্যক।

আর এভাবেই সর্বাবস্থায় প্রতিটি নিয়মিত বিসিএস-এ নিয়োগের সময় রাজস্ব খাতের শূন্যপদের বিপরীতে নিয়মিত ভিত্তিতে ডাক্তার নিয়োগ অব্যাহত রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখা যেতে পারে।

অতএব আশা করবো চিকিৎসক নিয়োগের পদ্ধতি সহজীকরণ করতঃ শূন্যপদ সমূহ আশু পূরণ করতে সরকার যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডাক্তারি ভাবনা: এমবিবিএস বনাম নন-এমবিবিএস ডাক্তার

ডাক্তারি ভাবনা: এমবিবিএস বনাম নন-এমবিবিএস ডাক্তার

ডা. আব্দুল করিম (ছদ্মনাম)। প্রেসক্রিপশনে নামের পাশে এমবিবিএস শব্দটি নেই। আছে কিছু…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর