ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


০২ মে, ২০১৯ ১০:২৫ এএম

তরুণ চিকিৎসকের অসহায়ত্ব

তরুণ চিকিৎসকের অসহায়ত্ব

ইন্টারমিডিয়েট পাশের ৬ মাস পর মেডিকেলে ভর্তি হয়ে কিছু সিস্টেমলস সহ এমবিবিএস পাশ করে ইন্টার্ন শেষ করতে কমপক্ষে সাড়ে ছয় বছর সময় লাগে। ইন্টার্ন শেষ করা মাত্র তরুণ চিকিৎসকের সামনে একসাথে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ চলে আসে।

১. পরবর্তী ডিগ্রী অর্জনের জন্য মেডিকেল লাইনের লেখাপড়া করা।

২. সে জন্য অবৈতনিক প্রশিক্ষণ শুরু করা এবং চালিয়ে যাওয়া।

৩. পেট চালানোর জন্য প্রাইভেট চাকরি করা।

৪. সরকারি চাকরির জন্য/বিসিএসের জন্য আলাদা পড়াশুনা করা। অর্থাৎ একসাথে ২চাকরি আর ২লাইনের পর্বত সমান লেখাপড়া!

মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার একটা সীমাবদ্ধতা আছে। একজন চিকিৎসক বিনা বেতনে সারাদিন সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণ করে বিকাল-রাতে পেট চালানোর জন্য প্রাইভেট চাকরি করে এমনিতেই যখন অস্বাভাবিক ক্লান্ত থাকেন, তখন সরকারি চাকরির জন্য বিসিএস আর মেডিকেল ক্যারিয়ারের জন্য এফসিপিএস, এমডি/এমএসের জন্য লেখাপড়া করার সুযোগ কোথায়? প্রাইভেট চাকরি করে মাসে বর্তমানে ২০হাজার টাকা পাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু এ টাকা দিয়ে নিজের মেসের মাসিক ভাড়ার টাকা, খাওয়া, যাতায়াত খরচ, ব্যাক্তিগত সরঞ্জামাদি ক্রয়, বিভিন্ন ধরনের চাঁদা প্রদান এবং লেখাপড়ার খরচ যোগানোসহ রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় তরুণ চিকিৎসককে।

এমবিবিএস পাসের পর পরবর্তী উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করতে হলে প্রথমেই নতুন করে পাঁচ বছরের প্রশিক্ষণ করা লাগে। এ সময়ে প্রাইভেট ইনকাম করা কঠিন। তাছাড়া, আমাদের অধিকাংশ রোগী তরুণ ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। সরাসরি প্রফেসর দেখাতে চায়। আর্থিক সংকটের কারনে অনেক তরুণ ডাক্তার তার পাঁচ বছর প্রশিক্ষণ সময়ে নিজের অতি প্রয়োজনীয় একটি ফান্ডস্কপ মেশিন কিনতে পারে না যার দাম মাত্র বিশ/পঁচিশ হাজার টাকা। তরুণ ডাক্তারদের অনেকে বিয়ে করে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে! একজন তরুণ ডাক্তারের ক্ষেত্রে এ হচ্ছে নির্মম বাস্তবতা। এমতাবস্থায় সমাজের লোকেরা যখন ওই তরুণ ডাক্তারের মা-বাবাকে বুঝাতে শুরু করে, "আপনার সন্তান ডাক্তার হয়ে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করতেছে, কই এখনো দালান বানাননি"? তখন অবস্থাটা কেমন হয়?

মূলত এমবিবিএস পাশের পর স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করে বিশেষজ্ঞ হতে একজন ডাক্তারের গড়ে ৪০বছর পার হয়ে যায়। আর আর্থিক ভাবে সর্বনিম্ন স্বাবলম্বী হতে আরও কমপক্ষে ৫ বছর লাগে। ততদিনে ডাক্তার নিজেই ডায়াবেটিস ও প্রেশারের রোগী হয়ে যান। তখন ডায়াবেটিস এর কারনে আর ভাল কিছু খাওয়ার সুযোগ থাকে না ডাক্তারের। আনন্দ উপভোগের সময় ও মানসিকতা কোনটাই তখন আর থাকে না তার। এ কারনে ডাক্তারির ইনকাম দিয়ে পিতামাতার মুখে হাসি ফুটানোর স্বপনটা অধরাই থেকে যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে। কেননা ততদিনে অনেকেরই পিতা মাতা মারা যায়। সে ক্ষেত্রে তর্কের খাতিরে বলা যায়, নিম্নবিত্ত পরিবারের কারো ডাক্তারি লাইনে আসা উচিত নয়। কিছুটা সুখি হতে পারে ডাক্তারের সন্তান আর নাতি-নাতনীরা।

সবাই যেভাবে মনে করে ও প্রচার করে, ডাক্তার মানেই টাকা আর টাকা; সেটা অন্ততপক্ষে তরুণ ডাক্তারের ক্ষেত্রে বাস্তবতার সাথে মিলে না। সামাজিক এ ভুল ধারনা তথা এ কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে অনেক পরিবার/পিতামাতা তার ২৫-৪০ বছর বয়স্ক একমাত্র অপ্রতিষ্ঠিত ডাক্তার সন্তানের কাছে অনেক কিছু আশা করে যখন তেমন কিছুই পায় না, তখন ওই পরিবারে সম্পরকের তিক্ততা সৃষ্টি হয়। আন্তরিকতা/আত্মীয়তার বন্ধন টুকরো টুকরো হয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা বাহিরে প্রকাশ হয় না, বরং জ্বলতে থাকে তুষের আগুনের মতো। অশান্তি নেমে আসে ওই পরিবারে। সমাজের লোকেরা তখন প্রচার করতে থাকে, বাবা-মা কষ্ট করে সন্তানকে ডাক্তার বানাইছে, এখন সে বাবা-মা'র খোঁজ খবর নেয় না। ডাক্তার মানেই কোটি কোটি টাকা, এই কুসংস্কারে মারাত্মক অন্ধ বিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রামে মা-বাবাকে হাজার বার বুঝালেও তারা এ ব্যাপারে সামান্যমাত্র বিশ্বাস করে না। আর এ দুঃখজনক ব্যাপারটা সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি করে তখনই, যখন গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় সন্তান একবার এমবিবিএস হয়!

সমাজে কিছু লোক আছে যারা নিজেরা কিছু গড়তে পারে না, কিন্তু আরেকজনের গড়া জিনিস ভাঙতে ওস্তাদ। তারা অপ্রতিষ্ঠিত তরুণ ডাক্তারের বাবা-মাকে উসকে দেয় কোটি কোটি টাকার কথা বলে। তাই এ কুসংস্কার থেকে সমাজের সবাইকে দ্রুত সরে আসা উচিত। সমাজের স্বার্থেই এটা করা উচিত। অনারারী মেডিক্যাল অফিসারদের জন্য একটি যুক্তিসঙ্গত ভাতার ব্যবস্থা করা উচিত। হাতে গোনা কিছু ব্যতিক্রম আছে। আর ব্যতিক্রম কখনই উদাহরন নয়।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না