অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম

অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম

ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ


২৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০৪:০৬ পিএম

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে

খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে
প্রতীকী ছবি

প্রতিটি মেয়ে তার মাতৃত্বকালীন সময়ে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করে একটি সুস্থ বাচ্চার জন্য। আমিও করেছিলাম। প্রথমে সম্পূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ একটি সুস্থ বাচ্চা; দ্বিতীয়ত: বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন। বলতাম, ‘এ দু'টি দিতে খোদা তুমি কার্পণ্য করো না’। তারপরেও যদি তুমি দয়াশীল হও একটু সৌন্দর্য দিও। আলহামদুলিল্লাহ্। খোদার দয়ার ভাণ্ডার থেকে শতভাগ পূর্ণ করে দিয়েছেন।

সেই দয়াবান খোদার দোয়া সবার জন্য নেই কেন? কি দোষ করেছে নানান রকম বিকলাঙ্গ শিশুটি! কি দোষ করেছে পরীর মতো সুন্দরী মেয়েটি, যার একটি জরায়ু নেই! কি দোষ করেছে সুস্থ সবল সুঠামদেহী ছেলেটি, যার দু'টো ভাস ডিফারেন্স নেই! কি দোষ করেছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষটি, যার কোনো লিঙ্গই বিকশিত নয়! কি দোষ করেছে ফুটফুটে শিশুটি, যার নিউরোডেভেলপমেন্ট স্বাভাবিক নয়!

চলতি মাসেই পালিত হলো অটিজম ডে। সেই উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মিলন হলে ও জিএসবি’র সিএমই’র ধারাবাহিকতায় এক সেমিনার হলো অটিজমের উপরে। অটিজম শিশুদের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার। এএসডি বা অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅরর্ডার। কেন হয়, এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ আজও  জানা যায়নি। আর তাই তার প্রতিরোধ রয়ে গেছে সাধ্যের বাইরে।

দু'জন সহকর্মীর কষ্টগাথা মাতৃত্বের বর্ণনায় পুরো অডিয়েন্সের চোখ ভেসেছে জলে। সুখের আলোকচ্ছ্বটার আড়ালে প্রতিটি মানুষের জীবনে যে এক ঘোর নিকষ কালো অন্ধকার থাকে তা আবার একবার বুঝলাম।

ভয়াবহ দুঃসংবাদ, অটিজমের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আর তার বেশিই হচ্ছে সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। গ্রামে-গঞ্জের তাজা গোবর সারের সবজি, ফলমূল, নিজের পোষা গরু-ছাগল আর খাল, বিল, পুকুরে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা মাছ খেয়ে যে মা নিশ্চিন্ত গর্ভাবস্থা কাটিয়েছে, তার যে শিশুটি একান্নবর্তী পরিবারে বহুজনের কোলে পিঠে করে দিন কাটিয়ে, কাদা জলে লুটোপুটি করে বড় হয়েছে তার অটিজমের সম্ভাবনা বহুগুণে কম।

তাই এই অত্যাধুনিক সভ্যতার ঝলমলে দেশে (ইউএসএ) কয়েক দশক আগেও যেখানে কয়েক হাজারে একটি অটিজম পাওয়া যেতো সেখানে তা বেড়ে ২০১৪ সালে হয়েছে ৫৯ জনে একজন। বর্তমানে হয়তো ৩৪/৩৫ জনে একজন।

পরিবেশের পরিবর্তন, খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কেমিক্যালের প্রভাব থাকতে পারে।

প্রতিরোধ বা প্রতিকার কি?

কোনো প্রতিরোধ নেই। কেননা নির্দিষ্ট কারণ এখনও অজানা। তাই সম্ভব হলে গর্ভাবস্থায় অরগ্যানিক ফুড খেতে পারলে ভালো। প্রয়োজন না হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম না করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুষধ সেবন না করা।

প্রতিকার:

যত তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যাবে, তত প্রতিকারের সম্ভাবনা থাকে। যদিও এটি একটি ওয়াইড স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার। মানসিক বিকাশের ধীর গতি থেকে শুরু করে, শারীরিক ও মানসিক ডেভেলপমেন্ট গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়।

কিভাবে দ্রুত শনাক্ত করা যায়?

স্বাভাবিক আচরণের অনুপস্থিতিগুলো খেয়াল রাখতে হবে। যেমন:

ক. ছয়মাসেও চোখের দিকে না তাকালে, না হাসলে সন্দেহ হবে।
খ. সেন্সরি সমস্যার জন্য শব্দ সহ্য করতে পারে না। তাই খুব ছোট অবস্থায় কেঁপে কেঁপে উঠবে। একটু বড় হলে শব্দে বিরক্ত হয়।
গ. ১২ মাসের মধ্যে আঙ্গুল দিয়ে কোনো কিছু পয়েন্টিং না করা, অর্থবহ সংকেত বা ইঙ্গিত না করা।
ঘ. নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেয়া।
ঙ. কোনো নির্দেশনা (কমান্ড) ফলো না করা।

এ ছাড়া মোটর ফাংশনেও সমস্যা থাকে।

অনেকে হামাগুড়ি দেয় না। হাত-পায়ের মাংসপেশীর দুর্বল থাকে। মুখমণ্ডলের মাংসপেশীর দুর্বলতার জন্য ফুঁ দিতে পারে না এবং কথা বলতে পারে না। এই কথা বলতে না পারা এবং ডিলেইড স্পিচ এক নয়।

১৬ মাসেও এক শব্দ না বলা, 
একটা নির্দিষ্ট খেলনা নিয়ে আকড়ে পরে থাকা,
একই কাজ বারবার করা, 
ফ্লাপিং বা হাত দু'টো উঁচু করে নাড়ানো বা একটি হাত চোখের সামনে নাড়ানো,
একই বয়সী বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা না করা ইত্যাদি।

কোনো কোনো বাচ্চার স্বাভাবিক বিকাশ হতে হতে পরবর্তীতে সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়া। রিগ্রেসন অব ডেভেলপমেন্ট। এটি শনাক্ত করার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়।

এরা নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, কারো কাছে কোনো চাহিদা থাকে না। তাই অন্য বাচ্চাদের মতো এটা সেটা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে না। এজন্য এদের লক্ষী বাচ্চা বলে সবাই জানে। তবে সিভিয়ার হলে কেউ আবার এরোগ্যান্ট থাকে।

মায়েদের প্রতি অনুরোধ, যত তাড়াতাড়ি সন্দেহ হবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। অনুগ্রহ করে লুকাবেন না। এটি ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। কারো অপরাধ নয়। আত্মীয়-স্বজন বিষয়টি জানতে পারলে তারাও তাদের আচরণে বাচ্চাকে সাহায্য করবে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বিএসএমএমইউ) বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা কেন্দ্র আছে। যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যায়, ততো তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক হবার সম্ভাবনা থাকে।

সকল দেবশিশুদের মায়েদের জন্য ভালোবাসা এবং অনেক অনেক দোয়া। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না