ঢাকা      মঙ্গলবার ১৮, জুন ২০১৯ - ৫, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


দাড়িতে জীবাণু বিতর্ক

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের একটি গবেষণার ফলাফল বিবিসিতে প্রকাশিত হওয়ার পর তা নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়েছে। সেখানে ফলাফলে পাওয়া গেছে , কুকুরের পশমের চেয়ে মানুষের দাড়িতে জীবানুর সংখ্যা বেশি। ফলে দাড়িওয়ালা যুবকেরা কেউ কেউ জেনে বা না জেনে, বুঝে বা না বুঝে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেছেন! কেউ কেউ গালি দিচ্ছেন!

বাস্তবতা হচ্ছে , বিষয়টি নিয়ে হৈচৈ করার কিছুই নেই! কেননা মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে/ অংশে আছে অসংখ্য জীবাণু। এগুলো আছে চামড়ায়, নাকে , মুখে, অন্ত্রে, দাঁতের প্লেকে, শ্বাসনালীতে , মূত্রনালীতে  ইত্যাদি। এগুলোকে বলা হয় 'নরমাল ফ্লোরা' বা 'কমেনসাল'। মানুষের চামড়ায় প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে এ ধরনের এক হাজার থেকে দশ হাজার জীবানু আছে। মানুষের দাঁতের প্রতি গ্রাম প্লেকে এ ধরনের এক বিলিয়ন জীবানু আছে। অর্থাৎ এক স্থানের থেকে অন্য স্থানে জীবাণু কম বেশি হতে পারে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই।

এসব জীবাণু সাধারনত রোগ সৃষ্টি করে না। বরং শরীরের কিছু উপকারি কাজ আঞ্জাম দেয় সাধারনত। রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু যে স্থানে প্রাথমিকভাবে আস্তানা গেঁড়ে রোগ প্রক্রিয়া শুরু করে, এসব নরমাল ফ্লোরা সেসব স্থান আগে থেকেই দখল করে রাখে। ফলে এগুলো রোগ প্রতিরোধকারী জীবাণু হিসেবে কাজ করে।   অন্ত্রের এসব জীবাণু ভিটামিন বি ও ভিটামিন কে তৈরি করে।  তাই কুকুরের পশমের চেয়ে মানুষের দাড়িতে জীবানুর সংখ্যা বেশি হলে যেমন চিন্তিত হওয়ার কিছুই নেই, তেমনি কুকুরের পশমের চেয়ে মানুষের দাড়িতে জীবানুর সংখ্যা কম হলেও আনন্দের কিছুই নেই।

কিন্তু এক স্থানের নরমাল ফ্লোরা  অন্য স্থানে গেলে বা ব্যক্তির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে তখন তাদের কোনো কোনোটি রোগ সৃষ্টি করে।

যেমন অন্ত্রের নরমাল ফ্লোরা পায়খানা থেকে কোনোভাবে মুখে গেলে শেষ পর্যন্ত রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

তেমনি অন্যান্য পশুরও এমন জীবাণু থাকতে পারে। এক পশুর থেকে অন্য পশুতে বা এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে এসব নরমাল ফ্লোরার ঘনত্ব কম বেশি হতে পারে। এ কারনে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই।

দাড়িতে যে জীবাণুর কথা বলা হয়েছে, সে ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাছাড়া সুইজারল্যান্ডে চালানো এই গবেষণায় যেসব পুরুষের দাড়ি থেকে নমুনা নেওয়া হয়েছে, তারা প্রতিদিন পাঁচ বার দাড়ি ধৌত করে কি না, সেটার ভিত্তিতেও সংখ্যার তারতম্য হতে পারে। কুকুরকে গোসল করানো , না করানোর ভিত্তিতে এবং  পুরুষের শরীর বা দাড়ির সাথে কুকুরের সংস্পর্শ হওয়া না হওয়ার ভিত্তিতেও এসব সংখ্যার তারতম্য হতে পারে।

আবার আবহাওয়া ও  পরিবেশের পার্থক্য, গবেষণার ধরন, নমুনার সংখ্যা ইত্যাদি কারনেও গবেষণার ফলাফলে আকাশ পাতাল পার্থক্য পাওয়া যেতে পারে। গবেষণার জন্য অর্থের যোগানদাতার ওপরেও গবেষণার ফলাফল এবং সুপারিশ অংশত নির্ভর করতে পারে।

 

আজ একটি গবেষণায় যা ফলাফল পাওয়া গেছে, আগামীকাল অন্য একটি গবেষণায় তাঁর বিপরীত ফলাফল পাওয়া যেতে পারে।

দাড়িতে জীবাণু থাকার কারনে যদি দাড়ি কেটে ফেলতে হয়, তাহলেতো চামড়ায় জীবাণু থাকার কারনে চামড়াও কেটে ফেলতে হবে!  মুখ,  নাক, শ্বাসনালী ইত্যাদি কেটে ফেলতে হবে?

সিংহের কেশর আছে , সিংহীর নেই যা  পুরুষের দাড়ির সমতুল্য। কেশরের জীবাণুর কারনে আফ্রিকার জঙ্গল কি সিংহশুন্য হয়ে গেছে?

তাই এসব বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন বা ক্ষুব্ধ হওয়া বা গালাগালের চর্চা করা প্রত্যাশিত নয়। সর্বোপরি গালাগাল করা মুনাফিকের চতুর্থ লক্ষণ। আবেগ তথা প্রবৃত্তির অনুসরণ করা অনুচিত। আবেগ মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়।  তাই এভাবে সময় ব্যয় না করে বরং নিজেরা অনুরূপ গবেষণা করার যোগ্যতা অর্জন করাটাই হোক আমাদের ব্রত।

কেননা একটি কথা আছে, পৃথিবীকে গড়তে হলে আগে নিজেকে গড়ো।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর