ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


এক ব্যবস্থাপত্রে বিশটি ওষুধ ও হাসি তামাশা

সব রোগীর রোগের সংখ্যা সমান নয়। কারো ৩০ টাকা দামের একটি ক্রিম দিয়েই চিকিৎসা হয়ে যায় এবং সেটা শুধুমাত্র একবার ব্যবহার করতে হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে শত চেষ্টা করেও ওষুধের সংখ্যা ২০টির কমে আনা যায় না এবং সেগুলো বছরের পর বছর চালিয়ে নিতে হয়। কেননা, দেখা যায় তার রোগই আছে অন্তত ৮টি।

এসব ক্ষেত্রে রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে অনেক স্নায়ুচাপ ভোগ করতে হয় এবং অন্য রোগীদের তুলনায় অনেক বেশি সময় ব্যয় হয়। ওষুধের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারনে ডাক্তার নিজেই অসহায় এবং বিব্রত বোধ করেন। উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে অনেক সময় ৪/৫টি ওষুধ দেয়া লাগে শুধু উচ্চ রক্তচাপের জন্য। যারা একবার স্ট্রোক করেছে বা যাদের একবার হার্ট এটাক হয়েছে, যাদের ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগ আছে তারা এবং আরো বিভিন্ন রোগের প্রত্যেকটার জন্য গড়ে ৪-৫টি ওষুধ গ্রহণ করতে হয় প্রতিদিন এবং এসব ওষুধ চালিয়ে যেতে হয়।

একটি উদাহরণ দেই। একজন রোগীর ডায়াবেটিস আছে। এভাবে ১৫ বছর পার হওয়ার পর একদিন দেখা গেল তিনি হঠাৎ ডান হাত ও ডান পায়ে দুর্বলতা বোধ করলেন। হাসপাতালে নিলে দেখা গেল তার স্ট্রোক হয়েছে। সাথে দেখা গেল কিডনী দুটির কার্যক্ষমতাও প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। কিডনী নষ্ট হওয়ার কারনে তিনি নতুন করে উচ্চ রক্তচাপে ভুগতেছেন এবং একই কারনে তার শরীরে রক্ত তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

শুধু তাই নয়। কিডনী নষ্ট হওয়ার কারনে তার হাড় দুর্বল হয়ে গেছে। এই রোগীর চিকিৎসার জন্য একেবারে চোখ বন্ধ করেই ২০-২৫টি ওষুধ লাগবে। এই রোগীকে গড়ে প্রতি ২-৩ মাসে একবার বেশ কিছু পরীক্ষা করতে হবে। আর ২০-২৫টি ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে। আমেরিকা লন্ডন যেখানেই যাক, এই রোগীর কমপক্ষে ২০ টি ওষুধ লাগবেই। কেননা সারা দুনিয়ায় আমরা একই বই পড়ে ডাক্তারি করি। তাই এই ধরনের রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে ২০-২৫ টি ওষুধ থাকাটা এই রোগীর ক্ষেত্রে সাধারন ব্যাপার! কেননা, ইনি শুধু রোগী নন , বরং রোগের খনি!

এভাবেই অবস্থার খাতিরে এবং রোগের সংখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কোনো রোগীর ব্যবস্থাপত্রে মাত্র ১টি বা ২টি আবার কখনো কখনো ২০ টি বা ২৫ টি ওষুধ থাকতে পারে।

এখন ফেসবুকের যুগ চলছে। বিভিন্ন ব্যস্ত ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে যে কেউই ২০টি ব্যবস্থাপত্রের মধ্যে অন্তত ২-৩ টিতে ১৭-১৮টি বা তার চেয়েও বেশি ওষুধ দেখতে পাবেন। তাই বলে কোনও ধরনের যাচাই না করে এরকম ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলে ফেসবুকে তুলে ধরে হাঁসি ঠাট্টা করা কোনও সভ্য লোকের কাজ নয়। কেননা, আপনাকে জানতে হবে, অনেক সময় অনেক রোগীর ৩০ টিও ওষুধ লাগতে পারে। আপনি খুব বেশি ইচ্ছুক হলে অন্য কয়েকজন ডাক্তারকে সেই ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে যাচাই করতে পারেন। এই রোগীর জন্য এতগুলো ওষুধ দরকার কিনা, সেটা অন্য এক বা একাধিক চিকিৎসকই শুধু বলতে পারবেন। আর তিনি যদি হন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, তাহলে সেই ব্যবস্থাপত্রটি অবশ্যই একই বিষয়ের অন্য এক বা একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে যাচাই করবেন।

মহাগ্রন্থ আল কুরআনে সুরা আন নাহল এর ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, "যদি তোমাদের জানা না থাকে, তবে যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো"।

এমনটা না করে আপনি যদি সস্তায় সেলিব্রেটি হওয়ার জন্য অতি উৎসাহী হয়ে সেই ব্যবস্থাপত্রের ছবি যেকোনোভাবে হাসি ঠাট্টা করে জনসম্মুখে প্রচার করেন, তাহলে সেটা সুস্পষ্টভাবেই বড় ধরনের অসভ্যতা এবং সর্বোচ্চ মূর্খতা হিসেবে পরিগণিত হবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক আপনার বিরুদ্ধে আদালতে মানহানি মামলা করার অধিকার রাখেন। সেক্ষেত্রে আপনি শুরুতেই আদালতে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হবেন। এতে কি আপনার সম্মান বাড়বে? ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।

প্রায় বছর খানেক আগে ১৮/২০টি ওষুধ সংবলিত একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের একটি ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে টিটকারি শুরু করেন এক ব্যক্তি। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, "রোগী কী ভাত খাবে, নাকি ওষুধ খাবে?"  সাথে সাথেই অন্য অনেকেই সেটি শেয়ার করতে শুরু করে। ২৪ ঘন্টায় সেটি দশ হাজার শেয়ার হয়। অনেক দাড়ি টুপিওয়ালা লোককেও দেখেছি অনেক বিশ্রী ভাষায় সেই ডাক্তারের উদ্দেশে গালি গালাজ করতেছে! অনেকে বলতেছে ভুয়া/অযোগ্য ডাক্তার, তাই অনেকগুলো ওষুধ লিখেছে যেন যেকোনো একটিতে কাজ হয়। অনেকে ডাক্তারের সার্টিফিকেট যাচাই করার প্রশ্ন তুলেছেন! কেউ কেউ বলেছে, ডাক্তার কোম্পানীর দালাল! ইত্যাকার বহু ধরনের কুৎসিত গালি গালাজ! ব্যবস্থাপত্রে ডাক্তারের মোবাইল নাম্বার উল্লেখ ছিল। অনেকে তাকে ফোন করে তাকে এবং তার পিতা মাতাকে উল্লেখ করে অকথ্য গালিগালাজ করেছেন! অথচ প্রায়ই গণমাধ্যমে অনেক ভুয়া ডাক্তারের খবর প্রকাশিত হয়, কিন্তু দেখা যায় এই লোকেরা তখন এসব প্রতারকদের ব্যাপারে 'টু' শব্দটিও করে না!

অতএব দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিত্ত নৈমিত্তিক একটি বিষয় নিয়ে চিকিৎসককে জড়িয়ে মানুষ বেহুশ হয়ে হাঁসি ঠাট্টা, গালি গালাজ করতেছে অথচ চিকিৎসক পরিচয়ধারী প্রতারকদের ব্যাপারে তারা চুপ!

এই চিকিৎসক ছিলেন একটি জেলা সদর হাসপাতালের মেডিসিনের কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। তিনি একজন সৎ, দায়িত্বশীল, মানবদরদী এবং তুখোড় মেধাবী চিকিৎসক। যাইহোক, আমি নিজে তাকে ফেসবুকে ট্যাগ করে সংশ্লিষ্ট পোস্টদাতা লোকটির বিরুদ্ধে মানহানী মামলা করার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। পরের দিন দেখলাম লোকটি সেই পোস্টটি প্রত্যাহার করেছে! ঠেলার নাম বাবাজী!

কী প্রয়োজন ছিল এই অসভ্যতার! যারা বেহুঁশ হয়ে সেটা শেয়ার করেছেন, তারা এখন কী বলবেন? একজন মুসলিম কি কখনো এমন কাজ করতে পারে? এই হাঁসি ঠাট্টা, গালি গালাজের বাড়ি ঘর কোথায়? এভাবে চলতে থাকলে, এ দেশের ভবিষ্যৎ কী?

সুরা হুজরাত এর ১১নং আয়াতে আছে, “মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। আবার ৬নং আয়াতে আছে, মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।”

তাই প্রবৃত্তির গোলাম না হয়ে সবার উচিত নিজের অজানা বিষয় নিয়ে হাঁসি তামাশা করার আগে, যারা সে বিষয়ে জানে, তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর