ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. এবিএম কামরুল হাসান

এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি এন্ড মেটাবলিজম), 
সহকারী রেজিস্ট্রার, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

 


লেভো-থাইরক্সিন সেবনের নিয়ম-কানুন

থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্ষমতা কমে গেলে থাইরয়েড হরমোন ওষুধ হিসেবে সেবন করতে হয়। সাধারণত মুখে খাবার ট্যাবলেট লেভো-থাইরক্সিন সেবনের মাধ্যমে এই হরমোনের ঘাটতি পূরণ করা হয়। বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই এই হরমোনের অভাবটা স্থায়ী, তাই সারাজীবন এই ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হয়। 

এক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হবার সুযোগ নেই। তাই ওষুধ খাওয়ার পর হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেলেও কোনোভাবেই এটি সেবন বাদ দেয়া যাবে না। বেশিরভাগ রোগীই এ ওষুধটি সঠিকভাবে সেবন করতে পারেন না, ফলে এর কার্যকারিতা ঠিকমতো নাও হতে পারে। এখানে লেভো-থাইরক্সিন সেবন সম্পর্কিত অতি জরুরি কিছু বিষয় দেয়া হলো:

◙ আমাদের দেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লেভো-থাইরক্সিন পাওয়া যায়। যেহেতু সারাজীবন এটি খেতে হবে, তাই একটি ভালো ব্র্যান্ডের ওষুধ বেছে নিন। আপনার ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের ব্র্যান্ড পরিবর্তন করবেন না, এতে ওষুধের কাজের মাত্রার পরিবর্তন ঘটতে পারে।

◙ লেভো-থাইরক্সিন ট্যাবলেট ছোট কৌটায় বা ঔষধের পাতায় পাওয়া যায়। মেয়াদোত্তীর্ণ বা রঙ নষ্ট হয়ে যাওয়া ওষুধ খাবেন না। ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ঘরের ঠাণ্ড, অন্ধকার জায়গা বেছে নিন। বাথরুম বা রান্নাঘরের মতো স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় ওষুধ রাখবেন না।

◙ লেভো-থাইরক্সিন একদম খালিপেটে সেবন করতে হয়। সেক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে উঠেই ওষুধটি খেয়ে নেয়া ভালো। ওষুধ খাওয়ার সময় থেকে সকালের নাস্তার ব্যবধান অন্তত একঘণ্টা হওয়া উত্তম। কেউ যদি রাতে ওষুধটি খেতে চায়, তাহলে রাতের খাবারের অন্তত তিনঘণ্টা পর খাওয়া উচিত।  

◙ ওষুধ খাওয়ার আগে হাত শুকিয়ে নিন, সম্ভব হলে হাত দিয়ে স্পর্শ না করেই ওষুধের কৌটা বা পাতা থেকে বড়ি সরাসরি মুখে দিন। সাধারণত লেভো-থাইরক্সিন বড়ি ২৫ এবং ৫০ মাইক্রোগ্রাম আকারের পাওয়া যায়। ৫০ মাইক্রোগ্রামের বড়ি মাঝখানে ভাঙা যায়, তাই এটি অর্ধেক করে ভেঙে সেবনযোগ্য;অন্যকোনোভাবে এই বড়ি না ভাঙাই ভাল। মুখে ওষুধ না চিবিয়ে অল্প পানি দিয়ে গিলে ফেলতে হবে।

◙ থাইরয়েড হরমোন স্বল্পতাজনিত রোগের চিকিৎসার একমাত্র স্বীকৃত ওষুধ লেভো-থাইরক্সিন। তাই এটি ব্যাতীত অন্য কোনো ধরণের ওষুধ এই রোগের জন্য সেবন করবেন না। অনেকে ওজন কমানোর জন্য এটি খেয়ে থাকেন, যাতে বিপদের আশঙ্কা আছে। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এটি খাবেন না।

◙ থাইরয়েড হরমোন স্বল্পতাজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য আলাদা কোন খাদ্য-তালিকা নেই। এরকম অধিকাংশ রোগীই ফুলকপি, বাঁধাকপি বা সয়াপ্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন।

◙ লেভো-থাইরক্সিন বড়ি খাবার একঘণ্টার মধ্যে উচ্চমানের আমিষযুক্ত খাবার, সয়াপ্রোটিন, ফাইবারযুক্ত খাবার, এন্টাসিড খাওয়া উচিত নয়, এতে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়। লেভো-থাইরক্সিন সেবনের পরবর্তী চারঘণ্টার মধ্যে ক্যালসিয়াম বা আয়রনযুক্ত কোনো ওষুধ সেবন করাও ঠিক নয়।

◙ লেভো-থাইরক্সিন বড়ি গর্ভাবস্থায় শতভাগ নিরাপদ, তাই এ সময় এটি বন্ধ করা কোনোভাবেই উচিত নয়। এতে গর্ভবতী মা এবং তার পেটের শিশু উভয়েরই ক্ষতি হতে পারে। গর্ভাবস্থায় সাধারণত লেভো-থাইরক্সিনের মাত্রা বাড়ানোর প্রয়োজন হয়। তাই গর্ভাবস্থা নিশ্চিত হওয়া মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। ডাক্তারের কাছে যেতে কোনো্ কারণে দেরি হলে আপনি প্রতিদিন যে মাত্রায় ওষুধটি খাচ্ছেন, সপ্তাহে দুইদিন তার দ্বিগুণ মাত্রায় ওষুধটি খান।

◙ কোনো কারণে ওষুধ খেতে ভুলে গেলে, যখন মনে পড়বে তখনি খেয়ে নিন, তবে তা অবশ্যই খালিপেটে (আহারের অন্তত ১-২ ঘণ্টা আগে বা পরে হতে হবে)। সেদিন মনে না পড়লে পরদিন একবারে দুইদিনের ডোজ খেয়ে নিতে পারেন।

◙ ভ্রমণের সময় ওষুধ সঙ্গে রাখুন এবং কোনোভাবেই বাদ দিবেন না। ব্যক্তিগত বা সামাজিক যে কোনো উৎসব, ঘটনা বা দুর্ঘটনায় এটি বাদ দেয়া যাবে না। অন্য কোনো অসুস্থতায়ও এটি বাদ দেবার কোনো সুযোগ নেই।

◙ ডাক্তারের পরামর্শক্রমে নিয়মিত আপনার থাইরয়েডের অবস্থা টেস্ট করুন। এজন্য রক্তের TSH, FT4 পরিমাপের প্রয়োজন হয়। কতদিন পরপর কী টেস্ট করতে হবে, তা আপনার ডাক্তারই ঠিক করে দিবেন। ভালো ল্যাবরেটরি থেকে টেস্ট করুন, কারণ এগুলো খুবই সংবেদনশীল টেস্ট, যা সঠিক নিয়মে না হলে ভুল রিপোর্ট আসতে পারে। যদিও দিনের যে কোনো সময় এই টেস্ট করা যায়, তবুও সকালে ঔষধ না খেয়ে টেস্ট করানোই সবচেয়ে ভাল উপায়। টেস্টের জন্য রক্ত দেবার পর ওইদিনের ঔষধ খেয়ে নিন।
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর