ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. জামান অ্যালেক্স

বিসিএস মেডিকেল অফিসার


প্রেসক্রিপশন ভাইরাল ও আমার অপূরণীয় ইচ্ছা

আউটডোরে রোগী দেখছি। গরমে আমার অবস্থা অনেকটাই বেড়াছ্যাড়া। তিন ঘন্টায় অলরেডী ৮০ জন রোগী দেখতে হয়েছে। বাইরে আরো জনা বিশেক রোগী দাঁড়িয়ে তখনো অপেক্ষা করছে। এমন সময় পেটের উপরের দিকে ব্যাথা নিয়ে এক মহিলা রুমে ঢুকলেন। শর্টকাট হিস্ট্রি নিলাম, পেপটিক আলসার মনে করে দ্রুত চিকিৎসা লেখা শেষ করে পরের রোগীতে মনোযোগী হলাম।

একটু পর ঐ মহিলা নিজেই একটি ইসিজি করে আবার রুমে ঢুকলেন। ইসিজি দেখে আমি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলাম, ক্লিনকাট হার্ট এটাক। পেশেন্ট লোড এর কারণে শর্টকাট হিস্ট্রি যখন নিয়েছিলাম তখন হার্টের সমস্যা বলে মনে হয়নি, ডিটেইলস হিস্ট্রি নিলে হয়তো এই মিসিং টা হতো না।

দুই.

এক হুজুর সাহেব সামনে বসে আছেন। ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে, ব্লাড সুগার ২২, বারডেম থেকে ইনসুলিন সাজেস্ট করা হয়েছে। এরপরও আমার কাছে এসেছেন মুখে খাবার ওষুধের জন্য, উনি ইনসুলিন নিতে চাচ্ছেন না। ব্লাড সুগারের অবস্থা সুবিধার না, কাজেই ইনসুলিন নেওয়ার প্রতি জোর দিয়ে রোগীকে বিদায় দিলাম। কোন রোগীকে ইনসুলিন নিতে বলার আগে কম করে হলেও মিনিট পাঁচেক কাউন্সেলিং করতে হয়, অশিক্ষিত হলে তো আরো বেশী সময় লাগে।

সরকারী হাসপাতালের আউটডোরে আর যাই হোক, কোন রোগীকে ৫ মিনিট বা তার বেশী সময় ধরে কাউন্সেলিং করার কোন সুযোগ নেই। পিলপিল করে রোগী আসছে, আমি পরের রোগী দেখা শুরু করলাম।

পরের দিন ছিলো আমার ইমার্জেন্সী ডিউটি। ডিউটিতে সেই হুজুরের সাথে আবার দেখা হলো। উনি তখন অজ্ঞান, ইনসুলিন নেয়ার কারণে ডায়াবেটিস বেশী কমে গিয়েছে। ইনসুলিন নিলে তার ত্রিশ মিনিটের মাঝে যে খাবার খেতে হয় তা বারডেমের ডাক্তারও তাকে বলেনি, রোগীর চাপের কারণে আমারও সেটা বলা হয়ে উঠেনি। প্রেসক্রিপশনে বিষয়টা লিখে দিয়েছিলাম, হুজুর বোধ হয় সেটা খেয়াল করেননি।

তিন.

আরেকদিনের কথা। আউটডোরের রুমে হুড়মুড় করে রোগী ঢুকছে আর বেরুচ্ছে। শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে এক রোগী আসলো, ভিটামিন চাচ্ছে। কি মনে করে বুকে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে চমকে উঠলাম। হার্টের স্বাভাবিক সাউন্ডের সাথে অস্বাভাবিক সাউন্ডও পাওয়া যাচ্ছে, এর মেডিকেল টার্মিনোলজী-"মার্মার"। ইন্টারেস্টিং একাডেমিক কেইস। সাধারণত এই ধরণের রোগী পেলে রোগীকে ভালোমতো এক্সামিন করলে হার্টের কোন ভালভে সমস্যা-সেটার ব্যাপারে একটা আইডিয়া করা যায়, সময় সাপেক্ষ ব্যপার, কিন্তু সেটা করা উচিত।

রুমের বাইরে লম্বা রোগীর ভিড় আমায় সেটা করতে দিলো না। সরাসরি Colour doppler Echocardiography নামক ইনভেস্টিগেশন করতে দিয়ে আমি পরের রোগী দেখা শুরু করলাম।

চার.

কি মনে হয়? আমি কি খুব খারাপ ডাক্তার? ভালো খারাপ জানি না, তবে আমার যতটুকু জ্ঞান আছে তাতে আর যাই হোক- রোগীর হার্ট এটাক হয়েছে, এটা ধরতে না পারার কোন কারণ নেই। যতটুকু জ্ঞান আছে তাতে আমি যদি একজন ইনসুলিন নিতে যাওয়া ডায়াবেটিসের রোগীকে ঠিকমতো কাউন্সেলিং করতে পারতাম, সে সময় পেতাম, তবে সে রোগী অজ্ঞান হবার কথা নয়।

যদি আমি আমার জ্ঞানকে ব্যবহার করার সময় পেতাম তবে ECHO করার আগেই এক্সামিন করে হার্টের কোন ভালভের কি ধরণের সমস্যা সে ব্যপারে একটা আইডিয়া দাঁড়া করাতে পারতাম। কিন্তু এই কাজগুলো আমি করতে পারি নাই, এদেশের রোগী দেখার যে সিস্টেম, সেই সিস্টেম আমাকে এই কাজগুলো করতে দেয় নাই। যে সিস্টেম একজন ডাক্তারকে প্রতিদিন ১০০ এর উপরে রোগী দেখতে বাধ্য করে, সে সিস্টেম একটা মগের মুল্লুক সিস্টেমে। সেই মগের মুল্লুকে অনেক ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটবে...

পাঁচ.

কয়দিন আগে এক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ভাইরাল হলো। উনি লিখেছেন, "Syp Napa--১ কেজি× ৩ বার"। ১ চামচ এর জায়গায় ১ কেজি লিখে ফেলাতে যত গন্ডগোল।

প্রেসক্রিপশনটি ফটোশপ করা। যদি প্রেসক্রিপশনটিকে সত্যও ধরে নেই তবুও ঐ চিকিৎসককে আমি খুব বেশী দোষ দিতে পারি না। সরকারী হাসপাতালে একজন চিকিৎসককে যখন শ'খানেক রোগী ডিল করতে হয় তখন 'চামচ' এর জায়গায় 'কেজি' হবে, 'মণ' হবে--এটাই স্বাভাবিক।

ছয়. সমস্যার কথা শুনলেন। সমাধান কিন্তু সহজ।

সেটাও শুনেনঃ

১. ডাক্তার প্রতি রোগী নির্দিষ্ট করে দেয়া, সেটা যেন ২০ জনের বেশী না হয়।

২. রোগী প্রতি সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া, সেটা যেন নূন্যতম ১৫ মিনিট হয়।

২. সরকারীভাবে আরো চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া। কম করে হলেও এদেশে এমুহূর্তে আরো ৩০০০০ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। ধাপে ধাপে এই নিয়োগ নিশ্চিত করা।শুধু চিকিৎসক নিয়োগ করলেই হবে না, লজিস্টিক সাপোর্টও নিশ্চিত করতে হবে, স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে।

স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা। এ বিষয়ে হেলাফেলা কাম্য নয়। দেশটা যদি সভ্য হতো তবে উপরের দেয়া সমাধানগুলো খুব দ্রুতই বাস্তবায়ন হতো। আমি জানি, সেটি হবে না।

সাত.

কয়েকদিন আগে বিদেশফেরত এক আঙ্কেল বাসায় এলেন। আমার সামনেই এদেশের ডাক্তাররা রোগ ধরতে পারে না বলে তাদেরকে তুলোধুনো করলেন। এদেশের ডাক্তারদের তুলোধুনো করা শেষ করে উনি as usual মুখ থেকে লোল ফেলে বিদেশী ডাক্তারদের প্রশংসা শুরু করলেন। ফেরেশতার মত বিদেশী ডাক্তাররা উনাকে নাকি দরজা খুলে রুমে অর্ভ্যথনা জানিয়ে ঝাড়া মিনিট পনেরো পিরিতের আলাপ করেছেন, আলাপ শেষে তার জন্য ট্যাক্সি ডাকবে কিনা সেটাও চিকিৎসক মশাই জানতে চেয়েছেন, শেষে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছেন।

আমি অবশ্য খালি শুনে গিয়েছি, কিছু বলি নাই। তবে মনে একটা ইচ্ছে হয়েছিলো। একবার যদি ঐ আঙ্কেল আর তার ঐ বৈদেশী ডাক্তারকে গরমের মাঝে আমি আমার আউটডোরের ভাঙ্গা চেয়ারে একদিনের মত বসিয়ে শ'খানেক রোগী দেখাতে পারতাম! খালি একদিন! মাত্র একদিনের জন্য যদি বসানো যেত! এরপর দেখতাম কত ধানে কত চাল, কত চালে ঐ বৈদেশী ডাক্তারের গায়ে কত চর্বি।

আফসোস, মনের ইচ্ছা সবসময় পূর্ণ হয় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর