অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত

অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত

নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ, সাবেক উপাচার্য, বিএসএমএমইউ


২৬ অগাস্ট, ২০১৬ ০৯:৪৪ এএম

ঢাকার কাশি, ঢাকার হাঁচি

ঢাকার কাশি, ঢাকার হাঁচি

বিশ্বের জনবহুল মেগা সিটিগুলোর একটি আমাদের এই ঢাকা শহর। চিকিৎসাকর্মী হিসেবে আমাদের মূল চিন্তার বিষয় এই শহরের স্বাস্থ্যসমস্যা। এখানে একজন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞের কাছে প্রায় ৫০ শতাংশ রোগীই আসে হাঁচি-কাশির সমস্যা নিয়ে। আর এই সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।

বর্তমানে ৭০ লাখ বাংলাদেশি হাঁপানি রোগে ভুগছে, তার অর্ধেকের বেশি শিশু। শিশুদের মধ্যে ব্রংকাইটিস ও দীর্ঘমেয়াদি কাশির প্রকোপ বেড়েছে বিগত কয়েক বছরে। গবেষণা বলছে, কেবল বায়ুদূষণের কারণে বছরে ১৫ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে ঢাকা শহরে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতার এক বিশাল অংশ ভুগছে এই হাঁচি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যায়। বিশেষজ্ঞ হিসেবে এর আলাদা নামও দিতে চাই—ঢাকার কাশি।
আতঙ্কের বিষয় হলো, এই সমস্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায় শুষ্ক মৌসুমে। নানা পদের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক, ইনহেলার এই কাশির কাছে হার মানে। কেননা, সমস্যাটা রোগীর শরীরে নয়, বরং ঢাকার বাতাসে। ঢাকার বাতাসে বিদ্যমান নানা দূষিত উপাদান মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে প্রদাহ, অ্যালার্জি ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে বলেই ঢাকার বাসিন্দারা নিত্য এ সমস্যায় ভোগে। তাই সাধারণ ওষুধপথ্য এই সমস্যার কোনো জুতসই সমাধান নয়।
গ্যাস ও তেলচালিত যানবাহন এবং শহরের আনাচেকানাচে ও উপকণ্ঠে গড়ে ওঠা নানা কারখানা থেকে প্রতিদিন নির্গত হচ্ছে কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও সিসার কণা। এর সবই শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বাতাসে সিসা-কণার ঘনত্ব দাঁড়ায় প্রতি ঘন মিমি বাতাসে ৪৬৩ মনোগ্রামে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ এবং সেফটি লেভেলের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এ ছাড়া আছে গাড়ির ধোঁয়া, যা কার্বন মনোক্সাইড ও অদাহ্য কার্বনের বড় উৎস। সুবিধাবঞ্চিত বস্তিবাসী ও গৃহহীন মানুষ এখনো শহরে খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে, যা থেকে অ্যামোনিয়া ও জীবাণু পরজীবী বাতাসে ভেসে শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে। যত্রতত্র কফ-থুতু ফেলাও শহরবাসীর অভ্যাস। জীবাণু এভাবেও সহজেই অন্যের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে রোগের সূচনা করে। কিন্তু এর কি সমাধান নেই?
নিশ্চয়ই আছে। একসময়কার নোংরা অস্বাস্থ্যকর সিঙ্গাপুর শহর আজ বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর স্বাস্থ্যপ্রদ সিটিতে পরিণত হয়েছে। চেষ্টা করলে ঢাকাও পরিচ্ছন্ন হবে। বাতাসের বিষাক্ত কণাগুলোকে অনেকাংশেই কমিয়ে আনা যায় ব্যাপক সবুজায়নের মাধ্যমে। কেবল বৃক্ষরোপণ নয়, স্রেফ রাস্তার ধারগুলো ও যেকোনো খোলা জায়গা বিশেষ ঘাস দিয়ে মুড়িয়ে দিলেই অনেক কমে যায় সমস্যা। ঢাকাবাসীকেও হতে হবে সচেতন। যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, কফ-থুতু বা খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলে আমরা নিজেদেরই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি। ভেবে দেখুন, এই শহরে প্রতি রাতে হাজার হাজার শিশু সারা রাত ধরে কাশে, প্রতিদিন সকালে লাখ লাখ মানুষ হাঁচি দিতে থাকে, প্রতিদিন বেড়ে চলেছে হাঁপানির জন্য ইনহেলার কেনার সংখ্যা—এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে।

সূত্রঃ প্রথম আলো

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে