ঢাকা      মঙ্গলবার ২১, মে ২০১৯ - ৬, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


মরণের চিকিৎসা দেবেন নাকি যে সই লাগবে?

ষাটোর্ধ্ব এক মহিলা, যিনি ডায়রিয়ায় ভুগছেন দু'দিন থেকে। রাতে তার স্বামী ও ছেলেরা তাকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন। তাদের বাড়ি কাছেই, মিনিট পাঁচেক লাগে আসতে। বলে রাখা ভাল, আমাদের এখানে ডায়রিয়ার মহামারি চলছে এখন! ডায়রিয়া ওয়ার্ড ছাপিয়ে রোগী যেন উপচে পড়ছে, ফ্লোর করিডোর সব সয়লাব রোগী ও রোগীর লোক দিয়ে।

তো যথারীতি ওই রোগীর বেশ ডিহাইড্রেশন পাওয়া গেল, ভর্তির পরামর্শ দেয়া হল, হিস্ট্রি নিয়ে দেখা গেল রোগী DM ও IHD এর রোগী, ইনসুলিন নেয় ও বিভিন্ন ওষুধ খায়। সব মিলিয়ে অর্ডার লেখার পূর্বে তাদের আগের কাগজপত্র চাইলাম কি কি ওষুধ খায় দেখার জন্য। তারা কোন কাগজপত্র আনেনি। বললাম- আপনারা তো অনেক লোক, বাড়িও বেশি দূরে না, একটু কষ্ট করে একজন যেয়ে নিয়ে আসেন, দেখা জরুরি।

রোগীর বুড়ো স্বামী যিনি চেচিয়ে উঠলেন, কাগজ এখন আনতে পারবো না, ওষুধ যা খায়, খায়। আপনি এত কথা না বলে ডায়রিয়ার চিকিৎসা দেন!

আমি চাচাকে বললাম- চাচা এটার প্রয়োজন, আর এতে মাথা গরম করার তো কিছু নাই।

তিনি বেশ রাগতস্বরে আবারো বলে উঠলেন- বিছানা খালি নাই, ফ্লোরে থাকতে বলে, আপনি কেবিন দেন, আমি মুক্তিযোদ্ধা! তখনি সিস্টারের ফোন- এক রোগীর লোক এসে উপরে চেঁচামেচি করছে, কেবিন চায়।

আমি দেখছি বলে ফোন কেটে দিয়ে চাচাকে বললাম- আমার দুটো কথা মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে। আপনার রাগের কারণ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু ডায়রিয়ার রোগীকে আলাদা ওয়ার্ডে রাখা হয়, তাদের কেবিন দেয়ার নিয়ম নেই।

চাচা আমার কথার মাঝেই গজগজ শুরু করলেন। আমি সেটাকে উপেক্ষা করে বলতে থাকলাম, ডায়রিয়ার সাথে রোগীর যেহেতু আরো পূর্ব সমস্যা আছে, আর আপনি কাগজও আনতে পারছেন না, তাই রোগী একটু ঝুঁকির মধ্যে আছে, আমরা সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় আমাদের হাতে যা চিকিৎসা আছে সেটা দিয়ে চেষ্টা করবো, কিন্তু সেটা শুরু করার আগে আপনার সাইন লাগবে। কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন- ‘কেন মরণের চিকিৎসা দেবেন নাকি যে সই লাগবে? সই দিতে পারবো না!’

আমি তাকে আবারো রোগীর অবস্থা এবং তার ডায়বেটিস ও হার্টের সমস্যার বিষয়ের ঝুঁকিগুলো বুঝিয়ে বললাম, তিনি রাগ দেখাতেই থাকলেন, যার সাক্ষী হলেন আমার পাশেই থাকা ক্যাশিয়ার, স্যাকমো, ওয়ার্ড বয়।

ইতোমধ্যে উপরে সিস্টারদের সাথে অগ্রীম সিট চেয়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে তার ছেলের আগমন। এসেই কর্তৃত্বের সুরে- কেবিন লেখেন, সিস্টার বলেছে নিচ থেকে লেখাইয়া আনেন, ফাইল আনেন।

আমি তখনো অর্ডার লিখিনি। আমি তাকে কেবিনের ব্যাপারে একই কথাগুলো বললাম। তিনি আরো বহুগুন রাগে- অবশ্যই কেবিন দিবেন, কেবিন দেবেন না মানে? আমার কেবিন লাগবে, আমি মুক্তিযোদ্ধার ছেলে। আমি তখন কি করবো কি বলবো বুঝতে পারছি না। রোগীর লোকদের রাগমুখো অবস্থা দেখে মাথা হ্যাং হয়ে আছে। এরমধ্যেই সে স্যারকে ফোন দিল, যা যা বলেছি সব বললো। কথা শেষে সে আমার দিকে ফোনটা এগিয়ে দিল, নেন কথা বলেন। ওপাশ থেকে, ঝামেলা করে তো লাভ নেই, স্থানীয় লোকজন, বুঝবে না, দিয়ে দাও!

আমি অবনত মস্তকে অর্ডার লিখলাম, কেবিন দেওয়ার জন্য স্যার অনুরোধ করেছেন এটাও লিখলাম। আগের চিকিৎসার কাগজপত্র চেয়েছি দেখাতে পারেনি এটাও লিখলাম, RBS, S. creatinine করা প্রয়োজন, করে দেখাতে বললাম।

স্থানীয় হোক, এহেন মুক্তিযোদ্ধা হোক, বা স্যারের সম্মতি হোক, আচরণগুলো সুখকর মনে হল না। সরকারী এই গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর এতিম হলাম আমরা। যে যাই যেভাবে বলে মেনে নিতে হবে, নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে, তবেই ভাল থাকা যাবে। রাতে খেতে গেছি, একা যাইনি, এক এমআর ছিল। খাওয়া শেষ হতেই আমার পিছনের বেঞ্চিতে বসা এক লোক আমাকে ডাক দিয়ে বললো- সেদিন এক রোগী নিয়ে গেলাম, সার্টিফিকেট চাইলাম কোর্টের হাজিরার জন্য, দিলেন না। বড় ক্ষতি হয়ে গেল, আপনার কথা একজন বলে দিয়েছিল, আপনি দিতে পারবেন। তাকে বলেছিলাম, সে বলেছে তার প্যাড নাই।

আমি অবাক হই শুনে, এরাই সেই বীরপুরুষ রাস্তায় মারতে চেয়ে স্যারের কাছে ফোন করেছিল। মনে মনে ভাবি, যিনি বলেছেন তার প্যাড নাই, প্যাড তারই আছে, গাইনির কনসালটেন্ট, প্রাকটিস তিনিই করেন, আমি তো আর প্র্যানকটিস করি না, সার্টিফিকেট তার পক্ষেও দেয়া সম্ভব, তিনি দেন বা না দেন তার ব্যাপার, কিন্তু আমার কথা তো এভাবে বলতে পারেন না।

এসব কথা মনে মনেই বলি, মুখে শুধু এটাই বলি- দেখেন আমার নামের প্যাড ছিল না, আর আমি দিইও না, তাই সেদিন দিতে পারিনি।

মনে মনে ভাবি- নিজের পিঠ বাঁচিয়ে আমাদের বিপদে ফেলে আমাদের স্বগোত্রীয়রা, অন্যদের সামনে ছোট করে আমাদের। এহেন জনগন খারাপ, আমরা অনেক ডাক্তারও যে মন মানসিকতায় এদের চেয়ে ভাল তাও কিন্তু না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩৯তম বিসিএসের পোস্টমর্টেম

৩৯তম বিসিএসের পোস্টমর্টেম

দেশের সকল খাতের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্যসেবাকেও যুগোপযোগী করে তুলতে অপ্রতুল জনবলের বিষয়টি…

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

৩৯তম বিসিএসের নন-ক্যাডারদের দাবি, বিপক্ষ মতের যুক্তিখণ্ডন

যুক্তি-১ বিপক্ষ মতের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, একসঙ্গে এত চিকিৎসক নিয়োগের…

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

নিরাপত্তাহীনতায় কর্মস্থল বদল

যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ! জানি না আর কি কি খারাপ…

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের উচ্চ রক্তচাপঃ এক অবহেলিত অধ্যায়

শিশুদের রক্তচাপ মাপতে গেলেই রোগীর বাবা-মা সবসময়ই যে প্রশ্নটি করেন সেটি হল…

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

‘প্রধানমন্ত্রীর স্বদিচ্ছা সত্ত্বেও নিয়োগবঞ্চিত নন-ক্যাডার চিকিৎসকরা’

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগের দুই মেয়াদে আওয়ামী…

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা

আমার মা ২ সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। উনি গত আড়াই বছর ধরে…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর