ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫ ঘন্টা আগে
ডা. শামীমা জাহান

ডা. শামীমা জাহান

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারী বিভাগ।
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ,  ৫৩/১, জনসন রোড, ঢাকা।


২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০৯:৫৫

সেবায় নৈতিকতা

সেবায় নৈতিকতা

আজ আধবেলা কেটে গেলো সেবায় নৈতিকতার আলোচনায়। শবেবরাত এগিয়ে এসেছে, আরেকটু এগোলেই রোজা। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আজই বাড়তি। নৈতিকতা বিপর্যয়ে আছে সর্বত্র।

অনেক আলোচনাই শুনলাম। কিছু উপদেশ, কিছু উদাহরন! কেউ বলেনি, নৈতিকতার বিপর্যয়ের ফল! সবচেয়ে অসৎ মানুষটিও ভালোকথা বলে গেলো।

নৈতিকতার শিক্ষা কোথায় পাওয়া যায়? এক বাক্যে বলা যায়, পরিবারে। যিনি রোজায় দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেন, তার পরিবার কি তার কাছে অনেক বেশি টাকা চায়? সম্ভবত তাই-ই। কিন্তু কোনটি পৃথিবীতে স্হায়ী? দামী জামা- গহনা, দামী খাবার কোনটি?

যিনি মানুষকে (যে কোন পেশার) জিম্মি করে টাকা উপার্জন করেন, তিনি কি সুখে এই টাকা ভোগ করবেন? অসম্ভব। ভয়ংকর বিপদ/কষ্ট অবশ্যই তার ও পরিবারের জন্য অপেক্ষমান। আমি অসৎ ব্যক্তিদের সবিনয়ে বলি, আপনার কাজের কঠিন মূল্য দেবে আপনারই প্রিয়জন।

একদিন কাজের ফাঁকে কফি খেতে গেলে সহকর্মী প্রশ্ন করলেন, আপনি যে গত বছর চীন বেড়াতে গেলেন, পনেরো দিন থাকলেন, আপনাকে কে স্পন্সর করেছিলো? প্রশ্নটি বুঝিনি। আবার জানতে চাইলে ব্যাখ্যা শুনে হেঁচকি এসে গেলো। বিনীতভাবে হিসাব দিলাম। আমাদের দু' মাসের বেতন খরচ হয়েছিলো। এটি আরও কমানো যেতো, যদি নিম্নমানের হোটেলে থাকা যেতো। আমি পাঁচটি প্রদেশ বেরিয়েছি। স্হানীয় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার, সামান্য খাবার (প্রতি বেলায় দুধ, রুটি, কলা, আপেল। হারাম খাবার খাবনা।) কেনাকাটা নেই, আসা-যাওয়া বাজেট এয়ারলাইন্সে। আমার কোন কষ্ট তো হয়নি! শান্তিতে বেড়িয়েছি।

গতমাসে আভ্যন্তরীন কিছু পরীক্ষা ছিলো। যথারীতি আমি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাই সবসময় নিয়ে থাকি। টেবিলে মুখস্থ বলা তো সবাই পারে! হাতের কাজ জানতে হবে। এক ছাত্র কিছুই বলতে পারছিলো না। তাকে নরম গলায় বললাম, আচ্ছা, পড়াশুনা বাদ, তোমার দেশ কোথায় বলো। উত্তর শুনে মন খারাপ হয়ে গেলো। বাড়ী নরসিংদী। বললাম, বাবা আমি নরসিংদীর মেয়ে হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে যদি এতদূর আসতে পারি, তুমি আটকে আছো কোথায়? জবাব নেই। তবে আমি আশাবাদী, হয়তো এই কথাটি তার পড়াশুনার যত্ন বাড়াতে সাহায্য করবে।

বিপরীত চিত্রও আছে, এক চতুর্থ শ্রেনীর অসাধু কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে নরসিংদীর ধোঁয়া তুলে, কিছু অনৈতিক সুবিধা চাইলে আমি জানালাম, আমার দেশ বাংলাদেশ।

তিনমাস আগে সার্জারীর হেড অব দি ডিপার্টমেন্টের চার্জ নেবার পর, এ মাসে প্রফেসরের (চলতি দায়িত্ব) কাগজ পেলাম। বেতন না বাড়লেও কাজ দ্বিগুণ হয়েছে। চিঠি পড়ে বাড়ীর লোকজন বিরক্ত। বন্ধুরা বললেন, দয়া করে এবার একটু দামী কাপড়চোপড় পড়ুন। হেসে বললাম, রাজা- বাদশাহ্ টাইপ পোশাক? আমি শান্তই আছি। কারণ আমার কিছুতেই কিছু যায় আসে না।

ক্লাসে পড়াবার সময় মাঝেমধ্যেই বলি, যেদিন মেডিকেল কলেজে পা রেখেছো, সেদিন থেকেই তোমাদের জীবন বদলে গেছে। এই জীবন মেনেই এগিয়ে যেতে হবে। ফেরার পথ বন্ধ।

অভিভাবকদের বিনীতভাবে প্রশ্ন করতে চাই, তাঁরা তাদের সন্তানকে যখন ডাক্তার হবার জন্য পাঠান, তারা কি ভাবেন? একটি টাকা উপার্জনের যন্ত্র চান? নাকি মানবিক একজন চিকিৎসক চান? রোজার মাসে কসাই ও মাংসের দাম বাড়িয়ে টাকার উপার্জন বাড়ায়। ভোজ্য তেলে ভেজাল দেন। মাছে ফরমালিন মেশান, সবজিতে-ফলে ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মেশান। দুটো কি এক করে দেবেন?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত