মুবাশ্বির আহমদ সাকীফ

মুবাশ্বির আহমদ সাকীফ

শিক্ষার্থী, ৫ম বর্ষ,

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ।


১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:১৪ এএম

সূর্যোদয়ের দেশে

সূর্যোদয়ের দেশে

ছোটবেলায় যখন পড়েছিলাম জাপানকে বলা হয় সূর্যোদয়ের দেশ, তখন থেকেই একটি ইচ্ছা ছিল, "ইশ! যদি সুর্যোদয়টা ওখান থেকে একবার দেখতে পারতাম!" আর সেই সুযোগটাই আমরা পেয়েছিলাম। আজকে সেই স্মৃতি রোমন্থন করতেই লিখতে বসলাম।

এ বছরের ২০ জানুয়ারী জাপান সরকার আয়োজিত জেনেসিস প্রোগ্রামে অংশ নিতে আমরা ১৪ জন বাংলাদেশী জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। এবারের জেনেসিস প্রোগ্রামের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘স্বাস্থ্য’। উদ্দেশ্য: জাপানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে শিক্ষা নিয়ে তা আমাদের দেশে কিভাবে কাজে লাগানো যায়। ১০দিন ব্যাপী এই প্রোগ্রামে বাংলাদেশ ছাড়াও অংশ নেয় সার্ক অন্তর্ভুক্ত ৮টি দেশের মোট ৯৬ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং ডাক্তার। জাপানের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হবার পাশাপাশি আমাদের বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীদের মাঝে কখন যে এত সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল বুঝতেই পারিনি!

এই প্রোগ্রামের প্রতিটি দিনই ছিল আমাদের জন্য শিক্ষনীয়। প্রথম দিন টোকিওর নারিতা এয়ারপোর্টে নেমেই আমাদের দেখা হয় নেপালী বন্ধুদের সাথে। সেখান থেকে আমরা দুপুরের খাবার সেরে আমরা রওনা দেই হোটেলের উদ্দেশ্যে। পথে ছবির মত সুন্দর টোকিও শহর দেখে আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। কী সাজানো গোছানো শহর! কোথাও কোন ময়লা আবর্জনা নেই, গাড়ির হর্ন নেই, সবাই যার যার মত ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলছে।

১ঘন্টার পথে কোথাও জ্যামেও পড়তে হয়নি আমাদের। মাঝপথে নেমে আমরা দেখে নেই জাপানের ঐতিহ্যবাহী ইম্পেরিয়াল প্যালাস। যেখানে অবস্থিত জাপানের সম্রাটের বাসভবন। হোটেলে যেয়ে কোনরকম একটু ফ্রেশ হয়ে আমরা চলে যাই জেনেসিস প্রোগ্রামের ওরিয়েন্টেশন লেকচারে। সেখানে আমাদের ১০দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে ধারনা দেওয়া হয়, আমরা পরিচিত হয়ে নেই অন্যান্য দেশের প্রতিযোগী এবং আমাদের প্রত্যেক গ্রুপের কো-অরডিনেটরদের সাথে৷

পরদিন সকালের নাস্তা সেরে আমরা আবারও চলে যাই লেকচার সেশনে। সেখানে জাপান সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন ইয়োকোহামা ইউনিভার্সিটির লেকচারার কেঞ্জি হাসেগাওয়া। আমরা জানতে পারি জাপানের ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ, জলবায়ু, ভাষা, অর্থনীতি এবং আরো অনেক কিছু সম্পর্কে। খুব অবাক হয়েছিলাম যখন জানতে পারলাম জাপানে প্রতিদিন ছোট বড় প্রায় ৯০০টি ভূমিকম্প হয়, কিন্তু এদেশের প্রত্যেকটি ভবন ভূমিকম্প প্রতিরোধক, তাই খুব বড়সড় দুর্যোগ না হলে ক্ষয়ক্ষতি বলতে গেলে হয়ই না।

পরদিন আমাদের সব প্রতিযোগীদের ২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। একদল চলে যায় চিবা প্রদেশে, এবং আরেকদল-আমরা যাই নাগাসাকিতে। আকাশপথে যাওয়ার সময় পাইলট জানালা দিয়ে আমাদের বাম পাশে তাকাতে বললেন। আমরা দেখতে পাই জাপানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ফুজি, যা কিনা এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি! তখনও আমরা বুঝিনি নাগাসাকিতে আমাদের জন্য আরো কত বিস্ময় অপেক্ষা করছে। যান্ত্রিক টোকিও শহর ছেড়ে নাগাসাকিতে আমরা যেন জাপানের এক অন্য রুপ আবিষ্কার করলাম।

গাছপালা, ছোট ছোট টিলায় সাজানো ছিমছাম পাহাড়ি একটি শহর। এ শহরে যেন কোন কষ্ট নেই, কোন বিশাদ নেই। চারিদিকে শান্তিময় পরিবেশ। কে বলবে ৭৪ বছর আগে এখানেই ভয়ংকর পারমানবিক বোমা আঘাত এনেছিল! কিন্তু মাঝে মাঝেই আমাদের চোখে পড়ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস সেই হামলার কিছু প্রমান।

চতুর্থ দিনে আমরা যাই নাগাসাকি ইন্সটিটিউট অব ট্রপিকাল মেডিসিন, যেখানে ট্রপিকাল দেশগুলোর বিভিন্ন রোগ নিয়ে একটি তুলনামূলক চিত্র আমদের সামনে তুলে ধরেন প্রফেসর কাজুহিকো মজি। এর সাথে জাপান কিভাবে যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল সে সম্পর্কেও উনি বক্তব্য রাখেন। পারমানবিক বোমা হামলার ভয়াবহতার আরও করূন চিত্র আমরা দেখতে পাই নাগাসাকি পিস পার্ক এবং এটমিক বোম্ব জাদুঘরে যেয়ে। এটাই সেই স্থান যেখানে "ফ্যাট মান" নামক বোমাটি বিস্ফরিত হয়েছিল। ভয়াবহ সেই হামলার ধ্বংসাবশেষ এবং নানা নিদর্শন দেখে গা সিউরে উঠছিল আমাদের। 

পরদিন আমদেরকে পাঠানো হয় জাপানি কিছু পরিবারে। উদ্দেশ্য: জাপানি সংস্কৃতি আরো ভালভাবে উপলব্ধি করা। পরবর্তী ২দিন আমরা আমাদের নতুন পরিবারে ছিলাম। সেখানে একই ভাষা না জানা সত্ত্বেও ভাঙা ভাঙা জাপানি ভাষাতেই চলে আমাদের হাসি ঠাট্টা এবং আড্ডা। সত্যি, এখনও মনে হয় জাপানে আমার একটি পরিবার আছে, তাদের আদর আপ্যায়ন এবং আন্তরিকতা কখনই ভুলবার মত নয়। তাই, তাদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় আমাদের সবার চোখেই ছিল অশ্রু। 

আমরা সবাই আবার টোকিওতে ফিরে এলাম আমাদের ফাইনাল প্রেসেন্টেশন সেশন এর জন্য। সেখানে সকল দেশের প্রতিযোগি এবং আয়োজকদের সামনে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আমাদের প্রেসেন্টেশন সেশনের পর আমাদের সার্টিফিকেট বিতরন করা হয় এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদায় জানানো হয়। একে একে সব দেশের প্রতিযোগিদের সাথে আবেগ ঘন পরিবেশে বিদায় নেই আমরা। একে অপরকে কথা দেই এই বন্ধুত্ব থাকবে চিরকাল। পরদিন সকালেই নারিতা এয়ারপোর্ট থেকে দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি আমরা। সাথে নিয়ে আসি সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের সুন্দর প্রত্যেকটি মূহুর্তের স্মৃতি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত