ঢাকা      মঙ্গলবার ২০, অগাস্ট ২০১৯ - ৫, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



অধ্যাপক ডা. সালমা আফরোজ

সাবেক বিভাগীয় প্রধান, হেমাটোলজি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। 


হিমোফিলিয়ার চিকিৎসায় সরকারি উদ্যোগ জরুরি

রাত ১১টা। মোবাইলে অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। ভয়-সংশয়ে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠ, ‘ম্যাডাম আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান। পড়ে গিয়ে ওর ঠোট কেটে গেছে, খুব রক্ত পরছে!’

রোগী না দেখে কি বলবো, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তিনি বললেন, বাচ্চার হিমোফিলিয়া। ৩ বছর আগে আমার কাছে ভর্তি ছিল। হেল্থ কমপ্লেক্সে বা কাছাকাছি মেডিকেল কলেজে নিতে বলি। কোন কিছুই কাছাকাছি নেই। প্রয়োজনীয় কিছুই কাছে নেই। আবার অনেক হাসপাতালে এ রোগী রাখতে চায় না।

মুঠোফোনে যতটুকু উপদেশ সম্ভব দিলাম। কিন্তু এ রকম একজন রোগীর চিকিৎসা দিতে না পেরে সারারাত অস্থিরতার মধ্য কাটলো। ওর পরিবারের অসহায়ত্বের কথা বারবার মনে হলো। 

পাবনা থেকে ১৮/১৯ বছরের রোগী আসলো। বাম পাটা হাঁটুর উপড় থেকে অসম্ভব ফুলে আছে। চামড়া টানটান হয়ে আছে। যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। খুব গরিব।তাই ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও শ্রমিকের কাজ করতো। পাটা দিনদিন ফুলছিলো। টাকার অভাবে কিছুই করতে পারেনি।

চিকিৎসার কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি পাবনাতে। ঢাকায় আসার টাকা জোগাড় করতে অনেক দেরি হয়েছিল। আবার টাকার অভাবে ফিরে যেতে হয়েছিল। কয়দিন পর ওর মৃত্যুর খবর পেলাম।

যাদের কথা লিখলাম, ওরা অস্বাভাবিক রক্তপাতের রোগী। আমরা আঘাত পেলে বা কোন জায়গা কেটে গেলে স্বাভাবিক নিয়মে একটু পর জমাট বেধে রক্ত বন্ধ হয়। 

রক্তের কতগুলো উপাদান প্রয়োজন। এর মধ্য ৮ ও ৯ উপাদান হিমোফিলিয়া রোগীদের কম বা একবারেই থাকে না। তাই ওদের অনেক বেশি রক্ত পরে। এই ফ্যাক্টর বা উপাদান x ক্রোমজম তেরি করে। এই রোগীর অসুস্থ x ফ্যাক্টর তেরি করতে পারে না।

ছেলেদের xy একটা x থাকায় ফাক্টর অভাব হয়। তাই রক্ত বন্ধ হতে চায় না। কিন্তু মেয়েদের xx থাকায় অসুস্থ একটা x থাকলেও অন্য x ফ্যাক্টর তৈরি করায় এই রোগে ভোগে না, শুধুমাত্র বহন করে। ছেলেরা মায়ের কাছ থেকে এই রোগ পেতে পারে। আবার কিছু রোগীর পরিবারে এই রোগ নাও থাকতে পারে।

হিমোফিলিয়ার প্রধান উপসর্গ অস্বাভাবিক রক্তপাত, তা শরীরের বাইরে বা ভিতরে হতে পারে। কতখানি ফ্যাকটর তার উপর উপসর্গ নির্ভর করে। নিজ থেকে বা আঘাতে রক্তক্ষরণ হয়। ভার বহন করে এমন জয়েন্টই বেশি ক্ষতি হয়। পরে জয়েন্ট কাজ করে না, এক পর্যায়ে রোগী পঙ্গু হয়ে যায়। রক্ত পড়তে পড়তে কেউ কেউ মারাও যায়।

আমাদের দেশে এই রোগীদের রোগ নির্ধারণ ব্যবস্থা সীমিত ও ব্যয়বহুল। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যক্টর অপ্রতুল ও দামি হওয়ায় বেশিরভাগ রোগীই পযাপ্ত চিকিৎসা নিতে না পারায় পঙ্গু হয়ে থাকে। 

এ অবস্থায় অন্ততপক্ষে সব সরকারি হাসপাতালে কমমূল্যে পরীক্ষা করা গেলে অনেক রোগীর ডায়াগনোসিস হতো। আবার ইমার্জেন্সির জন্য ফ্যাক্টর সাপ্লাই থাকলে অনেক দুর্ভোগ কমানো যেতো। অন্ততপক্ষে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে প্লাজমা রক্ত থেকে আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করলে খুব সহজেই রোগী কিছু সেবা পেতো। আর এজন্য শুধু সদিচ্ছারই প্রয়োজন।

অনেক রোগী আমাদের চোখের আড়ালে, ওদের কাছে আনি। সেবা পাবার অধিকার দেই। বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবসে রোগী ও ওদের পরিবারের জন্যসহমর্মিতা ও শুভকামনা।
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতাল নিটোরের গল্প

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নিটোর নিয়ে কিছু কথা উঠেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থোপেডিক হাসপাতালটির…

মৃত্যুর আগে কথোপকথন

মৃত্যুর আগে কথোপকথন

হাতির মতন বিশাল মেশিনটি আমার বুকের উপর দিয়ে বার কয়েক চক্কর দিয়ে…

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

একজন কনসালটেন্ট তার মামাতো ভাইকে দেখাতে এসেছে। রোগীর সাথে কথা বলছি, এই…

মানহীন মেডিকেলের প্রাদুর্ভাব বন্ধে মেডিকেলিয় ভূমিকা

মানহীন মেডিকেলের প্রাদুর্ভাব বন্ধে মেডিকেলিয় ভূমিকা

আমরা সবাই জানি এবং প্রতিনিয়ত বলে বেড়াচ্ছি ব্যাঙের ছাতার মতো মানহীন মেডিকেল…

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সৈন্যের সংখ্যা বিশ্বে তৃতীয়! অথচ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কোনো…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর