ঢাকা      শুক্রবার ১৯, জুলাই ২০১৯ - ৪, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. মিথিলা ফেরদৌস

বিসিএস স্বাস্থ্য

সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


রোগী ও চিকিৎসকের আন্তরিকতা সমাচার

কিছুদিন আগে, ছেলেটা অনলাইনে এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে দেখাতে এসেছিলো, বহুদুরে বাড়ি। চেম্বারে দেখলাম, পায়খানার রাস্তা বহুবার চিড়ে গিয়ে ছোট হয়ে গিয়েছে। রোগ সম্পর্কে বুঝিয়ে বললাম, অপ্সান দিলাম দুইটা। সাময়িক চিকিৎসায় আরাম পাবে, অপারেশন করলে ভাল হয়ে যাবে। সাময়িক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিলাম।

আমার প্রায়শই ভিজিট নেয়ার কথা মনে থাকেনা। আরও দুইটা রোগী দেখে চেম্বার থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠতে যাবো, ছেলে হাফাতে হাফাতে এলো, "ম্যাডাম সরি আমি ভিজিট দিতে ভুলে গিয়েছিলাম।" মনে মনে হাসি, অনেক ক্ষেত্রেই ভুলে গিয়ে দেখেছি, কেউ এমন ফিরে আসেনি।

৭/৮ মাস পর, একটা ফোন আসে।

: ম্যাডাম, আমি আপনার অমুক রোগী। অপারেশন করতে চাই। আমি বহু নেট ঘেটে দেখেছি, আপনি যেমন করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমার অবস্থা তেমনই। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি ম্যাডাম ভাল হইনি। আমি এর মধ্যে এসে অপারেশন করাবো।

এমন অনেক রোগীই ফোন করে, আমার মনেও থাকেনা, থাকার কথাও না। তবুও আচ্ছা বলে ফোন কেটে দিই। এরও দুই মাস পরে ছেলেটা আসে।

: ম্যাডাম,আমি আজকেই অপারেশন করবো।

হালকা পাতলা কমবয়সী ছেলেটাকে দেখে মনে পরে, সে আমাকে ছুটে এসে ভিজিটের টাকা দিয়েছিল। বললাম,

: হুট করে তো অপারেশন করা যাবেনা। কিছু পরিক্ষা দরকার। আপনি পরশু করেন। কাল শুক্রবার, আমি রোগী দেখিনা।

ছেলেটা বেশ মরিয়া।

: ম্যাডাম আমার অপারেশনের খরচটা তাহলে আপনার কাছে রেখে দেই?

আমি খুব অবাক হই। : না,তা কেন? অপারেশন না করে আমি চার্জ রেখে দিবো কেন?

: আপনার কাছে টাকাটা থাকলে আমার সুবিধা হতো।

আমি সাফ না বলে চলে আসি। শনিবার ছেলেটার অপারেশন করি। পোস্ট ওপে ছেলেটাকে দেখতে যাই। বেশ এনিমিক আর ম্যালনারিশড। বুঝি আর্থিক অবস্থা ভাল না। ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করি-

: সাথে কে আছে? একটু বুঝিয়ে দিতাম।

: কেউ আসেনি ম্যাডাম। ক্লিনিকের এক ওয়ার্ডবয়কে আপনার টাকা দেয়া আছে। কিছু টাকা কম দেয়া আছে ম্যাডাম। আমি ছাত্র মানুষ!

খুব লজ্জিত সে, আমি নিজেও লজ্জা পেয়ে বলি-

: বাবা, টাকা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবেনা। কোনও সমস্যা হলে ফোনে জানিও।

সাধারণত কোনও অপারেশন করলে রোগীর লোক ফোনের পর ফোন করতে থাকে। কিন্তু এইক্ষেত্রে রাত পর্যন্ত কেউই ফোন করলোনা।

পরদিন সকালে নিজেই ফোন করি ক্লিনিকে। ডিউটি ডাক্তারকে অবস্থা কি জানতে চাইলে সে বলে খোঁজ নিয়ে জানাবে। বেশ কিছু পর, ডিউটি ডাক্তার জানায় ছেলের ১০৫ ডিগ্রি জ্বর। আমি বেশ টেনশনে পরে যাই। এমন হওয়ার কোনও কারন খুঁজে পাইনা। তখন সিজন যেহেতু ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়ার। তাই সব ব্যাথার ঔষধ দিতে মানা করে দিয়ে শুধু প্যারাসিটামল দিতে বলি। অফিস শেষে দ্রুত যাই ছেলের খোঁজ নিতে।

সাধারণত, রোগীরা ডাক্তারকে কম টাকা দিলেও দেখা যায় ভিআইপি কেবিনে ঠিকই উঠে। এখানে তাদের কার্পণ্য নাই। কিন্তু ছেলেটাকে দেখলাম, ওয়ার্ডের এক কোনায় শুয়ে আছে। কেউই নাই সাথে। কপালে হাত দিয়েই বুঝলাম ১০২ ডিগ্রীর মত জ্বর। জ্বর মেপেও তাই পেলাম। আমি একটু হলেও নার্ভাস হয়ে পরি। এমন তো হওয়ার কথা না। কমবয়সী একটা ছেলে, ২৪/২৫ বয়স হবে বড়জোড়। জিজ্ঞেস করি-

: ব্যথা কেমন?

: ব্যাথা নাই ম্যাডাম। অপারেশনের কোনও সমস্যা নাই আমার। জ্বর ভাল হয়ে যাবে আপনি টেনশান করবেন না ম্যাডাম।

ডিউটি ডাক্তারকে কিছু টুকিটাকি ওর্ডার চেঞ্জ করে চলে আসি। রাত পর্যন্ত কেউই কোন ফোন করেনা। নিজেই ছটফট করে বেশ রাতেই ফোন করলাম। ডিউটি ডাক্তার জানালো রোগী ভাল আছে। আমি হাফ ছাড়লাম। পরদিন, ছেলে চলে যায় দেশে। ক্লিনিক থেকে আমাকে জানায় সে ভাল আছে। সে লজ্জায় আমাকে জানাতে পারেনি, কারন সে আমাকে টাকা কম দিয়েছিল। আমি পুরা অবাক। এই সামান্য ব্যাপারে সে এত লজ্জা পেলো!

আমি অনেক শিক্ষিত বড়লোক দেখেছি, এর চেয়েও বহুটাকা কম দিয়েছে। আমি টাকা গুনে নেই না। অনেক সময় বাসায় এসেও দেখেছি, যে টাকা বলেছে তার চেয়ে অনেক টাকা কম দিয়েছে। এরপর ফোনের পর ফোনে ত্যক্ত করেছে, দেড়বছর পরেও অন্য সমস্যা নিয়ে ফোনে চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের কখনও লজ্জিত হতে দেখিনি।

আমার কাছে রোগীরা সবসময় অসহায়, কিন্তু রোগীর সাথে আসা যত বেশি এটেন্টডেন্ট থাকবে, এদের বহু মত থাকবে। এদের রোগীর চিকিৎসা করে তো শান্তি পাওয়াই যায় না, তার উপর বিরক্তিকর হুমকি ধামকি তো আছেই। আমি একটা কথা বার বারই বলি, আপনি আপনার ব্যবহার দিয়েই যে কারো কাছে যে কোনও সেবা আদায় করে নিতে পারবেন। আন্তরিকতা উভয় দিকেই থাকতে হবে, শুধু একদিকে আশা করা কখনওই উচিৎ না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় ইরানের এগিয়ে চলার গল্প 

যতদিন যাচ্ছে ইরানের মেডিকেল সায়েন্স গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে অভূতপূর্ব সব অবিষ্কার। বিশ্ব…

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

বিদেশে চিকিৎসা: শোনা কথায় কান দিবেন না

যখন গাইনী আউটডোরে চাকরি করি তখন এক জুনিয়র এসে বলল "আপু তোমরা abnormal…

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

সাইমন্ড্স ডিজিজ রোগ ও তার প্রতিকার

আমাদের মাথার ভেতরে পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থান। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নানা রকম হরমোন…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর