ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০৫:৩৯ পিএম

পান্তাটিকা

পান্তাটিকা

ঐতিহ্য রক্ষায় বাঙালী বরাবরই আন্তরিক। এদেশের সংস্কৃতিতে বিজাতীয় আচার এদিক-সেদিক দিয়ে ঢুঁ মেরে ঢুকে পড়লেও বাঙালী তার নিজস্ব সংস্কৃতি কিন্তু ধরে রেখেছে বেশ পোক্তভাবেই। সময় যতো গড়াচ্ছে, সামাজিক গণমাধ্যমগুলোর প্রচার ও প্রসারে এ সকল কৃষ্টি-সংস্কৃতি আরও ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করছে। বাংলা নতুন বছর মানেই এখন ফেসবুক জুড়ে লালের ছড়াছড়ি। মাটির পাত্রে পান্তা-ইলিশ আর মরিচের নন্দিত উপস্থাপন।

পান্তা নিয়ে কোন কথাই থাকতে পারেনা। এই জিনিস মরিচ আর নুন দিয়ে ডলে খেতে যে আসলে কত সুস্বাদু তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। যদিও সম্মানের দিক থেকে কিভাবে যেন একে টেনে নামিয়ে ফেলা হয়েছে নিম্নস্তরের কাতারে। এখন একটি বিশেষ দিনে বিশেষভাবে খেয়ে আমরা পান্তার হারানো ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি মাত্র। কথা সেটা না। কথা হচ্ছিল, পান্তার সাথে থাকা ইলিশ প্রসঙ্গে।

কয়েকদিন আগে ঢাকায় গিয়েছিলাম সাউথ এশিয়ান গাইনোকলজিস্টদের কনফারেন্সে। ফিরে এসে রাতে খাবারের টেবিলে দেখি, গরম গরম জাটকা ফ্রাই। অবাক হয়ে জানতে চাইলাম- জাটকা আসলো কোথা থেকে?

আব্বু হেসে বললেন, বাজারে ছোট মাছ আনতে গিয়ে এগুলো পেলাম, তাই নিয়ে এসেছি।

: হায়! হায়! জাটকা কিনেছো কেন? এগুলো তো বেচাকেনা নিষেধ।

আব্বু মুচকি হেসে বললেন, আমি না কিনলে অন্য কেউ তো কিনতো! ওরা কি আর বেচা বন্ধ করতো?

চিন্তারই বিষয়। বাজারে জাটকা উঠার পর কেউ না কেউ তো কিনবেই। বিক্রি হবেই। আর লাভের আশায় ওরা আবারও জাটকা ধরবেই। এই চক্রের শেষ নেই।

আচ্ছা, ইলিশ বা ইলিশের বাচ্চা এই জাটকা নতুন বছরে না খেলে কি এমন হবে বলুনতো? জাত যাবে? আমরা আর বাঙালী থাকব না? কি হবেটা কি?

মাঝে একটা মজার গল্প বলে নিই। আমাদের এক নিকটাত্মীয়া আম্মার কাছে নানান বিষয় নিয়ে আবদার করে। আম্মা প্রায় নানাভাবে আমাকে ইঙ্গিত করে সেইসব আবদারের কথা শোনান। বাচ্চার দুধ কেনার সমস্যা, নতুন জামার সমস্যা, সংসার চালানোর সমস্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। তো, গেল বৈশাখের আগে আগে আম্মা বেশ কাঁদো কাঁদো গলায় আমাকে ফোন করে বললেন, জানিস, ও এত মন খারাপ করছিল! ইলিশ মাছ কিনতে পারছেনা। দাম বেশী।

: তো? সমস্যা কি?

: না। সমস্যা আর কি! সবাই ইলিশ কিনছে, ও পারছেনা।

: ইলিশ কিনতেই হবে এমন কোন কথা আছে আম্মা?

: না! দেখতো, সবাই কিনছে, খাবে পান্তার সাথে। বছরকার প্রথম দিন...!

: আম্মা, বছরকার প্রথম দিনে পান্তার সাথে ইলিশ খেতে হবে এটা কোথাও লেখা আছে?

: দেখতো,সবাই খাচ্ছে। তোরা খাবিনা?

: শোন আম্মা, আমি ফ্রিজ চেক করব। ইলিশ থাকলে রান্না করব, না থাকলে করব না। এই সময় আদিখ্যেতা করে ইলিশ কিনতে যাব না।

আম্মা বেশি সুবিধা করতে পারলেন না দেখে ফোন রেখে দিলেন। নববর্ষের দিন বেশ খুশী খুশী ভাব নিয়ে জানালেন, ও শেষ পর্যন্ত কিনতে পেরেছে ইলিশ।

: ওওহ তাই নাকি? তা সংসারে এত টানাটানি, ইলিশ কিনল কিভাবে?

: ওই যে বাসার উপরে জাটকা বিক্রী হতে এসেছিল। কম দামে। তাই দুটা কিনেছে।
: যাক। তাও ভাল। না হলে ইজ্জত চলে যাচ্ছিল! কোরবানি দিতে না পারলেও মনে হয় মানুষ এত দুঃখ পায় না!

আম্মা আবারো খানিক নাখোশ হয়েই ফোন রাখলেন। 

আসলে আমি কারে কি বলি! এই ঘটনা একটা উদাহরণ মাত্র। এই কাহিনী বাংলার ঘরে ঘরে। শোনেন, আপনার পয়সা আছে, ইলিশ কিনে খান, সারা বছর খান। কোন সমস্যা নেই। কিন্তু এই যে নতুন বছর উপলক্ষ্য করে ইলিশ, ইলিশের বাচ্চা, ইলিশের ডিম সব খেয়ে সাবাড় করে ফেলছেন এতে পক্ষান্তরে কার ক্ষতি করছেন? ভেবে দেখেছেন? আজকের জাটকাগুলো আগামী বর্ষায় ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা দেবে। ইলিশের বংশ রক্ষা পাবে। আর আমরা কি করছি? জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষার দোহাই দিয়ে দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের বংশই নির্ব্বংশ করে ফেলছি। এইটা কিছু হইল!

তার চেয়ে আসুন আমরা নাইলোটিকা মাছ দিয়ে পান্তা খেয়ে "পান্তাটিকা" উৎসব পালন করি। ইলিশও বাঁচল, পয়সাও বাঁচল, আর আমাদের পান্তা ঐতিহ্যও টিকে থাকলো।

নাইলোটিকা মাছ খাওয়ার ভিডিও দেখেন নাই? ওই যে ময়না নাইলোটিকার মাছ খায়, ময়নার কুউভ ফচন্দ। সেই মাচ আবার কুউভ ট্যাশ। আসলে কিন্তু রান্না করতে জানলে শুধু ইলিশ বা জাটকা না, সব মাছেরই খুব ট্যাশ।

আমরা সবাই যদি জাটকা কেনা বন্ধ করি, তাহলে এই অসময়ে জেলেরা আর সেটা ধরার জন্য কারেন্ট জাল ফেলবে না। বাজারেও উঠানোর প্রশ্ন আসবেনা। বর্ষার আগে আগে এই সময় ইলিশ ধরাটাও খুব বুদ্ধিমানের কাজ না।

তাইলে আর কি! চলেন বাজারে গিয়ে নাইলোটিকা মাছ কিনে আনি। পেঁয়াজ আর সামান্য টক দিয়ে নাইলোটিকার ভুনা, মুশরীর ডাল, আলু, মরিচের ভর্তা দিয়ে চটকায়ে পান্তা খাই নতুন বছরের নতুন প্রভাতে। আমাদেরও রসনা বিলাস হোক আর টিকে থাকুক বাঙালীর ঐতিহ্যবাহী পান্তা উৎসব।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না