আকমাল হোসাইন

আকমাল হোসাইন

সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ,
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ


১২ এপ্রিল, ২০১৯ ০৩:৪৯ পিএম

চিকিৎসকদের অবজ্ঞার আড়ালে

চিকিৎসকদের অবজ্ঞার আড়ালে

ডা. ইশতিয়াক বখত, ওসমানি হাসপাতালের চিকিৎসক। নামের পূর্বে ডা. শব্দ লিখা, যার সামাজিক অর্থ হলো যিনি সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন না। একইভাবে আমি একজন শিক্ষক, যার সামাজিক অর্থ হলো যিনি শ্রেণি কক্ষে পড়ান না। কথাটি শুনে হয় তো অবাক হবেন, কিন্তু লেখাটি আদ্যোপান্ত পাঠে এ নিয়ে আপনার বিভ্রান্তি দূর হয়ে যাবে। যাক, ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে আমার আবার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, যা শব্দ প্রয়োগ করে প্রকাশ করা যাচ্ছে না, কারণ সামাজিকভাবে শব্দটি গালি অর্থে ব্যবহৃত হয়।

তিনি ইতিমধ্যে রোগীদের মধ্যে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। ডা. ইশতিয়াক বখত যখন শাহপরানে (সিলেট শহরের পূর্ব প্রান্তে) ছিলেন, তখন থেকেই খুবই জনপ্রিয়। সেখানে তিনি সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই সময় দিতেন।

আমার পরিচিত একজন শিক্ষক তার পেটে ব্যথার কথা জানালে, আমি তাঁকে ডাক্তার সাহেবের কাছে যেতে বললাম। তিনি তখন খুবই নবীন ছিলেন বলে ওই শিক্ষক উনার উপর আস্থা রাখতে না পেরে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তার দেখালেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুস্থ না হয়ে শাহপরান স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডাক্তার সাহেবকে দেখালেন। ডাক্তার সাহেব সব কিছু শুনে অনুমান করলেন তার পেটে পাথর হয়েছে। চিকিৎসার অংশ হিসেবে টেস্ট এবং ওষুধ দিলেন, রোগী ভালো হয়ে গেলেন। রোগী আমার কাছে ডাক্তার সাহেবের শুধু সুনাম আর সুনাম করলেন, আমারও ভাল লাগলো—কারণ ডাক্তার সাহেব সম্পর্কে আমার…।

গত ২৮ মার্চ রাত ৯টার দিকে ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম, উনার মনটা খারাপ। কারণ জানতে চাইলে বললেন, ২১/২২ বছরের একজন গরীব রোগী তাঁর হাত ধরে বাঁচার আকুতি নিয়ে কেঁদেছে। কিন্তু তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ডাক্তার সাহেব নিজ পকেট হতে টাকা খরচ করে পথ্য আনালেন। কিন্তু একটিও সিট খালি না থাকায়, তাকে ICU তে নিতে পারলেন না।

ডাক্তারদের প্রতি ইতিবাচক হোন
আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি, শিক্ষকরা ক্লাসে পড়ান না, ডাক্তাররা হাসপাতালে রোগী দেখেন না। জানি না, মন্তব্যগুলো করার সময় আমরা কোনো বিদ্যালয় বা হাসপাতাল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি কিনা?

শিক্ষকরা ক্লাসে পড়ান না, ডাক্তাররা হাসপাতালে রোগী দেখেন না—সত্যিই যদি আমরা এই ধারণা বিশ্বাস করি, তবে স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে এক দিনের কর্মবিরতি ডাকলে এত হৈচৈ পড়ে কেন? কর্মবিরতি ডাকলেই কি, আর না ডাকলেই বা কি? তাঁরা তো পড়ান না বা রোগী দেখেন না।

শিক্ষকরা ক্লাসে পড়ান না, এই বিষয়ে আর লিখবো না। কারণ এই বিষয়ে আমার ওয়ালে লেখা আছে। আজ ডাক্তার সাহেবদের নিয়ে একটু লেখবো।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওয়ার্ডগুলো ঘুরে আসুন। সেখানে ডাক্তার-রোগী অনুপাত দেখুন। ভেবে দেখুন, বিরাট জনগোষ্ঠীর জন্য এত কমসংখ্যক ডাক্তার দিয়ে ভালো চিকিৎসা কিভাবে সম্ভব! আরও একটু নজর দিন, ডাক্তাররা ভিড়ের মধ্যে রোগীদের মধ্যে যাচ্ছেন কিনা?

আমরা শিক্ষকরা ক্লাস করার জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণি কক্ষ পাই না। বেঞ্চে ৩ জনের জায়গায় ৭ জন বসে। কোনো কোনো শ্রেণি কক্ষে ১৫০ বা ২০০ জন শিক্ষার্থী থাকে, সেথানে আপনি শিক্ষার্থীদের শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করবেন, না মানসম্মত শিক্ষা দিবেন? একইভাবে একজন ডাক্তার মাটিতে, বারান্দায়, বেডে ও লোকজনের ভিড়ের মধ্যে কতটুকু চিকিৎসা সেবা দিতে সক্ষম?

এরপরও আমাদের নিম্নবিত্ত লোকদের ভরসাস্থল হলো সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু চাহিদামতো সেবা না পাওয়ার কারণে আমরা সরাসরি বলি, ডাক্তাররা রোগী দেখেন না! রোগীদের বিভিন্ন চাহিদা—যেমন: বিছানা-পথ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। এগুলো মেডিকেল প্রশাসনের দায়িত্ব, সাধারণ ডাক্তাররা কী করবেন?

দেশের চিকিৎসকদের হেয়জ্ঞান কিসের আলামত?
আমরা নিজ দেশের ডাক্তারদের বদনাম করতে খুবই পছন্দ করি। কিন্তু বিদেশি ডাক্তারের সুনাম করতে গিয়ে একেবারে অজ্ঞান হয়ে যাই। আমাদের ডাক্তাররা রোগ ধরতে পারে না, কিন্তু ওরা (বিদেশি ডাক্তার) রোগ ধরতে পারে, ব্যবহার কত্ত ভাল।

আমরা যখন স্টেডিয়াম মার্কেটে (সিলেট) ডাক্তার দেখাতে যাই, তখন বাজেট থাকে গড়ে দেড়/দুই হাজার টাকা। ৬০০ টাকা ডাক্তার, বাকিটা ওষুধ-পথ্য বাবদ। স্টেডিয়াম মার্কেটের ডাক্তার যদি আপনাকে সমস্ত টেস্ট দেয়, তখন আপনি কী করবেন? বলবেন, কমিশন পাওয়ার জন্য টেস্ট দিয়েছে, আপনি অন্য ডাক্তারের কাছে চলে যাবেন।

স্টেডিয়াম মার্কেটের ডাক্তারের চিকিৎসায় সুস্থ না হলে আপনি চলে যান, ঢাকার ডাক্তারের কাছে। সেখানে আপনি মানসিকভাবে পূর্ণপ্রস্তুত হয়ে যান—কিছু টেস্ট করতে হবে, অর্থাৎ বাজেট বাড়াতে হবে। যেহেতু ঢাকার ডাক্তাররা একটু বেশি টেস্ট দিতে পারছেন, সেহেতু উনারা একটু বেশি রোগ ধরতে পারেন, ফলে চিকিৎসা সিলেটের তুলনায় ভালো হয়।

ঢাকার ডাক্তাররা ব্যর্থ হলে আমরা চলে যাই ভারতে। সেখানে কি আমরা এক/দেড় হাজার টাকা নিয়ে যাই? প্রয়োজন হলে জমি বিক্রয় করে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে যাই। ওখানে সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাই। হিসাবটা খবু সহজ, ভারতের ডাক্তাররা বাংলাদেশের ডাক্তারদের সমস্ত টেস্ট ও চিকিৎসা দেখে রোগী সম্পর্কে একটি আগাম ভাল ধারণা পায় এবং পরবর্তী টেস্ট ও চিকিৎসা সেবা দেন, ফলে রোগী ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

এক্ষেত্রে আপনি ভারতের স্টেডিয়াম মার্কেটের মতো জায়গায় ডাক্তার দেখিয়ে, তাদের রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপসন বাংলাদেশের ডাক্তারদের দেখান এবং ভারতের মতো লক্ষ লক্ষ টাকা বাংলাদেশে খরচ করুন, দেখুন বাংলাদেশের ডাক্তাররা রোগ ধরতে পারেন কিনা?

আর ব্যবহার! আমাদের জীবনে জড়বাদের প্রভাব বেশি। অনেকেই জড়বাদে বিশ্বাসী। ব্যবহার হলো এখন কর্পোরেট ব্যবহার।

সিলেট হতে ঢাকায় লোকাল বাসে যান, আবার গ্রিন লাইনে যান। দুই বাহনে ব্যবহার কী সমান? একটাতে বলছে, ‘হেই মিয়া চিল্লান ক্যান?’ আরেকটা বলছে, ‘স্যার আপনার জন্য কী করতে পারি?’ কারণ একটির ভাড়া ২০০ টাকা, আরেকটির ভাড়া ১২০০ টাকা।

আপনি লক্ষ টাকা খরচ করে ভারতে যাচ্ছেন, সেখানে ব্যবহার তো ভালই পাবেনই।  কারণ আপনার কাছে সুনাম শুনে আমিও যাবো। প্রয়োজনে জমি বিক্রয় করেও যাবো এবং বলবো, আহা ভারতীয় ডাক্তাররা কত্ত ভাল…, সিংগাপুরের ডাক্তাররা কত্ত ভাল…।

আমাদের মধ্যে এতো স্ববিরোধিতা যে, আমরা বলি, ডাক্তাররা প্রতিদিন এত রোগী দেখে! অথচ ওই ডাক্তারের টিকিট না পেলে আমরাই তার এটেনডেন্সকে কিছু দিয়ে টিকিট ম্যানেজ করি।

চিকিৎসা গ্রহণে ধারাবাহিকতা জরুরি
আমরা জ্বর বা কাশি হলেই একেবারে বড় ডাক্তারের কাছে চলে যাই। বিদেশে এত তাড়াতাড়ি বড় ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে যদি বড় ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে একটি নির্দিষ্ট লেভেলের ডাক্তারের রেফারেন্স লাগতো, তবে বড় ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগেই অনেকের রোগ ভাল হয়ে যেত। এবং এতে ডাক্তার ও রোগীর প্রকৃত অনুপাত কমে আসতো।

ডাক্তারদের নিয়ে যত ‘সমালোচনা’
ডাক্তারদের নিয়ে কারণে অকারণে নানা সমালোচনায় মুখর উঠি আমরা। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব সমালোচনার বিরাট অংশই স্রেফ প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। 

তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আমাদের দেশের বড় ডাক্তার সাহেবরা রোগী দেখতে এসে রোগীর আত্মীয়-স্বজন বা অভিভাবকের সঙ্গে মোটেই কথা বলেন না। উনারা যদি নিজ থেকে রোগীর আত্মীয়-স্বজন বা অভিভাবকের সঙ্গে এক মিনিট আলাপ করতেন, তবে ডাক্তারদের বদনাম সাধারণ জনগণের কাছে অনেকটাই কমে যেত।

আমাদের ডাক্তারদের একটি বড় বদনাম হলো, তাঁদের একটি অংশ  ডায়াগনোস্টিক সেন্টার হতে কমিশন নেন। যদি এই কমিশনটা তাঁরা না নিতেন, ডাক্তারদের মর্যাদা আরও বাড়তো।

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে একটি বড় ‘অভিযোগ’, তাঁরা থানা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে যান না। এরশাদ সরকারের সময়, হাইকোর্টকে বিভিন্ন জেলা শহরে স্থানান্তর করায় বিচারপতিরা আন্দোলন করেন, তা বন্ধ করে দেন। বাইরে বিভিন্ন যুক্তি থাকলেও, ভিতরের কথা হলো ঢাকার বাইরে চাকরি করতে রাজি না।

নির্মম সত্য হলো, বিচারকরা জেলা শহরে আসতে চাইলেন না এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে ছাড়লেন। কিন্তু ডাক্তার বা শিক্ষকরা ইউনিয়ন বা উপজেলা লেভেলে চাকুরি করছেন, হতে পারে মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

কথায় কথায় ডাক্তারদের বদনাম বেমানান
চিকিৎসা সেবা মানুষের নিকট সহজলভ্য করতে হবে। শুধু ডাক্তারদের বদনাম করলে হবে না। আমাদের দেখতে হবে, একটি ক্যানসার চিকিৎসায় টেস্ট, ঔষুধ বাবদ কতটাকা খরচ করছি এবং ডাক্তারকে কত টাকা সম্মানি দিচ্ছি। এক্ষেত্রে ডাক্তারের ফি মোট খরচের কত অংশ? এটি কী আমরা ভেবে দেখেছি?

চিকিৎসার নামে ডাক্তাররা আমাদের টাকা নিয়ে যাচ্ছেন, না মাল্টিনেশনাল কোম্পানিগুলো আমাদের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে? এই হিসাব সম্ভবত সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের হাতে নেই।

চিকিৎসার মানোন্নয়নে মনোযোগী হোন
বর্তমান সময়ে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন বীমা। যেমন ক্যানসার বীমা, হার্টে ভাল্ভ বা সার্জারির বীমা ইত্যাদি। কিছু নতুন নতুন বিষয় চিন্তা করতে হবে। আগে এগুলো চিন্তা না করলেও চলতো। কারণ তখন ক্যানসার হলে কেউ জানতো না। ভোগান্তির এক পর্যায়ে লোকটি মারা যেত, আর আমরা বলতাম, আহারে! কিছু দিন আগেও লোকটি ভালো ছিল।

এখন লোকজন রোগ সম্পর্কে আগে জেনে ফেলে। কিন্তু চিকিৎসার খরচ নেই, ফলে ফাঁসির কাষ্ঠের আসামির মতো তাকে মরতে হয়। এজন্য সময়ের অনিবার্য দাবি চিকিৎসা বীমা।

শেষ কথা হলো, সব পেশাতেই ভাল লোক আছে, আবার খারাপ লোকও আছে। আমরা দুর্নামকেই হাইলাট করি, কিন্তু সুনামকে, ভাল কাজকে লুকিয়ে রাখি। আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি, ডাক্তাররা রোগী দেখেন না, শিক্ষকরা ক্লাসে পড়ান না। অথচ একজন হাইস্কুলের শিক্ষক দৈনিক ৬টি ক্লাস নিচ্ছেন। এই শিক্ষক তো প্রতিবাদ করতে পারবেন না, কারণ শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে প্রবেশ করে টিভি ক্যামেরার সামনে কথা বলার মতো বুদ্ধিজীবী তিনি নন! আর ইশতিয়াক বখতের মতো ডাক্তাররা পকেটের টাকা খরচ করেও শুনবে, ডাক্তাররা রোগী দেখেন না।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে