ডা. শাহ মো. রিমান

ডা. শাহ মো. রিমান

রোগী কল্যাণ ও সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক,

ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ,

সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ।


১১ এপ্রিল, ২০১৯ ১২:১৪ পিএম

একটি রক্তদানের নেপথ্যের গল্প

একটি রক্তদানের নেপথ্যের গল্প

সকাল দশটা। রোজকার মতো আজও অপারেশন থিয়েটারে ডিউটিতে গেলাম। আজ সকালের প্রথম অপারেশন। সিজারের রোগী। এটা ৩য় বাচ্চা তাদের। রোগী আর বাচ্চা নিবে না। এজন্য লাইগেশান করাবে (যেন আর বাচ্চা না হয়)। তারা এক ব্যাগ রক্ত প্রস্তুত রেখেছে। একজন ডাক্তার তার অপারেশন করছেন (সহকর্মী সহ)। অপারেশন চলাকালীন তার হঠাৎ করেই রক্তক্ষরণ শুরু হলো প্রচন্ড। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার পরেও রক্তক্ষরণ থামছে না।

রোগীর অবস্থা যায় যায়। সাথে সাথে সিনিয়র ডিউটি ডক্টরদের বিষয়টা জানানো হলো। ওয়ার্ড থেকে মিনিট খানেক পরেই তাঁরা উপস্থিত অপারেশন থিয়েটারে। যিনি অপারেশন করছিলেন তার সঙ্গে এসে বাকী দু’জন সিনিয়র ডাক্তার যোগ দিলেন। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। রক্তক্ষরণ যেনো সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলছে। রোগীর লোকদের কাছ থেকে এক ব্যাগ রক্ত এনে ইতোমধ্যে দিয়ে দেয়া হয়েছে। রোগীর চেষ্টা চলছে যেনো রক্তক্ষরণটা থামিয়ে জরায়ুটা অক্ষত রাখা যায়। এতো চেষ্টার পরেও সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো জরায়ু সহ কেটে ফেলতে হবে। তাছাড়া আর রোগীকে বাঁচানো সম্ভব না। রোগীর লোকদের জানানো হলো, তারা রাজি।

অপারেশন থেমে নেই, চলছে রোগীকে বাঁচানোর লড়াই। আরেক ব্যাগ রক্ত লাগবে খুব দ্রুত। রোগীর লোকদের বলা হলো। তারা একে অন্যের মুখে তাকাতে শুরু করলো। তাদের চেহারা দেখে বুঝা গেলো, রক্ত দেয়ার মতো লোক তাদের আর নেই। এমন একটা পরিস্থিতিতে সাধারণত ব্লাড ব্যাংকে যাওয়া হয়, সেখান থেকে রোগীর লোক রক্তের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু এ হাসপাতালে বা আশেপাশে কোথাও ব্লাড ব্যাংক নেই।

অপারেশনের আগে রোগীর চারপাশে এতো লোক ছিলো, আর এখন এক ব্যাগ রক্ত লাগার সময় তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এটাই সব সময় হয়।

ডাক্তারের ভুল ধরার জন্য এদেশে সবাই ডাক্তার সাজতে পারে, কিন্তু নিজের রোগীর জন্য তারা রক্ত দিতে বা রক্তদাতা খুঁজে বের করতে অপারগ। 

সব দায় ডাক্তারের। এই রোগীটাই যদি এখন মারা যায়, তখন আবার সেসব মানুষকে পাওয়া যাবে। যারা একটা বিকারগ্রস্থ মানসিকতা নিয়ে আসে হাসপাতালে যে, একটা ডাক্তারকে কোনোভাবে যদি আঘাত করা যায়, তাহলে বাইরে গিয়ে বীরদর্পে বলা যাবে, "আজ হাসপাতালে ডাক্তার পিটিয়ে এসেছি, কসাইগুলা আমার রোগীটাকে বাঁচাতে পারেনি।”

আচ্ছা যাই হোক, যেখানে ছিলাম.... রোগীর লোক যেহেতু রক্ত খুঁজে বের করতে পারছে না, তাই বাধ্য হয়ে আমাদেরকেই খুঁজতে হবে। তা না হলে এমনও হতে পারে যে, রোগীটা রক্তের অভাবেই আজ অকালে মারা যাবে।

রোগীর কাগজে লেখা রক্তের গ্রুপ: A positive.

এখন রক্তের লোক খুঁজতে গেলেও অনেক সময় চলে যাবে। আমার রক্তের গ্রুপ একই। আশেপাশে আর কেউ নেই যে রক্ত দিবে। আগেও দিয়েছি রক্ত, তবে এভাবে ইমার্জেন্সী রোগীকে দেইনি। তাড়াতাড়ি করে ক্রস মেচিং এর কাগজ নিয়ে অপারেশন থিয়েটারের কাপড় পরেই রওনা হলাম দোতলায় রক্ত দিতে। দশ মিনিটের মধ্যে আমার এক ব্যাগ তাজা রক্ত রোগীর কাছে পৌঁছে গেলো। অপারেশন সম্পন্ন হলো। রোগী পরপর দুই ব্যাগ রক্ত পেয়ে এখন আগের চেয়ে ভালো। জীবনের ঝুঁকি আর নেই।

আজ সকালেও রোগীটাকে দেখে আসলাম। ভালো আছে আগের চেয়ে। বাচ্চাটাও সুস্থ আছে।

একটা বিষয় আমাকে খুব ভাবাচ্ছে, যতই ভাবছি হতাশ হচ্ছি। এই যে সকল ডাক্তারদের চেষ্টায় এতো সীমাবদ্ধতা থাকা স্বত্তেও এতো ইমার্জেন্সী একটা রোগীর জীবন বেঁচে গেলো, আমি যে এক ব্যাগ রক্ত দিলাম, তাদের মধ্যে ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাবোধ কাজ করেনি। তাদের কেউ একটা সামান্য ধন্যবাদ দেবার জন্যেও আমাকে খুঁজতে আসেনি।

একজন ডাক্তারের রক্ত দেয়ার পেছনের কাহিনীটা খুব সাধারণ নয়। যেখানে আমি নিজেই রক্ত দিয়েছি ৯ বার। রক্তের বিনিময়ে সামান্য ধন্যবাদটুকু আশা করাটাও বোধ হয় ডাক্তারদের উচিত না এদেশে। অথচ সামান্য কৃতজ্ঞতাবোধ পারে একজনকে আবার রক্তদানে অনুপ্রাণিত করতে।

দিন শেষে আমার মতো। যারা রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে, তারা এসব ছোট ছোট বিষয় মাথায় রাখে না। আবার কারণ ছাড়াই অনুপ্রাণিত হয় একইভাবে রক্তদেয়ার জন্য। যাতে বেঁচে যায় আরেকটি প্রাণ।

ভালো থাকুক সকল রোগী, সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাক।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত