ঢাকা      রবিবার ২৫, অগাস্ট ২০১৯ - ১০, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী

মেডিভয়েসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজজ

চিকিৎসকদের পদোন্নতি তিনটি ক্যাটাগরিতে হোক

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) বর্তমান  মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ। বর্তমানে ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ চিকিৎসক নেতা। এর আগে তিনি দেশসেরা চিকিৎসা বিদ্যাপীঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপনাও করেছেন। সম্প্রতি মেডিভয়েসের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে মিলিত হন অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ। আলোচনায় উঠে আসে সরকারি হাসপাতালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিভিন্ন বিষয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মামুন ওবায়দুল্লাহ।

মেডিভয়েস: সরকারি চিকিৎসকদের মধ্যে পেশা নিয়ে হতাশা কেন?
অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ: অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে উদাহরণস্বরূপ আমি বলি, যেমন: ৮ম বিসিএসের একজন গাইনোকলজিস্ট (স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ) ২৫ বছর ধরে জুনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছেন, আবার অন্য সাবজেক্টের ২৮তম বিসিএসের আরেকজন চিকিৎসক ইতিমধ্যেই সহযোগী অধ্যাপক হয়ে গেছেন। এ বৈষম্যের কারণে এ পেশায় হতাশা আসছে। এটা অবশ্যই সমন্বয় করতে হবে।

মেডিভয়েস: এই বৈষম্যর সমাধান কী?
অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ: বৈষম্যের বিষয়ে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মনে করেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর বিভিন্ন কোর্সে ২ থেকে ৩ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হন। তাদের মধ্যে সরকারি শিক্ষার্থী থাকেন, বেসরকারি শিক্ষার্থীও থাকেন। ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর ও চয়েসের ভিত্তিতে তারা নির্দিষ্ট বিষয়ে ভর্তি হন। এখন বেসরকারি শিক্ষার্থী যারা, তারা তো যা খুশি সেটাতেই পড়বেন। কিন্তু সরকারি শিক্ষার্থী যারা তাদের মধ্যে প্রতিবছর কতজন  সার্জারি, কতজন গাইনি বা কতজন অ্যানেস্থেশিয়ার চিকিৎসক দরকার এটা আগে থেকেই ঠিক করতে হবে। তারপর পরীক্ষার ভিত্তিতে মেরিট অ্যান্ড চয়েস অনুসারে নির্দিষ্ট বিষয়ে যতজন দরকার ততজন পড়ার সুযোগ পাবেন। তাহলে কিন্তু সমস্যাগুলো থাকবে না। পাঁচ বছরের মধ্যে সমস্যাগুলোর সমাধান হয়ে যাবে। বিদেশেও তাই হয়। এমনকি আমাদের  দেশে সেনাবাহিনীতেও তাই হয়। আমরা চাই এ সেক্টরেও এটা বাস্তবায়ন হোক।

পদোন্নতির ক্ষেত্রে আমাদের এখানে কিছু সমস্যা আছে। বর্তমানে একজন মেডিকেল অফিসার পরের ধাপে কনসালটেন্ট এরপরের ধাপে সহকারী অধ্যাপক হয়ে যান। আমরা চাচ্ছি পদোন্নতি তিনটা ক্যাটাগরিতে হোক।

একটা ক্যাটাগরি হোক মেডিকেল অফিসার, আরএমও, টিএইচও, সিভিল সার্জন, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর, ডেপুটি ডিরেক্টর, ডিরেক্টর, এডিজি, ডিজি এভাবে। তাদের প্রশাসনিক একটা লাইন থাকবে গ্রেড ওয়ান পর্যন্ত।

আরেকটা ক্যাটাগরি হবে জুনিয়র কনসালটেন্ট, সিনিয়র কনসালটেন্ট, এডিশনাল কনসালটেন্ট, চিফ কনসালটেন্ট এভাবে। তারা হাসপাতালে সার্ভিস দেবেন। শেষ ক্যাটাগরিটা হবে যারা শিক্ষকতা করবেন তাদের নিয়ে। তাদের ক্ষেত্রে লেকচারার, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও প্রফেসর এভাবে ভাগ করা উচিত। এভাবে ভাগ করে দেয়া হলে বৈষম্য কমে আসবে।

বিসিএসও এভাবে ক্যাটাগরি ভিত্তিক হবে। এগ্রিকালচারের মতো আমাদেরও বিসিএস ভাগ করে দিতে হবে। তাদের যেমন ভ্যাটেরিনারি, মৎস্য, পশু সম্পদ এরকম নয়টি ক্যাটাগরি আছে। আমাদের হেলথের ক্ষেত্রে এরকম হলে বৈষম্য কমে যাবে।

সরকার এগুলো বাস্তবায়ন করলে বৈষম্য সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বিসিএসের সব পোস্টে গ্রেড ওয়ান আছে, শুধু আমাদের চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে নাই। ডাক্তারদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পদোন্নতি হচ্ছে জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যন্ত। এর উপরে উঠতে পারবেন না। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরা মেডিকেল চান্স পায় আর তারা চাকরি জীবনে সর্বোচ্চ জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যন্ত হতে পারেন। আর অন্য বিসিএস ক্যাডাররা সচিব পর্যন্ত হন। না হলেও সচিব স্কেল পান। এটাও চিকিৎসকদের মধ্যে হতাশার একটা কারণ। সরকারের উচিত প্রশাসনে বৈষম্য কমাতে এ বিষয়টাতে নজর দেয়া।

মেডিভয়েস: অনেক চিকিৎসক নিজস্ব পেশা বাদ দিয়ে বিসিএসে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন, এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ: আমার সাথে যারা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে জয়েন করেছিলেন তারা সচিব হয়ে গেছেন। আর আমাদের চিকিৎসকরা হয়তো মেডিকেল অফিসার, সিভিল সার্জন, টিএইচও হয়ে অবসরে যাচ্ছেন। এমনকি তারা স্কেলও পান না। এজন্য হতাশা কাজ করছে। এজন্যই তরুণ চিকিৎসকরা অন্য প্রফেশনে চলে যাচ্ছেন। অন্য ক্যাডারে সময় যায়, স্কেল বাড়ে, পদোন্নতি হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে ৫ বছর ধরে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতে হবে, তারপর তিনবছর প্রশিক্ষণ দিতে হবে, ডিগ্রি নিতে হবে, বেশ কয়েকটা প্রকাশনা থাকতে হবে ইত্যাদি নানা হিসাব নিকাশ রয়েছে পদোন্নতিতে। এত কিছু পেরিয়ে তারপর কেউ সহকারী অধ্যাপক হন। তারপরেও আবার পরীক্ষা দিতে হয়। আমাদের হেলথে প্রমোশন জটিলতা অনেক। এ ধরনের নানা বিষয় বিবেচনা করে অনেক তরুণ চিকিৎসক অন্য পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

মেডিভয়েস: সম্প্রতি হাসপাতালে দুদকের অভিযানকে কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ: দুদকের অভিযান দেখে মনে হয়, দুর্নীতি শুধু স্বাস্থ্য সেক্টরেই হচ্ছে, আর কোথাও হচ্ছে না। কিছু গণমাধ্যমও একপেশে সংবাদ প্রচার করছে। এভাবে একপেশে সংবাদ পরিবেশনের কারণে জনগণের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়ছে, আর মন্ত্রণালয়ও বিব্রতবোধ করছে। দুদক একটা সরকারি সংস্থা, তারা যেতেই পারেন। কিন্তু তাদের অভিযোগ যৌক্তিক হতে হবে। আমি অসুস্থতার কারণে যদি একবেলা হাসপাতালে না যাই, সেটাও কি দুর্নীতি বা অনিয়ম হবে? যাই হোক, আমরা দুদকের অভিযানকে নেতিবাচকভাবে দেখি না। আসলে দুর্নীতি তো হয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। যেমন: অধিদপ্তর-মন্ত্রণালয়ের গুটিকয়েক জায়গায়। এর বাইরে তো সাধারণ ডাক্তাররা দুর্নীতি করেন না।

মেডিভয়েস: স্বাস্থ্যসেবা আইন কতদূর?
অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ: এটা হওয়া দরকার। এটা হলে চিকিৎসক এবং রোগী যার অপরাধ হবে সেই সাজা পাবেন। সাধারণ মানুষের সাথে চিকিৎসকের দূরত্ব কমে যাবে। এই আইনটা হলে রোগীর স্বজনরা যদি মনে করেন তার সঙ্গে অনিয়ম করা হয়েছে, তাহলে তিনি আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন। আবার চিকিৎসকও যদি মনে করেন রোগীর স্বজন তার সঙ্গে অন্যায় করেছে, তাহলে তিনিও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

একইভাবে প্রতিষ্ঠানের মালিক যদি মনে করেন তার হাসপাতাল ভাঙচুর করা হয়েছে, তাহলে তিনিও এই আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন। আইনটি দ্রুত সময়ের মধ্যে করা দরকার।

মেডিভয়েস: আপনাকে ধন্যবাদ।
অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ: আপনাকেও।

(সাক্ষাৎকারটি মেডিভয়েসের মার্চ-এপ্রিল ২০১৯ প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর