ঢাকা      সোমবার ২২, জুলাই ২০১৯ - ৭, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

মেডিকেল অফিসার, রেডিওলোজি এন্ড ইমেজিং ডিপার্টমেন্ট,

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল।


ডাক্তার সন্তানের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল চাই

বত্রিশ বছর আগের কথা। প্রতিটি মুহূর্ত যেন আজও একই রকম অস্থিরতা, ভীতি, উত্তেজনা নিয়ে বুকের মাঝে উথাল পাথাল। দাদার বংশের প্রথম নাতি আমি। বাবার মৃত্যুর পর থেকে দাদাই বিধবা ছেলে বৌ আর নাতির দেখাশোনা করেছেন। তাই দাদার কথার অবাধ্য হতে পারিনি।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় ছোট চাচা যখন পালিয়ে যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, দাদাজান তখন এইচএসসি পড়ুয়া আমাকে চাচার পাহারাদার নিযুক্ত করেছিলেন। আমি বেঈমানী করেছি দাদার সাথে। চাচার সাথে আমিও পালিয়ে যুদ্ধে চলে গেছি। সম্মুখ যুদ্ধে আমার সামনেই আমার ছোট চাচা শহীদ হলেন। বিজয়ের পর ফিরে এসে ঐ সন্তান হারা পিতার কান্না দেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যতদিন দাদা বেঁচে থাকবেন তার কথার অবাধ্য হবো না।

ঐ প্রতিজ্ঞার কারনেই বিয়ের পর পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পরীক্ষা দেবার পর যখন শহরের সরকারি স্কুলে শিক্ষক হয়ে জয়েন করলাম। তখনও বৌকে নিতে পারলাম না। আমি বিবাহিত ব্যাচেলর হয়েই থাকছিলাম। আর বৃদ্ধ মা, আমার প্রেগন্যান্ট বৌসহ দাদার কাছে গ্রামে।

শেষের দিকে বৌ খুবই রোগা হয়ে গেছিল। খুব দুর্বল দেখতে লাগতো। মা এসে বলেছিল ডাক্তার দেখাতে। দাদাজানকে বার বার করে বললাম। তিনি সৈয়দ বাড়ির বৌ বাচ্চা পেটে পুরুষ ডাক্তারের কাছে যাবে? কিছুতেই রাজি হলো না।

ছুটি শেষে মন খারাপ করে কর্মস্থলে ফিরলাম। কিছুদিন পর মায়ের চিঠি পেলাম, রুনার শরীর বেশি খারাপ। স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে লঞ্চে উঠলাম। বারো ঘন্টা লঞ্চ জার্নি। এরপর সাড়ে চার/পাঁচ ঘণ্টা নৌকার পথ। বাড়ি যখন পৌঁছলাম তখন সব শেষ।

প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরনে পুরো দুদিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে না ফেরার দেশে চলে গেছে রুনা। আমার অন্ধকার জীবনের জন্য রেখে গেছে এক টুকরো ফুটফুটে চাঁদ। মেয়ের নাম রাখলাম স্মৃতি।

দাদাজানের উপর ভীষন রাগ হলো। মাকে আর স্মৃতিকে নিয়ে সপ্তাহ খানেক পরেই শহরে এলাম। শহরে নতুন বাসা নিয়ে মাতৃহীন স্মৃতিকে বড় করতে লাগলাম। দুদিন পর পর মায়ের বিয়ে করে সংসারী হ, সংলাপ বাদে জীবন ভালোই চলছিল।

বিনা চিকিৎসায় স্ত্রী মারা গেছে। শহরের বালক বালিকা দুটো স্কুলেই শিক্ষকতা করেছি। সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়েছি চিকিৎসক হতে। জনসেবা, সম্মান, আর্থিক সচ্ছলতা -এই পেশাতে সব পাবে। একই চিন্তা স্মৃতির মগজে ও বসালাম।

মেয়েটি ছবি আঁকতে ভালোবাসে। সুন্দর কবিতা লেখে। সবাই প্রশংসা করে। বিভাগে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে প্রথম হয়। আমি গাল ফুলিয়ে বসে থাকি। ওকে তো ডাক্তার হতে হবে। বিনা চিকিৎসায় ওর মা মারা গেছে।

মেয়ে আমার অভিমান বোঝে। শীত নাই, বর্ষা নাই, গ্রীষ্ম নাই। মেয়ে শুধু পড়ে আর পড়ে। ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, ষ্টার মার্কস পেয়ে এসএসসি, এইচএসসি পাস। এর নেপথ্যের গল্প গুলো আর সময় গুলোও ভীষন কঠিন।

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষন। ভীষন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্মৃতি মেডিকেল কলেজে চান্স পায়। শুরু হয় অন্য এক জীবন যুদ্ধ। দিন রাত পড়া আর পরীক্ষা। নাওয়া নাই। খাওয়া নাই। মেয়ে ডাক্তার হচ্ছে। 

সুদীর্ঘ পথ চলার পর ডাঃ সৈয়দা স্মৃতি। আমার স্বপ্ন পূরন হলো। কিন্তু আফসোস। এ তো জীবন। বাংলা সিনেমা নয়। এই ছিল স্বপ্নের শুরু। ইন্টার্নশীপ কমপ্লিট হতে না হতেই মা চিল্লা চিল্লি শুরু করলেন। মেয়ে বিয়ে দে। একটু খোঁজ খবর করতেই ধাক্কা খেলাম।

গরীব মাষ্টারের মেধাবী ডাক্তার মেয়ের দর বিয়ের বাজারে শুন্যের কোঠায়। বাজার দখল করে আছে মেধাহীন, পালিশ কন্যাদের ধনবান পিতারা। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত বেসরকারি সংস্থাতে কাজ করছে এমন এক ডাক্তার পাত্রের সাথে স্মৃতির বিয়ে দিলাম।

এবার মেয়ে আর জামাতার যুদ্ধে সহযোদ্ধা হলাম। কি ঘর সংসার করবে। এরা দুজন কেবল পড়ছে আর পড়ছে। আমার মা মহাবিরক্ত। বয়স হয়েছে। নাতনী একদিন চিকিৎসা করাবারও সময় পায় না।

আমি বিরক্ত হই না। মেয়েটার জন্য মায়া লাগে। নিজের সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা হয়। আমার চাওয়ার জন্য আজ ও এই পেশায় এলো। যে পরিমান পড়াশোনা আর পরিশ্রম, শারীরিক মানসিক খাটুনী ও খেটেছে, তা অন্য যে কোন পেশাতে করলে আজ ও কোটিপতি থাকত এই বাংলাদেশে।

অথচ মলিন মুখে কেবল পড়ছে। বিসিএস করে পোষ্টিং পেয়েছে নিজ গ্রামে। আমি ও তাই অবসর জীবনের আরাম বাদ দিয়ে দুদিন পর পর গিয়ে খোঁজ নিতাম।

স্বামী স্ত্রী দুজন দুবছরেরও বেশি গ্রামে চাকরী করেছে। এরপর জেলা শহরে। একদিকে চাকরি একদিকে পড়াশোনা। এরি মাঝে জন্ম হয়েছে আমার নানাভাইয়ের। ওদের চাকরিতে না আছে টাকা। না আছে কোন সুযোগ সুবিধা। নিজ দায়িত্বে সবাই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হবার দৌড়ে।

আমি না হয় মেয়ের পিছন পিছন দৌড়াচ্ছি বলে স্মৃতি ছেলের চার বছর বয়সে গাইনী বিষয়ে এফসিপিএসে চান্স পেয়েছে। স্মৃতির বহুজন বন্ধুকে চিনি। কেউ অন্য ক্যাডারে চলে গেছে। কেউ জীবন নিয়ে ভীষন হতাশ। কেউ বাবা মা শ্বশুর বাড়ি থেকে পালিয়ে বেরাচ্ছে। ডাক্তার বৌ/ডাক্তার জামাই সবার এত চাহিদা কিছুই পূরন করতে পারছে না ওরা। কেউ চাকরি ছেড়ে হাউজ ওয়াইফ হয়ে গেছে। কেউ সংসার বাদ দিয়ে পড়ছে আর পরীক্ষা দিচ্ছে। কিছু কিছু পিতা মাতা ডাক্তারী পাস করিয়ে আকাশচুম্বী এক্সপেক্টেশন নিয়ে মানসিক অত্যাচার করছে। ওরা না পারছে বোঝাতে, না পারছে ভালো থাকতে। অনেকে বিশেষজ্ঞ হবার স্বপ্নের সাথে কম্প্রোমাইজ করে নিয়েছে।

আমি তবু আছি মেয়ের সাথে সাথে। আজও প্রতিদিনকার মতোই ওরা বাসায় নাই। জামাই নাইট ডিউটি করে হাসপাতালে। মেয়ে খুব সকালে বেড়িয়ে গেছে। মেয়ে ঢাকা মেডিকেলে গাইনী তে। নানাভাইকে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরেছি। মা মারা গেছেন দু’বছর।

ছুটা বুয়া কাজ করছে। টিভি ছেড়ে চ্যানেল ঘোরাতেই থ বনে গেলাম। অনেক রং বেরংয়ের পোষাক পরা মানুষ ঢাকা মেডিকেলের কোন একটা জায়গাতে ভাংচুর করছে। হৈ হৈ শব্দে কাঁচ ভাঙছে। রং বেরংয়ের পোষাক পরা মানুষ গুলো কিছু সাদা এপ্রনধারী মানুষকে আঘাতের পর আঘাত করছে। রক্তাক্ত সব সাদা এপ্রন। একটা মুখ খুব কাছে থেকে দেখালো। স্মৃতি!

হাত কাটা। ঠোঁট থেকে রক্ত পরছে। ব্যথাক্লিষ্ট মুখখানা একবার কি বাবা বলল? ফুটেজ শেষ হতেই খবরে বলছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাইনী বিভাগে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় ভুল চিকিৎসার অভিযোগে ভাংচুর এবং ডাক্তারদের আঘাত করে রোগীর স্বজন।

স্মৃতি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেরই একটি কক্ষে চিকিৎসারত। মেডিকেল কলেজ এর সামনে আজ কালো রংয়ের কাপড়ের টুকরো বুকে লাগিয়ে কিছু ডাক্তার বক্তব্য দিয়েছে।

আমার মাতৃহীন সন্তান। সারা জীবনে যার গায়ে একটা বার হাত তোলার দরকার পরেনি। দিন রাত পড়ে ডাক্তার হয়েছে। আজ সে রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজ কর্মস্থলে এমন আঘাতের শিকার? রোগীনি কোন রাজনৈতিক নেতার আত্মীয়। তাই মামলা নিচ্ছে না পুলিশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাগন ডাক্তারদের সহনশীল হতে বলেছে।

ডাক্তার দের সহনশীল হতে বলেছে। আর ডাক্তারদের পিতামাতাদের? ঐ রাতেই ফেসবুকে একটা গ্রুপ খুললাম। "আমার ডাক্তার সন্তানের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল চাই"। সব ডাক্তাররা এই গ্রুপে জয়েন করল। অনেকেই তাদের বাবা মাকে এড করল। অনেকে তাদের উপর কর্মস্থলে হওয়া হামলার ঘটনা শেয়ার করল।

কাউকে তুলে নেবার হুমকি। কাউকে জানালার কাঁচ ভেঙে হাত কেটে দেয়া। কারো হাতের দুটো হাড় ভেঙে দিছে। কাউকে বাথরুমের কমোডের সাথে মাথা টাকাইছে। কাউকে শ্লীলতাহানির হুমকি। অনেক কলিক/বন্ধুর কথা শেয়ার করল অনেকে যারা কর্মস্থলে খুনও হয়েছে।

সব পিতামাতা আজ অশ্রুসজল নয়নে কষ্ট বলছে। সময় ঠিক হলো। দেশের কোনা কোনা থেকে সব ডাক্তারদের পিতামাতা গন ঢাকা অভিমুখে ছুটল।

"আমার ডাক্তার সন্তানের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল চাই" লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে সকাল ছ’টার দিকে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে বসলাম। ধীরে ধীরে হাজার হাজার ডাক্তারদের পিতা মাতা, সন্তান আমার সাথে এসে বসল। ডাক্তাররাও এসে যোগ দিল। সাধারণ কিছু জনগন ও আমাদের সাথে যোগ দিল।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি পরাধীন দেশটাকে স্বাধীন করতে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে হাসপাতালে দেশের রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে আমাদের সন্তানরা এইভাবে রোগীর স্বজনদের আঘাতে রক্তাক্ত হবে?

বুকের সবটুকু কষ্ট আর্তনাদ হয়ে বেড়িয়ে এলো। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হলো শাহবাগ চত্বর। "মুক্তিযোদ্ধা মরে নাই। আর একটা মুক্তিযুদ্ধ চাই। তোমার আমার ডাক্তার সন্তান দের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল চাই।"

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে

হাসপাতালের সকলে মিলে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে পারে। সাধারণত যে মানুষ যেভাবে…

ভুতের হাসপাতাল!

ভুতের হাসপাতাল!

হুট করেই ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল। পড়ার টেবলে অন্যমনস্ক আমি যেই না সামনে…

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশন সমীপে কিছু কথা

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশন সমীপে কিছু কথা

বেশ কিছুদিন ধরেই ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাসবাহী এডিস মশার প্রকোপ বেড়েছে। রাজধানীতে এর…

স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হোয়াটস আপ ডক’ ৫০তম পর্বে

স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হোয়াটস আপ ডক’ ৫০তম পর্বে

ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ‘চিকিৎসা সংক্রান্ত’ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমরা সবাই অবগত। কিন্তু যদি বলা…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর