ডা. মৌলী আখন্দ

ডা. মৌলী আখন্দ

এমবিবিএস, এমপিএইচ (মা ও শিশু স্বাস্থ্য) 
সিনিয়র মেডিকেল অফিসার, 
এনআইসিইউ এণ্ড পিআইসিইউ ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ এণ্ড হসপিটাল।


০৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০৪:১৭ পিএম
বাচ্চা তো হবেই! এর আবার প্রস্তুতি কী?

প্রসঙ্গঃ গর্ভধারণ প্রস্তুতি ও অন্যান্য

প্রসঙ্গঃ গর্ভধারণ প্রস্তুতি ও অন্যান্য

বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা তো হবেই! এর আবার প্রস্তুতি কী? গর্ভধারণ সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষের ধারণা এমনটাই। কিন্তু আসলেই কি তাই? আমাদের বাসায় সম্মানিত বা আকাঙ্ক্ষিত কোনো অতিথি আসার আগে আমরা যেমন ঘরবাড়ি পরিষ্কার, রান্নাকরা ইত্যাদি প্রস্তুতি নিয়ে থাকি, ঠিক তেমনি আমাদের শিশুও আমাদের জীবনের এক বহুমূল্য, বহু প্রত্যাশিত অতিথি। সবচেয়ে বড় কথা, সে গড়ে উঠবে -বেড়ে উঠবে একদম শূন্য থেকে শুরু করে, তিলে তিলে অন্য একটি শরীর থেকে তার প্রাণ সঞ্চারী উপাদান সংগ্রহ করে।

পরিবেশের যে কোনো বিরূপ বা ক্ষতিকর উপাদান তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এখনো কি আপনার মনে হচ্ছে, শিশুকে মাতৃগর্ভে আনবার আগে কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই? চলুন দেখে নেয়া যাক কী সেই প্রস্তুতি।

শারীরিক প্রস্তুতি:

অন্তঃসত্ত্বা মাকে ভালো খাওয়াতে হয়, বেশি খাওয়াতে হয় এটা কমবেশি সবাই জানেন এবং মানেন। কিন্তু সেই ভালো খাবার বা বেশি খাবারটা আসলে কী? গর্ভবতী মা যা খেতে চাইবেন তাই? শুকনা মরিচ দিয়ে কিংবা শুটকি ভর্তা দিয়ে ভাত? নাকি রাস্তার বড়ই ভর্তা, আচার, ঝালমুড়ি?

আপনি যদি এমনটাই জেনে থাকেন যে অন্তঃসত্ত্বা মা যে খেতে চাইবেন তাই খেতে দিলেই চলবে তাহলে আপনি ভুল করছেন। আপনি যখন থেকে গর্ভধারণের জন্য পরিকল্পনা করছেন তখন থেকেই আপনার নিচের অভ্যাসগুলো গড়ে তুলতে হবে।

অভ্যাস:

১. সুষম খাদ্য গ্রহণ। যার মোট ক্যালোরির ৫০-৬০ শতাংশ আসবে শর্করা থেকে, ৩০-৩৫ শতাংশ আসবে তেল ও চর্বি জাতীয় খাবার থেকে, ১০-১৫ শতাংশ আসবে আমিষ বা প্রোটিন থেকে। সাথে অবশ্যই পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফল থাকতে হবে।

২. আপনার কতোটুকু ক্যালোরি প্রয়োজন সেটা কীভাবে ঠিক করবেন? আপনার ডাক্তার বা পুষ্টিবিদ আপনাকে বলে দেবেন আপনার উচ্চতা অনুযায়ী আপনার ওজন কি ঠিক আছে? ঠিক থাকলে আপনি নিশ্চিন্তে গর্ভধারণ করতে পারেন। কিন্তু যদি কম বা বেশি থাকে, ওজন ঠিক করার জন্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ডায়েট প্লান নিয়ে ওজন ঠিক করে তারপর গর্ভধারণ করা শ্রেয়। কম ওজনের মা যেমন কম ওজনের শিশুর জন্ম দেবেন ঠিক তেমনি বেশি ওজনের মা ভুগতে পারেন গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে। উভয় পরিস্থিতিই বাচ্চার জন্য সমস্যার কারণ।

৩. প্রচুর পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন দশ থেকে বারো গ্লাস।

৪. জাংক ফুড, ক্যান্ডি, সোডা এড়িয়ে চলতে হবে। রাস্তার খোলা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া যাবে না। কারণ, এতে থাকতে পারে টাইফয়েড হেপাটাইটিস সহ আরো অনেক মারাত্মক রোগের জীবাণু।

৫. ক্যাফেইন বর্জন করতে হবে। দিনে সর্বোচ্চ দুই কাপ কফি বা তিন কাপ চা পান করা যেতে পারে। কোলা ও চকলেটেও ক্যাফেইন থাকে তাই এগুলোও এড়িয়ে চলতে হবে।

৬. এলকোহল, এনার্জি ড্রিংক বর্জন করতে হবে।

৭. গর্ভাবস্থা ও এর প্রাকপ্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানটি হল ফলিক এসিড। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গর্ভধারণের অন্তত এক মাস আগে থেকে এবং গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস প্রতিদিন পাঁচ মিলিগ্রাম করে ফলিক এসিড সেবন আপনার শিশুকে রক্ষা করবে spina bifida, anencephaly র মতো প্রাণঘাতী জন্মগত ত্রুটির কবল থেকে।

অন্যান্য শারীরিক প্রস্তুতি:

১. অতিরিক্ত ফিটিং কাপড় পরবেন না। গর্ভধারণের চেষ্টা শুরু করার দিন থেকেই ঢিলাঢালা কাপড় পরার অভ্যাস করুন।

২. নিয়মিত ও স্বল্প সময় ধরে করা সম্ভব এমন কোনো সহজ ব্যায়াম শুরু করুন। সবচেয়ে সহজ ব্যায়াম হচ্ছে হাঁটা।

গর্ভধারণের পূর্বে কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে কি?

আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ ও অনুমতিসাপেক্ষে নিচের পরীক্ষাগুলো করতে পারেন :

১. রক্তের গ্রুপ (যদি না জানা থাকে)।

২. হিমোগ্লোবিন ও ফেরিটিন লেভেল (আপনার শরীরে রক্তাল্পতা বা আয়রন স্বল্পতা আছে কিনা দেখতে)।

৩. TORCH screening (রুবেলা ও অন্যান্য জন্মগত ত্রুটি সৃষ্টিকারী ভাইরাসের উপস্থিতি আছে কিনা জানতে)।

৪. VDRL

৫. রক্তের গ্লুকোজ, HbA1C

৬. HBSAg

৭. থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট ইত্যাদি।

পরিবেশগত প্রস্তুতি:

নিম্নলিখিত ক্ষতিকর পরিবেশ বা তার উপাদান থেকে আপনাকে দূরত্ব বা সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে:
১. প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান। অর্থাৎ শুধুমাত্র মা নয়,পরিবারের সকল সদস্যকেই অনাগত শিশুর স্বার্থে ধূমপান বর্জন করতে হবে।

২. চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনো প্রকার ওষুধ সেবন করা যাবে না।

৩. আপনার যদি আগে থেকেই এমন কোনো অসুস্থতা থেকে থাকে যার জন্য আপনাকে ওষুধ সেবন করতে হয়(যেমন এপিলেপ্সি,ডায়াবেটিস, হাইপোথাইরয়েডিজম,হার্ট ডিজিজ) তাহলে আপনার চিকিৎসককে জানান যে আপনি গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন। তিনি আপনার ওষুধ(এন্টি এপিলেপ্টিক বা এন্টি ডায়াবেটিক ড্রাগ বা আইবুপ্রোফেন, থাইরক্সিন ইত্যাদি) বা ওষুধের ডোজ বা শিডিউল বদলে দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা করে দেবেন। 

৪. আপনি যদি এমন কোনো কারখানায় কাজ করেন যাতে আপনাকে কীটনাশক, রঙ বা কেমিকেল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয় তাহলে অতি অবশ্যই গর্ভধারণের পূর্বে ডিউটি স্টেশন বা সম্ভব হলে চাকরি পরিবর্তন করে নেবেন।

৫. বাসায় বিড়াল থাকলে তার মলমূত্রাদি পরিষ্কারের দায়িত্ব কি আপনার? আজই এই দায়িত্ব অন্য কাউকে বুঝিয়ে দিন কেননা বিড়ালের মলমূত্রাদি বহন করতে পারে ক্ষতিকারক toxoplasma virus.

৬. আপনি যদি পেশায় ডাক্তার, নার্স,স্বাস্থ্যকর্মী বা রেডিওলোজী নিয়ে কাজ করেন এমন যে কেউ হয়ে থাকেন তাহলে আজই আপনার ডিউটি স্টেশন পরিবর্তন করুন কিংবা কর্মস্থলে খোলাখুলি কথা বলুন। রেডিয়েশন এক্সপোজার মারাত্মক জন্মগত ত্রুটিপূর্ণ শিশুর জন্ম দিতে পারে। 

গর্ভাবস্থায় যেসব টিকা দেওয়া যাবে না/পেশায় ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী হলে যেসব রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে/যেসব টিকা নেয়ার পর গর্ভধারণের জন্য অন্তত ছয়মাস অপেক্ষা করতে হবে:

১. হাম

২. ইনফ্লুয়েঞ্জা

৩. মাম্পস

৪. মেনিনজাইটিস

৫. রুবেলা

৬. MR

৭. চিকেন পক্স

৮. বিসিজি

৯. টাইফয়েড

মানসিক প্রস্তুতি:

গর্ভকালীন সময়ে দুশ্চিন্তা এড়িয়ে চলতে হবে। হতাশা উদ্রেককারী চিন্তা করা যাবে না। এমনকি, চিকিৎসক পরিবারের সকল সদস্য বিশেষ করে বাবাকে মায়ের সম্ভাব্য মানসিক পরিবর্তনের কথা জানাবেন এবং মাকে মানসিকভাবে সহায়তা করার জন্য বলবেন।

অর্থনৈতিক প্রস্তুতি:

যেদিন থেকে আপনি গর্ভধারণের পরিকল্পনা করবেন, সেদিন থেকেই চিকিৎসা ও প্রসব খরচ সামলাতে একটি ফাণ্ড গড়ে তুলুন। তা হতে পারে একটি মাটির ব্যাংকও। হয়ত প্রয়োজনের মুহূর্তে এটি আপনার বা আপনার শিশুর জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসার খরচ যোগাতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে