ঢাকা      শুক্রবার ২৩, অগাস্ট ২০১৯ - ৮, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. আজাদ হাসান

সিওমেক , ২১তম ব্যাচ।


স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের দাবি

চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল চাই

অতি সম্প্রতি পর পর দু'দিনে সরকারি দু'টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরপর দু'দুটি ঘটনা ঘটে গেলো, যা কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। আর এসব ঘটনাগুলোকে এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ক্রমাগত চিকিৎসা পেশা সম্পর্কে মিডিয়ার অপপ্রচার এবং চিকিৎসা পেশার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা মূলত চিকিৎসক এবং রোগীর মাঝে যে আস্থাহীনতার সৃষ্টি করেছে, তারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

দেশবাসীর কাছে বলতে চাই, আমরা সেবা দিতে এসেছি, মার খেতে আসিনি। একজন ডাক্তার হিসেবে রোগীকে সেবা দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পেশাগত জ্ঞান, অভিজ্ঞতালব্ধ স্কিল বা দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আমরা চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আমরা চিকিৎসা দিতে পারি, কিন্তু আমরা কখনো কারো জীবনের গ্যারাটি/নিশ্চয়তা দিতে পারি না। আমরা উভয় ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত এবং যথাযথ বিচার চাই।

একের পর এক সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপর এ ধরনের ন্যাক্কারজনক হামলা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার আগে প্রয়োজন যারা চিকিৎসা সেবা দিবেন অর্থাৎ চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিক্সসহ সর্বস্তরের চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

একজন ডাক্তার রোগীকে সেবা দেওয়ার ব্রত নিয়েই চিকিৎসা পেশাকে বেছে নেন। কিন্তু তাকে যদি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সতত উদ্বিগ্ন থাকতে হয়, তা হলে তখন তার কাছ থেকে ইস্পিত বা কাঙ্খিত সেবা কখনো আশা করা যায় না। কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। স্থানীয়ভাবে নেতাদের মধ্যস্থতায় কেবল মাফ চাওয়াটা আর সমঝোতা করা মূল সমস্যার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান বলে মনে করি না।

আমার মতেঃ

যেই রোগীদ্বয়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে, হাসপাতাল রেকর্ড হতে সে সম্পর্কে তথ্য নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিত ওই রোগীর পার্টির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ-এর অংশ হিসেবে মামলা করা। কারণ-

১. সংশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বা পরিচালকের দায়িত্ব প্রশাসনিক প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত সর্বস্তরের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে সরকারি দায়িত্বে থাকা কর্তব্যকালীন সময়ে কেউ বহিরাগত সন্ত্রাসী দ্বারা আক্রান্ত হলে মামলার মাধ্যমে তাকে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে।

২. সরকারি সম্পত্তি নিরাপত্তা ও সুষ্ঠভাবে রক্ষণা-বেক্ষণ করাও আপনার দায়িত্ব। সুতরাং যারা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করেছে তারা নিঃসন্দেহ সন্ত্রাসী, সুতরাং তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

৩. বিষয়টি দ্রুত সমাধান কল্পে প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে হবে, প্রয়োজনে মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়া যেতে পারে।

আমরা আর কোনো হতাশার বানী নয়, চাই স্থায়ী সমস্যার সমাধান। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাই আমাদের প্রতি যত অন্যায় আচরণ হচ্ছে তার আইনানুগ বিচার চাই।

প্রসঙ্গত, এ মুহূর্তে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়ননের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণর নিমিত্তে সর্বস্তরের চিকিৎসকদের সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে এবং বিএমএকেও সম্পৃক্ত হতে হবে।  ‘নিরাপদ কর্মস্থলের’ নিশ্চয়তাকল্পে নিম্নে উল্লেখিত পদক্ষেপসমূহ এখনই নেয়া আবশ্যক।

১. ডাক্তারদের ‘কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক আইন প্রণয়ন’ ও তার বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া।

২. হাসপাতালের কর্মক্ষেত্র নিরাপদ করতে অবিলম্বে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ‘বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী’ নিয়োগ প্রদান করা।

৩. ডাক্তারদের আইনি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্য প্রয়োজনীয় ‘আইন সহায়তা দানকারী’ পারমানেন্ট ‘আইনজীবী প্যানেল’ গঠন করা।

৪. ইতিমধ্যে যাদের দ্বারা ডাক্তার এবং হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা লাঞ্ছিত হয়েছেন তাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. জরুরি ভিত্তিতে বিএমএ প্রতিনিধিবৃন্দের উচিত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের গোচুরিভূত করে এতদ-সংক্রান্ত একটি বক্তব্য হোক কিংবা সরকারের পক্ষ হতে প্রেস রিলিজ ঘোষণা আদায় করা।

উল্লেখিত দু'দিনে আমাদের পেশার যে নবীন সহকর্মী ভাইটি কিংবা বোনটি অন্যায়ভাবে কিছু মাস্তান দ্বারা বর্বরোচিত কায়দায় প্রহৃত এবং লাঞ্ছিত হলো তাদের বহিরাঙ্গের ক্ষত হয়ত শুকিয়ে যাবে, কিন্তু অন্তরে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে যে ক্ষত আজ সৃষ্টি হয়েছে, তা কখনো শুকাবার নয়। এই ক্ষতের রেশ রয়ে যাবে অনন্তকাল।

মানুষের কর্ম প্রেরণার উৎস মানুষের অন্তঃকরণ। কিন্তু কেউ যদি কর্মস্থলে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, কিংবা সেবা প্রদানকারীকে যদি জনগণ হতে যথাযথ সম্মানের পরিবর্তে নিগ্রহের শিকার হতে হয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যদি কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়, তখন আর মানুষের ভেতর হতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মস্পৃহা জাগ্রত হয় না। কাজের প্রতি মানুষ আগ্রহ ক্রমশ হ্রাস পায়। সেখানে জন্ম নেয় দারুণ হতাশা এবং দেশ ও জাতির প্রতি ক্ষোভ মিশ্রিত একধরনের ঘৃণা।

প্রতিটি মানুষের অন্তরে একটি সফ্ট স্পেস থাকে, যা একান্তই নিজস্ব। এই স্থানটি যদি একবার আহত হয়, তার প্রভাব হয় সুদূর-প্রসারী। তাই সার্বিক বিবেচনায় বিষয়গুলো গুরুত্ব অনুধাবন করতঃ সরকারের উচিত আন্তরিকতা সহকারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ভিআইপি রোগী

ভিআইপি রোগী

এমবিবিএস পাস করে কেবল ১৯৮৫ সনের নভেম্বর মাসে ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং শুরু করেছি।…

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা ‘অশনিসংকেত’

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সৈন্যের সংখ্যা বিশ্বে তৃতীয়! অথচ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কোনো…

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

গর্ভবতী মায়ের সন্তানের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু, করণীয় কী?

ডেঙ্গু বিষয়ক নানা প্রশ্নের একটি হচ্ছে, গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গু হলে সন্তানেরও তা…























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর