ঢাকা      সোমবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ফারহানা আফরোজ সীমা

সহকারী অধ্যাপক,

কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মির্জাপুর, টাঙ্গাইল।


বাচ্চা কিছুই খায় না!

আজ আউটডোরে রোগীর চাপ কম। আরামসে পড়তেছি। এর মধ্যেই আমার সহকারী ঢুকল পেশেন্ট নিয়ে। আমার যত পেশেন্ট তার শতকরা ৯৯.৯৯ জনের সমস্যা হলো বাচ্চা কিছুই খায় না। এই খায় না রোগাক্রান্ত বাচ্চার চিকিৎসা করা অন্য যেকোন কঠিন রোগের চিকিৎসা করার থেকে বিন্দুমাত্র কম না। কারণ, এই চিকিৎসার মূল থেরাপি দিতে হয় বাচ্চার মাকে। একজন পেডিয়াট্রিশিয়ানকে এক পেশেন্টের জন্য দু'জনকে চিকিৎসা দিতে হয়, এক বাচ্চা, দুই বাচ্চার মা।

বাচ্চার চিকিৎসা করার থেকে বাচ্চার মার চিকিৎসা করা কঠিন। তাকে প্রচুর কাউন্সেলিং করতে হয়। এখন যে পেশেন্ট ঢুকল তার সমস্যা ঠান্ডা কাশি এবং অবশ্যই বাচ্চা কিছুই খায় না। পরীক্ষা করে দেখলাম বাচ্চার তেমন কোন সমস্যা নাই। একটু নাক দিয়ে পানি পড়ছে, কিন্তু বুকে কোন সমস্যা নাই এবং দেড় বছরের বাচ্চার ওজন ১৭.৫ কেজি। যেখানে দেড় বছরে ১২-১৩ কেজি থাকলেই আলহামদুলিল্লাহ্। ওষুধ লিখে দিলাম। মায়ের পছন্দ হলো না, বললো-

- রুচি বাড়ার ওষুধ দেন, জোর করে খাওয়াইতে হয়, নিজে থেকে চায় না।

- জোর করে খাওয়ানোটা বন্ধ করেন। বাচ্চার সামনে খাবার দেন। পরিবারের সবাই একসাথে খেতে বসেন। বাচ্চার সাথে এমনভাবে বিহেভ করেন যেন সে এই পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাকে আলাদা প্লেট গ্লাস দেন। সবাই যেটা খায় সেটাই বাচ্চাকে খেতে দিন। কিছু খাবে কিছু ফেলবে, এভাবেই খেতে শিখে যাবে। জোর করে ঠেসে বেঁধে খাওয়ালে বাচ্চা খেতে শেখে না।

- অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু লাভ হয় না।

- আপনার বাচ্চার ওজন প্রয়োজনের থেকে অনেক বেশি। ওজন কম থাকা যেমন খারাপ, বেশি থাকাও খারাপ। সব ধরনের খাবার দিতে হবে বাচ্চাকে। আপনি বোধহয় সুজি বেশি খাওয়ান।

- কীভাবে বুঝলেন? সুজি-ই তো খায়। আর কিছু খেতে চায় না।

- দিয়ে দেখছেন কখনো? সব ধরনের পারিবারিক খাবারে বাচ্চাকে অভ্যস্ত করতে হবে। বড়রা যা যা খায় সেটাই খেতে দিতে হবে। সুজি বেশি খায় মানে বাচ্চা কর্বোহাইড্রেট বেশি খায়। টিভি দেখতে দেখতে খাওয়ানো যাবে না। এতে মনোযোগ থাকে টিভির দিকে। খাবার দেখলে যে খাদ্যরস নিঃসরণ হবার কথা সেটা ঠিকঠাক হয় না। কিন্তু টিভি দেখার তালে তালে বাচ্চা ঠিকই খেয়ে ফেলে, যার জন্য হজম প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়। এটা বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর।

- তারমানে সবার সাথে একসাথেই একই খাবার বাচ্চা কে খেতে দিবো?

- হুম অবশ্যই। এবং দেখবেন কিছু ফেলবে কিছু খাবে এভাবেই খাওয়াটা শিখে যাবে। একই খাবার প্রতিদিন দিবেন না। এতে বাচ্চারা একঘেয়ে হয়ে যায়।

- জোর করে না খাওয়ালে খাবে বলে তো মনে হয় না।

- চেষ্টা করেই দেখেন না। আগেই হাল ছেড়ে দিলে তো হবে না। আর একটা কথা, বাচ্চার খাবার অবশ্যই স্বাদের হতে হবে। অনেকেই মনে করে বাচ্চার খাবার এক রকম হলেই হলো। এটা ঠিক না। খাবারের স্বাদ বোঝার পূর্ণ ক্ষমতা আল্লাহ্ ওদের দিছে। যেন তেন খাবার দিলেই তো সে খাবে না। বাচ্চাকে খাবার দেবার আগে নিজে খেয়ে দেখবেন। যদি সেটা আপনার মুখেই ভালো না লাগে তো বুঝবেন বাচ্চা এটা কোনভাবেই পছন্দ করবে না।

উনি বেরিয়ে যেতেই পরের পেশেন্ট ঢুকলো। এই বাচ্চার সমস্যা সে শুধু বমি করে। হাসিখুশি ইন্টারেক্টিভ একটা তিন বছরের বাচ্চা। মায়ের সাথে গল্প করে যেটা জানতে পারলাম মা বাচ্চাকে ওভার ফিডিং করায়। সাথে থাকা বাচ্চার বাবা দেখলাম খুব বিরক্ত। বলছে-

- খাওয়ানোর এক পর্যায়ে দেখি বাচ্চা ওক দিচ্ছে। তখন বলি এখন রাখো যা খেয়েছে আলহামদুলিল্লাহ্। কিন্তু ও প্লেটে থাকা শেষ দানা পর্যন্ত খাওয়াবে। একটু খাবার থেকে গেলেও ওর নাকি মনে হয় বাবু কিছুই খায়নি। ব্যাস ছেলেটা খাবার শেষ হতে না হতেই গলগল করে বমি করে দেয়। এখন এর মায়ের চিকিৎসা করেন আপা।

এই রকম নানা সমস্যা নিয়ে দিন কাটে আমার। বেশিরভাগ বাচ্চারই তেমন কোন মেজর সমস্যা থাকে না। শুধুমাত্র ভুল টেকনিকের কারণেই বাচ্চারা খেতে চায় না।

তারপরও অনেক সময় অন্য সমস্যা ও থাকে কারো করো। তখন রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

হার্ট ফেইলিউর: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

হার্ট ফেইলিউর: পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা

কেরামত মোল্লা সারারাত সোজা হয়ে বসে কাটিয়ে দেন। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ, ঘুমাতে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস