ঢাকা      মঙ্গলবার ২০, অগাস্ট ২০১৯ - ৫, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


ডাক্তার কি অমরত্ব সুধার শিশি নিয়ে বসে আছে!

ডা. হাবিব পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্সের স্টুডেন্ট। তার কর্মস্থল শহরের এক সরকারি হাসপাতাল। হাসপাতালের কাছেই এক মেসে থাকেন গত ক'বছর ধরে। পরিবারের অন্য সদস্যরা থাকেন ঢাকার বাইরে। তার কোন বিশ্রাম নেই। ডিউটির অবসরে সারাদিন পড়ে থাকেন লাইব্রেরিতে। মুখ বুঝে পড়েন মোটামোটা সব বই। দিন নেই রাত নেই, পড়াশোনা করছেন আর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অসংখ্য রোগীদের। সুস্থ করে তুলছেন বহু মরণাপন্ন মানুষকে।

ঘটনার দিন ঐ রকমই এক মরণাপন্ন রোগী বিভিন্ন জায়গা ঘুরে রাত ১১ টা নাগাদ তাদের হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়। রোগীর অবস্থা তেমন সুবিধার নয়। তাদের যতটুকু যা করার তার সবটুকুই তারা সাধ্যানুযায়ী করলেন। পড়দিন সকালে রাউন্ডে এসে বড় স্যার রোগীর লোককে সব বুঝিয়ে বললেন, যে কোন সময় রোগী খারাপ হতে পারে। রোগীকে রাখা হয়েছে সিসিইউর নিবিড় তত্বাবধানে। ডা. হাবিব নিয়মিত রোগীর খোঁজখবর নিয়ে ফলোআপ করছেন।

দুপুর তখন সাড়ে তিনটা। ডা. হাবিব তখনো দুপুরের খাবার খাননি। কাজের ব্যস্ততায় সময় পাননি সকালের নাস্তা করার। ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে তার, তাই সামান্য কিছু মুখে দিতে নিচের ক্যান্টিনে বসে আছেন তিনি। হঠাৎই উপর থেকে রোগীর এক লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে তার সামনে। খাওয়া ফেলে ডা. হাবিব দৌঁড়ে উপরে ছুটে যান।

দ্রুত পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন রোগীর কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়েছে। পালস, বিপি, অক্সিজেন স্যাচুরেশন সব কমতে শুরু করেছে। তিনি দ্রুত ইমার্জেন্সি চিকিৎসা শুরু করলেন, সিপিআর দিলেন, রোগীর জীবন বাঁচাতে যতটুকু যা করার তার সবটাই করলেন। কিন্তু বিধিবাম, শেষ রক্ষা হল না। সব চেষ্টাকে বিফল করে রোগী চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

ডা. হাবিবের তখন মনে পড়লো তার বাবার কথা। বছর পাঁচেক হল তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। হার্ট এ্যাটাক হয়েছিল তার। চেষ্টায় কোন কমতি করেননি তারা, কিন্তু বাঁচাতে পারেন নি তাকে, কারণ এটাই নিয়তি ছিল। তিনি তখন মেডিকেল স্টুডেন্ট, সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কার্ডিওলোজিস্ট হবেন। যতটুকু পারেন চেষ্টা করবেন অসুস্থ মানুষগুলোকে সুস্থ করার, বাকিটা আল্লাহর হাতে।

এসব ভাবতে ভাবতে অজান্তেই ডা. হাবিবের চোখে পানি চলে আসে। এ পানি দৃষ্টিগোচর হয়না রোগীর আত্মীয় লোকটির। সে তখন দূরে দাঁড়িয়ে ফোনে কার সাথে কি যেন আলাপ করছে, আর রাগী রাগী চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে। তার অল্প কিছুক্ষণ পরই বাইরে বেশ শোরগোল শোনা গেল। বেশ কিছু ষণ্ডামার্কা লোক হুড়মুড় করে ওয়ার্ডে ঢুকে পড়লো। ঢুকেই শুরু করলো এলোপাথাড়ি ভাংচুর আর বেধড়ক মারধর। এরকম ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন বাস্তবে তারা কোনদিন হননি।

ডা. হাবিব কি করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। তিনি লোকগুলোকে বুঝানোর চেষ্টা করছেন। তারা যে তাদের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন, এখানে যে কারো কিছু করার নাই সেটা বারবার বলছেন, কিন্তু কে শোনে কার কথা। কেউ থাপ্পড়, কেউ লাথি ঘুষি, কেউ কলার ধরে টান, কেউ বা দিচ্ছে সজোরে ধাক্কা। শার্টের বিভিন্ন জায়গা ভেদ করে চামড়া ছিড়ে একাকার। ডা. হাবিবের গায়ের সাদা এপ্রনটা রক্তে ভিজে লাল হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ এক লোক স্যালাইন ঝুলানো স্টান্ডটা খুলে সজোরে তার দু পায়ে বাড়ি দিতে শুরু করলো। প্রচন্ড ব্যাথায় ককিয়ে উঠলেন তিনি। দাঁড়াতে পারলে না, কাটা কলা গাছের মত টুপ করে ফ্লোরে পড়ে গেলেন। মনে হল আজই বুঝি তার জীবনের শেষদিন। ডা. হাবিবের চোখে তখন তার মায়ের মুখটা ভেসে উঠল, ভেসে উঠলো সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর মুখখানি। চোখ দিয়ে ছলছল করে পানি পড়ছে তার। ব্যাথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর।

এভাবে মার খেতে খেতে যখন আধমরা অবস্থা, বাইরে তখন আনসারদের বাঁশির শব্দ শোনা যায়। মাস্তান লোকগুলো তৎক্ষণাৎ ওয়ার্ড ছেড়ে দৌড়ে বের হয়ে আনসারদের সাথেও মারামারি শুরু করে। সেখানেও এক ভয়ানক অবস্থা তখন।

কিছুক্ষণ পর। ওয়ার্ডের মধ্যে যেন ঘুর্ণিঝড় বয়ে গেছে, চারপাশে লণ্ডভণ্ড অবস্থা। ফ্লোরে পড়ে আছে সাদা এপ্রণে ঢাকা রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত আহত একটি শরীর!

ছোট বেলা থেকে জীবনে কারো সাথে মারামারি করেননি, কারো খারাপ হোক সেটাও তিনি কখনো চাননি। সাধারণ ঘর থেকে কলমের জোরে আজ এখানে তিনি পৌছেছেন। ডা. হাবিব সাধারণ মানুষকে ভীষণ ভালবাসেন। তাদের জন্যই বিনিদ্র রজনী উৎসর্গ করেছেন। আজ সে যাদের কাছে মার খেলো, তাদের না আছে বিবেক, না আছে ভদ্রতা। তাদের এতটুকু জ্ঞান নেই যে কোন ডাক্তার রোগীকে মারে না, বরং ডাক্তার রোগীকে বাঁচাতে চায়, কিন্ত সব রোগীকে বাঁচানোর ক্ষমতা ডাক্তারের নেই। যে কোন মানুষের মৃত্যুই বেদনাদায়ক। যার যায় তার কি বেদনা তা ডাক্তাররাই সব থেকে ভাল বোঝে। কত ডাক্তার যে ডেথ সার্টিফিকেট লিখে নীরবে চোখের জল ফেলে তা কতজন জানে?

অবশেষে ডা. হাবিবকে সেখান থেকে উদ্ধার হল। এক্সরে দেখা গেল তার দুপায়েই মাল্টিপল ফ্রাকচার। অনেকগুলো অপারেশন আর বহুদিনের চিকিৎসা শেষে তিনি কিছুটা সুস্থ হলেন, কিন্তু ঠিকভাবে হাটতে পারবেন না তিনি কখনোই। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে স্ক্রাচে ভর করে চলতে হবে বাকিটা জীবন।

সব মিলিয়ে মানসিকভাবে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে যান। পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসের কারণে সবসময় কেমন যেন চুপচাপ হয়ে থাকেন। সেবা আর দিতে পারেন না তিনি, তার রাতগুলো নির্ঘুম হয় ভয়ংকর এক স্বপ্ন দেখে...

উপরের ঘটনাটা পুরনো, বহু কষ্ট নিয়ে বছরখানেক আগে লিখেছিলাম। আশায় বুক বেঁধেছিলাম, অমানুষগুলো মানুষ হবে। কিন্তু না, সে আশায় গুড়েবালি দিয়ে কক্সবাজার মেডিকেলে আবারো চিকিৎসকের উপর আক্রমনের ঘটনা ঘটলো। কবে হবে মুক্তি, অস্থির সময় থেকে কবে হবে পরিত্রাণ...

কিছু মানুষ কখনোই বুঝবে না, কখনোই খুঁজবে না এই অধমদের দিনগুলো কিভাবে যায়। কজন ডাক্তারের ডিউটি কত অল্প জনে করতে হয়। পরিবার-পরিজন বাড়ি-ঘর ছেড়ে কত দূরে থেকে তাদেরকে সেবা দিতে হয়। খাতা কলমে ফার্স্ট ক্লাশ হয়েও কতটুকু কম সুবিধা নিয়ে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। দিনশেষে অনেকে যখন ঘুমস্বপ্নে বিভোর তখন তাদের নিদ্রাহীন চোখে দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়। সবাই যখন আনন্দ উদযাপন আর ছুটি ভ্রমণে মগ্ন তখন তাদের কঠিন সব পড়া আর পরীক্ষা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করতে হয়।

ওহে অমানুষ, কে চায়, কেনই বা চায় তার কাছে আসা রোগীটা মরুক! বাঁচলেই যে তার সার্থকতা, এটাই যে তার পেশা। অসুস্থের জন্য যতটুকু যা করেছে তা তাকে বাঁচানোর জন্যই। কিন্তু সবাই কি বাঁচে রে পাগলা! ডাক্তার কি অমরত্ব সুধার শিশি নিয়ে বসে আছে! সে শুধু চেষ্টাটুকু করতে পারে, বাকিটা যে স্রষ্টার হাতে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

সরকারি হাসপাতালে নানা অনিয়মই যখন নিয়ম!

একজন কনসালটেন্ট তার মামাতো ভাইকে দেখাতে এসেছে। রোগীর সাথে কথা বলছি, এই…

ডেঙ্গু নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করবেন না 

ডেঙ্গু নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করবেন না 

গুজবে কান দেয়া হুজুগে মনুষ্য জাতির এক সহজাত প্রবৃত্তি। এই সুযোগটাকেই কাজে…

ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবস্থাপনায় মশারীর বিকল্প প্রস্তাব

ডেঙ্গু রোগীদের ব্যবস্থাপনায় মশারীর বিকল্প প্রস্তাব

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য সব সরকারি হাসপাতাল এবং কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর