ঢাকা রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪ ঘন্টা আগে
নাহিদ মুনতাসির

নাহিদ মুনতাসির

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ 


১৯ অগাস্ট, ২০১৬ ১৭:৪২

ইবনে সিনা

ইবনে সিনা

বুখারার ‘আফসানা’র কাছাকাছি জন্মগ্রহণ করে যে অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তি তাঁর জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন বাকিটা পৃথিবী তিনি ‘ইবনে সিনা’। তার পুরো নাম আবু আলী আল হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে  সিনা। দশম শতাব্দীর অসামান্য এ মেধাবী ব্যক্তিত্ব ইউরোপে আভিসিনা (Avicenna) নামে সাধারণভাবে পরিচিত।

৯৮০ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণকারী ইবনে সিনার অবদান চিকিৎসা শাস্ত্রে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রায় ৭০০ বছর ধরে তাঁর লিখিত বইগুলো অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ সহ ইউরোপের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হতো। 

ইবনে সিনা তাঁর প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন বুখারায়। ইসমাইল সুফী, আবু আব্দুল্লাহ নাতিলিসহ অন্যান্য বিখ্যাত শিক্ষকের কাছে দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, জ্যামিতি, ফিকহ, তাফসীর ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। এমন বহু দিন রাত্রি অতিবাহিত হয়েছে যার মধ্যে তিনি ক্ষণিকের জন্যও ঘুমাননি। কেবলমাত্র জ্ঞানসাধনার প্রতিই ছিল তার মনোনিবেশ। যখনি কোন সমস্যার সম্মুখীন হতেন তিনি তখনই মসজিদে গিয়ে সিজদায় পড়ে কান্নাকাটি করে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমার জ্ঞানের দরজাকে খুলে দাও। জ্ঞান লাভ ছাড়া পৃথিবীতে আমার আর কোন কামনা নেই।’ 

সে সময় বুখারার সম্রাট ছিলেন নূহ ইবনে মনসুর। সম্রাটের এক দূরারোগ্য ব্যধির চিকিৎসা করতে দেশ-বিদেশের বড় বড় চিকিৎসকেরা ব্যর্থ হবার পর এগিয়ে আসেন তরুণ ইবনে সিনা। তাঁর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন সম্রাট। কৃতজ্ঞ সম্রাট তাঁকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। কিন্তু ইবনে সিনা রাজি হলেন না। তার বদলে চাইলেন রাজকীয় গ্রন্থাগার ব্যবহারের সুযোগ। এই গ্রন্থাগারের সব গ্রন্থ ইবনে সিনা কয়েক দিনের মধ্যেই আত্মস্থ করে ফেলেন।

ইবনে সিনা চিকিসাশাস্ত্রের উপর প্রচুর লেখালেখি করেছেন।Cannon of Medicine (Al Kanun Fi Al Tibb)  এবং The Book of Cure (Kitab Al Shifa) এ দুটি অবিস্মরণীয় বইয়ের লেখক তিনি। ইবনে সিনা তার বইগুলোতে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার বর্ণনাও দিয়েছেন। যেমনঃ সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্রবণ, ক্যালসিয়াম পলি সালফাইড, কপার ও সোনার ভষ্মীকরণ, সালফারের তরলীকরণ ইত্যাদি।

অসাধারণ মেধাবী ইবনে সিনা ‘জড়তা’ ধারণার প্রবক্তা। তিনি ‘কিতাব আন নাজাত’ বইতে লিখেছিলেন, ‘কেউ নিজে নিজে নড়াচড়া বা নিজে নিজে স্থির হতে পারে না;’ যা জড়তার মূলনীতির একটি স্পষ্টতর ব্যাখ্যা। এছাড়া ইবনে সিনা Specific Gravity নিয়েও গবেষণা চালান। 

জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতের সময়েও ইবনে সিনা কখনোই জ্ঞানের চর্চা থামিয়ে রাখেন নি। একে একে তিনি খোয়ারিজম, গুরুগঞ্জ, খোরাসান প্রভৃতি শহর ভ্রমণ করেন। এ সময় গজনীর সুলতান মাহমুদ তাঁকে তাঁর রাজ্যসভায় যোগ দিতে আদেশ করেন। কিন্তু ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হবে এই ভয়ে তিনি তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে ‘জর্জন’ নামক স্থানে আত্মগোপন করেন। সুলতান মাহমুদ সেখানেও তাঁকে খুঁজতে লোক পাঠালে তিনি ইরানের দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে তিনি কবি ফেরদৌসির জন্মস্থান ‘তুস’ নগরী পরিদর্শন করেন এবং পরবর্তীতে ইরানের সুপ্রাচীন শহর হামদানে গমণ করেন। ঘটনা পরিক্রমায় ইবনে সিনা হামদান থেকে পলায়ন করে ইস্পাহানে আসেন। এখানেই তিনি ‘কিতাব আল ইশারাত’ রচনা করেন। 

পরবর্তীতে হামদান ও ইস্পাহানের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গেলে ইবনে সিনা সৈন্যবাহিনীর সাথে যেতে বাধ্য হন। একদিন তাঁর ভৃত্য ষড়যন্ত্র করে ওষুধের সাথে আফিম মিশিয়ে দিলে বিষক্রিয়ায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মুসলিম চিকিৎসাশাস্ত্র ও দর্শনের এ অনন্য চিন্তানায়ক মৃত্যুবরণ করেন ১০৩৭ খৃস্টাব্দে। 

যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের অস্তিত্ব ছিল না, তখন হিপোক্রেটস তা সৃষ্টি করেন, যখন তা মরে গিয়েছিল তখন তা পুনরুজ্জীবিত করেন ‘গ্যালেন’, যখন তা বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তখন ‘আল রাজী’ এ বিজ্ঞানকে সুসংবদ্ধ করেন আর ‘ইবনে সিনা’ একে পরিপূর্ণতা দান করেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তার সৃষ্টির মাধ্যমে।
 

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৩, বর্ষ ১, নভেম্বর ২০১৪ তে প্রকাশিত)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত